বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| ছোটগল্প
অন্বেষা
সরকার
পলাশের
রঙে এক বিকেলের গল্প
"গঙ্গার ঘাটে! আর কী সুন্দর জায়গা বল তো! নদীর জল ধীরে ধীরে বইছে, হালকা বাতাস, চারপাশে এত শান্তি… মনে হচ্ছিল যেন একটা ছবি আঁকা দৃশ্য।"
নৈহাটি থেকে বাড়ি ফিরে
চন্দ্রিমা তখনও যেন একটু ক্লান্ত, আবার মনটা অদ্ভুতভাবে
খুশিতেও ভরা। সারাটা পথ পিসিকে বাড়ি দিয়ে আসার পরও তার চোখের সামনে ঘুরছিল
গঙ্গার ঘাটের সেই শান্ত বিকেল, পলাশ ফুলের লাল রং আর শিমুল
স্কুলের চারপাশের নীরব সৌন্দর্য। বাড়িতে ঢুকেই সে ব্যাগটা রেখে ফোনটা হাতে নিল।
তার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তুতুলকে ফোন করতেই হবে—কারণ এত সুন্দর একটা দিনের গল্প
না বললে যেন মনটা শান্ত হবে না। ফোনটা বাজতেই ওপার থেকে তুতুলের কণ্ঠ ভেসে এল,
—হ্যালো, চন্দ্রিমা! পৌঁছেছিস
বাড়ি?
চন্দ্রিমা একটু হেসে বলল,
—হ্যাঁ রে, একটু আগেই এলাম। আর
তোকে একটা দারুণ গল্প বলব।
তুতুল আগ্রহ নিয়ে বলল,
—কী রে? এত উত্তেজিত শোনাচ্ছে
কেন?
চন্দ্রিমা বলল,
—কাল পিসিকে নৈহাটি পর্যন্ত বাড়ি দিয়ে আসতে গিয়েছিলাম তো।
—হ্যাঁ, সেটা তো জানি। তারপর?
চন্দ্রিমা একটু থেমে বলল,
—পিসিকে বাড়িতে দিয়ে যখন বেরোচ্ছিলাম, তখন দাদা বলল,
‘চল তোকে একটা জায়গা দেখাই।’
তুতুল অবাক হয়ে বলল,
—কোথায় নিয়ে গেল?
—গঙ্গার ঘাটে! আর কী সুন্দর জায়গা বল তো! নদীর জল ধীরে ধীরে
বইছে, হালকা বাতাস, চারপাশে এত শান্তি… মনে হচ্ছিল যেন একটা ছবি আঁকা দৃশ্য।
তুতুল মুগ্ধ হয়ে বলল,
—বাহ্! শুনেই তো ভাল লাগছে।
চন্দ্রিমা আবার বলল,
—আর সেখানে একটা বড় পলাশ গাছ ছিল। গাছটা ভর্তি লাল লাল ফুল।
যেন পুরো গাছটা আগুনের মতো জ্বলছে।
তুতুল হেসে বলল,
—পলাশ ফুল মানেই তো বসন্তের রং।
চন্দ্রিমা বলল,
—ঠিক তাই। তারপর দাদা বলল, ‘এইখানে দাঁড়া, তোর একটা ছবি তুলি।’
—ওহ! তাহলে ছবি তুলেছিস?
—হ্যাঁ! পলাশ ফুলের নিচে দাঁড়িয়ে একটা ছবি। আর একটা ছবি
গঙ্গার ঘাটের ধারে।
তুতুল কৌতূহল নিয়ে বলল,
—আর শিমুল?
চন্দ্রিমা বলল,
—হ্যাঁ, গঙ্গার ঘাটের কাছেই
একটা পুরনো শিমুল স্কুল আছে। লালচে দেওয়াল,
সামনে
শিমুল গাছ… পুরো জায়গাটা যেন খুব শান্ত আর সুন্দর।
তুতুল একটু আবেগ নিয়ে বলল,
—শুনে মনে হচ্ছে খুব সুন্দর একটা মুহূর্ত ছিল।
চন্দ্রিমা আস্তে বলল,
—সত্যি বলছি, ওই সময়টা আমি শুধু
চারপাশটা দেখছিলাম। নদীর জল, ফুলের রং, বাতাস… মনে হচ্ছিল সবকিছু খুব শান্ত।
তুতুল বলল,
—তারপর?
চন্দ্রিমা হাসতে হাসতে বলল,
—তারপর বাড়ি ফিরে দেখি দাদা আমাকে একটা খাম দিল।
—খাম?
—হ্যাঁ! খুলে দেখি ওই ছবিগুলো প্রিন্ট করে দাদা আমাকে গিফট
করেছে।
তুতুল অবাক হয়ে বলল,
—ওহ! এটা তো সত্যিই দারুণ একটা উপহার।
চন্দ্রিমা বলল,
—হ্যাঁ রে, আমি তো একদম অবাক
হয়ে গিয়েছিলাম। এত সুন্দর মুহূর্তগুলো ছবিতে ধরা পড়ে গেছে।
তুতুল একটু মজা করে বলল,
—ঠিক আছে, এত সুন্দর ছবি
তুলেছিস আর আমাকে দেখাবি না?
চন্দ্রিমা হেসে বলল,
—দেখাব অবশ্যই! কাল দেখা হলে তোকে সব দেখাব।
তুতুল বলল,
—আমি কিন্তু খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করব।
চন্দ্রিমা জানালার বাইরে
তাকিয়ে বলল,
—জানিস তুতুল, কখনো কখনো ছোট ছোট
মুহূর্তই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতি হয়ে থাকে।
তুতুল মৃদু স্বরে বলল,
—ঠিক বলেছিস। আর তোর আজকের দিনটা মনে হয় তেমনই একটা স্মৃতি।
চন্দ্রিমা হেসে বলল,
—হ্যাঁ, সত্যিই তাই।
ফোনটা কেটে যাওয়ার পরও
চন্দ্রিমার মনে তখনও ভেসে উঠছিল গঙ্গার ঘাটের সেই বিকেল, পলাশ ফুলের লাল রং আর প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া এক
টুকরো সুন্দর স্মৃতি।
~~000~~
No comments:
Post a Comment