বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১২তম সংখ্যা/১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
ছাই রঙের মাটি
[৩য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
ছাই রঙের মাটি
[৩য় পর্ব]
"চাপ চাপ অন্ধকারের মতন, ইটভাটার ছাই ঠিক যেখানটায় গিয়ে চূর্ণী নদীতে গিয়ে মিশে যেত সেই জায়গার জমাট বাঁধা কালো মাটিটার মতন, শ্রীগুরু নার্সারির গোলাপের মাটিতেও কি অল্প একটু দেলদার আর অল্প একটু বুলু পাশাপাশি মিশে আছে?"
“মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া?
মায়া নদী কেমনে যাবি বাইয়া।”
ইটভাটার কাজটা ওরা ছেড়ে দিয়েছিল। ঠিক কবে কখন সে স্মৃতি ফুরিয়ে গেছে। শিবপুরের ঘাটের কাছে ওই ইটভাটার পাশেই ওর বাবা কিছুটা দখলী জমিতে একটা গোলাপ নার্সারি খুলেছিল। ততদিনে অবশ্য দেলদার খুন হয়েছে নিজেরই ডান হাত রাফির হাতে। প্রবালের মা রানাঘাট, নিয়ামতপুর, মুকুন্দনগর, উকিলনাড়া, জগপুর পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি ঠিকে ঝিয়ের কাজে যেত। পাতায় পাতায় কাটাকুটি খেলার মুহূর্তে বারবার প্রবাল নতুন করে ওর ছোটোবেলার দিনগুলোকে পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছে। প্রতিবারই ওকে ফিরে ফিরে আসতে হয়েছে সেই আমবাগান জুড়ে নেমে আসা আয়তাকার রাতে। সেই “বুলু, বুলু” ডাকটা হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেছিল ওর জীবন থেকে! বুলুকে কি ওরা রানাঘাটে পিসির বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিল নাকি দেলদার ওকে ভোগ করে বডিটা ছুড়ে দিয়েছিল ইটভাটার চুল্লিতে? সেই আগুনেই জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ওর সেই টিকোলো নাক, টানা টানা চোখ, লক্ষ্মী প্রতিমার মতো নিটোল মুখ আর কোমর ছাপানো চুলের বাহার। নাকি ওকে ধরে কেউ চালান করে দিয়েছে বর্ডার পেরিয়ে ওপারে, জীবনের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো যেখানে ভাবনা বা চিন্তার কোনো অদৃশ্য বলয়ে গিয়ে, খেই হারিয়ে ফেলে। তার পর থেকে ওর মা আর বাবা শ্মশানের আধপোড়া মড়াগুলোর হাড়গোড় জড়ো করে নিয়ে এসে, সারা রাত জেগে হামানদিস্তায় গুঁড়ো করত। কার্বন! মাটিতে মিশে সার হয়ে গোলাপের পাপড়িকে সুগঠিত করে। বিছানায় শুয়ে অজানা কোনো বাড়ি থেকে আসা হারমোনিয়ামের সুরের মতন প্রবাল শুনতে পেত টং টং টং!
শত সহস্র আলোকবর্ষ থেকে ছুটে আসা শেষ রাতের ট্রেনের মাথা থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোর পরে পড়ে থাকা চাপ চাপ অন্ধকারের মতন, ইটভাটার ছাই ঠিক যেখানটায় গিয়ে চূর্ণী নদীতে গিয়ে মিশে যেত সেই জায়গার জমাট বাঁধা কালো মাটিটার মতন, শ্রীগুরু নার্সারির গোলাপের মাটিতেও কি অল্প একটু দেলদার আর অল্প একটু বুলু পাশাপাশি মিশে আছে? অনেকগুলো মৃত্যুর মাঝে আরও অনেকখানি কালো হয়ে গোলাপটা ঝরে যাবে একদিন! বাথরুমটা থেকে একটা কটু পেচ্ছাপের গন্ধ ভেসে আসে! মোমঝরা জাদুকরী আয়নাটার ওপারে তখন বুলু দাঁড়িয়ে আছে। দেখতে অবিকল প্রবালের মতন।
~~000~
No comments:
Post a Comment