বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১ম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
শাশ্বত বোস
ছাই রঙের মাটি
[২য় পর্ব]
"আর কি কোন স্মৃতি নেই? নেই কি বেঁচে মনের ভিতর চিন্তার কোন ধূপছায়া তরঙ্গ? ইটভাটার পাশে আমবাগানে ছোট্ট একটা শিশুকে বসিয়ে দোল দিচ্ছে একটি বালিকার হাত। বয়স মেরে কেটে বছর দশেক হবে।"
পূর্বানুবৃত্তি
প্রবালের
পুরো নাম প্রবাল কুমার বসু। একটা মূলত ন্যাশনাল কোম্পানিতে ডেলিভারি ম্যানেজার
লেভেলে আছে ও। নিউটাউনের কাছে একটা অভিজাত আবাসনে প্রবালের নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে।
একাই থাকে। সদ্য একটা বিলিতি গাড়িও কিনেছে। চাকরিটা ওর দৈনন্দিন জীবনে বেশ একটা
আভিজাত্যের ছাপ এনে দিয়েছে। আদপে ওরা নদীয়া জেলার বাসিন্দা। টবের মাটিটাকে এই
মুহূর্তে ভীষণ আপনার বলে মনে হয় ওর! অতি প্রাচীন কালের থেকে যেন সেটা প্রতি শনিবার
বিকেলে অনন্ত চালচিত্রের ছবি হয়ে ফুটে থেকেছে পশ্চিম আকাশের রামধনুর মতন। জীবনবাদী
দার্শনিক শিল্পীর মতন গভীর রেখায় ধীর দাগে এঁকে চলেছে সর্বনাশের বিবর্ণ ক্যানভাস।
মাটিটা ওকে যেন কিছু বলতে চায়। হয়তো কিছু ধরিয়ে দিতে চায়। কিন্তু সেটা ঠিক কী বুঝে
উঠতে পারে না প্রবাল। যেন অনেক পুরোনো একটা ভাবনার সাথে নির্জনতা আর আধ্যাত্মিকতা
মিশে গিয়ে একটা আপশোশ জন্ম নেয় ওর মনে। নিজের ডেস্ক থেকে রিসিভারটা তুলে অ্যাডমিন
অফিসারকে ওর কেবিনে ডেকে পাঠায় প্রবাল।
“আচ্ছা
মিস্টার পাড়ুই, পাড়ুই তো?” একটু হোঁচট খায় প্রবাল। একবার উলটোদিকে বসা ভদ্রলোকের বুকের কাছে সাঁটানো
ছোট্ট ধাতব নেমপ্লেটটায় চোখ বুলিয়ে নেয়।
“গ্রাউন্ড
ফ্লোরের মেল রেস্টরুমে একটা রোজ বুশ দেখলাম, ওটা কি ব্রীড বলতে পারেন? ডিটেলসটা একটু আমার
লাগবে মানে কোথা থেকে সাপ্লাই হয় পার্টিকুলার কোন নার্সারী, এগুলো আর কী।”
“অ্যাকচুয়ালি
স্যার, আমার মনে হয় দিশি। ইমপোর্টেড কিছু নয়। তবু স্যার
একবার গার্ডেনিং কনট্রাক্টরের সাথে কনফার্ম করে আপনাকে জানাচ্ছি। আমরা কোথা থেকে
নরমালি এই ফ্লাওয়ার প্লান্টস কিনি অ্যান্ড মোর ডিটেলস আমি হাফ অ্যান আওয়ার এর ভেতর
আপনাকে সব মেইল করে দিচ্ছি স্যার।”
লোকটি
বেশ বেকায়দায় পড়েছে বুঝতে পারে প্রবাল। হয়তো ইনি গার্ডেননিং সেকশনটা দেখেন না।
হয়তো হেড অফিস থেকে সব অর্ডার ফাইনাল হয়। শুধু তো একটা কৌতূহল আর তো কিছু না!
কিন্তু শুধুই কি একটা কৌতূহল? আদিম ধূসর প্রকাণ্ড
একটা গাছের থেকে একটা সোঁদা সোঁদা সার মেশানো মাটির গন্ধ ভেসে আসে ওর নাকে। খুব
মেপে মেপে পা ফেলে যেন ওর ঘর থেকে বেরিয়ে গেল লোকটা। তবে আধঘন্টা নয় পরবর্তী দশ
মিনিটেই প্রবালের মেলে নোটিফিকেশন এলো। কাজের এই গতি দেখে যেন একটু বিরক্তই হল
প্রবাল। হয়তো এতটা তাড়াতাড়ি জবাব না এলেই ভালো হত। মাথার ভেতর ছবিটাকে আরো কিছুটা
ভালোভাবে সেঁধিয়ে নেওয়া যেত। অভ্রমাখা মুখের চকচকে আয়নায় এবার ভেসে উঠলো ওর
ছেলেবেলার সময়ের একটা ইটভাটার ছবি। ওর বয়সি অনেকে সেখানে কাজ করছে। মাথায় করে ইট
বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। চুল্লির ঠিক সামনেটায় রাখছে। ওর বয়সি শ্রমিকদের কাজ অতটুকুই।
এরপর থেকে কাজটাকে যারা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের মধ্যেও একটা চেনা মুখ দেখতে পেল
প্রবাল। দেখতে অনেকটা ওর বাবার মতন। এই মানুষগুলো মানেই এঁদের সাথে জড়িয়ে থাকা
ইতিহাস-স্মৃতি-দর্শন। সময়ের টানে ফুরিয়ে আসা বালিঘড়িটা ঠিক জানে, সময় কত নিঃশব্দে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে ক্ষয়ে যাওয়া সময়ের কিনারে। ডেস্কের উপর
মাথাটা নিচু করে প্রবাল। ওর মাথার ভিতর প্রলাপের মন্বন্তর লাগে। আর কি কোন স্মৃতি
নেই? নেই কি বেঁচে মনের ভিতর চিন্তার কোন ধূপছায়া
তরঙ্গ? ইটভাটার পাশে আমবাগানে ছোট্ট একটা শিশুকে বসিয়ে
দোল দিচ্ছে একটি বালিকার হাত। বয়স মেরে কেটে বছর দশেক হবে। কোমল হাতে ইট বয়ে বয়ে
শিশুটির মতো মেয়েটির হাতেও প্রোথিত হয়েছে কয়েকটি শুকনো ক্ষত। তার শুষ্ক চামড়া
জৌলুস হারিয়েছে। বাতাসে
ভেসে আসা আবছা আলোর মতোই ম্লান ছায়া ও অস্ফুট শব্দের মতোই চিত্রকল্পগুলো এই
মুহূর্তে ভেসে আসে প্রবালের মাথার ভিতর। উকিলনাড়া মাঠের চড়ক, চূর্ণী নদীর পাড়ের মাটির ঢালে প্রায় শুয়ে পড়া শ্যাওড়া গাছ, তার তলায় জমা হওয়া পাতার অরণ্যে দমকা হাওয়া এসে লাগে ঘূর্ণির মতন। ভোঁতা
শব্দের আলোড়ন তুলে সেখানে খুলে যায় হাজারখানা দুয়ার। বেরিয়ে আসে অনামী সুর, ‘আমি কৃষ্ণ ভালোবাসি গো, সখী আমি কৃষ্ণ
ভালোবাসি।’
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment