বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| ধারাবাহিক গল্প
নবনীতা রায়
ক্ষণিকের
অতিথি
[১ম পর্ব]
"নন্দিনী বুঝতে পারে ওর এতদিনের তৈরি করা দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার জন্য আজ উঠেপড়ে লেগেছে শতদ্রু, তাই ভাঙন আটকাতে নন্দিনী বলে"
তিনটে তিরিশ
মিনিটের রাজধানী এক্সপ্রেস দিল্লি ছাড়বে আর কিছুক্ষণের মধ্যে, নন্দিনী জানলার পাশের একটা সিটে বসে আছে হাতে ধরা একটা
ফেলুদা সমগ্র। নন্দিনীর পড়াশোনার বিষয় ভূগোল এবং বর্তমানে ভূগোল নিয়ে গবেষণা এবং একটি
কলেজে পড়ান সত্ত্বেও বরাবরই সাহিত্যতে ওর দারুণ আনুরাগ তাই কাজের ফাঁকে যেমন গল্পের বই পড়ে তেমনই দূরে কোথাও ট্রাভেল করতে হলেও সঙ্গী সেই গল্পের বই। এই যেমন দিল্লিতে
আসার কারণ একটা সেমিনার। আপাতত দুদিন-এর সেমিনার শেষে এবার কলকাতায় ফেরার পালা, সেমিনারটা ভালভাবে মিটে যাওয়াতে খানিক নিশ্চিন্ত হয়ে এখন
ফেলুদাতে নিমগ্ন। এমন সময় উল্টোদিকের সিটে জোরে ব্যাগ রাখার শব্দ হতেই ফেলুদা থেকে
চোখ তুলে তাকিয়ে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠে সে,
এ কাকে
দেখছে সে? শতদ্রু, এ তো শতদ্রু, ততক্ষণে উল্টোদিকের
একজোড়া চোখ খেয়াল করেছে নন্দিনীকে, খানিক সামলে নিয়ে
শতদ্রুই প্রথম জিজ্ঞাসা করে, ‘আরে নন্দিনী তুই? কেমন আছিস? তোর কোন খবরই তো
পাওয়া যায় না’, একসঙ্গে এতগুলো কথা জিজ্ঞাসা করে থামে শতদ্রু, এবার নিজেকে একটু সামলে নিয়ে নন্দিনী শান্ত স্বরে বলে ওঠে, ‘আমি দিল্লি এসেছিলাম একটা সেমিনারের জন্য, এখন ফিরছি’। নন্দিনীর কথা বলার ধরন আর গলার স্বরে
খানিক চমকে যায় শতদ্রু প্রায় বছর তিনেক বাদে দেখা হল দুজনের কিন্তু এ কোন
নন্দিনীকে দেখছে সে এমন শান্ত,
মেপে
কথা বলা এরকম তো ছিল না নন্দিনী, কিছু কি হয়েছে ওর, অবশ্য এই তিন বছরে দুজনের যোগাযোগ অনেকটাই ক্ষীণ হয়েছে বদলে
গেছে অনেক কিছু তবে একটা জিনিস আগের মতোই আছে আর তা হল শতদ্রুর জন্মদিনে নন্দিনীর
শুভেচ্ছা জানানো। প্রতি বছর ঠিক জন্মদিনের সকালে শতদ্রুর ফোনে নন্দিনীর
শুভেচ্ছাবার্তা আসবেই কিন্তু ওই পর্যন্তই তার বদলে যদি শতদ্রু ধন্যবাদও জানায় তার
কোনো উত্তর দেয় না এমনকি শতদ্রুর কোনো মেসেজেরই উত্তর দেয় না। নন্দিনীর এই আচরণের
কারণ খুঁজতে চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছিল শতদ্রু, নন্দিনী এমন ছিল না ও ছিল ভীষণ হাসিখুশি একটা মেয়ে ওই
হাসিটাই ছিল ওর বিশেষত্ব।
শতদ্রুর সাথে নন্দিনীর আলাপ প্রায়
বছর সাতেক আগে, সব ঠিকঠাক ছিল তখন
প্রথম দু-আড়াই বছর প্রায়ই কথা হতো দুজনের,
বেশ
কয়েকবার দুজনে কলকাতা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছে, আড্ডা মেরেছে সময়ের হিসেব না রেখেই। তারপর বছর চারেক আগে
শতদ্রু কানপুর আইআইটিতে পিএইচডি করতে চলে যায়, তারপরেও কিছু দিন যোগাযোগ ছিল কলকাতা গেলে দেখা করতে চেষ্টা করত অবশ্য
বেশিরভাগ সময় নন্দিনীর আগ্রহই বেশি থাকত। সুর কেটেছিল বছর তিনেক আগের কালী পুজোর
সময়, শতদ্রু পুজোর ছুটিতে বাড়ি
গেছিল, ওদের দুজনের পরিচিত একজনের
বাড়িতে কালী পুজো হয় দুজনেই ছিল সেখানে শতদ্রু আর নন্দিনী পুজোর জোগাড় করছিল, সেদিন নন্দিনী ভীষণ চুপচাপ ছিল প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা
বলছিল না তবে কাজে কোনো ভুল ছিল না, সেদিন একবার দুজনে
একসাথে কিছু জিনিস কিনতেও গেছিল তাও কোথায় যেন তাল কেটেছে বুঝতে পারছিল শতদ্রু। সেদিন
যখনই কোনো কারণে নন্দিনীর দিকে তাকিয়েছিল তখনই খেয়াল করেছিল নন্দিনীর চোখে এক
অদ্ভুত বিষণ্ণতা খেলা করছিল। সেবারই কানপুর ফিরে গিয়ে শতদ্রু বুঝতে পেরেছিল একটু
একটু করে পালটে যাচ্ছে নন্দিনী, যে মেয়েটা
প্রত্যেকবার বলত, ‘পৌঁছে জানাস’
সেবার আর তা জানতে চায়নি নন্দিনী বরং শতদ্রুই নিজে থেকে
জানিয়েছিল যে পৌঁছে গেছে ও। সেইবারেই নন্দিনীর জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানানোর পর
উত্তর এসেছিল ধন্যবাদ, ব্যস তারপর প্রায় মাস
চারেক পরে শতদ্রুর জন্মদিনের দিন পাল্টা শুভেচ্ছা জানিয়েছিল নন্দিনী। তারপর থেকে
এই তিন বছরে ওই একটা দিনই আসে নন্দিনীর মেসেজ। কিন্তু ওদের সম্পর্কের সুর কেন কেটে
গেছিল সেদিন তা বুঝতে না পারলেও আজ কিছুটা বুঝতে পারে, নন্দিনীর মনের মধ্যে যে ওকে নিয়ে একটা দুর্বলতার সৃষ্টি
হয়েছিল তা আজ উপলব্ধি করতে পারে ও, অবশ্য কেন একথা
নন্দিনী শতদ্রুকে জানায়নি সেই উত্তর আজও অজানা।
ট্রেন দিল্লি স্টেশন
ছাড়িয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ, নন্দিনীর হাতে ফেলুদা
ধরা থাকলেও তার চোখ জানলার দিকে, তার মনে তখন ঝড়
উঠেছে। যে মানুষটাকে গত তিন বছর ধরে ভীষণ সাবধানে এড়িয়ে গেছে, এমনকি যখনই জানতে পেরেছে শতদ্রু কলকাতায় এসেছে তখন শতদ্রু
যেতে পারে এমন জায়গাগুলো এড়িয়ে গেছে ও,
যখন
বুঝতে পেরেছিল হাজার দুর্বলতা বা ভালবাসা থাকলেও শতদ্রুকে ও কোনোদিন পাবে না নিজের
করে কারণ যা কিছু দুর্বলতা তা ছিল কেবল মাত্র নন্দিনীর শতদ্রুর তাতে কোনো ভূমিকা
ছিল না, মেনে নিয়েছিল যে ভাগ্যে থাকে
না হাজার মন্দির-মসজিদে মাথা ঠুকলেও তাকে পাওয়া যায় না। আজ সেই মানুষটা ওর
সামনে বসে আছে, কী করবে ও ঠিক করতে
পারে না। এইসব চিন্তার মধ্যেই আবার শতদ্রু কথা বলে ওঠে, ‘অমন একদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে রাখলে তোর স্পন্ডিলাইটিস স্বয়ং ভগবানও আটকাতে
পারবে না’। ঘাড় ঘুরিয়ে শতদ্রুর দিকে তাকিয়ে অল্প হাসে
নন্দিনী। খানিক বাধ্য হয়েই এবার নন্দিনী জিজ্ঞেস করে, ‘তুই কাজে এসেছিলিস দিল্লীতে?’
‘না, বন্ধুর বিয়ে ছিল তাই এসেছিলাম’ বলে শতদ্রু। সাময়িক
বিরতি নিয়ে এবার শতদ্রু জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা
তুই এমন বদলে গেলি কেন?’ ‘বয়স বাড়ছে তাই’, ছোট্ট করে উত্তর দেয় নন্দিনী। শতদ্রু এবার বলে ওঠে, ‘আমি যদি আজকে বলি শুধু বয়স বেড়ে যাওয়া নয় তোর বদলে যাওয়ার কারণ আমি’, চমকে ওঠে নন্দিনী,
খানিক
অস্বস্তি নিয়েই উত্তর দেয় নন্দিনী, ‘না তুই কেন কারণ হতে
যাবি, আর কেনই বা তোর মনে হচ্ছে যে
আমি বদলে গেছি, দেখ বয়স বাড়ার সাথে সাথে
মানুষের মধ্যে কিছু বদল আসবেই আমার বদলে যাওয়া কেবল সেটুকুই’ শতদ্রুর কথায়
বিপদ আঁচ করেই নিজের স্বপক্ষে যুক্তি সাজায় নন্দিনী।
‘বেশ আমি মেনে নিলাম তোর কথা তুই কেবল বয়সের কারণে বদলে গেছিস তা সবার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়াটা কী সেই কারণেই’ বলে শতদ্রু। নন্দিনী বুঝতে পারে ওর এতদিনের তৈরি
করা দেওয়াল ভেঙে দেওয়ার জন্য আজ উঠেপড়ে লেগেছে শতদ্রু, তাই ভাঙন আটকাতে নন্দিনী বলে, ‘আমি কারোর
সাথে যোগাযোগ বন্ধ করিনি সবার সাথে যোগাযোগ আছে আমার, শুধু কথা বলার পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছি’।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment