প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে [৪র্থ পর্ব] | শাশ্বত বোস

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৩তম সংখ্যা/১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[৪র্থ পর্ব]

"কমলাকে দেখে সে মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঈষৎ স্তনভারে সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে তার শরীর। অর্ধ-উন্মীলিত বক্ষদেশের নিচে তার নির্মেদ কটিদেশ বেরিয়ে রয়েছে, শালজঙ্গলে পথ হারানো ভীরু হরিণীর মতো! না, সেখানে মাতৃত্বের কোনো চিহ্ন নেই!"

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
এর পরের সাংসারিক জীবনে অবশ্য পার্বতী আর বিশেষ সদ্ভাব রাখেনি কমলার সাথে! জঙ্গলে কাঠ কুড়ানো, শুয়োর-গরু প্রতিপালন, রাত জেগে হাতির হাত থেকে ক্ষেত পাহারা দেওয়া—এসব কাজ সমানে সমানে ভাগ হয়ে গিয়েছে। এমনকি বিষুয়ায় আটকলাই-বাটকলাই ভেজে বাড়ির চালে ছড়ানো, ঘরের দরজায় পিঁয়াজ-রসুন-পানিমুদ্রি পাতা-বেতের ডাল ঝোলানো ইত্যাদি লোকাচার কিংবা বকা পিঠা, পাকন পিঠা, চিতই পিঠা বা নাড়ু বানানো—এইসবই ওরা করেছে হাসিমুখে। সবার সামনে দেখিয়েছে ওরা কত ভালো আছে! মিলেমিশে আছে!
কিন্তু কমলা ঠিকই বুঝতে পারে, ওর বিয়ের পর থেকেই ভিতরে ভিতরে একটা জং ধরা কাতরতায় ডুবে গেছে পার্বতী! নিজের অসম্পূর্ণতাকে চেপে রেখে সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকে, অপছন্দকে গ্রহণ করলে যেমন হয়, কিংবা যেমনটা হয় নিজের একান্ত পছন্দকে বুকে পাথর চেপে পর করে দিলে! কমলার কাছে এর কোনো নির্দিষ্ট উত্তর নেই, তাই আর এসব নিয়ে ভাবলে কষ্টও হয় না ওর!
হাতে হাতে তিল আর খেজুর গুড় জড়ো করে ঢেঁকিতে দেয় পার্বতী আর তালে তালে পা চালায় কমলা। যেন একই পুরুষের সাথে সফল আসক্ত একটি সঙ্গমের পর কোনো কাল্পনিক নাগরদোলার দুই মাথায় চড়ে বসেছে দুই নারী! একদিকে শর্তাধীন নীরবতা, আর অন্যদিকে অশুচি একাকীত্ব! দুজনেই আপাত ক্রিয়াশীল, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কী ভীষণ হিসেবি! যেন চরম ব্যক্তিগত কোনো সুখে বা অসুখেও কেউ কাউকে একবার জিজ্ঞেস করবে না, “কেমন আছ?”
এখানে এখন ধূসর আকাশ মাথার ওপর ঝুলে থাকে সুঠামদেহী কোনো পরপুরুষের মতন! তার গায়ে মেঘেরা লেগে থাকে লুকোনো কোনো বিষণ্ণতা নিয়ে। অলক্ষ্যে ভিজে ওঠে বাতাস। শ্যামলা রঙের বিকেলবেলাটায় যেন পুরোনো কোনো কান্নার গন্ধ মিশে থাকে। এখানে এখন জন্ম-মৃত্যু-যৌনতা-নাগরিকত্ব চাপা পড়ে থাকে ছেঁড়াফোঁড়া শুকনো পাতার মতন।
পাথুরে মাটির গা বেয়ে উল্লাস আর বিষাদের লুকোচুরি খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়া মূর্তি নদীর শীতল জলে পা দিলে, এই খরতপ্ত বসন্তের বিকেলবেলাতেও হালকা শীত-শীত ভাব হয়। নদীর পশ্চিমের তট বরাবর ধানক্ষেত নেমে গেছে ধাপে ধাপে। এ সময় বেশ অনেকক্ষণ ধরে বেশ অনেকটা ওপর থেকে, পরিশ্রমী চিলের আতসী চোখে মূর্তিকে দেখলে মনে হয়, অন্ধকারের গভীর থেকে উঠে আসা শীর্ণকায় এক বালুপথ! যেন ঋতুমতী নিঃসঙ্গ তরুণীটি! আশেপাশের পরিচিত সবকিছুর ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে সে একাকী হেঁটে চলেছে দূরে, কিছু রঙিন ফুল আর সুগন্ধির বন্ধুত্বের আশায়।
দিনের আলো শেষে বিকেলের ছায়াতেই অন্ধকার নামে একটু একটু করে। নোনাধরা দুপুরের শেষে নিষ্প্রাণ যৌবনের মতো একা তেতে-পুড়ে শেষ হয়ে যেতে পারে এমন একটা জীবন অবশিষ্ট থাকে শুধু! ঠিক সেই রকম একটা জীবনকে সাথে করে আজ নদীর ধারে এসেছে কমলা। সেই জীবনের যে রং চোখে দেখা যায়, সেই রং নয়, বরং চোখের আড়ালে গাঢ় হয়ে ঝিম ধরে যে রং, সেই রং নিয়ন্ত্রণ করে বেঁচে থাকার ছলাকলা! এতক্ষণ ঠিক সেই রঙের পৃথিবীটাকে একটা কাচের বোতলে বন্দী করে তাতে চোখ রেখেছিল কমলা।
এদিক-সেদিক থেকে কিচির-মিচির পাখির ডাক ভেসে আসছে। ওরা গান গাইতে চাইছে বোধহয়! ভালোবাসার গান! ঠিক তখনই তাকে আবার দেখা গেল! পরনের সেমিজটা হাঁটুর উপর গুটিয়ে, একটা সুরতি মোষের পিছু পিছু গোড়ালি জল ডিঙিয়ে মূর্তি পারাপার করছে সে। মূর্তি নদীর জলে বোনা ঝাপসা আয়নায় তার কোনো স্পষ্ট ছায়া পড়ে না! তার পায়ে পায়ে খেলা করে যায় বোরোলি মাছের ঝাঁক! দৃশ্যটার ভেতর অনেকখানি মায়া, অনেকখানি জাগতিক মাদকতা লুকিয়ে থাকে যেন!
সেদিকে দেখতে দেখতে বুঝি কমলার মনের ভেতর শিরশিরে বাতাস বয়! বুকের মাঝে অজস্র খঞ্জনি বেজে ওঠে ঝনঝন! সব আনন্দ যেন ঠেসে জমা হয়েছে দৃশ্যটায়! এ দৃশ্য যেন তার বহুদিনের চেনা। যেন এর আগেও কয়েক হাজারবার দেখেছে সে। তবু আজ আবার তাকে দেখে ছন্নছাড়াভাবে স্বাধীন হওয়ার বোধটা বুঝি আবার সজীব হয়ে উঠল কমলার মনের ভেতর।
সে যেন দেখতে ঠিক সেরকম, যেমনটা সংসারের শুরুর দিনগুলোতে কমলাকে দেখতে ছিল। ডাগর ডাগর চোখ, ঈষৎ ভারী বুক, বাঁকানো চিবুক, ডিঙি নৌকার মতন মুখ। বহু কাঙ্ক্ষিত ঘুমের ভাব থেকে সরে আসা একটা নিষ্পলক চাহনি নিয়ে সে যেন ওকে ওর গতজন্মের কথা বলে। জীবনের অলিগলি, ভুলভুলাইয়া পথে হারিয়ে যাওয়া অতীত খুঁড়ে, সযত্নে তুলে আনে একখানা আধপোড়া স্বপ্নের ফালি।
ওকে দেখলেই খুব ভালোবাসতে ইচ্ছে করে কমলার! কীরকম একটা বৃষ্টি শুরু হয় ভেতর ভেতর! প্রথমে ঝিরঝিরে, তারপরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে বেগ। মনে মনে বেজে ওঠে রংপুরী ভাওয়াইয়ার সুর।
মইষাল রে, তোর মইষের গলার ঘণ্টি
বাজে ঠুন ঠুনাইয়া রে...
সেই ঘণ্টির শব্দে মোর পরান
কান্দে উঠে গুমরাইয়া রে।”
কিন্তু তারপর আর সুর মেলে না, তাল কেটে যায়! চৈত্রশেষের ঝোড়ো হাওয়ায় অবিন্যস্ত হয়ে পড়ে তার জট পাকিয়ে যাওয়া রুক্ষ চুল। তার খোঁপা থেকে নদীতে পড়ে ভেসে যায় গোলাপি রঙের এক নাম-না-জানা ফুল।
কমলাকে দেখে সে মাঝনদীতে দাঁড়িয়ে পড়েছে ততক্ষণে। ঈষৎ স্তনভারে সামনের দিকে ঝুঁকে গেছে তার শরীর। অর্ধ-উন্মীলিত বক্ষদেশের নিচে তার নির্মেদ কটিদেশ বেরিয়ে রয়েছে, শালজঙ্গলে পথ হারানো ভীরু হরিণীর মতো! না, সেখানে মাতৃত্বের কোনো চিহ্ন নেই! হাত দুয়েক দূরত্বে মন্ত্রমুগ্ধের মতো স্থির দুটো মানুষকে জড়িয়ে ধরে, ধোঁয়ার কুণ্ডলী পাকানো এই হিম-হিম কালবেলায় রচিত হয় এক অসীম, অপার মায়ার মাধুকরী।
ও সুমিত্রা! নামটা অবশ্য কমলারই দেওয়া। খুব ছোটোবেলায় যখন কমলার মা মারা গেল বসন্ত রোগে, সেদিন প্রথম ওকে দেখেছিল কমলা। তারপর থেকে বেনের পুতুল নাচের আসরে, কাউনিয়ার বাড়ির আনাচেকানাচে, একা পুকুরঘাটে, সন্ধেবেলা তুলসীতলায়, ঋতু আসার আগে বা খুব নিকটজনকে দাহ করে ফিরে অশুচি হয়ে যাবার সময়ে, আবার নিকট পরিবার-পরিজনের হাতে ‘খারাপ’ হতে গিয়ে, ওর নিজের না-বলা কথায়, বলে-ফেলা সব কথায়, স্মৃতির পাতা হাতড়ে, সবখানে কমলা শুধু তাকেই দেখতে পায়।
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)