বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ছোটগল্প/৪র্থ
বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
বর্ষার দিন আর খিচুড়ির গল্প
নারী না পুরুষ
ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
বর্ষার দিন আর খিচুড়ির গল্প
"ওরে, বেশি পড়লে যে মানুষ গাধা হয়! তোর বাপ, ঠাকুরদাকে দেখলাম, এখন তোকে দেখছি। ভালো লাগলে বলে দে। মাঝেমধ্যে সময় কাটাও, একসঙ্গে পড়াশোনা করো, দেখ, হয়ে যাবে প্রেমটা। আমার পুতি হয়ে যে তুই এত বোকা, কী করে হলি?"
অত্রির রান্না বলতে ওই ভাত, ডাল, তরকারি বা ভাজা। ইউটিউবের সাহায্য নেওয়াই যায়, ইচ্ছে করে না আর রান্না করতে। তবে আজ ইউটিউব তো একেবারেই নয়। অত্রি আম্মাকে ভিডিও কলে নিয়ে রান্নাটা সারবে।
আম্মা হল বাবার ঠাম্মা। নব্বইয়ের কোঠায় বয়স, তবে শরীর, মাথা এখনও সজাগ। উত্তর কলকাতার বনেদি বাড়ির বউ ছিলেন সুহাসিনী। সেই বাড়িটা এখনও আছে, তবে বাকি শরিকদের মধ্যে ভাগ হয়ে অনেকটা আধুনিক ফ্ল্যাটের মতো হয়ে গেছে। তাতে অবশ্য দুঃখ নেই সুহাসিনীর। ছেলে, বউ, নাতি, নাতবউ আর পুতি নিয়ে দিব্যি আছেন। একটাই সাধ—যদি একশো ছুঁতে পারেন!
নাতি অর্ক, অত্রির বাবা, ফোনটা ঠিক করে দিলেন।
কলকাতায় নিম্নচাপ আর বর্ষার বৃষ্টি। বড়ঘরে বসে আম্মা, জানলার ধারে। অত্রি দেখছে, আমগাছের পাতাগুলো স্নান করেছে। তবে দিল্লির মতো মুষলধারে বৃষ্টিটা নেই কলকাতায়। শ্রেয়াটা জানো ঠিক সময় আসে!
-হাই, আম্মা! তুমি রেডি তো?
-রাম রাম! কেন, নারকেল পেলে না? যাহ্, যাহ্! তোর রান্না খেয়ে যদি শ্রেয়া না বলে দেয়?
-আম্মা, প্লিজ স্টার্ট করো। দেরি হয়ে যাবে। শ্রেয়া এসে গেলে বাজে হবে।
মুড অফ হয়ে গেছে অত্রির।
-ডালটা আগে গরম কড়াইতে লাল করে ভাজ। তারপর অন্য কড়াইতে সর্ষের তেলে ফোড়ন দে গোটা জিরে, তেজপাতা, শুকনো লঙ্কা, থেঁতো করা গরম মশলা...
রান্না চলতে থাকে। অত্রির এক কামরার ভাড়ার ঘরে ম-ম করতে থাকে সেই ভোগের খিচুড়ির গন্ধ... আহ!
সুহাসিনী দেখেন, এতক্ষণে পুতি বাবুর মুখে হাসি এসেছে।
-হ্যাঁ রে, মেয়েটাকে শুধু খিচুড়ি খাওয়াবি?
লাজুক মুখে বলে অত্রি।
-হরি হে দীনবন্ধু! এই করতে তুমি দিল্লি গেছ? ওই বর্গীর মেয়ে এল বলে গিরিশ পার্কে, তোর বাপ-মাকে বলছি আমি, দাঁড়া...
-আম্মা, প্লিজ না। শুধু একটা ভালো লাগা। একসঙ্গে থাকাটা সারাজীবন... ভাবতেই পারছি না। ধুস!
-এই জন্য এত পড়াশোনা করতে নেই।
বাচ্চাদের মতো হাসতে হাসতে সুহাসিনী বলেন,
হি-হি করে হাসতেই থাকেন সুহাসিনী।
-মানে?
বুকের মধ্যে হাতুড়ি পেটাচ্ছে। সব রক্ত জমা হয়েছে মুখে। তবু তাকাতে ইচ্ছে করছে। এই অনুভূতি তো স্বামীর জন্য হয় না।
সুহাসিনী কাপ হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
আর নীরেন—সে কি দেখেছিল ভালো করে সুহাসিনীকে? দেখেছিল হয়তো...
-ও আম্মা, আম্মা গো... বাকিটা শেষ করো। কী করলে তারপর?
-বলি, এত পড়াশোনা করে কী গাধা হলি? এটাও বুঝলি না? তোর বড়দাদুর সঙ্গে আমার নির্ভরতার, বিশ্বাসের সম্পর্ক রে। দুদিনের মোহে সংসার ভাসিয়ে কী আমি ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’-এর রোহিণী হতাম?
আলতো করে কাঁধে হাত রাখে শ্রেয়া অত্রির।
প্রায় ছয় মাস হল, একশোর ধাপে পা রাখার বহু আগে বুড়িটা চলে গেছে। অত্রি মাঝেমধ্যে ভিডিও রেকর্ডিংটা দেখে। এত মজার, সাহসী, বুদ্ধিমতী নারী খুব কমই দেখেছে।
শ্রেয়ার হাতটা চেপে ধরে অত্রি বলে,
-তাহলে ভুলিস না,
সুহাসিনী এখন দিল্লির অত্রির এক কামরার ফ্ল্যাটে উপস্থিত থাকলে হয়তো বলে বসতেন—
-আমার পুতি বউ তাহলে শ্রেয়াই হচ্ছে তো? সেই বর্গীর মেয়ে আসছে বাড়িতে, বলেছিলাম আমি। মনে আছে, পুতি বাবু? হি-হি-হি...
~~000~~

No comments:
Post a Comment