বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১২তম সংখ্যা/১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৩য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৩য় পর্ব]
"সুন্দরী এমন ব্যবহারে একটু হতভম্ব হয়ে যায় প্রথমে! কেউ তো তাদের স্পর্শ করে না। সেও তো কারও মা ছিল। সন্তানের কিছু হলে মা যে কত কষ্ট পায়, তা বোঝে।"
“কী বলছিল?”
“আঃ! বলো তো।”
“ওর মা বলছিল, ওই যে বেদের দল এসেছে। ওই বেদেনিরা খুব ভালো মাদুলি দেয়। সোমেনের ছেলের তো কদিন ধরে জ্বর। অসুদেও কিচু হয়নি। অই বেদেনির তেকে মাদুলি নিয়ে বাঁদতি ছেলে এক্কেরে চাঙ্গা।”
সুধা ঝাঁঝিয়ে উঠবে কী, সুন্দরী বেদেনির দল সুধার বাড়ির উঠোনে হাঁক দেয়,
সুধা মাটির দাওয়া থেকে উঠোনে নামে। সুধার কাপড়ের খুঁট ধরে বিভুও নেমে আসে। বিভুকে দেখে সুন্দরী চমকে ওঠে। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে গান ধরে,
গান শুনে বিভুর ঠাকুমা রেকাবে করে চাল, আলু নিয়ে সুন্দরীর ঝুলিতে ঢালতে ঢালতে বলে,
সুধা হঠাৎ খপ করে সুন্দরীর হাত ধরে কাতর স্বরে বলে,
সুন্দরী এমন ব্যবহারে একটু হতভম্ব হয়ে যায় প্রথমে! কেউ তো তাদের স্পর্শ করে না। সেও তো কারও মা ছিল। সন্তানের কিছু হলে মা যে কত কষ্ট পায়, তা বোঝে।
“তুমার ছেলের জন্যি মাদুলি দিব। উ মা মনসার কৃপায় ভালো হয়ে যাবেক। একন তো মর কাচে আর মাদুলি লাই। তুমাকে কালই মাদুলি করে এনি দিব।”
মায়ের পাশে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিভুকে দেখে হেসে ওঠে সুন্দরী,
তাঁবুতে ফিরে সুন্দরী দেখে মাইনকা শুয়ে আছে,
মাইনকা চুপ করে শুয়ে ছিল। মাদুলি তৈরির কথা শুনে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে,
সুন্দরী মাইনকা বেদের চোখে কী যে দেখতে পেল, ভয়ে শিউরে উঠল!
“তু কী করতি চাস!”
“মুই উড়ান চণ্ডী মাদুলি বেইনে দুব।”
“না, ই কাজ তুই করিস লাই।”
“সুন্দরী, তুর সখ হয় লা যে মোদের একটো ব্যাটা থাকুক?”
বেদে পরিবারের সবাই হতবাক! তবু সরদারের কথায় তারা সব গোছগাছ করতে থাকে। মাইনকা মাদুলির জোগাড়যন্ত্র করতে শুরু করে। এই উড়ান চণ্ডী মাদুলি তৈরি সে তার ঠাকুরদার থেকে শিখেছিল। এই মাদুলি তৈরি এখন সে ছাড়া তাদের বেদে পরিবারে আর কেউ জানে না। বড় ভয়ংকর এই মাদুলির গুণাগুণ। জীবনে একবারই মাদুলি বানানো যায়। মাইনকা নিজেও এর গুণাগুণ চোখে দেখেনি। তার ঠাকুরদা বলেছিল, এই মাদুলি নাকি যেখানেই বাঁধা হোক, মন্ত্র পড়তে শুরু করলেই কাজ দিতে শুরু করবে।
মাইনকা সন্ধের পূর্ব মুহূর্তে গিয়ে পৌঁছায় মাতলা নদীর ডান তীরে। জায়গাটা ভীষণ নিস্তব্ধ। বাতাস এখানে কেমন ভারী। একপাশে বিশাল ভাগাড়। গরু, মহিষ, পচা ছাগলের হাড়গোড়, দেহাবশেষ। এই সন্ধের মুহূর্তেও কয়েকটি শকুন একটা পচা ছাগলের দেহাবশেষ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। চারদিক কী দুর্বিষহ, পচা দুর্গন্ধ! মাইনকাকে দেখে শকুনগুলো ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। মাইনকা অত্যন্ত সন্তর্পণে শকুনের পড়ে থাকা পালক কুড়িয়ে নিল। তারপর ভাগাড়ের পাশে নির্জন শ্মশানের দিকে হনহন করে এগিয়ে যায়।
শ্মশানে তখন এক ছোট ছেলের দেহ পুড়ছে। শ্মশানের পাশের বাইনগাছের আড়াল থেকে মাইনকা লক্ষ্য করতে থাকে। কয়েকজন লোক চিতার পাশে বসেই মদ খাচ্ছে। অদূরে একজন যুবক বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সেই-ই হয়তো হতভাগ্য পিতা। তাকে একজন বয়স্ক লোক সান্ত্বনার স্বরে বলছে—
“তুই এমন করে যদি কাঁদিস, ওর মাকে কে সামলাবে? ছোট ব্যাটাটাকে তো মানুষ করতে হবে। এমন ভেঙে পড়লে চলবে?”
নির্জন ভাগাড়ে তখন মৃত পশুর দেহ নিয়ে কয়েকটি শিয়াল নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করছে। মাইনকা ভাগাড়ের দক্ষিণ দিকে একটি জায়গা নির্বাচন করে। তারপর কাঁধের ঝোলাটা নামিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে উবু হয়ে বসে। ঝোলা থেকে মেটে সিঁদুর, ভাঙা শাঁখার টুকরো, চারটে মোমবাতি, একটি ছোট্ট ফাঁকা মাদুলি ও কালো ঘুনসির সুতো বের করে। সামনে সিঁদুর ছড়িয়ে একটি বর্গাকার ঘর বানায়। তারপর সেই ঘরের চার কোণে চারটে মোমবাতি জ্বালায়। ঘরের মাঝে চিতাভস্ম দিয়ে ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীর মুখাকৃতি আঁকে। তারপর অদ্ভুত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে!
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment