বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৪তম সংখ্যা/২৬শে ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[৫ম পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[৫ম পর্ব]
"দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝরনা হয়ে গড়িয়ে পড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে!"
প্রেমিক চোখে ওর নাভির গভীরে আলতো জিভের ছোঁয়ায় দেশ-কাল-মানুষের মানচিত্র আঁকতে দেখেছে! সম্ভোগ শেষে হীরেন ওকে ছেড়ে দেওয়ার পর ওর যন্ত্রণাক্লিষ্ট শরীরটার পাশে এসে বসেছে সুমিত্রা। ওর বিবশ শরীর জুড়ে বুলিয়ে দিয়েছে ময়ূর পালক। উন্মুক্ত জিহ্বা দিয়ে চেটে নিয়েছে ওর সব রক্ত-স্বেদ-বেদনা-ক্লান্তি! নরম হাতের পরশে ওর চোখ জুড়ে নেমে এসেছে বহু কাঙ্ক্ষিত হেমন্তের রাত! ঠিক যেন ওর মায়ের স্পর্শ!
ওর কানে কানে এসে সে শুনিয়েছে, ছেলেবেলায় কমলার বাবার গলায় শোনা গাড়িয়ালের গান—
“ও মুই নাই ওর আর না জাইম গাড়িয়াল
তোমার গাড়িত চড়ি।
তোমার গাড়ির হাঙরাত বাজি
ছিরি গেইল মোর বিয়ার শাড়ি।”
সুর, গান—এসব কমলার রক্তে! ওর বাবা নিজেই কত ভাওয়াইয়া রচনা করেছেন! সুর দিয়েছেন! তা হয়তো কোথাও লেখাজোখা নেই। মানুষের মুখে মুখে ঘুরে ঘুরে প্রচলিত তকমা পেয়ে গিয়েছে। কামতাপুরের আকাশ, বাতাস, ভাষা, লোকগানের সুর, পাখির শিস—এই সবকিছুর ওপর ওদের আকণ্ঠ ঋণ! তাই তো মাতৃসম ভাষার বঞ্চনার বিরুদ্ধে গিয়ে নিজেদের দেশ গড়ার জন্য বাপ-বেটায় মিলে সুর ছেড়ে বন্দুক নিয়েছিল হাতে। পুলিশের গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ভেসে গেছিল বুড়িবাসরার জলে।
দেশ বানায় মানুষ, মানুষই মানুষের স্বাধীনতার সীমানা বাঁধে! সেই মানুষ আবার সুরও তো বাঁধে! সুরের সাথে মিলেমিশে যেতে পারলে মানুষ নদী হয়ে যায়! স্রোতের মতন ঝরনা হয়ে গড়িয়ে পড়ে এক দেশ থেকে অন্য দেশে!
খুব তীক্ষ্ণ একটা পাখির শিস ভেসে আসছে এখন। সুরটা বড়ো চেনা লাগে কমলার। ইষ্টিকুটুম! দূরের সজনে গাছে পাতায় মোড়া পিঁপড়ের বাসা, হাওয়ায় দোল খাচ্ছে ফুটবলের মতো। আগত বৈশাখের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ এসব উপলব্ধি করে জঙ্গলের বুকে গাছেরা নতুন পাতা বোনার সুর তোলে। সময়ের বাঁকে গোত্তা খেয়ে সে সুর হয়তো জঙ্গলেই হারিয়ে যায়! সাধারণ মানুষের কান অবধি এসে পৌঁছয় না। তবু তো এ পৃথিবীতে সবই তৈরি হয়—দুঃখ, আনন্দ, হাসি, জন্ম, মৃত্যু, উৎসব! সবকিছু!
নদীর বুকে কোনো শ্রমজীবী জল ছেঁচে পাথর তুলছে এখন! এতে করে হয়তো মূর্তির বুক পরিষ্কার হবে! স্রোত আসবে!
কমলা-সুমিত্রা এখনও মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝে হয়তো সাদা দেওয়াল! বেপরোয়া প্রেমিকার মতন দুহাত দিয়ে সে আচ্ছাদন সরিয়ে নদী-মাঠ-পাহাড়ের আহ্বান নিয়ে সুমিত্রায় মিশে যেতে ইচ্ছে করে কমলার! যেন ওর আমি মিশে যাবে ওর নিজের আমিতেই! যেমন নদী গিয়ে শেষ হয় বড়ো নদীতে, কিংবা শেষমেশ বাউল আঁকড়ে ধরে নিজের দোতারাকেই!
“কালা তোর দোতরার ডাং
কালা তোর ভাওইয়া গান
উরাং বাইরাং মোর মন থাকিবার না পারে
ও কালা রে...”
আজ এতক্ষণে নিশ্চয়ই ওদের ঝুপড়িটা ঘিরে আবার একটা জটলা জুটে গেছে। প্রতি দুপুরের মতো এই দুপুরেও ঝুপড়িতে ওদের ঘরে একাই ছিল কমলা। মাটিতে কোলেরটাকে শোয়ানো ছিল। আজ সকাল থেকে সেটা চিল-চিৎকার করে কান্না জুড়েছে। বারবার চেষ্টা করেও তাকে থামাতে পারেনি কমলা। এখন ওর বুকে আর এক ফোঁটাও দুধ নেই! ভয়ংকর বেসুরো ওটা! ভয়ংকর বেতালা! লয়ের সাথে লয় মেলে না মোটে! সুরে পড়ে যায় ফাঁকি!
বড়ো ছেলেটা বাকিগুলোকে নিয়ে ইস্কুলে গেছে। ওদের মধ্যে তিনটে তিন ‘কেলাসে’ পড়ে, আর বাকিগুলো ইস্কুলের বাইরে বসে থাকে মিড-ডে মিলের জন্য। হীরেন গেছে বিট অফিসে।
এই সুডৌল বসন্তে নিজের কঙ্কালসার শরীরে নিদারুণ স্তন্যহীনতা আর অন্যদিকে খিদের জ্বালায় দুগ্ধপোষ্যের বিষম চিৎকার—এই দুয়ের মাঝে পড়ে দিশেহারা হয়ে গেছিল কমলা। ওটাকে চুপ করাতে দুহাতে সজোরে ওর গলাটা চেপে ধরেছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই একেবারে চুপ! যেন রক্তচক্ষু দিয়ে শ্বাসরোধ করা হল ক্ষোভের!
যে কোনো মৃত্যুই চাপাকান্নার শব্দ বয়ে নিয়ে আসে। কোথাও মৃত্যু হয় একটা গোটা জন্মেরই! কমলা এখন নির্বাক! ওর চোখে জল, কিন্তু চেতনায় কোথাও শোক নেই হয়তো! ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আছে মুক্তিহীন, অবসরহীন, অগোছালো দৃশ্যেরা।
কাউনিয়ার সবুজ ধানক্ষেত, আলের উপর দিয়ে ছুটে চলে দুটি মেয়ে, দেখতে হুবহু এক! ইন্ডিয়া থেকে বয়ে আসা সরু নদীগুলোয় ঝাঁপায় তারা অহরহ! সাঁতরে চলে যায় ওপারে। সর্ষে ক্ষেতের ভেতর দুজনে জড়াজড়ি করে শুয়ে থাকে সারা বেলা। দূরে মুখ তুলে দেখে ইন্ডিয়ার বর্ডার, বিএসএফের চেকপোস্ট। সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে আসে তারা ছায়াঘেরা সবুজ বাঁশবনের ভেতর দিয়ে।
তুচ্ছ বেঁচে থাকা ও মরে যাওয়ার মাঝে, গৃহহীন, রাষ্ট্রহীন ওই দুইজন কান পেতে থাকে রাতের তারার দিকে। সুরেলা মিঠে বাতাসে কোমল নিষাদের মতো তখন ভেসে আসে অনাম্নী কোনো সাধকের গাঁথা বিনিসুতোর ভাওয়াইয়া—
“উড়িয়া যায় চখুয়ার পঙ্খী বগীক বলে ঠারে
ওরে তোমার বগা বন্দী হইছে ধল্লা নদীর পারে রে।
ফান্দে পরিয়ে বগা কান্দে রে...”
জঙ্গলে এখন বৃষ্টি নেমেছে হঠাৎ করেই। অবিরাম বৃষ্টি! মূর্তির শীর্ণ শরীরে যেন হঠাৎ করে বান ডেকেছে! অনুভূতির দুর্বলতম জায়গায় গভীর আঘাত পেয়ে এক মাঝি নদীপাড়ে হাপুস নয়নে কাঁদতে বসেছে! বৃষ্টির তোড়ে তার নৌকাখানা ভেসে গেছে। জঙ্গলের পাখিদের ডানার পালক ভিজে ভারী হচ্ছে ক্রমশ।
অসুখের দুঃখ, অন্যায়ের দুঃখ, বঞ্চনার দুঃখকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলে রেখে একটা নতুন জন্মকে আর নিজের পরিচয়ের দলিল বানাতে এখন নারাজ কমলা। সে চাইছে পাখি হয়ে বাঁচতে—শুধু বাঁচার আনন্দে।
~~000~~

No comments:
Post a Comment