বাতায়ন/চৈতি
হাওয়া—নববর্ষ/পর্যালোচনা/৪র্থ বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩৩
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | পর্যালোচনা
কবিতা— সব চরিত্র কাল্পনিক
কবি— সিদ্ধার্থ মিত্র
পর্যালোচক— তৈমুর খান
চৈতি হাওয়া—নববর্ষ | পর্যালোচনা
কবিতা— সব চরিত্র কাল্পনিক
কবি— সিদ্ধার্থ মিত্র
"অবদমিত কাম ও ধ্বংস: 'বন্ধ্যা ভিসুভিয়াস' এবং 'ঊরুর ওপর অচেনা হাট'—এই চিত্রকল্পগুলো মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের বাণিজ্যিকীকরণকে ফুটিয়ে তোলে। আগ্নেয়গিরিটি বন্ধ্যা, অর্থাৎ সেখানে ধ্বংসের সম্ভাবনা থাকলেও তা সৃজনশীল নয়।"
তুলে আনে মানুষের সমগ্র কারখানা
ঢাকে শরীরের পর্যায় সারণী
জলের ভিতর বুদবুদের মানচিত্রে
বন্ধ্যা ভিসুভিয়াস জেগে ওঠে
ঊরুর উপর বসে অচেনা হাট
আঙুলে আঙুলে ডুবিয়ে মাপি
প্রতিরোধের অবাধ্য তাপাঙ্ক
নখের নীচে জমে বাষ্পের এক্সটেনশন
চেনা মেঘ ডাকে বন্যার কলহে
গ্লাসের গর্ভাধানে জমা তরল, দেখি
জিভের তলায় রাখা সম্পর্ক ভীষণ অচেনা
লুপ্তভাষার সংক্রমণে জড়সড় মৃতের স্তূপ
মুখোশে ঢাকা সব চরিত্রই আজ কাল্পনিক
'সব চরিত্র কাল্পনিক' কবিতাটি বেশ গভীর এবং রূপকনির্ভর। এখানে শরীর, বিজ্ঞান, ভূগোল এবং মনস্তত্ত্ব মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
এই কবিতায় কবি মানুষের অস্তিত্বকে কেবল মাংসপেশির কাঠামো হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখিয়েছেন একটি জটিল যন্ত্র বা কারখানার মতো।
বিজ্ঞানের রূপক: 'পর্যায় সারণী' (Periodic Table) বা 'বাষ্পের এক্সটেনশন'-এর মতো শব্দগুলো ইঙ্গিত দেয় যে মানুষের আবেগগুলো আসলে কিছু রাসায়নিক ও যান্ত্রিক প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি। কিন্তু এই যান্ত্রিকতার আড়ালে লুকিয়ে আছে এক 'অস্থির স্থপতি' বা সৃজনশীল সত্তা।
অবদমিত কাম ও ধ্বংস: 'বন্ধ্যা ভিসুভিয়াস' এবং 'ঊরুর ওপর অচেনা হাট'—এই চিত্রকল্পগুলো মানুষের অবদমিত আকাঙ্ক্ষা এবং সম্পর্কের বাণিজ্যিকীকরণকে ফুটিয়ে তোলে। আগ্নেয়গিরিটি বন্ধ্যা, অর্থাৎ সেখানে ধ্বংসের সম্ভাবনা থাকলেও তা সৃজনশীল নয়।
বিচ্ছিন্নতা (Alienation): কবিতার শেষ দিকে 'জিভের তলায় রাখা সম্পর্ক ভীষণ অচেনা' এবং 'মুখোশে ঢাকা সব চরিত্র'—এই অংশগুলো আধুনিক মানুষের চরম একাকিত্ব ও কৃত্রিমতাকে তুলে ধরে। আমরা একে অপরের সাথে কথা বলি, সম্পর্কে জড়াই, কিন্তু দিনশেষে সবাই যেন একেকটা কাল্পনিক বা কৃত্রিম চরিত্র।
এই কবিতাটির মেজাজ এবং চিত্রকল্পের সাথে আধুনিকতাবাদী কবি টিএস এলিয়ট-এর বিশেষ করে তাঁর বিখ্যাত কবিতা "The Love Song of J. Alfred Prufrock"-এর দারুণ মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
এই কবিতাই পাই : যান্ত্রিক শরীর "ঢাকে শরীরের পর্যায় সারণী"।
এলিয়টের কবিতায় পাই : "When the patient is etherized upon a table"
এলিয়টের কবিতায় পাই "To prepare a face to meet the faces that you meet"
এলিয়টের কবিতায়: "It is impossible to say just what I mean!"
