বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৭তম সংখ্যা/১৩ই চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[৪র্থ পর্ব]
"ঢাকা শহরের বুকে রিক্সা চালানো যেমন কষ্টের, তেমনি আনন্দের। পয়সা বেশি কামাই হয় বলে আনন্দের জোয়ারে কষ্টটা ভেসে যায়। খবির আলী তা অনুভব করে। সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরে মেসে এসে গোসল করে একটু বিশ্রাম নিয়ে তৃপ্ত হয়।"
পূর্বানুবৃত্তি সগির আলী ছেলে খবিরকে সৎমা জরিমনের অত্যাচারের হাত থেকে
বাঁচানোর কথা ভেবে নমিরুদ্দিনের মেয়ে রমিজার সঙ্গে বিয়ের কথা বলে। জরিমন অত্যাচার করলেও
অতিথিদের জন্য মুরগির মাংস রান্না করে। তারপর…
(৫)
সগির আলীর সংসার নামক চাকাটি
ধীরে ধীরে ঘুরতে থাকে। কিন্তু সংসারে সদস্য সংখ্যা বাড়ে তার দ্বিগুন হারে। কয়েক
বছরে পাঁচ-পাঁচটি নাতি-নাতনি এসেছে। প্রথম প্রথম দাদা হবে বলে খুশিতে আটখানা হয়েছিল সে। কিন্তু এখন মাথায় হাত পড়েছে তার। সংসারে দশ জন
খানেওয়ালা। চোখে অন্ধকার দেখতে থাকে। দুনিয়ার সমস্ত চিন্তা তার মাথায় ভিড় করেছে। ফজরের আজানের অনেক আগেই ঘুম ভেঙেছে। আর ঘুম আসে না। হাঁপানি
রোগটা একটু বেশিই বেড়েছে মনে হয়। ঠিকমতো ঔষধ কিনতেও পারে না।
কোনোমতে ফজরের নামাজ পড়ে সুতা উঠানো পলিস্টার একটি চাদর গায়ে জড়িয়ে কাশতে কাশতে
খবির আলীর দরজায় এসে হাঁক ছাড়ে,
-বাবা খবির আলী উঠছিস?
রমিজা শ্বশুরের ডাকটি
শুনতে পেয়ে খবির আলীকে ডেকে তোলে। খবির আলী তড়িঘড়ি করে উঠে বের হয়ে বলে,
-মোক তোমরা ডাকলেন?
-হয়।
বুক চেপে ধরে আবার কাশতে
কাশতে বলে সগির আলী।
-এই সকালে কী কবার চান কন।
হাই তোলে খবির আলী।
-বাবা খবির তোক
মুই একখান কথা কবার চাং।
-কন ক্যানে কী
কইবেন।
-মুই কী কইম তাক তো মুই দিশা পাবার নাগজো না। শোন, আগ বাগ করবু না। তোর পাঁচখান ছাওয়া-পোয়া নিয়ে ক্যাংকরে মোর
একার উপর অত চাপ দেস?
-তোমরা মোক কী কইবেন তাক খুলি কন ক্যানে।
বাপের কথা শেষ হওয়ার আগে
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে খবির আলী।
-মুই এ্যালা
তোক কী কবার চাং তাক তুই বুঝবার পাস না?
বাপের কথার অর্থ কিছুটা হলেও
বুঝতে পারে খবির আলী। তার ধারণা, এইটা মোর বাপের কথা
নয়। এই কথা মোর সৎমায়ের; মুই আগতই বুচচোঁ।
তার কিছুদিন পর দশ কেজি চাল, দুইটি পাতিল ও দুইটি থালা দিয়ে খবির আলীকে সংসার থেকে আলাদা
করে দেয় সগির আলী। সেও কোনদিন বাপের উপর প্রতিবাদ করেনি। সংসার থেকে আলাদা হয়ে
খবির আলী যেন আকাশ থেকে পড়ল। একার কামাইয়ে এতোগুলো বাচ্চার মুখে কীভাবে আহার
তুলে দিবে। গায়েগতরে খাটতে তার বাধা নেই। কিন্তু গৃহস্থের
এখন কাজ কমে যাওয়ায় ভালমতো মজুরি পায় না। তবুও যতটুকু পারে
মনের সাহসে দিনাতিপাত করতে থাকে। এভাবেই আরো কতগুলো বছর কেটে যায়। কামলা দিয়ে
সাতজন খানেওয়ালা একবেলা-আধবেলা খেয়ে দিন পার করে। তার বিশ্বাস, খোদা একদিন মুখ তুলিয়া চাইবে। এক হাতে কোদালের হাতল ধরে ও
অন্য হাতে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে ভাবে খবির আলী। সামনে নজর করে দ্যাখে পরিচিত
একজন লোক আইলের উপর দিয়ে হাঁটু পর্যন্ত লুঙ্গি উঠিয়ে তার দিকেই আসছে। ডাক দেয় খবির
আলী,
-এই যে, খালেক ভাই, এই দিকে আইসেন
ক্যানে।
সূর্য রশ্মি চোখে এসে পড়ায়
চোখের উপরে এক হাত রেখে খালেক বলে,
-কে খবির আলী?
-হয় মুই, তোমাক ডাকবার নাগজো।
-ক্যান মোক
ডাকবার নাগজিস?
-তোমাক
ক্যাম্বা আর দেখোম না, তোমরা কোটে থাকেন
এ্যালা?
-আর তুই না কস, মুই এ তো এ্যালা অনেক দিন হলো ঢাকাত থাকবার নাগজো।
-ওই ঠে কী করেন তোমরা?
-ইস্কা চালাবার
নাগজো।
-কামাই কেমন হয়?
-দিনে
দেড়শো-দু’শো হইবে। তুই যাবু নাকি?
-মুই কি যাবার
পাম, এতগুলা ছাওয়া-পোয়া থুয়ি মুই
কেমন করি যাম?
-তুই কী কস। ওগলা চিন্তা করলে কি আর দিন চলবে? ঢাকাত ইসকা চালাইলে ম্যালা পাইসা। কাঁইয়ো পাঁচ টাকার নিচত
ভাড়া না দেয়। ট্যাকা খালি ঘুরি বেড়ায়,
ধরিবার
পাইলে হয়।
খবির আলী মনে মনে ভাবে।
দ্যাশত তো কোন কাম-কাজ নাই, বউ ছাওয়া-পোয়াক
ঠিকমতো খাওয়াতে পারে না, ঢাকা গেলে মন্দ হয় না।
-কী চিন্তা
করবার নাগজিস খবির আলী, যদি যাবার চাস তাইলে
পরশুদিন মোর সাথে চল।
-মোর হাতত তো
পাইসাকড়ি নাই ভাই। ঢাকা যাইতে তো ম্যালা পাইসা নাগবে।
-সে চিন্তা তোক
করবার নাগবার নয়। যে বিশ-ত্রিশ খান ট্যাকা নাগবে মুইয়ে দিম এ্যালা, তুই মোক পরে শোধ করি দেস।
-বিশ-ত্রিশ খান
ট্যাকা দিয়ে ঢাকা যাওয়া যাইবে?
তোমরা
পাগলা হইছেন নাকি?
-ক্যানে মুই
পাগলা হম। আরে মফিজ গাড়ির ছাদে তো বিশ-ত্রিশ ট্যাকা দিয়েই আসা-যাওয়া করবার নাগজো।
-ওগনা আবার কী গাড়ি ভাই।
-আরে গেলেই
একবার বুঝবার পাবু।
(৬)
দুদিন পর খালেকের সাথে ঢাকায়
রওনা করে খবির আলী। কোনদিন বাসে উঠেনি সে। ছাদের উপরে বস্তা সাজানোর মতো করে
সাজিয়ে রেখেছে সবাইকে। নড়াচড়ার কোন উপায় নেই। গাড়ির ঝাঁকুনিতে ভালই লাগছিল তার। এ
এক নতুন অভিজ্ঞতা। যারা বেশি ভাড়া দিতে পারে না তাদের কাছে এক পঞ্চমাংশ ভাড়া নিয়ে
ঢাকায় পৌঁছায় এসব গাড়ি। একেই বলে মফিজ গাড়ি। আর এভাবেই সরলতা ও দুর্বলতার সুযোগ
নেয় সংশ্লিষ্টরা।
ঢাকায় পৌঁছে চোখে ধাঁধা লাগে
খবির আলীর। এ এক স্বপ্নের শহর। সন্দেহের বশে চোখ কচলায় সে। স্বপ্ন দেখচোঁ না
তো? হাতের কব্জিতে চিমটি কাটে। না
সত্যিই! খালেকের জামার পিছনে টেনে ধরে গাবতলীতে রাস্তা পার হয়।
মোহাম্মদপুর বেড়ি বাঁধের
উপরের এক বস্তিতে থাকে খালেক। সেখানেই নিয়ে গিয়েছে খবির আলীকে। ওই বস্তিতে আরো
অনেকে থাকে। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া জেলা মোট কথা উত্তরবঙ্গের প্রায় অনেক জেলার লোকই
থাকে। সবাই সবাইকে দেশি বলে ডাকে। খুব ভাল লাগে খবির আলীর। তিনশো মাইল
দুরে এসে এলাকার লোক পেয়ে সবাইকে আপন ভাবে সে। পরদিন মহাজনের নিকট থেকে খালেক একটি
রিক্সা নিয়ে দেয় খবির আলীকে। দিনে কুড়ি টাকা ভাড়া। নতুন চালক হিসেবে দিনে সত্তর
আশি টাকা কামায় খবির আলী। প্রতি ট্রিপে ভাড়াও পায়, নতুন নতুন জায়গা দেখা হয় তার। পনেরো দিন পর
বাড়িতে পাঁচশত টাকাও পাঠায়। মনে মনে ভাবে, মুই এ্যালা খুব সুখত আচোঁ বাহে।
ঢাকা শহরের বুকে রিক্সা
চালানো যেমন কষ্টের, তেমনি আনন্দের। পয়সা
বেশি কামাই হয় বলে আনন্দের জোয়ারে কষ্টটা ভেসে যায়। খবির আলী তা অনুভব করে।
সারাদিন রিক্সা চালিয়ে ঘর্মাক্ত শরীরে মেসে এসে গোসল করে একটু বিশ্রাম নিয়ে তৃপ্ত
হয়। তারপর মেসের লোকজনের সাথে গল্পগুজব ও টেলিভিশনে ডুব দেয়। এই কদিনে সে যেন নতুন
জীবনের সন্ধান পায়। সবেমাত্র চালু হওয়া দেশ-বিদেশের হাতে গোনা কয়েকটি চ্যানেলের
দৌলতে ঝিমিয়ে পড়া বর্ণহীন জীবনে রঙের ছোঁয়া লাগতে শুরু করে তার।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment