বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১২তম সংখ্যা/১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[৩য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[৩য় পর্ব]
"হীরেনের মুখে শুনেছে কমলা, পোষ মানানোর প্রথম দিনের কথা! সে দৃশ্য বড়ো নির্মম! হাতিটার চারটে পা চারটে খুঁটির সঙ্গে বেশ মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে এই বাঁধনগুলো পরাবার কাজ চলে। সেসময় হস্তীশাবকটির কান ফাটানো চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে ওঠে!"
হাতিটা এখন আপনমনে আখের ছোলা চিবোচ্ছে। ধীর পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে যায় কমলা।
প্রশিক্ষণের প্রথম কয়েক মাস গলার কাছে রশি দিয়ে কষে বাঁধা থাকে। একে বলে ‘ফাঁদ’! তাছাড়াও বুকের কাছ থেকে জড়িয়ে সামনের পা দুটোও বাঁধা থাকে। তাকে মাহুতেরা বলে ‘বুক ফারা’।
হীরেনের মুখে শুনেছে কমলা, পোষ মানানোর প্রথম দিনের কথা! সে দৃশ্য বড়ো নির্মম! হাতিটার চারটে পা চারটে খুঁটির সঙ্গে বেশ মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে এই বাঁধনগুলো পরাবার কাজ চলে। সেসময় হস্তীশাবকটির কান ফাটানো চিৎকারে পুরো জঙ্গল কেঁপে ওঠে!
অনেক টানাহ্যাঁচড়ার পর স্ব-যাপনের যুদ্ধে হেরে যায় হাতিটি! তার শূন্য, ক্লান্ত শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে! স্তব্ধ হয় তার যাবতীয় তর্জন-গর্জন! স্মৃতি ঘোলাটে হয়, অনুজ্জ্বল চোখদুটো জুড়ে তার ঘুম নেমে আসে।
হাতিটার গায়ে বাঁধনগুলো হয়তো তখন কষে বসে গিয়েছিল! সে দাগ এখনো সুস্পষ্ট! জায়গাগুলোয় হাত রাখে কমলা। ওর হাতের তালুর নিচে কয়েকটা অমসৃণ বলিরেখা ভেসে চলে যায়। ওর হাতের নাগালের ভিতর হাতিটার পিঠের শুকিয়ে যাওয়া ফোসকাগুলো জেগে থাকে শুধু, শুকনো পাথরের গায়ে ঋতুর হাত ধরে জন্ম নেওয়া অদৃশ্য ফাটলের অন্ধকার নিয়ে।
মাকে ছেড়ে আসার শোক, শৈশব হারিয়ে ফেলার অভিমান আর লড়াই করে বেঁচে থাকার অহংকার—এসব নিয়েই কবে যেন বড়ো হয়ে গেছে এই হস্তীশাবক। সে এখন তার মাহুতকে ভোলাতে জানে। সময়-সময় নাকরা করে ব্যস্ত করে তুলতে পারে। পৃথিবীর বুকে এর থেকে বড়ো ভালোবাসার দৃশ্য হয়তো আর কিছু নেই!
শুধু কমলা কাছে এলেই হাতিটা পিছন ফিরে দাঁড়ায়! মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে! কমলা যেন ওর কতকালের সতীন!
এই মুহূর্তে হাতিটার সঙ্গে একটা চেনা-অচেনার আত্মময়তা অনুভব করে কমলা। শিরা-ধমনিতে বহমান নিঃশব্দ সে আবেগ, মূর্তির কুলুকুলু স্রোতের মতোই স্নিগ্ধ, স্বচ্ছ!
একদিন মা-বাপের ঘর ছেড়ে সেও এসেছিল হীরেনের কাছে। ঘরকন্যার সুখ পেতে জঙ্গলের বুকে হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসা নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় শিয়ালকাঁটার মতোই হয়তো সেও ভেসে এসেছিল।
এখন গোটা শীতকাল জুড়ে পেয়ে বসা স্মৃতির অবসন্নতা আর মূর্তির প্রায় নিশ্চিহ্ন শরীর জুড়ে বেছানো ঠান্ডা বিছানার চাদর চিরে, সদ্য যুবতীর সোহাগের ওম এনে দেওয়া চৈত্রশেষের তপ্ত রোদকে ফিকে করে দিয়ে, ডেকে যায় শুধু নিখাদ ভালোবাসার লোভে কপাল পোড়ানো, কুলত্যাগী কোনো এক চরিত্রহীনা কোকিলা!
কমলার নিজের বিয়ের দিনের গীত মনে পড়ে যায়—
“বালির বাবার বাড়ি রে।
কলা সারি সারি রে।।
কোথা গিয়া পাইলা মধু।
বৈদেশী ভ্রমরা রে।।”
ওর ভাতারকে সেই প্রথমবার দেখে ওর পছন্দ হয়েছিল খুব। বেশ নির্মেদ, পেশীবহুল, টানটান চেহারা—যেন ফুট ছয়েক লম্বা ধনুকের একটা ছিলা। দেখলেই কেমন যেন ভালোবাসতে ইচ্ছে করে। মরদ হীরেনকে দেখে কমলার নরম বুকে তীব্র কর্ষণ-ইচ্ছা জেগে উঠেছিল সেদিন! ঠিক ততক্ষণ কর্ষণ, যতক্ষণ না অবধি ফাঁপা কুয়োয় জমে থাকা ধাতুরস দুকূল ছাপিয়ে গৃহস্থের বাড়ি ভাসিয়ে দেয়।
শ্বশুরবাড়িতে এসে বউ দেখানোর সময় এই পার্বতীই ওর মুখ দেখে বলেছিল, “এ ছয়রি মায়া জানেই! আজি থেকেই মোর দেবর বশ হল!”
আঁকাবাঁকা সর্পিল পথে স্থিরচিত্রের মতো স্থির হয়ে যাওয়া যায়—এমন একটা জড়তা ছিল সেদিন পার্বতীর চোখের চাহনিতে! তারপর চোখে ঈষৎ বাঁকা দৃষ্টি এনে সামনে রাখা ধানের গোছা থেকে বেশ কিছুটা ধান মুঠো করে নিয়ে ওর সিঁথিতে ছড়িয়ে দিয়েছিল। সে দৃশ্যে এসে সজোরে ধাক্কা দিয়ে একখানা আস্ত রামধনু এঁকে দিয়ে গেছে তখন, টলটলে দু-একটা ভবঘুরে হাওয়ার স্মৃতি! পাশে বসা পুরুষটির মুখে তখন নির্নিমেষ তৃপ্তির হাসি। আশেপাশে শুধু পক্ককেশ রাজবংশী বৃদ্ধা-গোষ্ঠীর মুখরিত গুঞ্জন।
আশীর্বাদ পর্ব সেরে পার্বতী তার দেবর আর দেবরানীর কপালে আলতো করে চুমু দিয়েছিল। শ্রাবণের জলভরা মেঘ যেমন স্রোত নিয়ে আসে মূর্তির বুকে, জঙ্গল ঋতুমতী হয়, ওজন লাগে তার ভারী শরীরে, ঠিক তেমন একটা সমর্পিত স্তনভারে পার্বতীর শরীরটা ঝুঁকে পড়েছিল সামনের দিকে। অনিমেষ মায়ায় ভরা সে চুম্বন! যেন অনেক দূর দিয়ে ভেসে গেছে নির্বাক কল্পনারা! দিনের দূরগামী আলোর গভীরে যেন তাতে বোনা হয়ে আছে ক্রোধ, ভয় আর সমবেদনার রূপবতী অক্ষর!
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment