বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ভ্রমণ/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | ভ্রমণ
ডঃ শেষাদ্রি শেখর ভট্টাচার্য
দুই
দিনে নাসিক ভ্রমণ
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | ভ্রমণ
ডঃ শেষাদ্রি শেখর ভট্টাচার্য
"রামায়ণের স্মৃতি-ভরা নাসিকে আসার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরে। গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত নাসিক শহরকে হিন্দুরা পরম ‘পবিত্র স্থান’ মনে করেন।"
বেলা সোয়া ১০টা নাগাদ হোটেলে এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরে পেলাম একটি প্রশস্ত, সাজানো-গোছানো ঘর। এখানে খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। তাই প্রাতরাশের জন্য জোমাটো থেকে পছন্দ-মতো খাবারের অর্ডার দিয়ে একে একে স্নান সেরে নিলাম। প্রাতরাশ শেষে নিকটস্থ দোকান থেকে চা আনিয়ে নিলাম। রিসেপশন থেকে ফোনে জানাল, সাইট-সিয়িং করার গাড়ি এসে লবিতে অপেক্ষা করছে। আমরা হোন্ডা অরা-তে চড়ে বসতেই সেটা চলতে শুরু করল।
রামায়ণের স্মৃতি-ভরা নাসিকে আসার ইচ্ছে ছিল বহুদিন ধরে। গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত নাসিক শহরকে হিন্দুরা পরম ‘পবিত্র স্থান’ মনে করেন। হিন্দু ঐতিহ্য অনুযায়ী বিভিন্ন যুগে নাসিক শহরের নাম ছিল বিভিন্ন – সত্যযুগে ‘পদ্মনগর’, ত্রেতাযুগে ‘ত্রিকান্তক’, দ্বাপর যুগে ‘জনস্থান’ এবং শেষে কলিযুগে নাম ‘নভশিক’ তথা নাশিক / নাসিক। জনমানসে বিশ্বাস, অযোধ্যার রাজা শ্রীরামচন্দ্র তাঁর চৌদ্দ বছর বনবাসকালে এই নাসিকে ছিলেন বহুদিন।
কালারাম মন্দির, নাসিক
তপোবনে এসে পৌঁছলাম দুপুর
১২টা ৪০ মি নাগাদ। গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই পৌঁছলাম লক্ষ্মণজীর মন্দিরে। সেখানে
দর্শন করলাম শেষনাগ অবতার রূপে শ্রীলক্ষ্মণজীকে। এবার ডানদিকে এগিয়ে দেখলাম সেই
স্থান যেখানে শ্রীলক্ষ্মণ রাবণরাজের বোন শূর্পণখার ‘নাসিকা’
কর্তন করেন। ওই ‘নাসিকা’ শব্দ থেকেই শহরের নাম হয় নাসিক। যদিও স্থানীয় সরকারী
ওয়েবসাইট অনুসারে শহরের ‘নাসিক’ নামের উৎপত্তি ‘নয় পাহাড়ের শহর’ থেকে। আমরা
লক্ষ্মণ-মন্দির থেকে বের হয়ে পথের পাশেই দেখে নিলাম ‘সর্ব ধর্ম মন্দির’।এবার চললাম অনতিদূরে অবস্থিত গোদাবরী ও কপিলা নদীর সঙ্গমস্থল দেখতে। একটা উঁচু, পাথুরে জায়গায় পৌঁছে দেখলাম, নীচে সঙ্গমের কাছে সাধু ও পুরোহিত-সহ কয়েকজন মিলে পুজোর কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। আমরা ফেরার পথে পৌঁছলাম ‘রামস্মৃতি উদ্যান’ যেখানে সম্প্রতি প্রভু শ্রীরামের এক সুন্দর মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে। এবার কিছুটা এগিয়ে অপেক্ষারত গাড়িতে চড়ে বসতেই সেটা এগিয়ে চলল ৬ কিমি দূরে অবস্থিত পঞ্চবটীর পথে।
সীতাগুফা, পঞ্চবটী
গাড়ি এসে থামল কালারাম
মন্দিরের দক্ষিণ দ্বারের কাছে। আমরা মন্দির চত্বরে প্রবেশ করেই প্রস্তর-নির্মিত, সূক্ষ কারুকার্য-শোভিত এবং চৌদ্দটি স্তম্ভ বিশিষ্ট বিশাল
মন্দির দেখে মুগ্ধ হ’লাম। দ্রুত দাঁড়িয়ে পড়লাম বিগ্রহ দর্শনের দীর্ঘ লাইনে। এই
মন্দিরের নাম গর্ভগৃহে প্রতিষ্ঠিত শ্রীরামের রত্নশোভিত কৃষ্ণবর্ণ-মূর্তি থেকেই।
সেখানে শ্রীরামচন্দ্রের দুই পাশে বিরাজমান সুসজ্জিত শ্রীলক্ষ্মণ ও সীতাদেবীর
বিগ্রহ দু’টি।ইতিহাস জানায়, এক অজ্ঞাত বিগ্রহের প্রতি সমর্পিত মূল মন্দিরটি তৈরি হয়েছিল সম্ভবত সপ্তম থেকে একাদশ শতাব্দীর মাঝে, রাষ্ট্রকূট বংশের শাসনকালে। বর্তমান মন্দিরে অধিষ্ঠিত শ্রীরামচন্দ্রের মূর্তিটি ২০০০ বছরের পুরনো দাবী করা হলেও তার সত্যতা প্রমাণিত হয়নি। বর্তমান মন্দিরটি ১৭০০ শতাব্দীতে তৈরি হয়েছিল সর্দার রঙ্গরাও ওধেকার কর্তৃক। এক উপাখ্যান অনুযায়ী তুর্কী আক্রমণের সময় শ্রীরামের কৃষ্ণমূর্তিটিকে রক্ষা করার জন্য মন্দিরের পুরোহিতরা সেটিকে গোদাবরীর জলে ছুঁড়ে ফেলেন। সর্দার ওধেকার স্বপ্নে জানতে পারেন, শ্রীরামের কৃষ্ণমূর্তিটি গোদাবরীর জলের নীচে রয়েছে। বিগ্রহটিকে উদ্ধার করার জন্য তিনি এক অভিযান শুরু করেন এবং দৈবক্রমে তিনি সেটিকে খুঁজে পান। বিগ্রহটিকে উদ্ধার করে তিনি এক সাধুকে অনুরোধ করেন সেটিকে দৈব স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী মন্দিরে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য। এরপর ওধেকার মন্দির নির্মাণ করেন। নাসিকের ইতিহাসে সর্দার ওধেকার-এর সেই অভিযান এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মন্দিরে সর্দার ওধেকারের এক মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।
সুলা ভাইন-ইয়ার্ডস, নাসিক
এবার প্রায় আধ কিমি দূরত্ব হেঁটে পৌঁছে গেলাম গোরেরাম মন্দিরে। এখানে রাম-লক্ষ্মণ-সীতার সুন্দর মূর্তিগুলি দুধ-সাদা মার্বেল পাথরে তৈরি। এরপর কিছুদূর হেঁটে পৌঁছলাম সীতাগুম্ফার কাছে। সেখানেও দেখি দর্শনার্থীদের ভিড়। আমরাও সেই ভিড়ে সামিল হ’লাম। বিশ্বাস করা হয় যে অজ্ঞাতবাসের সময় এই গুফাতেই সীতা মহাদেব শিবের পূজা করেন। সরু সিঁড়িপথে গুহার নীচে পৌঁছলে রাম, লক্ষ্মণ ও সীতার বিগ্রহ দর্শন করা সম্ভব। আদি শিবলিঙ্গ রয়েছেন এই গুহাতেই। পূণ্যার্থীরা বিশ্বাস করেন যে এই স্থানেই রাক্ষসরাজ রাবণ সীতাদেবীকে হরণ করেছিলেন। গুহার ঠিক বাইরেই প্রাচীন পাঁচটি বটবৃক্ষের সমাহার। তাই এই স্থানের নাম পঞ্চবটী। বলা হয়, বটগাছগুলো শ্রীরামের অজ্ঞাতবাসের সময় থেকেই বিরাজমান এই স্থানে। রামায়ণের ‘অরণ্য কাণ্ড’ ঘটেছিল এই পঞ্চবটীতেই।
আনজানেরি পর্বত, নাসিক
এবার এসে পৌঁছলাম গোদাবরী
তীরে অবস্থিত রামকুণ্ডে। নাসিকের পবিত্রতম স্থান মানা হয় এই জলাশয়কে, কারণ এখানে স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্র স্নান করতেন। এটাই
অস্থি-দ্রবীকারক ‘অস্থিবিলয় তীর্থ’। ১৬৯৬ সালে এই কুণ্ড নির্মাণ করেন সাতারা-র
জমিদার চিত্ররাও খাটভ এবং পরে সেটার মেরামতি করানো হয় চতুর্থ পেশোয়া মাধবরাও-এর
মাতা গোপিকাবাই দ্বারা। বহু জন তাঁদের প্রিয়জনের অস্থি নিয়ে এসে এই অস্থিবিলয়
কুণ্ডে বিসর্জন দেন।রামায়ণের স্মৃতি খুঁজে বেরিয়েছি গত দুই ঘণ্টা ধরে। এবার খুশি মনে গাড়িতে চড়ে চললাম নাসিক তথা ভারতবিখ্যাত ‘সুলা ভাইনইয়ার্ড’ দেখতে। শ্রেষ্ঠ গুণমানের দ্রাক্ষাসুরা প্রস্তুতকারক ‘সুলা’ আজ সমগ্র পৃথিবীর সুরাপ্রেমীদের কাছে এক পরিচিত নাম। বেশ কিছু নতুন প্রজাতির আঙুর উৎপন্ন করে সুলা ভারতীয় সুরা-শিল্পকে সমৃদ্ধ করেছে। সুলা ভাইনইয়ার্ড প্রতিষ্ঠা করেন শ্রীরাজীব সামন্ত এবং আঙুরবাগানের নাম রাখেন ‘সুলা’, যা তাঁর মা সুলভা-র নাম থেকে নেওয়া।
গাড়ি চেপে আঙুরবাগান দেখতে দেখতে একেবারে টিকিট ঘরের কাছে এসে থামলাম। প্রবেশ মূল্য মাত্রাতিরিক্ত মনে হওয়ায় আমরা আবার গাড়ি চড়ে সুলা ভাইনইয়ার্ডস ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম ইয়র্ক ভাইনইয়ার্ডস কাম ওয়াইনেরি-র পথে। এই জায়গাটি সুলার চেয়েও সুন্দর, তবে খ্যাতি ও আয়তনে কিছুটা কম। জনপ্রতি ৫০০ টাকার টিকিট কেটে আমরা প্রবেশ করলাম ভাইনইয়ার্ডের সাজানো কমপ্লেক্স-এ। কাউন্টারে জানিয়ে দিল, ওই ১৫০০ টাকা ওয়াইন কেনা বা তার স্বাদ নেওয়া এবং সেখানকার রেস্টুরেন্ট খাওয়ার সময় ‘রিডিম’ করা যাবে। আঙুরের রস থেকে ওয়াইন তৈরি করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া দেখার দীর্ঘ সময় আমাদের কাছে ছিল না। আমরা বরং বিভিন্ন জায়গায় ছবি তুলে, পছন্দের কয়েকটি খাবার খেতে ঢুকে পড়লাম সাজানো রেস্টুরেন্টে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে গত কয়েক দশক ধরে সুরা-শিল্পের উন্নতি ও বিস্তৃতির কারণে নাসিক অঞ্চলকে ‘ভারতের নাপা ভ্যালি’ বলা হয়।
আমরা বিকেল ৪টে নাগাদ এগিয়ে চললাম ১২ কিমি দূরে অবস্থিত এমটিডিসি বোট ক্লাব-এর পথে। যথাসময়ে সেখানে পৌঁছে জনপ্রতি ১০০ টাকা মূল্যের তিনটি টিকিট কিনে প্রবেশ করলাম বোট ক্লাবের বিশাল চত্বরে। উইক এণ্ডে প্রচুর জনসাগম সেখানে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গঙ্গাপুর ড্যামের লেকে বোট রাইডের জনপ্রতি ৩০০ টাকা মূল্যের ৩টে টিকিট কিনে নিলাম এবং লাইফ-জ্যাকেট পরে নির্দিষ্ট বোটে উঠে পড়লাম। মাত্র ২০ মিনিটের নৌকা ভ্রমণ ৮ জন যাত্রীকে নিয়ে। লেকের বুকে নির্দিষ্ট পথে এই নৌকা-ভ্রমণ কোন চালকের সাহায্য ছাড়াই চলে। এছাড়াও আছে প্যাডল সাইক্লিং, কায়াকিং, বাম্পার রাইড, বানানা রাইড, হুইর্ল পুল ইত্যাদি। ড্যামের জলে ঢেউ উঠছে নৌকার পাশে, তাই হাত ভেজাতে ভারি মজা। নির্দিষ্ট দূরত্বে পৌঁছে যন্ত্রচালিত নৌকা থেমে যায় এবং প্রায় তিন মিনিট সময় নিয়ে সে প্রস্তুত হয় ফিরতি যাত্রার জন্য। বিশাল জলরাশির মাঝে এই নৌকা-ভ্রমণ সত্যিই বেশ আনন্দের।
নাসিক বোট ক্লাব থেকে সূর্যাস্ত
জানলাম, বোট ক্লাব থেকে লেকের বুকে সূর্যাস্ত দেখতে নাকি দারুণ
লাগে। তাই ক্লাবের প্রশস্ত লনে রেলিং-এর পাশে তিনটি চেয়ার দখল করে বসলাম। একটু পরেই
