বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১তম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[২য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
এক বসন্ত স্বাধীনতার জন্যে
[২য় পর্ব]
"কমলার স্তনের বোঁটা বেয়ে দুধ বেরিয়ে এসে ভিজে যায় চারপাশ! হীরেনের দাপাদাপি তবু থামে না! যেন কাঁটা বসানো ক্ষুরধার লিঙ্গ তার! কমলার জরায়ুর বেদনা ভুলতে দিতে চায় না সে কোনো মতে! ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে প্রতিদিন নতুন করে খনন করে চলে সে কমলার যোনিদেশ!"
প্রতি রাতে তাই হীরেনের পুরুষ শরীর জেগে ওঠে, সদ্য খোলস ছাড়া চা-বাগানের রাজগোখরোর মতো! বর্ষার মেঘের মতো ছড়ানো চুলে কুসুমিত কামিনী তেলের হাহাকার নিয়ে পড়ে থাকা কমলার লোলচর্মসার শরীরটাকে জড়িয়ে ধরে সে হাতড়ায়, কামড়ায়! তার আঙুলের প্রতিটা নখে লেখা হতে থাকে লালা, মাংস আর রক্তের অযুত সহজপাঠ! আকাঙ্ক্ষার উন্মাদ আগুন জ্বলে যেন!
কমলার স্তনের বোঁটা বেয়ে দুধ বেরিয়ে এসে ভিজে যায় চারপাশ! হীরেনের দাপাদাপি তবু থামে না! যেন কাঁটা বসানো ক্ষুরধার লিঙ্গ তার! কমলার জরায়ুর বেদনা ভুলতে দিতে চায় না সে কোনো মতে! ঢুকিয়ে, পেঁচিয়ে প্রতিদিন নতুন করে খনন করে চলে সে কমলার যোনিদেশ!
তিরতির করে কাঁপতে থাকা লম্ফের আলোয় সে গমনপথে রাতের অবয়ব ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে! ফুলে ওঠা ঠোঁট, শরীরজোড়া কালশিটে, ঝুলে যাওয়া স্তনবৃন্তে কস্তুরীহীন, চিনচিনে, হেঁচড়ানো সম্ভ্রমহীনতা নিয়ে দূরে কান পাতে কমলা। রাতের বুক চিরে তখন পাথরে পাথরে জলের ধাক্কা লাগার শব্দ, জঙ্গলের নিস্তরঙ্গ নীরবতা এড়িয়ে নিশাচর পাখিদের ডাক, নিশিকৃষ্ণ তিথিতে অদ্ভুত লয়ে নিরলস জৈবিক কসরতে ব্যস্ত ঝিঁঝি পোকার ঝমাঝম নগরকীর্তন, আশ্লেষী হায়নার পিশাচ হাসি—এসবের পাশাপাশি ঝুপড়ির ঠিক বাইরেটা থেকে লোহার শিকলের একটা হালকা ঠুনঠুন শব্দ ভেসে আসে।
জঙ্গলের ভেতর গাছপালার গভীরতা ভেদে যেমন আলো-আঁধারি বাড়ে-কমে, ঠিক তেমন নদীর বুক বেয়ে বয়ে চলা বিভ্রান্ত হাওয়াটার ধাক্কায় শব্দগুলোর গভীরতা যেন কমতে থাকে! কেমন ফাটা-ফাটা, অস্পষ্ট হয়ে মাত্রা হারিয়ে ফেলে শেষে!
ফি বছর হীরেনের স্থায়ী নাগরিকত্বের পক্ষে দাখিল করতে চাওয়া চামড়া-মাংসের কাগজপত্রগুলোকে নিজের গর্ভ দিতে না-পাড়ার পাপ ধুয়ে ফেলতে-ফেলতে, কমলা যেন দেখতে পায় বাইরে বাঁধা হাতিটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠেছে এখন! ঘন ঘন মাথা নাড়ছে! পিছনের দু-পায়ের মাঝে শিকলটাকে হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেলতে চাইছে!
এ আজ নতুন কিছু না। কমলা দেখেছে প্রায় প্রতিরাতেই এই সময়টায় হাতিটা যেন ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠে। ওদের সঙ্গমের তীব্রতা যত বাড়ে, তত যেন চঞ্চল হয়ে ওঠে সে!
মাস ছয়েক হল মূর্তি বিট অফিস থেকে হাতিটাকে দিয়ে গেছে হীরেনের জিম্মায়। জলদাপাড়া ফরেস্ট অফিস যখন হস্তীশাবকটিকে ওর মায়ের থেকে আলাদা করার পদ্ধতি শুরু করেছিল, তখন হয়তো সেটির বয়স চার বছর! ফি বছরই এই কাজ চলে। মায়ের থেকে আলাদা করার সময় মা হাতিটির অস্থিরতায় তটস্থ থাকতে হয় বনদপ্তরের সকলকে! এ সময় তাকে শান্ত রাখে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের অন্যান্য কুনকি হাতির দল।
এসবই কমলা শুনেছে হীরেনের মুখে। হীরেন বেশ কয়েক বছর ধরে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টে একটা পার্ট-টাইম কাজ বাগানোর ধান্দায় ছিল। মাহুত হওয়ার ট্রেনিং নিয়েছে সে বেশ কিছুদিন। নিজে হাতে হাতি বাঁধার দড়ি বানিয়েছে। ওর মতো আরও অনেকেই ট্রেনিং নিয়েছে যদিও। তারপর প্রধান মাহুত বাসের আলীকে হাত করে, এটা-সেটা ফাইফরমাশ খেটে দিয়ে, কিশোরগঞ্জের দোক্তা পাতা সাপ্লাই দিয়ে, আস্তে আস্তে মাহুত হওয়ার বিশ্বাস সে অর্জন করেছে।
এখন সে নিজেই বুক ফুলিয়ে, ছুঁচলো গোঁফের আগা সরু করে বলে, “হামরা বর্মন! মাহুতের জাত! মোর দাদা-পরদাদা আসাম থাকি হাতি ধরি আনি, পোষ মানি খেলা দেখাইত।”
হাতিটাও দিব্যি এখন হীরেনের পোষ মেনেছে। হীরেনই বলতে গেলে এখন ওর ‘মাহুত বন্ধু’! হাতিটাকে সেই এখন চান করায়, খেতে দেয়, তার পিঠে চেপে জঙ্গল, নদীর ধার চড়তে বেরোয়। রোজ একবার বিট অফিসে রিপোর্ট করে আসে।
সেসময় রাখালিয়া বাঁশিতে সুর তোলে হীরেন। তার বাঁশির সুরে জঙ্গলের শাল-সেগুন-গামার গাছে জন্ম নেয় কয়েকশো চুমুর রোমান্টিকতা! হয়তো ওর না-বলা ভালোবাসাগুলো অব্যক্ত প্রেম আর ব্যর্থযাপনের কবিতা হয়ে তাতে মিশে থাকে। যেন এক আদিম অরণ্যমানবের সবুজ হারানো উদাস কথকতা, দূরের পাহাড়ের গায়ে তোলা অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসে, এক ফোঁটা গাঢ় বাদামি রঙের জাদুধ্বনি হয়ে!
হাতিটা সত্যি দিব্যি পোষ মেনেছে হীরেনের! পেছনে বাড়ি মেরে ‘বোট’ বললে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে! হাতের বেতের লাঠিটা দিয়ে একটু খুঁচিয়ে ‘মাইল’ বললে উঠে দাঁড়াবার চেষ্টা করে! আবার একটু চেঁচিয়ে ‘তিরে’ বললে কাত হয়ে শুয়ে পড়ে! হাতিটার সামনে গিয়ে হীরেন ‘ধের’ বললে কেমন শূরে করে পেঁচিয়ে ধরে ওকে! ব্যালান্স করে ওর কাঁধে চড়ে বসে হীরেন।
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment