প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

ক্ষণিকের অতিথি | আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত

বাতায়ন / ক্ষণিকের অতিথি /সম্পাদকীয়/ ৩য় বর্ষ/৪৪তম সংখ্যা/২৩শে   ফাল্গুন ,   ১৪৩২ ক্ষণিকের অতিথি  |  সম্পাদকীয়     আতঙ্কবাদ ও আতঙ্কগ্রস্ত ...

Sunday, March 8, 2026

মায়া কাজল | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪তম সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
মায়া কাজল

"হাওয়ার ছোঁয়ায় টের পান অনিমেষ ছুঁয়ে গেল বুঝিএই বার্ধক্য আসা শরীর এখনো সেই তরুণীর মতো কেঁপে ওঠে ভাল লাগায়। বলা যায় নাকি কাউকে?"

 
বহুদিন ধরে তনুশ্রীর একটা স্বপ্নকে মনের গভীরে লালনপালন করে গেছে সেটা হলো নিজের ফ্ল্যাট। 217/5A চন্ডী ঘোষ রোডের এই পুরোনো পৈতৃক বাড়িটা অবশেষে ও ছাড়তে পারবে। একদিনের জন্যেও গত দশ বছর ধরে এই বাড়িটা ও নিজের বাড়ি ভাবতেই পারেনি। ওর মতে শাসন আর নিয়মের গুঁতোয় ভাবতে দেওয়াই হয়নি এটা ওর নিজের বাড়ি, ভাড়াটের মতো থেকেছে প্রতিটা পল অণু পল এখানে। দোলের দিন ওর নিজস্ব প্রাসাদে একটা ছোট্ট পুজোর আয়োজন করে তারপর থেকে ওর আস্তানা হবে ছিমছাম স্বপ্নের সেই বাড়িটা। আহ্‌! মুক্তি! মুক্তি! মুক্তি...
 
তনুশ্রী কোনদিনও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারে না কিন্তু নতুন ফ্ল্যাটে যাওয়ার আনন্দে ইদানীং ওর ঘুম-খিদে সবই কমে গেছে। এখন বেশ ঠান্ডা ভোরের দিকটা, একটা জয়পুরী চাদরে নিজেকে মুড়ে বাড়ির সামনের ছোট্ট বাগানটাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে ও। গোলাপ ফুলে বাগানটা আলো হয়ে আছে, গোলাপি রঙের একটা পাপড়ির ওপর ছোট্ট শিশির বিন্দু। হাত ছোঁয়ালেই ভেঙে যাবে। তনুশ্রী যেন সমাহিত, এত সুন্দর দৃশ্য, এ যে অলৌকিক!
 
পরমা অনেকক্ষণ ধরেই লক্ষ্য করছিলেন বৌমাকে, এমনিতে শাশুড়ি-বৌমার ভাব হয়নি, আসলে স্বভাবেই মেলে না। মেয়েটিকে বড্ড চঞ্চল মনে হতো, কিছুটা নিজের মনের মতো করে গড়ার চেষ্টা করেছিলেন ওই আদবকায়দা, সাজগোজ, রান্না যা তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে নিজের শাশুড়ি রেণুকাদেবীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন কিন্তু এই মেয়ে তো কিছুই শিখল না বরং নিত্যদিনের খিটমিট চলল ছেলের সাথে। এখন নিজের ফ্ল্যাটে চলে যাচ্ছে। যাক্ যে যেখানে ভাল থাকবে সেখানেই যাক। পরমার কিচ্ছু যায় আসে না। তবু আজ ভোরে ফুল গাছটার সামনে মেয়েটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মনে হচ্ছে ও নিজেই একটা 'নরম আলোয় মাখা ভোর'কী ভাল লাগছে মেয়েটাকে আজ পরমার, কোনো রাগ নেই আর।
 