কাছে চলে এল গরম পকৌড়া ও চা। বিকেল ৫টা ৫০মিনিটে লেকের জলে লাল রং ছড়িয়ে সূর্যদেব অস্তাচলে গমন করলেন পরবর্তী ৪-৫ মিনিটে। এই সূর্যাস্তের
রূপ মনে থেকে যাবে বহুদিন। এবার আমরা গাড়িতে চড়ে ফিরে চললাম হোটেলের পথে। আধ-ঘণ্টা
পরে আমাদের অনুরোধে গাড়ি থামানো হলো একটা চা-দোকানে। ড্রাইভারের প্রস্তাবে আমরা
গুড়ের তৈরি চা খেয়ে শুধু খুশি হ’লাম না, নতুন অভিজ্ঞতাও লাভ করলাম। হোটেলে ফিরলাম সন্ধে ৮টা নাগাদ।সকাল পৌনে ৬টায় গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে হোটেল লবিতে। আমরা গাড়িতে চড়ে বসতেই গাড়ি চলতে শুরু করল। আমরা চলেছি ত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনে। নাসিক থেকে ৩৫ কিমি দূরে ঐ মন্দির অবস্থিত। আমরা চলেছি এনএইচ ৮৪৮ ধরে। প্রথম সকালে গাড়ি ছুটছে জোরে। ড্রাইভার বলেছে, সকাল ৭টার মধ্যে জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনের লাইনে দাঁড়াতে পারব। আধ ঘণ্টা পরেই গাড়ি ধরে নিয়েছে এনএইচ ৩০ এবং মিনিট ১৫ পরে আমরা ত্র্যম্বকেশ্বর রোড ধরে মন্দিরের কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। দ্রুত এক কাপ করে গরম চা খেয়েই গাড়ি রাখা হোল নির্দিষ্ট পার্কিং প্লেসে। মন্দিরের উত্তর দ্বার দিয়ে প্রবেশ করে দ্রুত গিয়ে লাইনে দাঁড়ালাম ৭টা বাজার ঠিক আগে।
শ্রীত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ মন্দির ত্র্যম্বকেশ্বর তহশিলের অন্তর্গত ত্র্যম্বক শহরে অবস্থিত। এই মন্দির ভগবান শিবের প্রতি উৎসর্গিত এবং এই লিঙ্গ দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম। পবিত্র নদী গোদাবরীর উৎস ত্র্যম্বকের নিকটস্থ ব্রহ্মগিরি পর্বত থেকে। মন্দির চত্বরের কুশবর্ত কুণ্ড (পবিত্র পুষ্করিণী) নির্মাণ করেন তৎকালীন ইন্দোর রাজ্যের ফড়ণবিস শ্রীমন্ত সর্দার রাওসাহেব পার্নেকার। গোদাবরীর জলে পূর্ণ এই কুণ্ডের আর এক নাম ‘গোদাবরী কুণ্ড’। মুঘল শাসক ঔরঙ্গজেব দ্বারা ধ্বংস্রাপ্ত হওয়ার পর বর্তমান মন্দিরটি নির্মাণ করেন পেশোয়া বালাজী বাজি রাও।
ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দির ব্রহ্মগিরি, নীলগিরি এবং কালগিরি নামক তিনটি পর্বতের মাঝে অবস্থিত। মন্দিরের তিনটি লিঙ্গ শিব, বিষ্ণু ও ব্রহ্মাকে নির্দেশ করে। মন্দিরের জলাধারকে বলা হয় ‘অমৃতবর্ষিনী’ যা দৈর্ঘ্য ও প্রস্থে যথাক্রমে ৩০ মিটার ও ২৮ মিটার। মন্দিরের অন্য তিন জলাধারের নাম ‘বিল্বতীর্থ’, ‘বিশ্বাননতীর্থ’ এবং ‘মুকুন্দতীর্থ’। মন্দিরের ভিতরে গঙ্গা, জলেশ্বর, রামেশ্বর, কেদারনাথ, রাম, কৃষ্ণ, পরশুরাম এবং লক্ষ্মীনারায়ণের চিত্র রয়েছে। এছাড়াও এই মন্দিরে সাধু-সন্ন্যাসীদের বহু মঠ ও সমাধি রয়েছে।
গত ২০ মিনিটে জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনের লাইন এগোয়নি একটুও, কিন্তু আমাদের পিছনে লাইন ক্রমশই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। আধ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলে লাইন একটু নড়াচড়া শুরু করল। ড্রাইভার বলেছিল, ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে নিশ্চয়ই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন সম্পূর্ণ হবে। কিন্তু গত ২ ঘণ্টায় আমরা মাত্র ৩০০ মিটার পথ অতিক্রম করতে পেরেছি। বুঝতে পারছি, সামনের দিকে পূণ্যার্থীদের লাইন অনেকটাই দীর্ঘ – কিন্তু কতটা দীর্ঘ বোঝা যাচ্ছে না। প্রায় ৪ ঘণ্টা কেটে যাবার পরে মনে হলো, আমরা অর্ধেক পথ অতিক্রম করে এসেছি। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আমাদের এখন লম্বা হলের মধ্যে দুই পাশে রেলিং ঘেরা বেশ কয়েকটি জায়গা পেরোতে হবে। হঠাৎই মনে পড়ল, গত মে মাসে শ্রীবদ্রীনাথ দর্শনে আমাদের সময় লেগেছিল পুরো ৫ ঘণ্টা। বুঝতে পারছি, শ্রীত্র্যম্বকেশ্বর জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শনে সময় লাগবে আরও বেশি।
ইতিমধ্যে পূণ্যার্থীদের জন্য গর্ভগৃহে জ্যোতির্লিঙ্গের ‘লাইভ দর্শন’ শুরু হয়েছে হলঘরের দেওয়ালে লাগানো বেশ কয়েকটি বড় এলইডি টিভির মাধ্যমে। বর্তমানে দু’জন পূজারীর দ্বারা লিঙ্গের শোধন-কার্য সম্পন্ন হচ্ছে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায়। আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি লক্ষ্যের দিকে। যখনই লাইনের গতি রুদ্ধ হচ্ছে, ক্লান্ত পূণ্যার্থীরা রেলিং-এ লাগানো স্টিলের আসনে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। পাঁচ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হবার পর আমরা একটা বড় ঘরে প্রবেশ করলাম। দেখি, সেখানেও রেলিং ঘেরা লাইনের মাধ্যমে অসংখ্য পূণ্যার্থী এগিয়ে চলেছেন। লাইভ দর্শনে এখন প্রত্যক্ষ করছি লিঙ্গের ‘অভিষেক’-সাজ। চোখ ফেরানো যাচ্ছে না জ্যোতির্লিঙ্গের উপর পুষ্পসজ্জার শোভা থেকে। আমাদের হাতে-ধরা পূজোর ডালিতে ফুলেরা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে পড়ছে।
বেলা ১টা নাগাদ আমরা তৃতীয় তথা শেষ ঘরে পৌঁছলাম। এই ঘর অতিক্রম করে গর্ভগৃহে পৌঁছনোর লাইন। আমরা এখন জ্যোতির্লিঙ্গের ‘রুদ্রবেশ’ প্রত্যক্ষ করছি লাইভ দর্শন-এর মাধ্যমে। প্রায় ৪০ মিনিট পরে আমরা গর্ভগৃহে পৌঁছনোর লাইনে দাঁড়িয়েছি। এখানে পূণ্যার্থীদের লাইন অপেক্ষাকৃত দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। মিনিট পনেরো পরেই আমার দক্ষিণ দিকে গর্ভগৃহের আসনে জ্যোতির্লিঙ্গের দর্শন হলো মাত্র কয়েক সেকেণ্ডের জন্য। চলন্ত লাইনে দাঁড়িয়েই পূজার ডালি দেবার সময় আবার দেখা পেলাম পবিত্র জ্যোতির্লিঙ্গের। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা মন্দিরের বাইরে চলে এলাম নিষ্ক্রমণ দ্বারের মাধ্যমে।
