বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১ম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
ভাস্কর সিনহা
স্নায়ুর সিঁড়ি
[২য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
ভাস্কর সিনহা
স্নায়ুর সিঁড়ি
[২য় পর্ব]
"আংটি কানে বলল, “আমি তোমাদের নাতি নই—আমি তোমাদের মায়ের পুণর্জন্মের চাবি। নাম ছিল বৈশাখী। তোমাদের ছেড়ে আমি মন ভাণ্ডারে আটকে আছি। আমার ছেলের নাম অনি। তোমার নাম সুমি। তোমরা আমাকে ভুলে গেছ—ভয় পেয়ে।"
“এটা…?” সুমি ধীরে ধীরে বলে।
“এটাই আত্মার সিম। সংযোগে থাকুন। মায়ের প্রশ্ন—আপনার উত্তর—পারস্পরিক–সম্মতি। তারপর স্থানান্তর।”
“কার কাছে?”
অ্যাটেনডেন্ট এবার সত্যি হাসে—“আইনের ভাষা খুব কঠিন। তবে আপনি চাইলে আত্মাকে ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেন।”
অনি বলল—“মানুষের আত্মা কি ব্যক্তিগত—নাকি জনগণের?”
সুমির গলা শুকনো, “আমরা তো… তখন… অনিও ছিল না—অর্থ… কোর্ট… আমরা ভেবেছিলাম… পরে…”
আংটি বলল, “পরে আর নেই, আছে স্থানান্তর।”
নীচে কোর্টের আঙিনার সামনে জমে গেল লোক—বিজ্ঞাপন–ব্যানার— “ডাটা দান করুন, শহরকে গড়ে তুলুন।”
অনির মাথার পেছনে বাড়ে উষ্ণতা—সুমি ফিশফিশ করে, “এরা… কারা?”
আংটি হালকা নীল হয়, “অনি, আংটি চুক্তিবদ্ধতার সিন্দুকে দিলে ‘আমার স্বীয় অভিপ্রায়‘ দেখাবে, ‘আমি ফিরতে চাই’—তুমি সেটা কোর্ট–এ দাখিল করো। আইনও কিছু শব্দ চায়।”
“আর যদি কোর্ট বলে— প্রয়োজন নেই?”
সুমির চোখ ভিজে গেছে, “ধর্মীয় আচার?”
“আইটি অ্যাক্টে এই ধারা?” অনি অবাক।
“আইনে সব কিছু লেখা থাকে না; কিছু প্রথা—কোর্টও মানে। তুমিও তো জানো।”
জজ ধীরে ধীরে বললেন, “আবেগ ছাড়া মানুষ? আর্কাইভে ‘ধর্মীয় আচারের শুনানি‘র ধারা আছে—শুনব।”
কোর্ট–চাপরাশির টেবিলে রাখা হল চায়ের কাপ; সুমি আলতো করে আলু–তরকারি–র গন্ধ ছড়াল—ছোট থালায় বাষ্প উঠল। অনি গাইতে শুরু করল, “ও বাবু, কি হাল হল যে আমাদের—”
কোর্টরুম হাসল না; কর্পোরেট ল–ইয়ার হেসে ফেলছিল—জজ তাকাতেই থেমে গেল।
কোর্ট–রুমের বায়ু বদলাল—খুব ছোট্ট একটা শিরশিরানি শুরু হল—যেন কেউ মুখ দিয়ে চায়ের বাষ্প টেনে নিয়ে একজনকে নামিয়ে আনছে। লেফাফার আত্মার সিমে অশ্রুর মতো এক ফোঁটা জল এসে জমল। স্ক্রিনে লেখা উঠল—“স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু: অনুমোদন নিশ্চিত করা হয়েছে।”
জজ হাত তুলে বললেন, “অর্ডার: সিন্দুক সিয়ের ব্যক্তিগত ডেটা পরিবারকে হস্তান্তর—ব্যবসায়িক ব্যবহারে স্থগিতাদেশ।”
অনি, সুমি—দুজনের চোখে ভাসল একই আলো। কর্পোরেট ল–ইয়ারের মুখে এসে লাগল শীতল ঝঞ্ঝা।
অনি আর সুমি বাড়ি পৌঁছতেই কুসুমদেবী খাটের ধারে উঠতে উঠতে বললেন, “পেলি?”
আংটি বলল, “মা।”
কুসুমদেবী হাসলেন—ফোকলা দাঁতে, “বৈশাখী!”
সুমির ভেতরে তখন শীতলতার আগুন—ঘর গরম—কিন্তু চোখ ঠান্ডা।
রবিবাবুর বিছানার পাশে রাখা ওই পুরোনো ছবি–ফ্রেমে রবিবাবু, ছোট্ট অনি, আর কেউ নেই; ছবির কোণে শিউলির ফুল শুকিয়ে আছে—হঠাৎ ফ্রেমের কাচে আলোর ফুলকি—আরেকটি মুখ নরম ছায়ায়—বৈশাখী—মিষ্টি হেসে বলছে, “চা খাব?”
সর্বত্র প্রবল বৃষ্টি নামল। সেতুতে ভেজা আলো নেমে এল। মনে হল, অন্ধকার সর্পিল স্নায়ুর সিঁড়ি—আজ ইতিহাস থেকে নেমে আবার বাড়ির ভেতর উঠে এল।
অনি তাকিয়ে রইল। সুইটি কেঁদে ভাসাল, “আমি? গৃহরক্ষিকা?” রবিবাবুর চোখ বন্ধ হয়ে গেছিল; একফোঁটা জল গড়িয়ে পার্শ্বে পড়ল—চায়ের বাষ্পের রং নরম কালির মতো হয়ে উঠল।
স্পনসররা নাক কুঁচকে বলল, “পাবলিসিটি!”
সুবল নামে এক কিউরেটর—যার প্রদর্শনী চলছিল অদৃশ্যের জাদুঘর নামে—দূর থেকে ছবি তুলল—ক্যাপশন দিল, “শহর আজ একটু বেশি মানুষ হল।”
সেতুর ওপর দাঁড়িয়ে এক ছোট্ট অনি বাঁশি বাজাল—সুরটা খুব দূরের, পুরোনো—বৃষ্টির ধারার। নীচে জল, ওপরে আকাশ। মাঝখানে বাড়ি। আংটি ধীরে ধীরে একবার ক্ষীণ নীল হল—তারপর একদম নিভেই গেল। নিভে গিয়ে থেকে গেল কেমন এক বিভূতির আলো।
~~000~~

No comments:
Post a Comment