প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

ছাই রঙের মাটি [৩য় পর্ব] | শাশ্বত বোস

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১২তম সংখ্যা/১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
ছাই রঙের মাটি
[৩য় পর্ব]

"চাপ চাপ অন্ধকারের মতন, ইটভাটার ছাই ঠিক যেখানটায় গিয়ে চূর্ণী নদীতে গিয়ে মিশে যেত সেই জায়গার জমাট বাঁধা কালো মাটিটার মতন, শ্রীগুরু নার্সারির গোলাপের মাটিতেও কি অল্প একটু দেলদার আর অল্প একটু বুলু পাশাপাশি মিশে আছে?"

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
মেইলটা এতক্ষণ খোলা অবস্থায় পড়েছিল। হঠাৎই নতুন ইনকামিং মেইলের নোটিফিকেশন সাউন্ডে সম্বিৎ ফিরে পায় প্রবাল। মেল চেক করে প্রবাল দেখে অ্যাডমিন থেকে একটা কার্ড এসেছে মেলে। সাবজেক্ট ‘গার্ডেননিং ডিটেলস’। মেইলটা আবার ফরওয়ার্ড হয়েছে কর্পোরেট ইসথেটিক্স গ্রুপ থেকে। সেই মেলটা আবার এসেছে ভেন্ডরের কাছ থেকে। এই অতিরিক্ত বড়ো মেল চেনটা যেন প্রবালের সব চিন্তাভাবনাগুলোকে গুলিয়ে দিতে চায়। মেল থেকে ইমেজটা ডাউনলোড করে প্রবাল জুম করে পড়ে, ‘শ্রীগুরু নার্সারি, শিবপুর ঘাট, পায়রাডাঙা’। চোখের সামনে একটা রেলস্টেশন দেখতে পায় প্রবাল। নদীর দিকে যাবার পথে যেন ওই স্টেশনেই একদিন অনেকক্ষণ বসে থেকেছে ও। বসে থাকতে থাকতে সে দেখতে চেয়েছে চোখের দেখা ছাড়িয়ে আরও অনেকটা। এই পায়রাডাঙায় পুরো ছেলেবেলাটা কেটেছে প্রবালের, মা বাবা ঠাকুমার সাথে। একাত্তরে ওর বাবা ওপার থেকে ভিটেমাটির টান পাকাপাকিভাবে ছিন্ন করে এদেশে চলে এসেছিলেন। দেশান্তরের স্মৃতি ওর নেই, থাকবার কথাও নয়। ওদের দেশ, ওদের মাটি কখনও দেখা হয়ে ওঠেনি ওর। পায়রাডাঙার মাটিতেই অনস্তিত্ত্বের মাঝে নিজের একান্ত আপন অস্তিত্বকে খুব সচতন ভাবে খুঁজে নিয়েছিল প্রবাল। ওর মনে আছে দেলদার শেখ বেশ একজন প্রভাবশালী লোক ছিল এই পায়রাডাঙা-রানাঘাট চত্বরে। ওর শিবপুরের ইটভাটাতেই কাজ করত প্রবালের পুরো পরিবার। কানাঘুষো শোনা যেত দেলদার বর্ডার পেরিয়ে মেয়ে পাচার করে, বেচুয়া হাটের কেনা গরু পারাপারের মতো। ওই বয়সে লোকটাকে দেখলেই ভয়-ঘৃণা-ক্রোধ মিশিয়ে একটা নিয়ন্ত্রণহীন অন্ধকার চাগার দিয়ে উঠত প্রবালের মনে। ওর ছোটোবেলার জীবনটার শুরুর দিকে প্রবালের একটা দিদি ছিল বলে শুনেছিল ও। সেই দিদির যখন বছর দশেক বয়েস তখন কী যেন একটা ভয়ংকর গণ্ডগোল হয়েছিল। তার পর থেকেই প্রবাল দেখেছে অন্ধকার ঘরের এক কোণে ওর বাবা বসে বসে কাঁদত। সেসময় ভারী ফ্রেমের চশমার ঘষা কাচের ফাঁক দিয়ে তাঁর চোখদুটিকে দেখলে যন্ত্রণার বোধ থেকে সরে আসা একটা ছিন্নবিচ্ছিন্ন আত্মাকে দেখতে পেত প্রবাল। সেই দিদিরই কি নাম ছিল বুলু?
 
চূর্ণী নদীর বাঁকে ডুবে যাওয়া বিকেলটার শরীর জুড়ে ঘরে ফিরতে চাওয়া পাখি কিংবা পূর্বপুরুষের ভিটেকে সাক্ষী রেখে তৈরি হয় পৃথিবীপাড়ের গণসংগীত।
“মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া?
রঙ্গীলা দেশের নাইয়া
মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া।”
ইটভাটার কাজটা ওরা ছেড়ে দিয়েছিল। ঠিক কবে কখন সে স্মৃতি ফুরিয়ে গেছে। শিবপুরের ঘাটের কাছে ওই ইটভাটার পাশেই ওর বাবা কিছুটা দখলী জমিতে একটা গোলাপ নার্সারি খুলেছিল। ততদিনে অবশ্য দেলদার খুন হয়েছে নিজেরই ডান হাত রাফির হাতে। প্রবালের মা রানাঘাট, নিয়ামতপুর, মুকুন্দনগর, উকিলনাড়া, জগপুর পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজে যেত। পাতায় পাতায় কাটাকুটি খেলার মুহূর্তে বারবার প্রবাল নতুন করে ওর ছোটোবেলার দিনগুলোকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছে। প্রতিবারই ওকে ফিরে ফিরে আসতে হয়েছে সেই আমবাগান জুড়ে নেমে আসা আয়তাকার রাতে। সেই “বুলু, বুলু” ডাকটা হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেছিল ওর জীবন থেকে! বুলুকে কি ওরা রানাঘাটে পিসির বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল নাকি দেলদার ওকে ভোগ করে বডিটা ছুড়ে দিয়েছিল ইটভাটার চুল্লিতে? সেই আগুনেই জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ওর সেই টিকোলো নাক, টানা টানা চোখ, লক্ষ্মী প্রতিমার মতো নিটোল মুখ আর কোমর ছাপানো চুলের বাহার। নাকি ওকে ধরে কেউ চালান করে দিয়েছে বর্ডার পেরিয়ে ওপারে, জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো যেখানে ভাবনা বা চিন্তার কোনো অদৃশ্য বলয়ে গিয়ে, খেই হারিয়ে ফেলে। তার পর থেকে ওর মা আর বাবা শ্মশানের আধপোড়া মড়াগুলোর হাড়গোড় জড়ো করে নিয়ে এসে, সারা রাত জেগে হামানদিস্তায় গুঁড়ো করতকার্বন! মাটিতে মিশে সার হয়ে গোলাপের পাপড়িকে সুগঠিত করে। বিছানায় শুয়ে অজানা কোনো বাড়ি থেকে আসা হারমোনিয়ামের সুরের মতন প্রবাল শুনতে পেত টং টং টং!
শত সহস্র আলোকবর্ষ থেকে ছুটে আসা শেষ রাতের ট্রেনের মাথা থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোর পরে পড়ে থাকা চাপ চাপ অন্ধকারের মতন, ইটভাটার ছাই ঠিক যেখানটায় গিয়ে চূর্ণী নদীতে গিয়ে মিশে যেত সেই জায়গার জমাট বাঁধা কালো মাটিটার মতন, শ্রীগুরু নার্সারির গোলাপের মাটিতেও কি অল্প একটু দেলদার আর অল্প একটু বুলু পাশাপাশি মিশে আছে? অনেকগুলো মৃত্যুর মাঝে আরও অনেকখানি কালো হয়ে গোলাপটা ঝরে যাবে একদিন! বাথরুমটা থেকে একটা কটু পেচ্ছাপের গন্ধ ভেসে আসে! মোমঝরা জাদুকরী আয়নাটার ওপারে তখন বুলু দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অবিকল প্রবালের মতন
 
~~000~
 
 
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)