প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

বর্ষার দিন আর খিচুড়ির গল্প | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
বর্ষার দিন আর খিচুড়ির গল্প

"ওরে, বেশি পড়লে যে মানুষ গাধা হয়! তোর বাপ, ঠাকুরদাকে দেখলাম, এখন তোকে দেখছি। ভালো লাগলে বলে দে। মাঝেমধ্যে সময় কাটাও, একসঙ্গে পড়াশোনা করো, দেখ, হয়ে যাবে প্রেমটা। আমার পুতি হয়ে যে তুই এত বোকা, কী করে হলি?"

 
দিল্লিতে অবশেষে বৃষ্টি এল। অত্রি আজ শ্রেয়াকে নেমন্তন্ন করেছে। মারাঠি মেয়েটা বাঙালি ভোগের খিচুড়ি কোনোদিনও খায়নি। দেখা যাক, যদি ভালো লাগে! দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজনেই সোশিওলজি নিয়ে পিএইচডি করছে। অত্রির মনে একটু ভালো লাগা আছে, একটু সাহসী, একটু খেপি মেয়েটাকে নিয়ে।
অত্রির রান্না বলতে ওই ভাত, ডাল, তরকারি বা ভাজা। ইউটিউবের সাহায্য নেওয়াই যায়, ইচ্ছে করে না আর রান্না করতে। তবে আজ ইউটিউব তো একেবারেই নয়। অত্রি আম্মাকে ভিডিও কলে নিয়ে রান্নাটা সারবে।
আম্মা হল বাবার ঠাম্মা। নব্বইয়ের কোঠায় বয়স, তবে শরীর, মাথা এখনও সজাগ। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির বউ ছিলেন সুহাসিনী। সেই বাড়িটা এখনও আছে, তবে বাকি শরিকদের মধ্যে ভাগ হয়ে অনেকটা আধুনিক ফ্ল্যাটের মতো হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য দুঃখ নেই সুহাসিনীর। ছেলে, বউ, নাতি, নাতবউ আর পুতি নিয়ে দিব্যি আছেন। একটাই সাধ—যদি একশো ছুঁতে পারেন!
নাতি অর্ক, অত্রির বাবা, ফোনটা ঠিক করে দিলেন।
কলকাতায় নিম্নচাপ আর বর্ষার বৃষ্টি। বড়ঘরে বসে আম্মা, জানলার ধারে। অত্রি দেখছে, আমগাছের পাতাগুলো স্নান করেছে। তবে দিল্লির মতো মুষলধারে বৃষ্টিটা নেই কলকাতায়। শ্রেয়াটা জানো ঠিক সময় আসে!
-হাই, আম্মা! তুমি রেডি তো?
-ওরে বাবা! অত্রি বাবু দেখি আজ রাঁধুনি! তা হ্যাঁ রে, সব গুছিয়ে রেখেছিস?
-একদম। এই তো দেখো—গোবিন্দভোগ চাল, সোনামুগ ডাল, আদা বাটা, কিশমিশ, কাজু, নুন, মিষ্টি, হলুদ, জিরের গুঁড়ো, ধনের গুঁড়ো, ঘি, গরম মশলা আর ডেসিকেটেড কোকোনাট।
-রাম রাম! কেন, নারকেল পেলে না? যাহ্, যাহ্! তোর রান্না খেয়ে যদি শ্রেয়া না বলে দেয়?
সুহাসিনী দেখেন, তাঁর পুতি বাবুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। তির ঠিক জায়গায় লেগেছে। পথে এসো বাবা!
-আম্মা, প্লিজ স্টার্ট করো। দেরি হয়ে যাবে। শ্রেয়া এসে গেলে বাজে হবে।
মুড অফ হয়ে গেছে অত্রির।
-ডালটা আগে গরম কড়াইতে লাল করে ভাজ। তারপর অন্য কড়াইতে সর্ষের তেলে ফোড়ন দে গোটা জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, থেঁতো করা গরম মশলা...
রান্না চলতে থাকে। অত্রির এক কামরার ভাড়ার ঘরে ম-ম করতে থাকে সেই ভোগের খিচুড়ির গন্ধ... আহ!
সুহাসিনী দেখেন, এতক্ষণে পুতি বাবুর মুখে হাসি এসেছে।
-হ্যাঁ রে, মেয়েটাকে শুধু খিচুড়ি খাওয়াবি?
-না গো, পমফ্রেট ফ্রাই করব। শ্রেয়া শিখিয়েছে।
লাজুক মুখে বলে অত্রি।
-হরি হে দীনবন্ধু! এই করতে তুমি দিল্লি গেছ? ওই বর্গীর মেয়ে এল বলে গিরিশ পার্কে, তোর বাপ-মাকে বলছি আমি, দাঁড়া...
-আম্মা, প্লিজ না। শুধু একটা ভালো লাগা। একসঙ্গে থাকাটা সারাজীবন... ভাবতেই পারছি না। ধুস!
-এই জন্য এত পড়াশোনা করতে নেই।
বাচ্চাদের মতো হাসতে হাসতে সুহাসিনী বলেন,
-ওরে, বেশি পড়লে যে মানুষ গাধা হয়! তোর বাপ, ঠাকুরদাকে দেখলাম, এখন তোকে দেখছি। ভালো লাগলে বলে দে। মাঝেমধ্যে সময় কাটাও, একসঙ্গে পড়াশোনা করো, দেখ, হয়ে যাবে প্রেমটা। আমার পুতি হয়ে যে তুই এত বোকা, কী করে হলি?
-আচ্ছা! বোকা? তুমি কটা প্রেম করেছ শুনি?
-আ গেল যা! করেছি রে, করেছি তোর বড়দাদুর সঙ্গে। তবে তোকে একটা চুপিচুপি কথা বলি—আমার না, তোর বড়দাদুর এক বন্ধুকে খুব ভালো লাগত রে! পুরো পাঠানদের মতো দেখতে। তোর বড়দাদু তো নরমসরম, প্রমথেশ বড়ুয়ার মতো চেহারার মানুষ। ও আমার ঠিক ভালো লাগত না। বাড়িতে এলেই ছুটে যেতাম চা নিয়ে। তখন তোর দাদু হয়নি, তবে মেয়েটা হয়ে গেছে। ভাগ্যিস পর্দা প্রথা ছিল না, ঘোমটা ছিল, তবে কপাল ছুঁয়ে রাখতাম। আসলে তোর বড়দাদু তো উকিল ছিল, সাহেবদের সঙ্গে ওঠাবসা, তাই ওই সব নিয়মটিয়ম উড়িয়ে দিয়েছিল। তো একদিন খুব, খুব বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে কাক হয়ে তোর বড়দাদুর সেই বন্ধু এসেছেন। আমার ‘তিনি’ তো শুকনো জামাকাপড়, তোয়ালে যা লাগবে, বন্ধুকে দিয়ে আমাকে বলল, ‘চা দাও গো, নীরেনকে।’ আমি তো এই ডাকটারই অপেক্ষায় বসে। চা নিয়ে ছুট্টে গেছি...
হি-হি করে হাসতেই থাকেন সুহাসিনী।
-মানে?
অত্রি জিজ্ঞেস করে,
-ছুট্টে গিয়ে কী করলে, আম্মা?
কিন্তু সুহাসিনী এখন জানলা দিয়ে বৃষ্টি দেখছেন। নাকি সেই ঘর? চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন বছর উনিশের সুহাসিনী—পায়ে আলতা, কমলা রঙের ঢাকাই শাড়ি, কপালে সিঁদুরের টিপ আর ঘন চুলের মাঝে পথ করে নিয়েছে সিঁদুরের দাগ—এয়োস্ত্রী মানুষের চিহ্ন।
বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। সব রক্ত জমা হয়েছে মুখে। তবু তাকাতে ইচ্ছে করছে। এই অনুভূতি তো স্বামীর জন্য হয় না।
সুহাসিনী কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আর নীরেন—সে কি দেখেছিল ভালো করে সুহাসিনীকে? দেখেছিল হয়তো...
-ও আম্মা, আম্মা গো... বাকিটা শেষ করো। কী করলে তারপর?
কৌতূহল চাপা অসম্ভব। শ্রেয়া চলে আসবে, সেটাও এখন মনে পড়ছে না অত্রির।
-বলি, এত পড়াশোনা করে কী গাধা হলি? এটাও বুঝলি না? তোর বড়দাদুর সঙ্গে আমার নির্ভরতার, বিশ্বাসের সম্পর্ক রে। দুদিনের মোহে সংসার ভাসিয়ে কী আমি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর রোহিণী হতাম?
-বড়ি আম্মা!
আলতো করে কাঁধে হাত রাখে শ্রেয়া অত্রির।
প্রায় ছয় মাস হল, একশোর ধাপে পা রাখার বহু আগে বুড়িটা চলে গেছে। অত্রি মাঝেমধ্যে ভিডিও রেকর্ডিংটা দেখে। এত মজার, সাহসী, বুদ্ধিমতী নারী খুব কমই দেখেছে।
শ্রেয়ার হাতটা চেপে ধরে অত্রি বলে,
-ক্যা করুঁ, শ্রেয়া? ভুল হি নেহি পা রাহা হুঁ।
-তাহলে ভুলিস না,
শ্রেয়া খুব মিষ্টি করে ভাঙা বাংলায় বলল। অত্রির কিন্তু মারাঠি এখনও শেখা হল না।
সুহাসিনী এখন দিল্লির অত্রির এক কামরার ফ্ল্যাটে উপস্থিত থাকলে হয়তো বলে বসতেন—
-আমার পুতি বউ তাহলে শ্রেয়াই হচ্ছে তো? সেই বর্গীর মেয়ে আসছে বাড়িতে, বলেছিলাম আমি। মনে আছে, পুতি বাবু? হি-হি-হি...
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)