প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

লোন আতঙ্ক | অর্পিতা চক্রবর্তী

বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ছোটগল্প
অর্পিতা চক্রবর্তী
লোন আতঙ্ক

"বেশ তবে তাই করো। তুমি বরং তোমার ছেলেকে বলো ওটা ফেরৎ নিয়ে নিতে। এমনিতেই আমি ওই ফোন থেকে যোজন ক্রোশ দূরে অবস্থান করি। আর তাছাড়া তোমার তো একটা অতি আধুনিক ফোন আছে এবং তুমি সেই ফোনের সব কিছুই পারো।"

 
কী ব্যাপার কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। কাল থেকে নন্দদুলাল-বাবুর ফোনটি বাজলেই উনি সাইলেন্ট করে দিচ্ছেন। কিন্তু কেন? প্রশ্নটা মাথায় আসলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেন না অতসীদেবী। আসলে এক-দুই-দশ-বিশ নয়, পুরো পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে এমন তো কোনদিন হয়নি। তবে আজ কেন? কার ফোন আসে? কে এতবার ফোন করে?
সেদিন নন্দদা বাথরুমে ছিল আর ঠিক সেই সময়ে ফোনটা যথারীতি বেজে উঠল। অতসীদি গ্যাস বন্ধ করে চশমা পড়তে পড়তে একপ্রকার দৌড় দিয়ে এসে ফোনটি ধরলেন। যদিও এই বয়সের দৌড়কে কচ্ছপের গতির সঙ্গে তুলনা করলেই বোধহয় ভাল হয়।
-ও মা এ তো কোম্পানির ফোন। এর জন্য আবার এত লুকোচুরির কী আছে কে জানে? আসলে বুড়ো বয়সের ভীমরতি বোধহয় এমনটাই হয়।
এদিকে আমাদের নন্দদা বাথরুম থেকে তড়িঘড়ি বেড়িয়ে দেখলেন ফোন কেটে গেছে। কিন্তু ওনার চোখ আর মন দুটোই তখন নিবিষ্ট হয়ে আছে ওই মহামূল্যবান ফোনটির দিকে। অতসীদি বললেন,
-কী ব্যাপার? এত মন দিয়ে কী দেখছ? ওটা তোমার ফোন, কোন বোমাটোমা তো নয়। তাহলে?
-বোমা নয় জানি তবে বস্তুটি বোমার চেয়ে কোন অংশে কম নয়।
-আচ্ছা তুমি একটু পরিষ্কার করে বলো তো। ওটা বাজলেই তুমি ওরকম করো কেন? আমি বরং বুবলাইকে বলি ওটা নিয়ে যেতে।
-বেশ তবে তাই করো। তুমি বরং তোমার ছেলেকে বলো ওটা ফেরৎ নিয়ে নিতে। এমনিতেই আমি ওই ফোন থেকে যোজন ক্রোশ দূরে অবস্থান করি। আর তাছাড়া তোমার তো একটা অতি আধুনিক ফোন আছে এবং তুমি সেই ফোনের সব কিছুই পারো।
-আচ্ছা বেশ আমি ওকে বলব এবার আসলে ওটা নিয়ে যেতে। তবে তোমার ছেলের মতো এত ভালো ছেলে তুমি দ্বিতীয়টি পাবে না। ও তোমাকে জন্মদিনে এত ভালো একটা উপহার দিল আর তুমি সেটা কী না ওকে ফিরিয়ে দেবে। সত্যিই তোমার মতো মানুষ দেখিনি আমি। আচ্ছা ওটা তো একটা ফোন, সমস্ত ইনস্ট্রাকশন দেওয়া আছে ওতে। তুমি একটু মন দিয়ে পুরো ব্যাপারটা শুধু বোঝার চেষ্টা করো, দেখবে সব বুঝতে পারবে। এই তো সেদিন পাশের বাড়ির মুখার্জীদার নাতিকে দেখলাম বারান্দায় দাঁড়িয়ে সেলফি পোজ দিচ্ছে। ওই পাঁচ বছরে পুচকুটা এখনই যা পারে তুমি তো বাকি জীবনে তা পারবে বলে মনে হচ্ছে না।
-ঠিক বলেছ গিন্নি। এই একটি বিষয়ে শিখতেও আতঙ্ক জাগে। আর এই আতঙ্কের নাম কি জানো? লোনাতঙ্ক
-কী... কী বললে? আজকাল কী যে সব বলো মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না।
-আরে ওই না বুঝেই তো সর্বনাশ করেছি।
-কেন কী সর্বনাশ করেছ। এই সব কিছু পরিষ্কার করে বলো তো আমাকে। কিচ্ছু লুকিও না।
-আর বলো কেন... বুবলাই তো আমাকে ফোনটা দিয়ে চলে গেল। তারপর থেকে আমি কখনও এ দুয়ার কখনও সে দুয়ার ঘুরে ঘুরে পড়া মুখস্থ করার মতো করে ফোনের সব কিছু শিখেছিলাম। মোটামুটি এই বিষয়ে সামান্য পান্ডিত্য অর্জন করেও ফেলেছিলাম। শুধু তোমার কাছে বোকা সেজে থাকতাম। আসলে আমি আজও তোমায় দেখে সেই প্রথম দিনের মতোই কেবলা হয়ে যাই।
-কখন কী বলতে হয় তুমি আজও শিখলে না গো। তবে এবার তোমার কথা শুনে আমার রীতিমতো ঘাম ছুটছে। আর তুমি কী না নাটক করছ।
-আরে নাটক তো এখনও শুরুই হয়নি। তবে এবার হবে। শোন তাহলে, আমার এই নতুন আধুনিক ফোনে মাঝে মাঝেই একটা কল আসে আর ফোনের ওপার থেকে কোন এক কোকিল কণ্ঠি বলে ওঠে আমার নামে না কী অনেক টাকার লোন অ্যাপ্রুভ হয়েছে। আমি চাইলেই সব ডকুমেন্টস জমা দিয়ে লোন পেতে পারি। দীর্ঘ দিন ধরে এমন অদ্ভুত কথা শুনতে শুনতে আমার মাথায় সেদিন সত্যিকারের ভীমরতি চাপল। আমি তোমাদের সাথে কোন আলোচনা না করে একটা লোন অ্যাপ্লাই করলাম এবং পেয়ে গেলাম এক লক্ষ টাকার সেই লোন। লোন পেয়ে তখন আমি নিজেকে আরও পণ্ডিত জ্ঞান করতে লাগলাম। এর পরের একমাস কিন্তু বেশ দিব্য ছিলাম। ঠিক একমাস পর থেকেই আবার কোম্পানির ফোন আসা শুরু হলো। ওরা বলল আমাকে না কী এই মাস থেকে লোনের ইএমআই দিতে হবে। আর ঠিক এখান থেকেই শুরু হলো আমার আতঙ্কের দিনরাত্রি। ওই যাকে বলে ফোন আতঙ্ক বা লোনাতঙ্ক যা জলাতঙ্কের চেয়ে কোন অংশে কম না। আমি সবকিছু জেনে বুঝে কী করে যে এত বড়ো একটা ভুল করলাম সত্যিই জানি না। এরপর আমার দ্বিতীয় ভুল, আমি তোমাদের থেকে সবকিছু লুকোতে শুরু করলাম। তবে শেষ রক্ষা হলো না। আর আজ আমি ধরা পড়ে গেলাম কিন্তু এখন কী করব কিছুই বুঝতে পারছি না। যাহোক এবার তোমরা মায়ে-পোয়ে যা শাস্তি দেবে আমি নত মস্তকে তা মেনে নেব এবং বরাবরের জন্য চালাকি বিসর্জন দিয়ে ক্যাবলা হয়ে যাবো। কথা দিচ্ছি।
অতসীদি সব শুনে কিছুক্ষণের জন্য একেবারেই বাক্যহারা। উনি আর কোন কথা না বাড়িয়ে ওনার স্বামীর ফোনটা নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেলেন।
শেষ পর্যন্ত মা এবং ছেলের মিলিত প্রয়াসে নন্দদার লোনাতঙ্কের চিকিৎসা সুসম্পন্ন হয়েছে। তবে ছেলের কড়া নির্দেশ এসেছে তার শ্রদ্ধেয় বাবার প্রতি,
-জীবনে কোন কিছু না জানাটা অপরাধ নয় কিন্তু জানার চেষ্টাটুকু থাকা খুব দরকার।
ছেলে জানে বাবা যথেষ্ট শিক্ষিত এবং একজন আদর্শ গৃহকর্তা। সুতরাং বর্তমান প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলাটা ওনার পক্ষে খুব বিশেষ কষ্টকর নয়। শুধু ইচ্ছা থাকাটা জরুরি।
আর সবচেয়ে বড়ো কথা হল আজকের এই উন্নত সমাজে জালিয়াতির সাম্রাজ্য চলছে। আর এ সবকিছুর মাঝে আমাদের নিজেকে এবং আমাদের চারপাশের মানুষকে রক্ষা করে চলতে হবে।
সুতরাং বুবলাই-এর শেষ সিদ্ধান্ত, তার বাবা বোতাম টেপা ফোনে অভ্যস্ত তাই ওনাকে ওটি দেওয়া হবে কিন্তু শর্ত একটাই বাবাকে স্মার্ট ফোনে অভ্যস্ত হতে হবে। এ বিষয়ে সব কিছু শিখতে হবে ঠিক তার মায়ের মতন করে।
আসলে ছেলে চায় না তার বাবাকে এভাবে কেউ ঠকাক, এভাবে কেউ তার সরলতার সুযোগ নিক। তবে এত সব কাণ্ডকারখানা ঘটিয়ে আমাদের নন্দদুলালবাবু বর্তমানে খুব ভালো আছেন। আজকাল উনি খুব মন দিয়ে এবং সিরিয়াসলি বাধ্য ছাত্রের ন্যায় ওনার স্ত্রীর কাছে স্মার্ট ফোন বিষয়টিকে রপ্ত করছেন। যদিও ওনার কোলের কাছে এখনও শোভা পাচ্ছে ওই বোতাম টেপা ফোন কিন্তু মস্তিষ্কে এখন ওনার একটাই চিন্তা কী করে এই ঝাঁ চকচকে সমাজের একজন হয়ে লোনাতঙ্ক কাটিয়ে জালিয়াতিদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নতুন রূপে প্রকটিত হওয়া যায়।
যদিও এই যাত্রাপথ এই বয়সে নন্দদুলালবাবুর মতো মানুষের জন্য খুব সুখকর নয় তবে অসম্ভব বলে আজ আর কোন শব্দ বাকি নেই ওনার অভিধানে।
 
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)