বাতায়ন/ক্ষণিকের অতিথি/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৪৪তম
সংখ্যা/২৩শে ফাল্গুন, ১৪৩২
ক্ষণিকের অতিথি
| ছোটগল্প
সৈকত প্রসাদ
রায়
মায়াবী
বিকেল
"উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে গত রাতেই আকাশ পাড়ি দিয়েছে না-ফেরার দেশে। অলোকেশবাবু স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।"
-নাম কী রে তোর?
ছেলেটি মৃদু স্বরে বলল,
-আকাশ।
অলোকেশবাবু নিজের ঠোঙা থেকে
একমুঠো মুড়ি ওর দিকে এগিয়ে দিলেন। আকাশ গপগপ করে খেতে লাগল। ওর খাওয়ার ভঙ্গি দেখে
অলোকেশবাবুর মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া নিজের নাতি অর্কর কথা। ঠিক
এভাবেই ও মুড়ি খেতে ভালবাসত। এক নিবিড় মমতায় অলোকেশবাবুর মনটা ভরে উঠল।
সেই দিন থেকে আকাশ আর
অলোকেশবাবুর এক অলিখিত নিয়ম হয়ে দাঁড়াল। প্রতিদিন বিকেলে ঘাটের ওই নির্দিষ্ট
জায়গাটিতে দুজনে বসতেন। আকাশ ছিল বাস্তুহারা,
স্টেশনের
ধারে মায়ের সাথে থাকত। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করে, আর আকাশ সারাদিন এটা-সেটা খুঁজে বেড়াত। কিন্তু বিকেল হলেই সে ছুটে আসত দাদুর
কাছে।
অলোকেশবাবু ওকে শুধু খাবার
দিতেন না, সাথে করে নিয়ে আসতেন ছোটদের
গল্পের বই। আকাশ পড়তে জানত না, অলোকেশবাবু পড়ে
শোনাতেন। ঠাকুরমার ঝুলি থেকে শুরু করে রামায়ণের বীরত্বগাথা—সবটাই আকাশ মুগ্ধ হয়ে
শুনত। সে শুনত কীভাবে হনুমানজি গন্ধমাদন পর্বত তুলে এনেছিলেন, আর অলোকেশবাবু শুনতেন আকাশের জীবনের ছোট ছোট সুখ-দুঃখের
গল্প।
অলোকেশবাবু খেয়াল করলেন, আকাশের প্রতি তাঁর টানটা যেন রক্ত সম্পর্কের চেয়েও বেশি হয়ে
দাঁড়াচ্ছে। যে হৃদয়টা গত দশ বছর ধরে অর্কর স্মৃতিতে পাথর হয়ে ছিল, সেখানে যেন আবার প্রাণের স্পন্দন ফিরে আসছে। তিনি মনে মনে
ঠিক করলেন, আকাশের পড়ার দায়িত্ব তিনি
নেবেন। ওকে একটা ভাল স্কুলে ভর্তি করে দেবেন।
হঠাৎ করেই শীতের প্রকোপ বাড়ল, একদিন আকাশ এল না। অলোকেশবাবু ভাবলেন হয়তো ঠাণ্ডায় আসতে
পারেনি। কিন্তু দ্বিতীয় দিন, তৃতীয় দিনও যখন আকাশ
এল না, তখন অলোকেশবাবুর মনে কু ডাকল।
তিনি স্টেশনের ধারের বস্তিতে খোঁজ নিতে গেলেন।
সেখানে গিয়ে যা শুনলেন, তাতে তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। আকাশের মা ডুকরে
কেঁদে উঠলেন। আকাশের খুব জ্বর হয়েছিল,
সেই
জ্বরের ঘোরেই সে বারবার বলছিল,
-দাদু আসবে, দাদু আমাকে মুড়ি দেবে, গল্প বলবে।
কিন্তু উপযুক্ত চিকিৎসার
অভাবে গত রাতেই আকাশ পাড়ি দিয়েছে না-ফেরার দেশে। অলোকেশবাবু স্তম্ভিত হয়ে
দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁর চোখের জল শুকিয়ে গেছে। যে ছেলেটি তাঁর জীবনে মাত্র কয়েক
সপ্তাহের জন্য এসেছিল, সে যে এত বড় শূন্যতা
তৈরি করে যাবে, তা তিনি কল্পনাও করতে
পারেননি। আকাশ সত্যিই তার নামের মতোই অসীম হয়ে গেল, তাকে আর ছোঁয়া যাবে না।
সেদিন বিকেলে অলোকেশবাবু আবার
ঘাটে গিয়ে বসলেন। কিন্তু আজ তাঁর হাতে কোনো গল্পের বই নেই, ঠোঙাভর্তি মুড়িও নেই। আছে শুধু এক বুক হাহাকার। তিনি আকাশের
সেই মায়াবী চোখদুটো দেখতে পাচ্ছিলেন গঙ্গার ঢেউয়ের মাঝে।
তবে অলোকেশবাবু ভেঙে পড়লেন
না। তিনি বুঝলেন, আকাশ এসেছিল তাঁর
জীবনের স্থবিরতা ভাঙতে। সে হয়তো ‘ক্ষণিকের অতিথি’, কিন্তু সে একটা বার্তা দিয়ে গেছে। অলোকেশবাবু নিজের একাকীত্বের খোলস ছেড়ে
বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁর বড় বাড়িটির একটা অংশ খুলে দিলেন পাড়ার গরিব বাচ্চাদের
জন্য। সেখানে শুরু হলো একটি ছোট পাঠশালা। পাঠশালার প্রবেশপথে ছোট করে লেখা— ‘আকাশ-স্মৃতি
পাঠশালা’।
আজ অলোকেশবাবুর চারপাশে অনেক
বাচ্চা। তিনি তাদের রামায়ণ-মহাভারতের গল্প শোনান, তাদের হাতে নতুন বই তুলে দেন। প্রতিটি বাচ্চার হাসির আড়ালে তিনি খুঁজে পান
তাঁর সেই ক্ষণিকের অতিথিকে। মৃত্যু হয়তো মানুষকে শরীর থেকে কেড়ে নেয়, কিন্তু আদর্শ আর ভালবাসার মাধ্যমে সেই মানুষটি বেঁচে থাকে
হাজারো প্রাণের মাঝে।
গঙ্গার ওপর দিয়ে যখন ঠান্ডা হাওয়া
বয়ে যায়, অলোকেশবাবু চোখ বন্ধ
করেন। তাঁর মনে হয়, কোথাও যেন আকাশ বসে
বলছে—দাদু, একটা গল্প বলো-না!
~~000~~

অপূর্ব ❤️
ReplyDeleteখুব সুন্দর
ReplyDelete