মানুষের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টা বড়ই বেরসিক, এই যেমন এখন রসভঙ্গের কারণ হলো তনুশ্রীর কাছে। ঘোরটা ভেঙেই দেখে সামনেই 'মাননীয়া পরমাদেবী মহাশয়া', বড় জ্বালিয়েছেন এই মহিলা দশ বছরে। কী সব আদ্দিকালের ধ্যানধারণা নিয়মকানুন পুজো (বাপরে চাপড়া ষষ্ঠী, ইতু পুজো আরো কত কত কী!) নিজেও পালন করে চলেছেন, তনুশ্রীকেও বাড়ির বৌ বলে করতে হবে ! অত মজা নেই। এইবার একটু নিজের মতো করে বাঁচব। তবু মুখে হাসি নিয়ে এগিয়ে আসে তনুশ্রী শাশুড়ির দিকে। ওটাই ভদ্রতা, ওটাই হয়তো নিয়ম।
-মা তেজপাতা গাছ আর নিম গাছটা কিন্তু বড় সুন্দর আমাদের বাগানের। আর যত গাছই থাকুক।
-তেজপাতা গাছটা লাগিয়েছিল তন্ময়ের বাবা আর নিম গাছটা আমার শাশুড়ি। তোমার দিদিশাশুড়ি কনকলতাদেবী। বড় সুন্দর মানুষ ছিলেন, বড় আদুরে।
-মা, একটু বাবার কথা বলুন-না!
পরমাদেবী সংসার করলেন কত বছর? আঠারো না উনিশ? না আঠারো বোধহয়! জটিলতাবিহীন এক মানুষ ছিলেন অনিমেষ, গাছ বড় ভালবাসতেন, পরমাদেবীরও গাছ ভালবাসা স্বামীর হাত ধরে। বয়সে অনেকটাই বড় ছিলেন, প্রায় পনেরো বছর। আদর করে বলতেন,
-পরমা ফুল আর ফলকে ভালবাসব গাছের যত্ন নেব না, তাই কি হয়?
কত বছর মানুষটা চলে গেছে, প্রায় বছর একুশ বোধহয়, কেউ জানে না যখনই এই তেজপাতা গাছ, এই বাগানে পা রাখেন পরমা অনুভব করেন তাঁর স্বামীকে। হাওয়ার ছোঁয়ায় টের পান অনিমেষ ছুঁয়ে গেল বুঝি, এই বার্ধক্য আসা শরীর এখনো সেই তরুণীর মতো কেঁপে ওঠে ভাল লাগায়। বলা যায় নাকি কাউকে? তনুশ্রী দেখে শাশুড়ির ফর্সা মুখটা ধীরে ধীরে লাল হচ্ছে, দূরের দিকে চোখ কিছু ভাবছেন। কৌতুহলটা একটু দমন করল ও। গলাটা একটু খাঁকড়ানি দিল।
পরমাদেবী মনে মনে একটু লজ্জা পেলেন, ধুলো ঝাড়ার মতো ভাললাগাটা এই মুহূর্তে মন থেকে সরিয়ে পরিষ্কার গলায় তনুশ্রীকে বললেন,
-জানো আমার শাশুড়ি বড় ভালবাসত তন্ময়ের দাদুকে। একবার বাবার অসুখ করেছিল, জ্বর। তখন মা-র কত হবে ওই বছর তেরো, বাবার বালিশে আঠা ঢেলে দিয়েছিলেন, যাতে যেই বালিশে মাথা দেবে অমনি মাথাটা আটকে যাবে। ব্যস আর যমে নিয়ে যেতে পারবে না।
হা হা করে হেসে ওঠেন পরমা।
-মা বলতেন ঘরবাড়ি-সংসার কিচ্ছু বোঝেন না, খালি জানতেন নিজের স্বামীকে। ওইরকম ভালবাসা, ওইরকম টান আর একটিও দেখলাম না গো, যদি আমি লিখতে জানতাম লিখতাম ওদের কথা
একটু চুপ করেন পরমা। গাঁদা গাছের মাটিটা একটা খুঁচিয়ে দেন। গাঁদা গাছের পাতার গায়ের মাটিগুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলেন,
-আমিও তাই ছিলাম, বড় যত্ন-আদর-প্রশ্রয় পেয়েছি তন্ময়ের বাবার কাছে। এই বাড়ি, এই নিয়ম কিচ্ছু আমারও ভাল লাগত না। কত লোক তখন! এখন তো শরিকি ভাগ হয়ে গেছে। এই ঘরে একজন তো করিডোরে একজন, খাওয়ার সময় ঠিক নেই। তবু তোমার বাবা আমার খেয়াল রেখে গেছেন। আমিও চেয়েছি তোমার বাবাকে সুখী করতে, ভাল রাখতে। যেমনটি নিজের শাশুড়িকে দেখেছি। সেই থেকে এই বাড়ি, লোকজনের মায়ায় জড়িয়ে গেলাম। তোমার বাবা আজ অন্য পৃথিবীর বাসিন্দা তবু জানো এই বাগানে ছাদে এই বাড়ির আলোতে হাওয়ায় ওনাকে অনুভব করি আজও। তাই এই বাড়ি আমারই অংশ। আরেকটা রক্তমাংসের পরমা।
-তনুকে ডাকো এইবার, চা বসাই চলো।
পরমাদেবী বাথরুমের দিকে গেলেন হাত-পা ধুতে।
বাগানে একা দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে তনুশ্রী এত জেদি, সংস্কার আচ্ছন্ন, ব্যক্তিত্বময়ী মানুষটার মধ্যে এত প্রেম! তাও যে কবেই পৃথিবী থেকে চলে গেছেন! এই কি তবে সেই  অনুভূতি যেখানে একে অন্যের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়!
তনুশ্রী দেখল হঠাৎ ওঠা হাওয়ায় বাগানের ফুলগুলো নাচতে শুরু করল, যেন ওকে বলছে, হ্যাঁ গো তুমি যা ভাবলে তাই
গা-টা শিরশিরিয়ে ওঠে তনুশ্রীর...
 
~~000~~

No comments:

Post a Comment

ফিরতে হবে ঘরে~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)