পরাবাস্তববাদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো জীবন্ত শরীরের সাথে জড়বস্তু বা যন্ত্রের অদ্ভুত মিলন। এই কবিতায়:
"শরীরের পর্যায় সারণী" বা "মানুষের সমগ্র কারখানা"—এখানে মানুষের রক্ত-মাংসের শরীরকে রসায়ন বা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাঁচে ফেলা হয়েছে। এটি অনেকটা সালভাদর দালির ছবির মতো, যেখানে শরীর থেকে ড্রয়ার বেরিয়ে আসে। শরীরের ভেতর এক 'অস্থির স্থপতি' বসে আছে, যা এক ধরনের অলৌকিক ও পরাবাস্তব চিত্রকল্প।
পরাবাস্তববাদীরা প্রায়ই ক্ষুদ্র বস্তুকে বৃহৎ বা বৃহৎকে ক্ষুদ্র করে দেখান।
"জলের ভিতর বুদবুদের মানচিত্রে / বন্ধ্যা ভিসুভিয়াস জেগে ওঠে": একটি সামান্য বুদবুদ যখন মানচিত্র হয়ে ওঠে এবং তার ভেতর আস্ত একটি আগ্নেয়গিরি (ভিসুভিয়াস) জেগে ওঠে, তখন তা বাস্তবের সীমা ছাড়িয়ে যায়। এটি একটি শক্তিশালী 'সাররিয়াল ইমেজ', যা ভেতরের সুপ্ত ক্রোধ বা বাসনাকে মহাজাগতিক রূপ দেয়।
যখন এমন কিছু ঘটে যা স্বাভাবিক পরিবেশে ঘটা অসম্ভব, তখনই পরাবাস্তবতা তৈরি হয়।
"ঊরুর উপর বসে অচেনা হাট": এটি একটি ধ্রুপদী পরাবাস্তব চিত্র। শরীরের একটি নির্দিষ্ট অঙ্গের ওপর আস্ত একটি 'হাট' বা বাজার বসে যাওয়া যুক্তির অতীত। এখানে কাম বা মানুষের সামাজিক লেনদেনকে এক অদ্ভুত ও উৎকট (Grotesque) রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে।
"নখের নীচে জমে বাষ্পের এক্সটেনশন": নখ মানুষের শরীরের একটি মৃত অংশ, কিন্তু তার নিচে 'বাষ্প' বা গ্যাসীয় কিছুর বিস্তার ঘটা এক ধরনের বায়বীয় অস্থিরতাকে প্রকাশ করে। এটি বাস্তব ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করা অসম্ভব, কেবল অবচেতনেই সম্ভব।
"লুপ্তভাষার সংক্রমণে জড়সড় মৃতের স্তূপ": ভাষা যখন মৃতদেহের মতো স্তূপ হয়ে যায়, তখন তা পরাবাস্তববাদী কাব্যের চূড়ান্ত শিখর স্পর্শ করে। এখানে শব্দরা আর অর্থ বহন করে না, বরং তারা এক-একটি 'সংক্রমণ'।
কবিতাটির শেষে যখন বলা হয় "মুখোশে ঢাকা সব চরিত্রই আজ কাল্পনিক", তখন বোঝা যায় কবি আসলে এক 'হাইপার-রিয়ালিটি' (Hyper-reality) তৈরি করেছেন। এখানে সত্য বলতে কিছু নেই, সবই অবচেতনের অভিক্ষেপ।
কবিতার এই পরাবাস্তববাদী শৈলীটি অনেকটা ফরাসি কবি পল এলুয়ার (Paul Éluard) বা স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা (Federico García Lorca)-র 'সুররিয়ালিস্ট' কবিতার কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে ব্যক্তিগত যন্ত্রণা আর বিশ্বজনীন রূপকগুলো যুক্তিহীন এক মায়াজাল তৈরি করে।

No comments:
Post a Comment