বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ছোটগল্প
অর্পিতা
চক্রবর্তী
তাজমহল
"শিবু এক দৌড়ে গিয়ে দেখে একটা ছোট্ট পাখি পুটুর খাঁচায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসলে পুটু চলে যাওয়ার পর থেকে ওই খাঁচার দরজাটা সবসময় খোলাই থাকে।"
আজ তিনটে দিন হয়ে গেল শিবুটা
ঠিক মতো খাচ্ছে না, ঘুমোচ্ছে না। পড়াতেও
মন নেই ওর। সারাটা দিন শুধু পুটু, পুটু আর পুটু।
পুটুটাও বোধহয় ভাল নেই ওর শিবুকে ছাড়া। শিবানী আর সৌরভ অনেক চেষ্টা করেছে শিবুকে
বোঝাবার কিন্তু ওর শিশু মন মানছে না... কিছুতেই মানছে না।
শনিবার শিবুদের বাড়িতে
নিরামিষ রান্না হয়। আজ শিবানী শিবুর পছন্দের পনির, ধোঁকার ডালনা রান্না করেছে কিন্তু ও সেই ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া
করেই চলেছে। শিবানী ছেলের মানসিক অবস্থা বুঝতে পেরে আজ ওকে নিজের হাতে খাওয়াতে
বসেছে। আসলে এভাবে চলতে থাকলে শিবুটা খুব শিগগিরই বিছানা নেবে।
-আচ্ছা মা
তোমার মনে আছে তুমি সেদিন কীভাবে আমার পুটুকে বাঁচিয়েছিলে?
-মনে আছে বাবা, সব মনে আছে। সেদিন একঝাঁক কাক তাড়া করেছিল তোর পুটুকে। আর
ও বেচারি ভয় পেয়ে এসে ঢুকে পড়েছিল আমাদের বারান্দায়। আমি হঠাৎ করেই দেখতে
পেয়েছিলাম ওকে। তারপর ওকে তুলে নিয়ে আসি ঘরে। তুই তো তখন ইস্কুলে ছিলিস। তোর
বাপি সেদিন একটু তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরলে পুটু গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে এসে ওর গা
ঘেঁষে চুপটি করে বসে থাকে।
-ও সেদিন তাহলে
বাপি ওর জন্য খাঁচাটা কিনে এনেছিল তাই না মা?
-একদম ঠিক
বলেছিস। তোর বাপির আনা খাঁচাতে পুটু কিন্তু বেশ ছিল কিন্তু তুই স্কুল থেকে ফিরে
ওকে প্রথম কোলে নিলে ওর যে কী হলো জানি না বাপু।
-তুমি যাই বলো
মা আমার পুটু কিন্তু খাঁচায় কম আমার কাছে বেশি থাকত।
শিবানী দেখল ছেলে পুটুর গল্প
শুনতে শুনতে ভাতটুকু শেষ করেছে। দুপুরবেলা মা আর ছেলে শুয়ে আছে খাটে। পড়ন্ত রোদে
তখন চিকচিক করছে চারপাশটা। হঠাৎ শিবু বলল,
-আচ্ছা মা আমি তো পুটুকে খাঁচায় ভরে ইস্কুলে গেলাম তাহলে ওই বদমাশ
বিড়ালটা আমার পুটুকে মারল কী করে?
-সেদিন তুই ওর
খাঁচার দরজাটা বোধহয় ঠিক মতো লাগাসনি। আর সেই সুযোগে মেনিটা এসে সব শেষ করে দিল।
আমি পুটুর চিৎকার শুনে রান্নাঘর থেকে এসে দেখি সব শেষ।
শিবু মাকে জড়িয়ে ধরে আবার
কান্না শুরু করল। শিবানী বলল,
-কাঁদে না সোনাবাবা আমার। তুমি তো এখন আর একদম ছোট নও। তুমি
তো জানো ওরা আমাদের জীবনে ক্ষণিকের অতিথি মাত্র। তোমার পুটু যেখানেই আছে
ভাল আছে। আমরা সবাই ওকে আগলে রাখার চেষ্টা করেছি মাত্র কিন্তু ওর বরাদ্দ এতটুকুই
ছিল। তোমার পুটু মুক্তি পেয়েছে শিবু। আর কেউ ওকে খাঁচায় আটকাতে পারবে না, কেউ ওকে নিরাশ্রয় করতে পারবে না। আজ ও মুক্ত। এই গোটা
বিশ্ব সংসার আজ ওর ঘর। ওর যেখানে ইচ্ছা ও সেখানে উড়ে যাবে।
-সত্যি বলছ মা, আমার পুটু তাহলে আমাকে দেখতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে আমার কথা।
-পাচ্ছে সোনা।
ঠিক শুনতে পাচ্ছে। তুমি ভাল থাকলে তোমার পুটু ভাল থাকবে। তুমি মন দিয়ে লেখাপড়া
করো, ভাল মানুষ হও। দেখবে তোমার
পুটু খুব খুশি হবে।
-ঠিক আছে মা।
আমি আর কাঁদব না। আমার পুটু ভাল আছে। আমিও ভাল থাকব।
এই ঘটনার সাতদিন পর...
-ওই দেখ শিবু, পুটুর খাঁচায় কী যেন একটা নড়াচড়া করছে?
শিবু এক দৌড়ে গিয়ে দেখে
একটা ছোট্ট পাখি পুটুর খাঁচায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। আসলে পুটু চলে যাওয়ার পর থেকে ওই খাঁচার
দরজাটা সবসময় খোলাই থাকে। শিবু মুখে একগাল হাসি নিয়ে ছুটে গেল পুটুর খাঁচার পাশে, খাঁচাটাকে নামাল আর মেলে ধরল ওই দূর আকাশের
দিকে।
শিবানী আর সৌরভ দূর থেকে
দেখছিল ছেলের কান্ডকারখানা। ওরা কাছে আসতেই সেই ছোট্ট পাখিটা উড়ে গেল দূর আকাশে। শিবানী
ছেলের কাঁধ স্পর্শ করতেই শিবু বলল,
-আমি ঠিক কাজ করেছি না মা?
শিবানী বলল,
-একদম ঠিক করেছ সোনা।
শিবু দু’ হাত নেড়ে আকাশের
দিকে চেয়ে বলল,
-ভাল থাকিস পুটু। আমি ভাল থাকব। কথা দিচ্ছি।
শিবানী আর সৌরভের চোখ
দুটো জলে টলটল করছে। শিবু ওর বাবা-মায়ের চোখের জল মুছিয়ে
বলল,
-বাপি পুটু চলে গেছে কিন্তু ওর বাড়িটা (খাঁচা) রয়ে গেছে।
আমি ওর বাড়িটাকে খুব যত্ন করে রেখে দেব। কাউকে দেব না। এ বাড়িটা আমার, এটা আমার পুটুর তাজমহল।
~~000~~

গল্পের সমাপ্তি কিছুটা দ্রুত এবং আকস্মিক মনে হয়ছে। সাত দিন পরের ঘটনাটি আরও একটু বিস্তারিত হলে ভালো হতো।
ReplyDeleteগল্পে শিবুর পোষ্যটি পাখি, নাকি অন্য কোনো প্রাণি—সেটা পরিষ্কার করে উল্লেখ নেই। উড়িয়ে দেওয়ার বর্ণনা থেকে পাঠককে বুঝে নিতে হয়।
খাঁচায় হঠাৎ অন্য পাখির আসা এবং সেটির উড়ে যাওয়া কিছুটা নাটকীয় এবং কাকতালীয় মনে হয়েছে, যা গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহকে কিছুটা ক্ষুণ্ণ করেছে।
শিবুর বাবা-মায়ের অনুভূতি এবং তাদের সাথে শিবুর কথোপকথন আরেকটু বিস্তৃত হলে গল্পের প্রেক্ষাপট আরও জোরালো হতো।
এছাড়া বলা যায় গল্পটি বেশ আবেগঘন, শোক কাটিয়ে ওঠা এবং ভালোবাসার এক সুন্দর নিদর্শন। গল্পের মূল শক্তি হলো এর মানবিক আবেদন। একটি শিশু তার প্রিয় পোষ্যের মৃত্যু শোক কাটিয়ে যেভাবে ইতিবাচক মানসিকতায় ফিরছে, তা পাঠকদের হৃদয় স্পর্শ করে।
খাঁচাকে 'তাজমহল' হিসেবে তুলনা করা একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। তাজমহল যেমন ভালোবাসার স্মৃতিস্তম্ভ, শিবুর কাছে পুটুর খাঁচাটিও তেমনি তার অটুট ভালোবাসার প্রতীক।
শোকের পর "আমি ভালো থাকব" বলে নিজেকে এবং মা-বাবাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মাধ্যমে শিবুর চরিত্রের এক দৃঢ় ও পরিপক্ক দিক ফুটে উঠেছে অর্থাৎ তার মানসিক উত্তরণ ঘটেছে।
সামগ্রিকভাবে, এটি একটি শিক্ষণীয় এবং ইতিবাচক বার্তা বহনকারী গল্প যা হারানোর বেদনাকে স্মৃতিতে রূপান্তরিত করার কথা বলে।