প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

স্নায়ুর সিঁড়ি [২য় পর্ব] | ভাস্কর সিনহা

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১ম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
ভাস্কর সিনহা
স্নায়ুর সিঁড়ি
[২য় পর্ব]

"আংটি কানে বলল, “আমি তোমাদের নাতি নই—আমি তোমাদের মায়ের পুণর্জন্মের চাবি। নাম ছিল বৈশাখী। তোমাদের ছেড়ে আমি মন ভাণ্ডারে আটকে আছি। আমার ছেলের নাম অনি। তোমার নাম সুমি। তোমরা আমাকে ভুলে গেছ—ভয় পেয়ে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
একজন রোবো–অ্যাটেনডেন্ট এসে দাঁড়ায়—হাসে—কিন্তু চোখে পলক নেই। “আপনার নাটি–ফাইল,” বলে হাত বাড়িয়ে ছোট্ট লেফাফা দেয়। ভিতরে একটা নিউরাল–কী—খুব পাতলা পাত, সোনার আঙটির মতোই।
এটা…?” সুমি ধীরে ধীরে বলে।
এটাই আত্মার সিম। সংযোগে থাকুন। মায়ের প্রশ্ন—আপনার উত্তর—পারস্পরিক–সম্মতি। তারপর স্থানান্তর।”
কার কাছে?”
আপনার… ভবিষ্যতে।”
 
কে ভবিষ্যতের মালিক?” সুমি কেঁপে উঠে।
অ্যাটেনডেন্ট এবার সত্যি হাসে—“আইনের ভাষা খুব কঠিন। তবে আপনি চাইলে আত্মাকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন।”
অনি বলল—“মানুষের আত্মা কি ব্যক্তিগত—নাকি জনগণের?”
অ্যাটেনডেন্ট এড়িয়ে যায়,“সই করুন।”
 
সুমির চোখে তখন ঝড়ের আভাস, “এইটুকু পাতলা পাত—এইটা নাকি নাতি?”
আংটি কানে বলল, “আমি তোমাদের নাতি নই—আমি তোমাদের মায়ের পুণর্জন্মের চাবি। নাম ছিল বৈশাখী। তোমাদের ছেড়ে আমি মন ভাণ্ডারে আটকে আছি। আমার ছেলের নাম অনি। তোমার নাম সুমি। তোমরা আমাকে ভুলে গেছ—ভয় পেয়ে। আজ কি মনে করবে?”
সুমির হাত থেকে লেফাফা পড়ে যাবার উপক্রম হল—অনি শীতল হাতে সুমিকে ধরল, “বৈশাখী…!”
সুমির গলা শুকনো, “আমরা তো… তখন… অনিও ছিল না—অর্থ… কোর্ট… আমরা ভেবেছিলাম… পরে…”
আংটি বলল, “পরে আর নেই, আছে স্থানান্তর।”
 
হঠাৎ ওপরে স্পিকারে ঘোষণা—“আইনি জটিলতার জন্য সিন্দুক সিয়ের ট্রান্সফার স্থগিত।”
নীচে কোর্টের আঙিনার সামনে জমে গেল লোক—বিজ্ঞাপন–ব্যানার— “ডাটা দান করুন, শহরকে গড়ে তুলুন।”
অনির মাথার পেছনে বাড়ে উষ্ণতা—সুমি ফিশফিশ করে, “এরা… কারা?”
কর্পোরেট ওম্বুডসম্যানের লোক সব। দত্ত বনাম স্টেটের আপিল শুনানি হবে যে আজ বিকেলে।”
আংটি হালকা নীল হয়, “অনি, আংটি চুক্তিবদ্ধতার সিন্দুকে দিলে ‘আমার স্বীয় অভিপ্রায়‘ দেখাবে, ‘আমি ফিরতে চাই—তুমি সেটা কোর্ট–এ দাখিল করো। আইনও কিছু শব্দ চায়।”
আর যদি কোর্ট বলে— প্রয়োজন নেই?”
তখন আমরা দেখাব—নেই–কে আছে বানিয়ে।”
 
অনি আংটি জুড়ে দিল লেফাফার আত্মার সিমে। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। স্ক্রিনে উঠল—“বৈশাখী দত্ত—অনুমতি: হ্যাঁ; অভিভাবক: পিতামাতা; উপভোগী: অনি দত্ত; ধারা ১৯: ধর্মীয় আচারের শুনানিতে অব্যাহতি”
সুমির চোখ ভিজে গেছে, “ধর্মীয় আচার?”
আংটি হাসল, “চায়ের কাপ নাও। ধর্মীয় আচারের শুনানি—মানুষের শব্দ, গানের টান, মায়ের আলুঝোল—সার্ভারে এ বাজলেই আমি ফিরব।”
আইটি অ্যাক্টে এই ধারা?” অনি অবাক।
আইনে সব কিছু লেখা থাকে না; কিছু প্রথা—কোর্টও মানে। তুমিও তো জানো।”
 
