প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, June 17, 2026

বিক্রেতা | তড়িৎ চক্রবর্তী

বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | ছোটগল্প
তড়িৎ চক্রবর্তী
 
বিক্রেতা

"মার শরীরটা কোনোদিনই ভাল ছিল না, ইদানীং আরো হাড় জিরজিরে হয়ে গিয়েছে। তার উপর ছ’মাসের ভাইটা ইদানীং যেন আরো টেনে দুধ খায়, মা’র ভারী দুধগুলো কেমন যেন শুখিয়ে গিয়েছে, ভাইও পুরো দুধ না পেয়ে কামড়ে খিমছে দেয়।"

 
তখন বয়েস চোদ্দো পেরিয়ে পনেরোতে পড়েছে। গতবছর এ’রকম সময়ে ভর পেট চোলাই আর হাবিজাবি চাট খেয়ে সারারাত হেগে বাপটা ভোরে মরল। চোলাইয়ের ঠেকের লোকজন নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে এসেছিল। এগারোদিন পরে মার হার দুটো বেচে শ্রাদ্ধ হলো আর বারোজন গাঁয়ুই খেলো। সেদিন অনেকদিন পরে ও বেশ আনন্দ করে খেয়েছিল পেটপুরে।
বাপটা মরে যেতে ও’ প্রথমে এত বোঝেনি, কদিন পর থেকে ব্ড্ড ফাঁকাফাঁকা লাগতে। বাপ খুব ভালবাসত তাকে, ভ্যানে বসিয়ে পাড়া ঘুরিয়ে আনত, কাঁধে চড়িয়ে বনবন করে ঘোরাত, কাঠি আইসক্রিম কিনে দিয়ে বলত,
-তুই কলেজে পড়বি। তোকে রানী সাজিয়ে বিয়ে দেবো। কত আনন্দ করব।
সে মানুষটা নেই দুমাস হলো। মাঝেমাঝে মনেপড়ে, মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়।
এখন সে ঢিল ছুঁড়ে আম পাড়ে, স্নান করতে গিয়ে আঁচল পেতে পুঁটি আর তেচোখা মাছ ধরে, আর প্রজাপতিকে বন্ধু করে দৌড়ে বেড়া। সংসার নিয়ে মা গজগজ করে। মার শরীরটা কোনোদিনই ভাল ছিল না, ইদানীং আরো হাড় জিরজিরে হয়ে গিয়েছে। তার উপর ছ’মাসের ভাইটা ইদানীং যেন আরো টেনে দুধ খায়, মা’র ভারী দুধগুলো কেমন যেন শুখিয়ে গিয়েছে, ভাইও পুরো দুধ না পেয়ে কামড়ে খিমছে দেয়।
কিছুদিন বাড়ির জিনিস বেচে সংসার চললো যখন একান্তই অচল হলো, মা একবাড়িতে দু’বেলার রান্নার কাজ নিলো। ভাইকে সঙ্গে নিয়ে যেত। আমার উড়ে বেড়ানো আরো বাড়ল। মার অনুপস্থিতিতে বাড়ির কিছু কাজ সেরে রাখার জন্যে মা বলে যেত কিন্তু কে কার কড়ি ধারে, দিনটা কাটত পুকুরে বাগানে টইটই করে। আমার সেরকম
কোনো বন্ধু ছিল না, ছিলাম বড্ড একালসেঁড়ে
সংসারটা বড়ই টনাটানিতে, অনেকদিন শুধু শাপলা সিদ্ধ আর খুঁদ জুটত। হঠাৎ একদিন মা আমাকে হালদারবাড়ির ঘর মোছা আর উঠোন ঝাঁটের কাজে পাঠাল। বাড়িতে শুধু বুড়ো আর বুড়ি থাকে, কাজ খুব কম। বুড়ো সারাদিন বই মুখে বসে থাকে, আর গিন্নিমা নিজের মনেই বকবক করে। আমাকে পেলে ছাড়তে চায় না, শুধু বকেই যায়, যার অর্ধ্যেক কথা বুঝি না। তবু ঘাড় নাড়ি, গিন্নিমা বলে কথা, মালকিন।
হালদার গিন্নি মানুষটা ভাল, খেতে দিত, ওনার বাদ দেওয়া শাড়িগুলোও দিত আমাদের পরবার জন্যে। একটু খুশি ফিরল। হঠাৎ একদিন দেখলাম, লম্বা ফরসা মাথা ভরা কোঁচকানো চুল, বেশ বড় একটা সুটকেস নিয়ে এক যুবক হালদার বাড়িতে এলো। খুব হইচই, গিন্নিমা তো যেন কীভাবে সে ছেলেটিকে যত্ন করবেন যেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। বাপ-মা দুজনায় কত আপ্যায়ন, কত আদিখ্যেতা। ছেলেটার চাউনি ভাল ছিল না। ওর  চোখ সবসময়ে আমাকে ঘিরে থাকত। মোটেই ভাল ঠেকত না। ঝাঁট দেবার সময়ে জানলা দিয়ে আমার দিকে বিশেষ করে আমাকে যেন মাপত, আমার বুকের ভাঁজ মাপত।
ফাঁকা বারান্দায় দু’দিন হাত ধরতে এলো। আস্তে আস্তে তার সাহস বাড়তে লাগল। একদিন ঘর মোছার সময়ে পাছায় হাত দিল, গিন্নিমাকে বলে দেব বলতে মুচকি হেসে চলে গেল। মাকে বললাম। মা যেন কানেই দিল না।
হয়তো সমাধান ভাবতে আমাদের পাশের পাড়ার শিবু দাসের সাথে আমার বিয়ে ঠিক করল। আমি তো অবাক, পাড়ার অনেকেই বারণ করল, শিবুর আগের বউটা বসন্ত রোগে মারা গিয়েছে। আমার দুগুণ বয়স। একটা ভ্যান আছে, সেটাই চালায়। দুদিনের মধ্যে আমাকে সিঁদুর পরিয়ে ওর টালির চালের ছ্যাচারী বেড়ার ঘরে নিয়ে গিয়ে তুলল।
বিয়ের রাতে একপেট চোলাই খেয়ে এসে অনেক আদর করল বটে কিন্তু বুঝলাম শিবু শারীরিকভাবে অক্ষম।
একদিন আমাকে বলে ফেলল মার কাছ থেকে ও আমাকে বিশ হাজার টাকায় কিনে এনেছে। সেদিন ঠিক করলাম আমার বিক্রেতা মার মুখ আর কোনোদিন দেখব না।
দিনগুলো গড়াচ্ছিলো ভালই। শিবু ভ্যান চালায়। সংসারটা চলে যায়। দুপুরে-রাত্রে যখন পারে সোহাগ করে, কিন্তু আমার শারীরিক চাহিদার সময়ে শিবু করুণ চোখে তাকিয়ে নেতিয়ে পড়ে। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়ে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থাকি, জানতে পারি না কখন নিজে থেকে চোখের কোল দিয়ে জল গড়িয়ে যায়। তবু শিবু, শিবুর চোলাই, ভ্যান, এসব নিয়ে আমার দিনগুলো ভালই কেটে যাচ্ছিল। শিবু বাড়ি ফিরে বাজার দিলে রান্না করি।
হঠাৎ সেদিন সারাদিন শিবু ফিরল না। শিবু না আসলে খেতামনা, সারা দিনরাত কিছু পেটে পড়ল না।
সকালে ওদের ইউনিয়নের লোকেরা খবর দিল, একটা ট্রাক শিবুর ভ্যানটাকে টুকরো করে শিবুকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়েছে। ভাগ্যগুণে শিবু প্রাণে বেঁচেছে, ইউনিয়ন থেকে ওকে হাসপাতালে ভর্তি করেছে কিন্তু খুব প্রাণ সংশয়। ইউনিয়ন থেকে টাকা দিয়ে ওষুধপত্র কিনে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের ঘরে সান্ত্বনা জানাতে ইউনিয়নের বড় নেতা এসে আমার গায়ের খারাপ জায়গাগুলোতে হাত ছুঁইয়ে বলে গেল, ইউনিয়ন শিবুর পাশে আছে। রাহা খরচের কিছু টাকা আমাকে দিয়েও গেল।
প্রায় একমাসের উপর যমে মানুষের টানাটানির পরে শিবু বাড়ি ফিরল। ফিরল বটে কিন্তু শিবুর কোমর থেকে নিচের দিক আসার হয়ে গিয়েছে। বসতেও পারে না। ইউনিয়নও টাকা দেওয়া বন্ধ করল, শুধু মাঝেমাঝে এসে ওদেরই চায়ের খরচ করিয়ে দেয়। অগত্যা একটা রান্নার কাজে ঢুকলাম। মেসের অনেকের রান্না, ধরে নিয়েছিলাম কষ্ট করতে হবে। দুপুরে ফেরার সময়ে একেবারের বাড়ির বাজার করে আনতাম, এসে নিজেদের রান্না আর ঘরের সব কাজ, শিবুকে পরিষ্কার করিয়ে দিতে হতো। আর কেন জানি না ফেরার সময়ে শিবুর জন্যে বাবুর দোকান থেকে এক বান্ডিল কালো সুতোর বিড়ি আর একটা দেশলাই নিয়ে আসতাম। শিবুটা সারা দিনমান একইভাবে শুয়ে থাকত করুণ ভাবে তাকিয়ে। ইদানীংকালে শিবুর প্রতি একটু বেশ দরদ পরে গিয়েছিল। বাচ্চাদের মতো শিবুকে নিয়ে নাড়াচাড়া করতেই কোথা থেকে সময় কেটে যায়, বুঝতেও পারি না। অনেক সময়ে সব কাজ সেরে ঠ্যাং ছড়িয়ে চুল বাঁধার সময়ে শিবুর সঙ্গে গল্প জড়ে দিতাম, ভালভাবে না হলেও চলে যাচ্ছিল টুকটুক করে।
গোল বাধল তখনই যখন একদিন কাজ থেকে ফেরার সময় দেখলাম, হালদারবাড়ির ছেলেটা আমাদের বাড়ি থেকে বেরোচ্ছে। প্রথমটা কিছু মনে করিনি।
এরপর থেকে দেখলাম, হালদারবাড়ির ছেলেটি প্রায় শিবুর কাছে আসতে লাগল। ছেলেটি চলে গেলে শিবু প্রায়ই আমাকে অনেকগুলো টাকা দিয়ে বাজার পাঠাতে। আনাত অনেক খাবারদাবার। ছেলেটা যখনই আসত শিবুর আনন্দ বাড়ত নতুন মদের বোতল পেয়ে, সঙ্গে অনেক সময়ে নতুন জামাকাপড়।
সেদিন সারাদিন বৃষ্টি, কাজে যাইনি, আমাদের মেনু আজ খিচুড়ি পাঁপড় ভাজা, এই আবহাওয়ার সেদিন মনটা বেশ ফুরফুরে। আর শিবু যেন এই সুযোগই খুঁজছিল, খেতে বসে বলল,
-আমার দিব্বি কর আমার একটা কথা রাখবি।
-বলো রাখব, তবে দিব্বি ছাড়ো।
-না, তোকে কথাটা রাখতে হবে। না হলে আমার মরা মুখ দেখবি।
-আচ্ছা বলও রাখব।
-হালদারবাড়ির ছেলের কাছ থেকে আমি অনেক কটা টাকা নিয়েছি, কেবলমাত্র তুই একরাত তার সঙ্গে কাটাবি বিছানায়। কেবল মাত্র তো একটাই রাত।
একথা শোনার পরে চোখে অন্ধকার দেখলাম। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারলাম না। তারপরে খোলা খিলটা দিয়ে শিবুকে খুব পেটালাম। মার খেয়ে শিবু হাত জড়ো করে কাঁদতে লাগল। কিন্তু মুখে বলতে লাগল,
-আমাকে ক্ষমা করে দে। কিন্তু তুই না রাজি হলে হালদারবাড়ির ছেলেটা ওর দলবল এনে আমাকে জানে মেরে দেবে।
ভয়ে শিবুর মুখ পাংশুটে। মৃত্যু ভয়ে ভারাক্রান্ত। অগত্যা। সেদিন একটু গভীর রাতে সে এলো। শিবু তখন কুঁকড়ে খাটের একধারে শুয়ে।
আমার জন্যে সস্তা সিল্ক শাড়ি আর উগ্র সেন্ট নিয়ে এসেছিল আর শিবুর জন্যে একবোতল দামি মদ। আমাকে নতুন শাড়ি পরিয়ে প্রায় পুরো সেন্টটা ঢেলে দিল। তারপরে চলল ভালবাসার নামে নির্মম যৌন অত্যাচার। কামড়ে খিমছে আমার বুকদুটোকে ফালাফালা করল। আমার গোপনাঙ্গ হলো ক্ষতবিক্ষত। আমি চিৎকার করতে করতে কখন জ্ঞান হারিয়েছি মনে নেই। শুনেছিলাম ভয়ে পেয়ে সে একটা ভ্যান ডেকে আমাকে আমাদের কাছের ছোট  হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ছিল।
জ্ঞান ফিরলে গায়ে খুব ব্যথা। নিজেকে টানতে টানতে যখন রেল লাইনের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলাম, পিছন থেকে কে একজন টেনে ধরল। পিছন ফিরে দেখি লাইন বস্তির শম্পামাসি। বললে,
-জীবনটা এত কম দামি নয়রে। এতদিন তো তোকে অন্যেরা বিক্রি করল। এবার না হয়, নিজেকে নিজে বিক্রি কর।
সেই থেকে আমি রানীর হালে আছি, শুধু সন্ধ্যার সময়টুকু কিছুক্ষণের জন্যে নিজেকেই নিজে বিক্রি করি, কারোর জন্যে নয়, একদম নিজের জন্যেই।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)