বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৪৬তম সংখ্যা/৬ই চৈত্র, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
রমিজা
বেওয়া
[৩য় পর্ব]
"দু-দুইটা রাস্তা থাকতেও খবির আলী কৃষ্ণপুরের ভেতর দিয়ে মাঠে যায়। কারণ কী সেই জানে।
রাস্তার উপরে সেদ্ধ করা ধান শুকায় রমিজা। তাতে বড় একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মুরগি তাড়াতে গিয়ে খবির আলীর সামনে পড়ে সে। খবির আলীকে এক নজর দেখে ফিক করে হেসে ওঠে"
পূর্বানুবৃত্তি খবির আলীর খিদে পেয়েছে। অথচ সে সেদিন কামলা দিতে না
যাওয়ায় ভয়ে ভয়ে সৎমা জরিমনের কাছে ভাত চায়। ছুঁচটা গুঁজে রেখে মুখ ঝামটানি দেয় জরিমন।
তবু সে ভাত দেয়। তারপর…
সগির আলীও মনে মনে ভাবে-
বিয়াখান দিবার পাইলে সৎমায়ের কাউচাল থাকি বাঁচে তার ছাওয়াটা। নমিরুদ্দিনকে বলে,
-বিহাই আজ সন্ধ্যায় তোমরা একটু হামার বাড়িত আইসেন ক্যানে, আলাপ আছে।
সন্ধ্যায় সগির আলীর বাড়িতে
আসে নমিরুদ্দিন। সাথে দু’জন নিকট আত্মীয় এসেছে। ছাওয়ার বিয়া বলিয়া কথা। পেটে ধরেনি
বলে কি পর হয়েছে নাকি? হলই বা সতীনের ছাওয়া
তাতে কী। নিজেও তো কম যত্নআত্তি করেনি। মুরগির মাংস রান্না করতে করতে ফিকফিক করে হাসে জরিমন। বিয়ের আলাপ নিয়ে কথা হইবে। খালি মুখে কী ফেরত দেওয়া যায়? এই ভেবেই জরিমনের পোষা মুরগি হতে একটি জবাই করেছে সগির আলী।
বিয়ের কথাবার্তা প্রায় পাকাপাকি
এখন
লেনদেন বাকি।
-কী সগির আলী
কও, কী নিবা কয়ে ফেলাও?
ফোকলা দাঁতে পান চিবাতে
চিবাতে বলল নমিরুদ্দিনের জ্যাঠা গফ্ফার।
-না চাচা, মুই এ্যালা কী কইম। মোর চাওয়ার কিছু নাই। তোমরা মোর
ছাওয়াক খুশি করি যা দিবেন তাতেই এ্যালা মুই খুশি।
-বিহাই তোমরা
এইটা কথা কইলেন। তোমরা হইলেন ব্যাটার বাপ, তোমরাই তো চাইবেন।
ঘাড়ে হাত রেখে বলল
নমিরুদ্দিন।
-বিহাই তোমরা
শুনেন ক্যানে, কথায় বলে না, মায়ের দুধ চুষি হয় না,
বাপের
হোল চুষলি হইবে? মোর এ্যালা সাফ কথা
মুই তোমার কাছত চায়া ডিমান নিমু না, তোমরা খুশি হয়া দিলে
ভাল না দিলেও ভাল।
গরিব হলেও নির্লোভ সগির আলী।
খোদাভীরু বলে পরকালকে খুব ভয় করে সে। তার কথা,
-কাঁয় কখন যে মরবে, দুনিয়াতে এত করি কী হইবে। সগায়কেই খালি হাতে যাওয়া নাগবে।
কাঁইও কিছুই নিয়ে যাবার পাবার নয়।
আগামি পৌষের শেষের দিকে বিয়ের
দিন ধার্য্য হয়। দু পক্ষই খুব খুশি। কলিকালে ভাল ছেলে কিংবা মেয়ে পাওয়া কি
সোজা কথা? এখন ভাল ভালই শুভ
কাজটি শেষ হলেই বাঁচে তারা।
জলপাইতলী গ্রামের খুদু
পোদ্দার বেশ সম্পত্তির মালিক। সগির আলী তার কাছ থেকে দশ বিঘা জমির রোপা আমন ধানের
আগাছা নিড়ানোর চুক্তি নিয়েছে। ভাদ্র মাস।
মেঘের আড়ালে সকালের সোনা মাখা সূর্যের আলো উঁকি মারছে। সগির আলী একটু পান্তাভাত
মুখে দিয়ে ছেঁড়া লুঙ্গি আর তালি দেওয়া পলিস্টার পাঞ্জাবিটা গায়ে চেপে ধান নিড়াতে
যায়। খবির আলীও যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। কিন্তু সে একা যাবে। বাপের সাথে গেলে রমিজার
সাথে দেখা করতে পারবে না তাই। দু-দুইটা রাস্তা থাকতেও খবির আলী কৃষ্ণপুরের ভেতর
দিয়ে মাঠে যায়। কারণ কী সেই জানে।
রাস্তার উপরে সেদ্ধ করা ধান
শুকায় রমিজা। তাতে বড় একটি বাঁশের কঞ্চি দিয়ে মুরগি তাড়াতে গিয়ে খবির আলীর সামনে
পড়ে সে। খবির আলীকে এক নজর দেখে ফিক করে হেসে ওঠে বলে,
-ও খবির ভাই, এপাশে তোমরা কুণ্ঠি
যাবার নাগজেন?
-জমিত ঘাস
তুলিবার যাবার নাগজো।
বুকটা যেন ধুকধুক করে ওঠে
খবির আলীর।
-এই ঘাটা দিয়া
ক্যান তা? ভুলা খাইছেন নাকি?
আবারো হাসে রমিজা। এই ঘাটা
দিয়া এ্যাকনা তাড়াতাড়ি যাওয়া যায় তো। এবার রীতিমতো বুকের মধ্যে কাঁপুনি উঠে
খবিরের। হাজারো হলেও মেয়ে মানুষ, তাছাড়া হবু বউ।
কিন্তু বিয়ে কী জিনিস খবির আলী যৎসামান্য বুঝলেও পুতুল খেলা বয়সের রমিজা নূন্যতম
অনুভবটিও করতে পারেনি। বিয়ের পর চাটাইয়ের ঘরটিতেই নতুন বউ নিয়ে থাকে খবির আলী।
(৪)
ইতোমধ্যে বিয়ের এক বছর পারও
হয়েছে। বাপ-ব্যাটা মিলে কামলা দেয়। এবার এক বিঘা জমি বর্গা নিয়েছে বুদু পোদ্দারের
কাছ থেকে। ধানও ভাল হয়েছে। সগির আলী মনে করে বর্গার ধান দিয়ে ছয় মাসের খোরাক হইবে।
আবার গর্ব করে জরিমনকে বলে,
-দ্যাখ্ দ্যাখ্ জরিমন,
হামার
বউমা কপালে, বউমা আসিল আর হামার দুক্কু
পালাবার নাগিল।
জরিমন ক্ষোভে কী বিরক্ত হয়ে
বিড়বিড় করতে করতে খড় শুকানোর কাজে বাইরে চলে যায়।
রমিজা শাশুড়ির সাথে কাজ করে।
কুলা দিয়ে বাতাসে ধান উড়ায়। ভাল ধান থেকে চিটা ধান আলাদা করে। শাশুড়ি কাজের ভেতর
মাঝেমধ্যে ফোড়ন দেয়। রমিজা অত কুটিল কথার অর্থ বুঝতে না পেরে আপন মনে কাজ করে। মায়ের
কাছে অনেক কাজই শিখেছে রমিজা। তাইতো শ্বশুরবাড়িতে এসে কাজ নিয়ে কোনো কথা শুনতে
হয়নি তাকে। রান্না করা, থালাবাসন-পাতিল মাজা, কাপড়চোপড় কাচা,
ঘর লেপা, ধান সিদ্ধ করা,
ধান
শুকানো, ঢেঁকিতে ধান ভানা, খড় শুকানো, গোরু-ছাগল বাঁধা সবই
শিখেছে সে। তার মায়ের কথা,
-হামরা গরিবসরিব মানুষের ছাওয়া, হামরা কাম না করিলে কাঁয় করিবে, বেটি ছাওয়া কাম না শিখে শ্বশুরবাড়িত
গেলে এ্যালা সগায় কইবে, কাঁয় তোমাক জন্ম
দিছিল বাহে, এ্যালা কাম করিবার না পান।
মাঘ মাসের কনকনে শীতেও এক
চিলতে রোদ দক্ষিণ মেরুর মধ্যাকাশে মেঘের ফাঁকে উঁকি মারছে। দেড়মাস বয়সের বাচ্চাকে
শুয়ে রেখে সকালে এক বস্তা ধান পাতিলে সিদ্ধ করেছে রমিজা। ফজরের আজানের আগেই উঠে
পাশের বাড়ির জেবু চাচির কাছ থেকে বড় একটি পাতিল চেয়ে এনেছে সে। শীত তাকে কাবু করতে
পারেনি। ধান সিদ্ধ করতে করতে বেলা অনেক হয়েছিল। ধানগুলো বাড়ির নীচে এক জমির খলানে
শুকাতে দেয়। শাশুরিও মাঝেমাঝে পান চিবাতে চিবাতে আসে। পা দিয়ে ওলট-পালট করে দেয়।
রমনা বাজারের রইচ মাতব্বরের
মেঝ ছেলে ইদ্রিস মাতব্বর আইএ পাশ করে কিছুদিন ঢাকায় থাকার পর কেমন করে যেন বিদেশে
পাড়ি জমিয়েছিলেন। বেশ ক’বছর হল দক্ষিণ কোরিয়া ছিলেন। এখন অনেক পয়সার মালিক তিনি।
চোখ ধাঁধাঁনো একটা বাড়িও বানিয়েছেন। এখন শখ করেছেন মৎস্য খামার করবেন। তাই
প্রাথমিক ভাবে কয়েকটি পুকুর খোঁড়া জরুরি।
কামলা দেওয়া মজুরির অপেক্ষায়
বাজারের জাম গাছটার তলায় দাঁড়িয়েছিল সগির আলী। বিড়ি টানতে টানতে এদিক সেদিক তাকায়
আর চিন্তা করে, কখন যে গৃহস্থ আসবে? বাজার করবে তারপর রাতের খাবার। এমন সময় মাঝবয়সি এক লোক এসে
বলে,
-ও সগির ভাই তোমাক এ্যাকনা ডাকায়।
-কাঁয়।
বিড়িতে টান দিতে দিতে বলল।
-আরে ওই যে বিদেশি।
-বিদেশি কাঁয় রে? নাম কবার পাস না?
এবার খেঁকিয়ে ওঠে।
-আরে তোমরা
চেনেন নাই ক্যানে, রইচ, রইচ দেওয়ানির ব্যাটা।
-ও বুচচোঁ, ইদ্রিস দেওয়ানি?
কাশি দেয় সগির আলী।
-হয়।
-ওঁই ফির মোক
ক্যান ডাকায়?
-তোমরা আগত
আইসো ক্যানে, তারপর শুনেন এ্যালা।
পুকুর খোঁড়ার চুক্তি পায়
সগির আলী। আর ভাতের অভাব হইবে না তার। খবির আলীও ভাল খাটিতে পারে। সংসারে আর কোন
অভাব থাকিবে না। শুধু জরিমনের স্বভাবটি ভাল হইলেই হল। রাতের ভাত খেয়ে ভাবে সে।
পুকুর খোঁড়ার চুক্তি নিয়ে আর
জমির ধান দিয়ে খেয়েপরে বাপ-বেটা মিলে কিছু পয়সা জমাতে পেরেছিল। কিন্তু আর শেষ রক্ষা হয়নি।
গত কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে পরপর বন্যা আর খরায় গৃহস্থের আবাদ ঠিকমতো হয়নি বলে
তাদের কাজেও ভাটা পড়েছে। জমানো পয়সা হতে খরচ করতে করতে এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে।
ক্রমশ

No comments:
Post a Comment