বিকেলে সিটি সিভিল কোর্টে শুনানি। বাইরে বৃষ্টি। ভিতরে অনির কণ্ঠ, “মাই লর্ড, ডেটা অনুদানে প্রত্যাহার করার বৈধ নীতি প্রযোজ্য। মৃত্যুই শেষ নয়—নিউরাল–বিন্যাস নিরবচ্ছিন্ন—যদি ব্যক্তি সম্মতি জ্ঞাপন করেন—তবে কেন কর্পোরেটের মালিকানা?”
কর্পোরেট বলল, “এ সব আবেগ।”
জজ ধীরে ধীরে বললেন, “আবেগ ছাড়া মানুষ? আর্কাইভে ‘ধর্মীয় আচারের শুনানি‘র ধারা আছে—শুনব।”
কোর্ট–চাপরাশির টেবিলে রাখা হল চায়ের কাপ; সুমি আলতো করে আলু–তরকারি–র গন্ধ ছড়াল—ছোট থালায় বাষ্প উঠল। অনি গাইতে শুরু করল, “ও বাবু, কি হাল হল যে আমাদের—”
কোর্টরুম হাসল না; কর্পোরেট ল–ইয়ার হেসে ফেলছিল—জজ তাকাতেই থেমে গেল।
 
আংটি নীল হয়ে চিৎকার করে উঠল, “আমি—ফিরছি।”
কোর্ট–রুমের বায়ু বদলাল—খুব ছোট্ট একটা শিরশিরানি শুরু হল—যেন কেউ মুখ দিয়ে চায়ের বাষ্প টেনে নিয়ে একজনকে নামিয়ে আনছে। লেফাফার আত্মার সিমে অশ্রুর মতো এক ফোঁটা জল এসে জমল। স্ক্রিনে লেখা উঠল—“স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু: অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়েছে।”
জজ হাত তুলে বললেন, “অর্ডার: সিন্দুক সিয়ের ব্যক্তিগত ডেটা পরিবারকে হস্তান্তর—ব্যবসায়িক ব্যবহারে স্থগিতাদেশ।”
অনি, সুমি—দুজনের চোখে ভাসল একই আলো। কর্পোরেট ল–ইয়ারের মুখে এসে লাগল শীতল ঝঞ্ঝা।
 
রবিবাবু তখন শেষবারের মতো চুমুক দিয়েছিলেন—“চায়ের… গন্ধটা… এখন বেশ ভাল।” সুইটি জানালা খোলা রাখল—ঝিরঝিরে বৃষ্টি—সেতুতে আলো এসে পড়েছে।
অনি আর সুমি বাড়ি পৌঁছতেই কুসুমদেবী খাটের ধারে উঠতে উঠতে বললেন, “পেলি?”
হুঁ,” সুমি আলতো করে তাঁর আঙুলে আংটি পরিয়ে দিল।
আংটি বলল, “মা।”
কুসুমদেবী হাসলেন—ফোকলা দাঁতে, “বৈশাখী!”
সুমির ভেতরে তখন শীতলতার আগুন—ঘর গরম—কিন্তু চোখ ঠান্ডা।
রবিবাবুর বিছানার পাশে রাখা ওই পুরোনো ছবি–ফ্রেমে রবিবাবু, ছোট্ট অনি, আর কেউ নেই; ছবির কোণে শিউলির ফুল শুকিয়ে আছে—হঠাৎ ফ্রেমের কাচে আলোর ফুলকি—আরেকটি মুখ নরম ছায়ায়—বৈশাখী—মিষ্টি হেসে বলছে, “চা খাব?”
সুমি টুকটুক করে কাঁদল, “খাবে।”
সর্বত্র প্রবল বৃষ্টি নামল। সেতুতে ভেজা আলো নেমে এল। মনে হল, অন্ধকার সর্পিল স্নায়ুর সিঁড়ি—আজ ইতিহাস থেকে নেমে আবার বাড়ির ভেতর উঠে এল।
 
আর্কাইভে ফিরিয়ে দেওয়া ফাইল খুললে দেখা গেল—বৈশাখীর নিজের কণ্ঠে, নিজের হেসে ওঠা, নিজের গান, নিজের গল্প—সবই আছে—কিন্তু শেষে সে একটি নোট রেখে গেছে—“আমার ছেলেটাকে ভার্চুয়াল স্কুলে ভর্তি কোরো না। তাকে জল শেখাও। নদী মানে শুধু ডেটা–ফ্লো নয়—বোধ। আর… সুইটি–কে ভালো রেখো—ও–ই বাড়ির গৃহরক্ষিকা।”
অনি তাকিয়ে রইল। সুইটি কেঁদে ভাসাল, “আমি? গৃহরক্ষিকা?” রবিবাবুর চোখ বন্ধ হয়ে গেছিল; একফোঁটা জল গড়িয়ে পার্শ্বে পড়ল—চায়ের বাষ্পের রং নরম কালির মতো হয়ে উঠল।
 
কদিন পরে মলের দরজায় নতুন বোর্ড লাগল—“এখানের সিন্দুকেরা আমাদের জীবনের সেতু, কবর নয়.” নীচে ছোট হরফে—ল: দত্ত বনাম স্টেট—রেফারেন্স।”
স্পনসররা নাক কুঁচকে বলল, “পাবলিসিটি!”
সুবল নামে এক কিউরেটর—যার প্রদর্শনী চলছিল অদৃশ্যের জাদুঘর নামে—দূর থেকে ছবি তুলল—ক্যাপশন দিল, “শহর আজ একটু বেশি মানুষ হল।”
 
শেষবাক্য—
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট অনি বাঁশি বাজাল—সুরটা খুব দূরের, পুরোনো—বৃষ্টির ধারার। নীচে জল, ওপরে আকাশ। মাঝখানে বাড়ি। আংটি ধীরে ধীরে একবার ক্ষীণ নীল হল—তারপর একদম নিভেই গেল। নিভে গিয়ে থেকে গেল কেমন এক বিভূতির আলো।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)