এবার শ্রীত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরের ছবি তুলে উত্তর দ্বার দিয়ে আমরা তিনজন রাস্তায় চলে এলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই খুঁজে পেলাম পূজা-সামগ্রী নেওয়ার সেই দোকানটা, যেখানে ছেড়ে এসেছিলাম আমাদের জুতোগুলো। এবার এক দোকানে চা খেয়ে ড্রাইভারকে ফোন করে জানালাম আমরা কোথায় রয়েছি। সেও আমাকে ফোনে বুঝিয়ে বলল, কীভাবে আসতে হবে নতুন কার-পার্কিং-এর জায়গায়। তবু দুই-একজনকে জিজ্ঞেস করে প্রায় ৫-৭ মিনিট পরে উদ্দীষ্ট স্থানে গিয়ে পৌঁছলাম। আমরা গাড়িতে বসতেই ড্রাইভার ইঞ্জিন স্টার্ট করল। মনে এক দারুণ আনন্দ অনুভব করছিলাম সেই সময়।
ড্রাইভারকে বলা ছিল, সে গাড়ি দাঁড় করাবে শ্রীহনুমানের জন্মস্থান আনজানেরি-তে যার অবস্থান নাসিক ও ত্র্যম্বকেশ্বরের মাঝে। সে গাড়ি ঘুরিয়ে আনজানেরি পর্বতের নীচে হনুমান মন্দিরের কাছে পৌঁছে গাড়ি থামাল। গাড়ি থেকে নেমে একটু এগিয়েই পৌঁছলাম মন্দিরে। সেখানে শ্রীহনুমানজীর এক অসাধারণ সুন্দর মূর্তি প্রত্যক্ষ করলাম। বিখ্যাত মারাঠি সন্ত-কবি একনাথের মতে, আঞ্জাণা দেবী এক আদর্শ পুত্রলাভের আশায় আনজানেরি পর্বত শৃঙ্গে ৭০০০ বছর ধরে মহাদেব শিবের তপস্যা করেন। শিব সেই তপস্যায় সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে আশীর্বাদ দান করেন এবং তাঁরই পুত্র হয়ে হনুমান রূপে জন্মগ্রহণ করেন। মতান্তরে, শ্রীহনুমানের জন্ম হয় আঞ্জানাদ্রি পর্বতে। মহর্ষি বাল্মিকী রচিত রামায়ণে বর্ণিত কিষ্কিন্ধ্যা (বর্তমানে কর্ণাটকের হাম্পি)-ই হনুমানজীর জন্মস্থান।
পরিকল্পনা মাফিক দ্রষ্টব্য স্থানগুলি দর্শন করে অনুভব করলাম, নাসিক ভ্রমণ যেন সার্থক হলো এই দুই দিনে। আমরা এবার গাড়িতে চড়ে খুশি মনে ফিরে চললাম হোটেলের পথে।
~~000~~

%20%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%20%E0%A6%AE%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A6%E0%A6%BF%E0%A6%B0,%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95.jpg)
%20%E0%A6%B8%E0%A7%80%E0%A6%A4%E0%A6%BE%E0%A6%97%E0%A7%81%E0%A6%AB%E0%A6%BE,%20%E0%A6%AA%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9A%E0%A6%AC%E0%A6%9F%E0%A7%80.jpg)
%20%E0%A6%B8%E0%A7%81%E0%A6%B2%E0%A6%BE%20%E0%A6%AD%E0%A6%BE%E0%A6%87%E0%A6%A8-%E0%A6%87%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%A1%E0%A6%B8,%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95.jpg)
%20%E0%A6%86%E0%A6%A8%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0%E0%A6%BF%20%E0%A6%AA%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4,%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95.jpg)
%20%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A6%BF%E0%A6%95%20%E0%A6%AC%E0%A7%8B%E0%A6%9F%20%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%20%E0%A6%A5%E0%A7%87%E0%A6%95%E0%A7%87%20%E0%A6%B8%E0%A7%82%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4.jpg)
No comments:
Post a Comment