বাতায়ন/নারী না পুরুষ/ভ্রমণ/৪র্থ
বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
ভ্রমণ
অদিতি চ্যাটার্জি
আড়ংঘাটার শতাব্দীপ্রাচীন যুগল কিশোর মন্দির ও মেলা
"নিম্বার্ক সম্প্রদায়ের হিন্দিভাষী মহন্ত গঙ্গারাম দাস বৃন্দাবন থেকে কষ্টিপাথরে নির্মিত ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কিশোর রূপের বিগ্রহ নিয়ে বর্ধমান জেলার সমুদ্রগড়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাংলায় বর্গিদের উপদ্রব শুরু হলে তিনি সেই বিগ্রহ নিয়ে আড়ংঘাটায় চলে আসেন।"
সোনার সাজে যুগল কিশোর
নদিয়া
জেলার ধানতলা থানার অন্তর্গত একটি মফস্বল শহর আড়ংঘাটা। শিয়ালদহ–গেদে রেলপথের
আড়ংঘাটা স্টেশনের পাশেই গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন জনপদ। একসময় আড়ংঘাটা ছিল প্রায়
জনমানবহীন, জঙ্গলঘেরা একটি
গ্রাম। চূর্ণী নদীর তীরে অবস্থিত এই অঞ্চলে তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল
জলপথ। স্থলপথে পশ্চিম দিকে বীরনগরে পৌঁছে সেখান থেকে কৃষ্ণনগর অথবা রানাঘাট হয়ে
অন্যত্র যেতে হতো।
যুগল কিশোরের সোনার সাজ-- জামাই ষষ্ঠী বা জৈষ্ঠ মাসে এক মাস ধরে চলা মেলায় পরানো হয়
পরবর্তীকালে
ব্রিটিশ আমলে রেলপথ স্থাপিত হলে আড়ংঘাটায় রেলস্টেশন নির্মিত হয়। এর ফলে এই
প্রাচীন জনপদের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগ অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
চূর্ণী
নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত আড়ংঘাটার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ শতাব্দীপ্রাচীন যুগল
কিশোর মন্দির। রাধা ও কৃষ্ণের কিশোর রূপের বিগ্রহকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই
সুবৃহৎ দালান মন্দিরের স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য সত্যিই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দু’টি সারিতে
পাঁচটি করে ফুল-কাটা খিলান—এমন বৃহৎ দালানযুক্ত মন্দির পশ্চিমবঙ্গে বিরল বলেই মনে
হয়।
যুগল কিশোরের প্রতিষ্ঠার কাহিনি
কথিত
আছে, নিম্বার্ক
সম্প্রদায়ের হিন্দিভাষী মহন্ত গঙ্গারাম দাস বৃন্দাবন থেকে কষ্টিপাথরে নির্মিত
ভগবান শ্রীকৃষ্ণের কিশোর রূপের বিগ্রহ নিয়ে বর্ধমান জেলার সমুদ্রগড়ে প্রতিষ্ঠা
করেছিলেন। বাংলায় বর্গিদের উপদ্রব শুরু হলে তিনি সেই বিগ্রহ নিয়ে আড়ংঘাটায় চলে
আসেন।
আড়ংঘাটায়
তাঁর স্বদেশবাসী ব্যবসায়ী রামপ্রসাদ পাঁড়ের একটি গোপীনাথ জিউর বিগ্রহ ছিল। তার
পাশেই গঙ্গারাম একটি চালাঘর নির্মাণ করে শ্রীকৃষ্ণের কিশোর বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন
এবং নিত্যপূজার ব্যবস্থা করেন। সেই সময় কেবল শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহই পূজিত হতো।
পরবর্তীকালে
নদিয়ার রাজা মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নাদেশ পেয়ে কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির মাটির নিচে
একটি ধাতুনির্মিত রাধিকার মূর্তি পান। কথিত আছে, ১৭২৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র সেই রাধিকা
মূর্তিটি শ্রীকৃষ্ণের বাম পাশে প্রতিষ্ঠা করেন এবং মন্দিরের আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠা
করেন। তখন থেকেই রাধাকৃষ্ণের এই যুগল বিগ্রহ ‘যুগল কিশোর’ নামে পরিচিত হয়।
ভগবানের
সেবা-পূজার জন্য মহারাজা ১২৫ বিঘা নিষ্কর জমি দান করেছিলেন বলেও জানা যায়।
বিবর্ণ ঐতিহ্যের সাক্ষী
সময়ের
সঙ্গে মন্দিরের কারুকার্য অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে এসেছে। তবুও মন্দিরের দুই পাশের
স্তম্ভে দশাবতারের চিত্রিত অলংকরণের নিদর্শন এখনও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পুরনো
স্থাপত্যের গায়ে সময়ের ছাপ পড়লেও তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব একটুও কমেনি।
যুগল কিশোরের মন্দির গাত্র
মন্দিরের
গর্ভগৃহে পাঁচটি পৃথক কক্ষে গোপীনাথ, রাধাবল্লভ, যুগল কিশোর, কালাচাঁদ ও শ্যামচাঁদের
বিগ্রহ পূজিত হন। তবে বর্তমানে জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে মেলা চলা এবং দেখাশোনার লোকের
অভাবের কারণে আমাদের যাওয়ার সময় কেবল যুগল কিশোর ও কালাচাঁদের কক্ষ খোলা ছিল।
কালাচাঁদের মন্দিরটা এখন একমাত্র খোলা থাকে
মেলা
চলাকালীন আমাদের সৌভাগ্য হয়েছিল সোনার সাজে যুগল কিশোরকে দর্শন করার। সেই দৃশ্য
মন্দিরের প্রাচীন আবহের সঙ্গে যেন এক অন্যরকম আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য তৈরি করেছিল।
সিদ্ধ বকুলের ছায়ায়
মন্দিরের
পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়েছে চূর্ণী নদী। নদীর ধারে রয়েছে শানবাঁধানো একটি
প্রাচীন ঘাট। কথিত আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র
রাধিকার বিগ্রহ নিয়ে বজরায় করে এসে এই ঘাটেই নেমেছিলেন।
মন্দির
প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি প্রাচীন বকুলগাছ। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই গাছের নীচেই
পণ্ডিত-পুরোহিতদের দিয়ে মহারাজা মহাসাড়ম্বরে পূজা-অর্চনা করিয়ে কিশোর শ্রীকৃষ্ণ
ও কিশোরী রাধিকার মিলন ঘটিয়েছিলেন। সেই থেকেই প্রাচীন বকুলগাছটি ‘সিদ্ধ বকুল’ বা
‘কল্পতরু’ হিসেবে পরিচিত। এখনও অনেকে মানত করে গাছের ডালে ঢিল বেঁধে রাখেন।
সিদ্ধ বকুল গাছ, মনস্ককামনা জানিয়ে মানুষজন ঢিল বাঁধেন
মন্দির
প্রাঙ্গণটি বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। চোখে পড়ে গোশালা। মেলা চলাকালীন দূরদূরান্ত
থেকে বাউল ও বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে আসেন। তাঁদের থাকার জন্য অতিথিশালার ব্যবস্থাও
রয়েছে। এমনকি সারা বছর অনেক বয়স্ক সাধু ও বৈষ্ণব এখানে থাকেন বলে জানা যায়।
চূর্ণী
নদী বর্তমানে তার নাব্যতা অনেকটাই হারিয়েছে। নদীর জল ও প্রাচীন ঘাটের
পরিচ্ছন্নতার দিকটিও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। তবু ভক্ত-পুণ্যার্থীদের অনেককেই নদীতে
স্নান করতে দেখা যায়।
সেই চূর্ণী নদী, শ্রী রাধিকা কে নিয়ে মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র এসেছিলেন । বর্তমানে জল অপরিষ্কার হলেও ভক্তরা স্নান করেন এখনো
যুগল কিশোরের মেলা
কথিত
আছে, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রই
যুগল কিশোরের মিলন উপলক্ষে এই মেলার সূচনা করেছিলেন। মেলাটি ‘জামাই ষষ্ঠীর মেলা’
নামেও পরিচিত। জামাই ষষ্ঠীর তিথিতে মেলা শুরু হওয়ার কারণেই এমন নামকরণ বলে মনে
করা হয়।
‘যুগল মেলা’ বা ‘যুগল কিশোরের
মেলা’ দেখতে দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন। বিশেষত মহিলাদের মধ্যে একটি প্রচলিত
বিশ্বাস রয়েছে—জ্যৈষ্ঠ মাসে যুগল কিশোরের দর্শন বা পূজা করলে বৈধব্যের যন্ত্রণা
ভোগ করতে হয় না। অবশ্য এটি লোকবিশ্বাস, এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
মেলা
চলাকালীন রাতে বসে বাউল গানের আসর। ধর্মীয় আবহের সঙ্গে লোকসংস্কৃতির এই মেলবন্ধন
মেলার অন্যতম আকর্ষণ।
বর্তমানে
মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে মেলা ও উৎসবের আয়োজন হয়, তাতে আশপাশের রানাঘাট, বীরনগর,
বগুলা, কৃষ্ণনগর, বাদকুল্লা, চাকদহ, নৈহাটি এমনকি কলকাতা থেকেও
মানুষ আসেন।
মেলা
মেলায়
কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল, ঘর-গৃহস্থালির
সামগ্রী, সাজগোজের দোকান
ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের খাবারের স্টল দেখা যায়। বিখ্যাত নিরামিষ মথুরা কেকের
পাশাপাশি থাকে নানা ধরনের দোকান। শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে ইলেকট্রনিক নাগরদোলা
এবং বিভিন্ন ধরনের রাইড।
কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল
‘আড়ংঘাটা’
নামের সঙ্গে মেলার যোগ
শোনা
যায়, আড়ংঘাটা নামটির
সঙ্গে এই মেলারও একটি যোগ রয়েছে। ‘আড়ং’ শব্দের অর্থ হাট, বাজার বা উৎসবের সঙ্গে যুক্ত সমাবেশ। সেই সূত্রেই এই জনপদের
নাম ‘আড়ংঘাটা’ হয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। তবে নামটির উৎপত্তি নিয়ে ভিন্ন মতও
রয়েছে।
মেলা
তার নিজস্ব জৌলুস নিয়ে প্রতি বছর ফিরে আসে। কিন্তু মেলার চেনা কোলাহলের আড়ালে
দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন মন্দিরটির দিকে তাকালে মনে হয়, ঐতিহ্য সংরক্ষণে আরও যত্নবান হওয়া জরুরি। স্থাপত্যের
কারুকার্য, প্রাচীন ঘাট, নদী ও মন্দির-সংলগ্ন ঐতিহাসিক
নিদর্শনগুলির যথাযথ সংরক্ষণ হলে আড়ংঘাটা নিঃসন্দেহে আরও গুরুত্বপূর্ণ
ঐতিহ্য-ভ্রমণকেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
কীভাবে যাবেন
সারা
বছরই যুগল কিশোর মন্দিরে দর্শন করা যায়। তবে জ্যৈষ্ঠ মাস জুড়ে এখানে মেলা বসে, তাই মেলার সময় গেলে একসঙ্গে
মন্দির দর্শন ও উৎসবের আবহ উপভোগ করা যায়।
শিয়ালদহ
থেকে গেদে লোকাল ট্রেনে আড়ংঘাটা স্টেশনে নামা যায়। স্টেশন থেকে মন্দিরে যাওয়ার
জন্য টোটো পাওয়া যায়; চাইলে হেঁটেও যাওয়া
সম্ভব। এছাড়া রানাঘাট থেকে বাস বা অটোতেও আড়ংঘাটা যাওয়া যায়। কৃষ্ণনগর থেকেও
বাসযোগে আড়ংঘাটা পৌঁছনো যায়।
চূর্ণী
নদীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন মন্দির, সিদ্ধ বকুলের ছায়া, সোনার সাজে যুগল কিশোর, বাউলের গান আর জ্যৈষ্ঠের মেলার ভিড়—সব মিলিয়ে আড়ংঘাটা
যেন ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও বাংলার
লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত ক্যানভাস।
~~000~~
No comments:
Post a Comment