প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

স্নায়ুর সিঁড়ি [১ম পর্ব] | ভাস্কর সিনহা

বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ধারাবাহিক গল্প
ভাস্কর সিনহা
স্নায়ুর সিঁড়ি
[১ম পর্ব]

"সুইটি বুঝে নেয়, এই আগের মতো নয় মানে আগে যা ছিল, এখন আর তা নেই—শরীর যেমন, শহরও তেমনি। বাইরে কুয়াশা নয়, ধোঁয়া। ভিতরে নিস্তব্ধতা নয়, নিউরাল-হেঁচকি—স্মৃতির পর্দা আটকে আটকে কেবল ওঠানামা করে যাচ্ছে।"

 
নিভে যাওয়ার আগে রবিবাবু চোখ খুললেন। মুখের কাছে একটু ঝুঁকে সুইটি হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “চা খাবেন?”
 
চায়ের বাষ্প উঠে এসে মিনিটখানেক জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সর্পিল সেতুটার মতো ঘুরে ঘুরে নৃত্যের এক বিভঙ্গের সৃষ্টি করে। অনেক নীচু ভূমি থেকে ওপরে উঠে গেছে অন্ধকার ধাতুর বাঁক—পাঁচতলা উঁচু—শহরের সবচেয়ে উঁচু বেদীমূল পর্যন্ত একটানা এক সর্পিল সিঁড়ি। শহরকে বাঁচাতে বানানো সেতু—জোয়ারে যখন রাস্তা ডুবে যায়, তখন ওটাই যে একমাত্র ভরসা। তবু এই সময়ে, নিশুতি দুপুরে, অসুখের বিছানায় বসে সেতুটাকে সত্যি সত্যি নরকের দূত বলে যেন মনে হয়—মানুষকে ওপরে টেনে নিয়ে গিয়ে ডেটা-মলের আলোয় গুলিয়ে দেয়।
 
রবিবাবুর মুখে চুমুকের তাপ এবার স্পষ্ট হল। ঠোঁটের কোনা একটু কাঁপল। “চা… তা ভালো। গন্ধটা… তবে আর আগের মতো নয়।”
সুইটি বুঝে নেয়, এই আগের মতো নয় মানে আগে যা ছিল, এখন আর তা নেই—শরীর যেমন, শহরও তেমনি। বাইরে কুয়াশা নয়, ধোঁয়া। ভিতরে নিস্তব্ধতা নয়, নিউরাল-হেঁচকি—স্মৃতির পর্দা আটকে আটকে কেবল ওঠানামা করে যাচ্ছে।
 
আজ অনেকটা ভাল আছেন কুসুমদেবী। দুপুরবেলা অনি অফিস থেকে ফিরেই উঁকি মেরেছিল, সুইটি বলেছিল, “আজ জ্বর আর নেই।” বিকেলে আবার এলো। কুসুমদেবী অনির দিকে তাকিয়ে ফোকলা মুখে হাসলেন, “আমার দেরাজে একটা সোনার আংটি আছে। মলে আমার নাতিকে দিস।”
অনি চমকাল, “মলে? নাতিকে?”
হুঁ,” কুসুমদেবীর চোখে ক্ষীণ আলো। “নাতি—ওই যে—নাটি। যে মলের দ্বিতীয় তলায় থাকে। তোর বাবার পইপই করে বলে যাওয়া… আজ… আজই দিস।”
সুমির করা পরোটা আর আলুর তরকারি খেয়ে কাজে বসেছিল অনি—কোর্ট থেকে সদ্য ফিরেছে—পোস্টহিউমাস ডেটা অ্যাক্ট সংক্রান্ত একটা মামলা হাতে এসেছে—মৃতের ডেটা কাকে, কীভাবে, কতদিন রাখা যাবে এসব নিয়ে—নির্মম এক ধারা। ঠিক তখনই এই কথা।
 
আংটি! দেরাজ খুলতেই সত্যি এক চিকন সোনালি বৃত্ত—চওড়া নয়, পাতলা; ভিতরের দিকে কাঁটা চামচের দাঁতের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খাঁজ কাটা; নড়াচড়া করলে সোনার মাঝে ক্ষীণ নীল অঙ্গুরী জ্বলে ওঠে।
সুমি আঙুলে নিল, “এইটা… পুরোনো তো নয়। নতুন কিছু।”
কুসুমদেবীর ফিশফিশ, “তোমরা বুঝবে- বুঝবে। তোর বাবার কাজ ছিল… স্নায়ুর, স্মৃতির-আর্কাইভ। নাতিটাকে… ওখানেই রেখেছিল। বলেছিল—‘এই আংটিটাই কী?‘”
 
অনির মাথায় স্ট্যাটিউট, সেকশন, কেস-লর শিক্ষার যত আলো। তবু এই আংটি হাতে নিতে গিয়ে অন্য এক আলো জ্বলে উঠল—চায়ের বাষ্পের মতো, হালকা নীল—যেন আংটির ভিতরের নীল ঘূর্ণি একবারে চোখে এসে বসে গেল। আংটি কানে ধরতেই একটা কণ্ঠ—সুদূর হতে রেডিওর আওয়াজের মতো—“অনি?”
অনির হাত কেঁপে উঠল, “কে…?”
আমি বৈশাখী—ওরা আমাকে ‘নাটি নাম রেখেছিল।”
সুমি অনির দিকে তাকাল—চোখে প্রশ্ন। অনির ফিশফিশ, “তুমি শুনতে পাচ্ছ?”
সুমি মাথা নাড়ল, “না।”
অনি বুঝল—আংটি শুধু এক কানেই কথা বলে।
 
শহর ৩০৮৯। নীচে রাস্তায় জল, ওপরে সেতু, তারও ওপরে কাচের ডেটা–মল—নাম ‘পুণ্যপথ‘—ভিতরে “আর্কাইভ”, “স্মৃতির–লকার”, “স্নায়ু সংযোগ–ক্যাফে”, “মন–জরিপ”। মানুষ এখানে ছবি তোলে, গান শোনে, খবর পড়ে—সবই স্নায়ু–কুসুমের ভেতর। ধনী পরিবারেরা তাদের মৃত্যুকে সার্ভারে মিউজিয়াম বানিয়ে রেখে যায়; ওদিকে গরিব পরিবারেরা তাদের মৃত্যুর নাম-নিশানাও রাখে না। ল কোর্টে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিতণ্ডা চলে—“কারও স্মৃতি কি কারও নিজস্ব সম্পত্তি?”— চলে দীর্ঘ আইনের টানাটানি।
 
অনির কেসটা—স্টেট বনাম দত্ত—এক ছেলে মায়ের স্নায়ু–আর্কাইভ ফিরিয়ে নিতে চাইছে; কর্পোরেট বলছে—“ডেটা অনুদানে” সই ছিল, মেয়েবেলায়; তার প্রাণের আনন্দের–বিন্যাসিকা তারা বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করছে; তাই ফিরিয়ে দেওয়া হবে অর্থনীতির ক্ষতি।
অনি বলেছিল, “প্রাণ বেচা যায় না।”
জজ তাকিয়ে ছিল, “কোন প্রমাণ আছে?”
এখান থেকেই শুরু আংটির পথ। কুসুমদেবী বলেছিলেন, “আজই দিস।” সুইটি ততক্ষণে রবিবাবুর কপালে নরম সিক্ত কাপড় চেপে ধরে বসে আছে; তাঁর নিঃশ্বাস হচ্ছে গভীর, দীর্ঘ।
 
অনি আর সুমি বারান্দায় বেরিয়ে এল। উঁচু ধাতব মোড়কের সর্পিল সেতুটা মেঘে ঢুকিয়ে রেখেছে তার মাথা। দুজনে হাঁটতে হাঁটতে ওঠে—পায়ে জল, জলে সেতুর ছায়া। আংটি কানের কাছে, “তুমি আসছ?”
আসছি। নাতি…”
নাতি নয়—নাটি—নিউরাল আর্কাইভ ট্রান্সফার ইন্টারফেস। তবুও নাতি-ই তো!”
সুমির কণ্ঠে গরম স্বর, “এটা রসিকতা না সত‍্যি?”
আংটি বলল, “সত্যি। তবে রসিকতা ছাড়া সত্যি যে আলোনা হয়ে যায়।”
 
মলের দ্বিতীয় তলার ওপেন–আট্রিয়াম। চারধারে নীল পর্দা—লেখা আছে: মনের–পরিচারক,স্মৃতির–ভাণ্ডার, অতীতকে ধার নিন। মাঝখানে একটা কিয়স্ক—স্ব–সাইন–স্টেশন। তার উপরেই এক বৈদেহী–লোগো—একটা চোখ, তার ভেতরে সর্পিল গতি।
অনি কিয়স্কে আংটি ছোঁয়ায়। স্ক্রিনে লেখা ফুটে উঠে—“পরিচয়–লক খুলবে?”
দুটি বিকল্প—জৈব–লগ। রক্ষকের ছাড়পত্র।
আংটি নিজে থেকেই একটু বেশি নীল হয়ে দেখায়—“রক্ষকের ছাড়পত্র।”
স্ক্রিনে দ্রুত ছবি আসে পরে পরে—রবিবাবু, সুইটি, কুসুমদেবী, আর এক অদেখা মুখ। শেষে থেমে যায় স্ক্রিন—স্বাগতম, অনি দত্ত।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)