প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

কবিতা— গন্ধ | কবি— নীলাঞ্জনা মল্লিক | পর্যালোচক— তৈমুর খান

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/পর্যালোচনা/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | পর্যালোচনা
কবিতা— গন্ধ
কবি— নীলাঞ্জনা মল্লিক
পর্যালোচক— তৈমুর খান

"কবিতাটি একজন নারীর নীরব আত্মাহুতির এক চমৎকার আলেখ্য। কিছু ছোটখাটো উপমাগত অসংগতি বাদ দিলেএটি অনুভূতির একটি তীব্র ঘ্রাণ পাঠকের মনে রেখে যায়।"

 
[কবির নাম না-জেনে শুধু কবিতা ও শিরোনামের ভিত্তিতে এই পর্যালোচনা]
 
সব পোড়া গন্ধ একরকম হয় না
 
পয়মন্তী জানে—
ভালবাসা পোড়ার গন্ধ
অনেকটা শেষ বসন্তের জুঁইয়ের মতো
 
বিশ্বাস পুড়লে
ভেজা শ্যাওলার স্যাঁতসেঁতে গন্ধ
 
সতর্কতা পুড়লে চন্দন ধূপের
আর…
 
সদ্যস্নাতা মায়ের গন্ধ আসে
স্মৃতি পুড়ে ছারখার হলে
 
পয়মন্তী প্রদীপশিখাকে আগুন বলে
 
আগুন লাগে আঁচলে
মেঘলা শান্ত চোখে
কখনও-বা দুপুররোদে খোলা পিঠে ঘুমিয়ে থাকা স্নিগ্ধ সতীত্বে
 
লোকে বলে আলোয় আলো
বউটা সুলক্ষণা বটে!
 
টগবগে তেলে ফোড়ন দেওয়ার ঘ্রাণে
বিহ্বল পাড়াপড়শি
 
শুধু পয়মন্তীই জানে
 
তার নিপুণ হাতের রান্নার সুবাস
অনেকটা
পোড়া স্বপ্নের মতো
 
#################
 
কবিতাটি একটি সংবেদনশীল এবং রূপকধর্মী সৃষ্টি, যা নারীর অভ্যন্তরীণ দহন এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যকার বৈপরীত্যকে চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। নিচে কবিতাটির একটি কাব্যিক সমালোচনা ও কিছু ত্রুটি তুলে ধরা হলো:
 
কাব্যিক সমালোচনা
 
কবিতাটির মূল শক্তি এর ঘ্রাণজ অনুভূতি (Olfactory Imagery)কবি এখানে বিমূর্ত অনুভূতিগুলোকে (ভালবাসা, বিশ্বাস, স্মৃতি) মূর্ত ঘ্রাণের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
 
রূপকের ব্যবহার: ভালোবাসার দহনকে 'শেষ বসন্তের জুঁই' বা স্মৃতি পোড়াকে 'মায়ের গন্ধে'র সাথে তুলনা করাটা বেশ মৌলিক এবং স্পর্শকাতর। এটি পাঠককে কেবল ভাবায় না, বরং এক ধরণের ঘ্রাণানুভূতি দেয়।
 
নারীবাদী ও সামাজিক প্রেক্ষাপট: কবিতার শেষ অংশে এসে কবিতাটি একটি শক্তিশালী সামাজিক বয়ানে রূপ নেয়। 'পয়মন্তী' (যে সুলক্ষণা) নামটির আড়ালে যে নারীটি প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন আর অস্তিত্বকে বিসর্জন দিচ্ছে, সমাজ তাকে কেবল তার 'রান্নার সুবাস' বা 'সুলক্ষণা' রূপেই চেনে। তার 'স্নিগ্ধ সতীত্বে' আগুন লাগার বিষয়টি সমাজের অবদমনকে ইঙ্গিত করে।
 
বৈপরীত্যের সার্থকতা: বাইরের মানুষের কাছে যা সুস্বাদু রান্নার 'ফোড়ন দেওয়ার ঘ্রাণ', পয়মন্তীর কাছে তা 'পোড়া স্বপ্নের মতো'। এই বৈপরীত্য কবিতাটিকে একটি বিষণ্ণ কিন্তু গভীর সমাপ্তি দিয়েছে।
 
কিছু ত্রুটি ও উন্নয়নের জায়গা
 
কবিতাটি শক্তিশালী হলেও গঠনগত ও ভাবগত কিছু সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে:
উপমার অসামঞ্জস্যতা: "বিশ্বাস পুড়লে ভেজা শ্যাওলার স্যাঁতসেঁতে গন্ধ"—এই উপমাটি কিছুটা বিভ্রান্তিকর। সাধারণত পোড়া জিনিসে শুষ্ক বা ঝাঁঝালো গন্ধ প্রত্যাশিত। ভেজা শ্যাওলার গন্ধ 'পচন' বা 'অব্যবহৃত' কিছুর ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু 'দহন' বা পোড়ার তীব্রতা সেখানে কিছুটা ম্লান হয়ে গেছে।
 
ছন্দ ও যতিচিহ্নের শিথিলতা: কবিতাটি মুক্তছন্দে লেখা হলেও কিছু জায়গায় পঙ্‌ক্তি বিন্যাস (Line break) আরও আঁটসাঁট হতে পারত। যেমন—'আর…' লিখে লাইন ভেঙে দেওয়াটা নাটুকে মনে হতে পারে, যা কবিতার গাম্ভীর্যকে কিছুটা হালকা করে দেয়।
 
অস্পষ্ট চিত্রকল্প: "সতর্কতা পুড়লে চন্দন ধূপের"—এখানে সতর্কতা পোড়ার সাথে চন্দন ধূপের সম্পর্কটি খুব একটা স্পষ্ট নয়। চন্দন ধূপ সাধারণত পবিত্রতা বা আরাধনার প্রতীক, সতর্কতার সাথে এর যোগসূত্রটি আরেকটু ব্যাখ্যাসাপেক্ষ।
 
শব্দ চয়ন: "পয়মন্তী প্রদীপশিখাকে আগুন বলে"—এই লাইনটি কিছুটা আক্ষরিক। এখানে আরও গভীর কোনো রূপক ব্যবহার করলে কবিতার কাব্যিক মান আরও বৃদ্ধি পেত।
 
কবিতাটি একজন নারীর নীরব আত্মাহুতির এক চমৎকার আলেখ্য। কিছু ছোটখাটো উপমাগত অসংগতি বাদ দিলে, এটি অনুভূতির একটি তীব্র ঘ্রাণ পাঠকের মনে রেখে যায়।
 
 

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)