বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক
গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
ছাই রঙের মাটি
[১ম পর্ব]
"হাজার হাজার বছর অগেকার কাল থেকে বয়ে চলেছে নদীটা। ঢেউ তার অবিচল। কখনো তা ধীর শান্ত, কখনো তাকে ফুঁসে উঠে পাড় ভাঙতে দেখেছে প্রবাল! বর্ষাকালে তার উচ্ছ্বাস দুপাশের বেলে মাটিতে ছোটো ছোটো গর্ত তৈরি করত। সঙ্গে করে নিয়ে এসে ফেলত ছোটো ছোটো মাছেদের স্তূপ।"
ঝাঁ
চকচকে একটা কর্পোরেট অফিস! এই অফিসের ক্যানটিন থেকে বাথরুম সবজায়গায় একটা হাইফাই
ব্যাপার আছে। একবার অফিসটায় ঢুকে পড়লেই মনে হয় যেন কোন ফাইভ স্টার হোটেলে এসেছি!
বিশাল বড়ো ক্যানটিন। সুবেশী স্টুয়ার্ডরা সর্বত্র হাসিমুখে বিরাজমান। প্রতিটা
ফ্লোরে সুবাসিত মেল ও ফিমেল রেস্টরুম। দেওয়াল জুড়ে টাঙানো বিশাল বিশাল আয়নায়
নিজেকে দেখতে পেলে মনে পড়ে যায় আগুপিছু তিরিশটা বছর। চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা
মায়াময় বালকের মুখ।
দেওয়ালের
খাঁজে রাখা ছোট্ট গোলাপ চারাটা হ্যান্ড ড্রায়ার থেকে বেরিয়ে আসা রোদ জলহীন ভিজে
হাওয়ায় মাথা নাড়ছে সজোরে। প্রায় মাথা ছুঁতে চাওয়া আয়নাটার মাথায় আবার লেখা ‘Am I looking Smart?’ ঠিক তার পাশের দেওয়ালে ক্লঁদে মনেটের আঁকা একটা ছবি। ছবিটার
ভেতর শূন্য হয়ে যাওয়া একটা বাড়ি। তার বাইরেটায় একটা জমাট বাঁধা অন্ধকার। তার থেকেও
বেশি অন্ধকারে হয়তো সমর্পণ, ক্লান্তি আর অভিমানের
নিঃশব্দ অভিসার ঘটে চলে প্রবালের মন আর মাথা জুড়ে। ছোট্ট গোলাপ গাছটাকে খুব সুন্দর
মানিয়েছে এই পরিবেশটায়। গো গ্রীন ভাবনাটাও বেশ অভিনব! চারাটায় সবে একটা কুঁড়ি
এসেছে। সেদিকে চেয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎ টবের মাটিটায় চোখ আটকে গেল প্রবালের! কালো
ভুসভুসে একটা মাটি, কালির মতো কালো। শতেক
রকমের জৈব অজৈব সার নিশ্চয়ই মিশেছে মাটিটায়। একটা অমেরুদণ্ডী কেঁচো হয়তো শুরু থেকে
শুরু করে মাটিটার শরীর বেয়ে অনেকটা নিচে নেমে এসে কণাগুলির গভীরে বুনে চলেছে একটা
যৌথজীবনের গল্প। কঠিন শাস্তির মতো ওর এই জীবনচক্র, গাছটার শরীর জুড়ে এই কৃত্রিম শীতল সায়াহ্নে শারীরিক উষ্ণতার পরশ এনে দিচ্ছে
হয়তো! হয়তো ওর অনায়াস নিস্পৃহ জীবনের বুকে পা দিয়ে, মাটিটা থেকে সব রস শুষে নিয়ে কাল সকালে গাছটায় ফুটে উঠবে সবুজের খিদে মেরে
দেওয়া একটা কালো গোলাপ। একটা মধ্যবিত্ত উঠোনের নিকোনো গন্ধ সাথে কিছুটা লেবুপাতা
ফেলা টকডাল আর আমচুর দেওয়া কামরাঙার চাটনির গন্ধ, গাছটার গা থেকে ভেসে এসে বাথরুমটার বাতাসে বেশ খানিকক্ষণ আটকে থেকে, প্রবালের নাকের ভেতর দিয়ে ঢুকে ওর সুষুম্নাতন্ত্রে ভর দিয়ে, নেশার মতো একটা কালের সামনে নিয়ে গিয়ে দাঁড় করায় ওকে। এই গোলাপের আঁতুরঘর যেন
অনেকদিন থেকে চেনে প্রবাল, অর্থহীন অথচ এক দৃঢ়
মূক চেতনার ভেতর দিয়ে।
হাজার
হাজার বছর অগেকার কাল থেকে বয়ে চলেছে নদীটা। ঢেউ তার অবিচল। কখনো তা ধীর শান্ত, কখনো তাকে ফুঁসে উঠে পাড় ভাঙতে দেখেছে প্রবাল! বর্ষাকালে তার উচ্ছ্বাস দুপাশের
বেলে মাটিতে ছোটো ছোটো গর্ত তৈরি করত। সঙ্গে করে নিয়ে এসে ফেলত ছোটো ছোটো মাছেদের স্তূপ। জল সরে গেলে সেগুলো খাবি খেত
পাটের ব্যবসায় ফাঁপরে পড়া কলিম চাচার মতো। তখন গামছায় করে ধরে নিয়ে এসে সেগুলোকে বাড়ির রান্নাঘরে
চালান দিত ওরা। এই ওরা বলতে ঠিক কারা সেটা ঠিকঠাক মনে পড়ে না প্রবালের! শুধু ভেসে
ওঠে ছায়া ছায়া কিছু শরীর। এই ছায়াগুলোর মাঝে কোথাও একটা তীব্র ‘আমি’ আছে বলে মনে
করে প্রবাল। ও জানে অতীতকে নতুন করে কল্পনায় গড়ে তুলতে গেলে ফিরে ফিরে যেতে হয় ওই
ছায়াদের কাছে। প্রায় সকলের অলক্ষ্যেই ওর সাথে কথা হয় ওর অতীতের ছায়ার। ছায়াটা ওকে
দেখায় একটা নিটোল মুখ, টানা টানা দুটো চোখ, টিকোলো নাক, এক ঢাল এলো করে ছড়ানো চুল! ছায়াটা যেন সর্বক্ষণ
চোখে চোখে আগলাচ্ছে প্রবালকে।
সেন্সর
বেসড কলটা থেকে কিছুটা স্বচ্ছ জল আঁজলা করে তুলে নিয়ে চোখে মুখে ছেটায় প্রবাল।
সামনের আয়নায় তখন ক্রমশ দূরের ছবি ফুটে উঠছে। একটা নদী, পাড়ে বাঁধা নৌকা, বাঁশের সাঁকোটার
শুরুর দিকে জঞ্জালের মতন শিকড় ছড়ানো একটা জামরুল গাছ, সেই গাছের গায়ের ফাটলে বাসা বাঁধা দুটো প্যাঁচা আর তাদের ছানারা, যাদের ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে যাবার জন্য গাছটার চারপাশে ঘুর ঘুর করত প্রকাণ্ড সব
গাংচিল আর শিয়ালের দল। সেই ছবিটার ভেতর থেকেই প্রবাল শুনতে পায় একটা হিম ধরা গলার
“বুলু, বুলু” ডাক! ডাকটা ভীষণ চেনা চেনা লাগে ওর। এই
ডাকটা জুড়ে যেন জন্ম নেয় এক খণ্ড কালো মেঘের মতন পরিত্যক্ত ভালোবাসার গল্প! একটা
নাম-গোত্রহীন জগৎ থেকে
দোষে-গুণে
ভরা এই পৃথিবীতে একটা উল্কা এসে পড়ার সময় মাঝপথে থেমে গেলে যেমন হয়, ঠিক তেমন একটা শূন্যতা নিয়ে ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে প্রবাল। কৌতূহল হয়তো
খুব বেশি নেই ওর, শুধু একটাই প্রশ্ন জাগে ওর মনে। ওই “বুলু, বুলু” ডাকটা কার? এই বুলুটা ঠিক কে? বুলু নামটার সাথে কি ওই সুন্দর মুখটার কি আদৌ কোন সম্পর্ক আছে?
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment