বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন
সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা
| ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা
দাস
আমারে
ভুলিয়া যেও
"ভাইটার পড়াশোনার খরচ, মায়ের ওষুধ, সব দায়িত্ব ওর। বাংলায় এমএবিএড্। চাকরির চেষ্টা করছে প্রচুর কিন্তু পাচ্ছে না। টিউশনি করে চলছে সংসার। খুব খাটুনে মেয়ে।"
অনেকদিন পরে কৃষ্ণাকে দেখলাম।
কৃষ্ণা আমার ছেলেকে ছোটবেলায় পড়াত। তখন আমি দমদম মতিঝিল এলাকায় শ্বশুরবাড়ি
থাকতাম। ওই পাড়ায়ই কৃষ্ণার বাড়ি ছিল। আমি যখন কেষ্টপুরে ফ্ল্যাট কিনে
চলে আসি তার অনেক আগেই কৃষ্ণা একদিন হঠাৎ হারিয়ে গেছিল। এতদিন বাদে ওকে দেখে চমকে
উঠলাম। চিনতে একটুও অসুবিধে হয়নি,
সেই
শ্যামলা রঙে আলগা মিষ্টি মুখশ্রী। একটা সবজির ঠেলার পাশে টুলে চুপ করে বসে আছে।
একটু অসংলগ্ন লাগল। কাছে গিয়ে ডাক দিলাম,
-কৃষ্ণা! কেমন আছ?
তুমি
এখানে?
না, চোখ তুলে চাইল না। কোন জবাবও দিল না। সবজিওয়ালা জিজ্ঞাসা
করল,
-আপনি চেনেন? ওনার নাম জানেন? কোথায় বাড়ি?
বুঝলাম ও সব স্মৃতি মুছে বসে
আছে। একাকী, সব দায়িত্বের অবসান ঘটিয়ে
সব হারিয়ে হয়তো মেয়েটা শান্তি পেয়েছে।
মনে পড়ছে বছর ত্রিশ আগের
কথা। বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি এসেছি, বেশি মানুষ চিনি না।
কাজের ফাঁকে কখনো বারান্দায়, কখনো ছাদে গেলে
সামনের রাস্তা দিয়ে একটা মেয়েকে দেখতাম সবসময় ব্যস্ত, ছুটছে। কাঁধে ব্যাগ,
বারবার
ঘড়িতে চোখ। আমার বয়সি বা কিছু বড়। ভাবতাম হয়তো কোথাও চাকরি
করে আর আমি দেখো এইই বয়সে সারাদিন স্বামী-সংসার নিয়ে
ব্যস্ত। শাশুড়ি মায়ের কাছে প্রথম
শুনলাম ওর নাম "কৃষ্ণা"।
বাবা নেই, সংসারে অভাব। ভাইটার পড়াশোনার খরচ, মায়ের ওষুধ, সব দায়িত্ব ওর।
বাংলায় এমএবিএড্। চাকরির চেষ্টা করছে প্রচুর কিন্তু পাচ্ছে না। টিউশনি করে চলছে
সংসার। খুব খাটুনে মেয়ে। একা হাতে হাল ধরে রাখার এক অদম্য জেদ আছে।
আমার ছেলেকে প্রথম স্কুলে
ভর্তি করার দায়িত্ব ওকেই দিলাম। হয়তো শাশুড়ি মায়ের কাছে ওর
কথা শুনেই। পড়াতে আসত রোজ সন্ধ্যায়। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমার সংসারের
কথা, ওর বাড়ির কথা, সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতাম। এভাবে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। কেটে গেল কয়েক
বছর। আমি রীতিমতো গিন্নিবান্নি হয়েছি।
কৃষ্ণার শরীর আরো ভেঙেছে পরিশ্রমে। ওকে বিয়ের পরামর্শ দিতাম। অনেক বোঝাতাম।
পাড়ায় ওষুধের দোকান জয়ন্ত-দা ওকে ভালবাসে সে। ওর
অপেক্ষায় তারও বয়স বাড়ছে। কিন্তু কৃষ্ণার দায়িত্ব যেন শেষ হয় না। ভাইটা চাকরি
পেলে আমি আর আমার শাশুড়ি-মা ওকে একটু
চেপেই ধরলাম বিয়ের জন্য। সেই লোকটিরও তো অপেক্ষার একটা সীমা আছে। কিন্তু ওর মা মেয়ের বিয়েতে রাজি নন। তার ভয় যদি বিয়ের
পর মেয়ে আর না সাহায্য করে। আমাদের বলা বৃথা হল, ও সাহস করে এগোতেই পারল না। ভাই নিজেই বিয়ে করে বৌ ঘরে তুলল। কিছুদিনের মধ্যে
ফুটফুটে এক মেয়ের জন্ম দিল। সে ও বড় হচ্ছে। পিসি বলতে অজ্ঞান। অসম্ভব ভালবাসে
কৃষ্ণা ভাইঝিকে। এখন ওদের সুখের সংসার। কৃষ্ণার হয়তো একটু মুক্তির সময় এসেছিল।
কিন্তু জয়ন্ত-দা এতদিন তার
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মায়ের পছন্দের মেয়েকে বিয়ে করে নিয়েছে। অনেক বুঝিয়েছিল সেও, কিন্তু এভাবে আর
কতদিন? মনে আছে জয়ন্ত-দার বৌভাতের
দিন কৃষ্ণা আমার ছেলেকে সন্ধ্যায় পড়াতে এসেছিল। চোখের জল কী কঠোর চেষ্টায় আটকে রেখেছিল। আমি সেদিন কোন কথা বলিনি ওর সাথে।
ভাইয়ের বৌয়ের সাথেও শুরু হল
নিত্য অশান্তি। তার মেয়ে মাকে ছেড়ে পিসির ন্যাওটা কেন হয়েছে। বাড়িতে অবিবাহিত
ননদ থাকলে সংসারে নজর লাগে। নানা বাহানা নিয়ে তুমুল গণ্ডগোল।
কৃষ্ণার মা আজকাল ছেলে-বৌয়ের মন রাখতে মেয়েকেই দোষারোপ করে
সুযোগ বুঝে। একদিন হঠাৎ সকালবেলা শুনলাম কৃষ্ণাকে পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ওই ছোট
ব্যাগটা শুধু নেই। জামাকাপড় সব ঘরে পড়ে আছে। বাড়ির লোক একটা দায়সারা পুলিশ ডায়েরি করে নিষ্কৃতি পেল যেন। কয়েক বছরের মধ্যে ওর মা মারা গেল। ভাই বাড়ি
প্রোমোটারকে বেচে অন্য কোথাও বাড়ি কিনেছে। জয়ন্ত-দা সংসারী
হয়েছেন। স্ত্রী, দুটো ছেলে নিয়ে ভরা
সংসার। ধীরে ধীরে সবার স্মৃতি থেকে কৃষ্ণা মুছে গেছিল। আজ এত বছর পড়ে মনের মধ্যে
তুফান উঠল ওকে এই অবস্থায় দেখে। চোখের জলের বাধ ভাঙল।
~~000~~
No comments:
Post a Comment