প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

মাইনকা বেদের মাদুলি [৩য় পর্ব] | রাখী সরদার

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১২তম সংখ্যা/১২ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৩য় পর্ব]

"সুন্দরী এমন ব্যবহারে একটু হতভম্ব হয়ে যায় প্রথমে! কেউ তো তাদের স্পর্শ করে না। সেও তো কারও মা ছিল। সন্তানের কিছু হলে মা যে কত কষ্ট পায়, তা বোঝে।"

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
কথাগুলো বলতে বলতে বুড়ি চুপ করে যায়।
কী বলছিল?”
না, তুই একুনি রাগ করবি শুনে।”
আঃ! বলো তো।
ওর মা বলছিল, ওই যে বেদের দল এসেছে। ওই বেদেনিরা খুব ভালো মাদুলি দেয়। সোমেনের ছেলের তো কদিন ধরে জ্বর। অসুদেও কিচু হয়নি। অই বেদেনির তেকে মাদুলি নিয়ে বাঁদতি ছেলে এক্কেরে চাঙ্গা।”
সুধা ঝাঁঝিয়ে উঠবে কী, সুন্দরী বেদেনির দল সুধার বাড়ির উঠোনে হাঁক দেয়,
মা সকলা, ঘরে আচো? বিষহরির চরণে মাথা রাখি। মা, কিচু চাল, পয়সা দেও।”
সুধা মাটির দাওয়া থেকে উঠোনে নামে। সুধার কাপড়ের খুঁট ধরে বিভুও নেমে আসে। বিভুকে দেখে সুন্দরী চমকে ওঠে। পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে গান ধরে,
নমঃ মাগো বিষহরি, মাগো মুনসা। বাজনা দিব, বলি দিব, দিব মা অজা।”
গান শুনে বিভুর ঠাকুমা রেকাবে করে চাল, আলু নিয়ে সুন্দরীর ঝুলিতে ঢালতে ঢালতে বলে,
বউ, বল না আমার বিভুর কতা।”
সুধা হঠাৎ খপ করে সুন্দরীর হাত ধরে কাতর স্বরে বলে,
মাসি, আমার ছেলেটা জ্বরে খুব ভোগে। তোমরা তো অনেক জলপড়া, তাবিজ, মাদুলি দাও। আমার ছেলেকেও একটা মাদুলি দাও, মাসি। আমার ছেলেটা সুস্থ হয়ে যাক। অনেক ডাক্তার দেখাচ্চি, কিছু তেমন কাজ হচ্ছে নে।”
সুন্দরী এমন ব্যবহারে একটু হতভম্ব হয়ে যায় প্রথমে! কেউ তো তাদের স্পর্শ করে না। সেও তো কারও মা ছিল। সন্তানের কিছু হলে মা যে কত কষ্ট পায়, তা বোঝে।
তুমার ছেলের জন্যি মাদুলি দিব। উ মা মনসার কৃপায় ভালো হয়ে যাবেক। একন তো মর কাচে আর মাদুলি লাই। তুমাকে কালই মাদুলি করে এনি দিব।”
মায়ের পাশে জড়ো হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিভুকে দেখে হেসে ওঠে সুন্দরী,
ভয় কেনে পাও, বাছা। মুই কাল মাদুলি এনি দিব। দেকবে, ইকেবারে সুস্থ।”
তাঁবুতে ফিরে সুন্দরী দেখে মাইনকা শুয়ে আছে,
ইকন শুয়ে আচু! গা ধুয়ে লে, মুই রান্না চাপাই। জানিস, সি বাচ্চা ছেলেটারে, যাকে মোর সুবলার পানা দেকতি, আইজ তার ভিটাতে গান করি আইলুম। ছেলেটর শরিল খারাপ যায়। মুকে ওর মা এই হাত ধরে এককান মাদুলি চাইলে। মাদুলি চিলনি। মুই কাল উর জন্যি ভাল করি বিষহরির মন্ত্র পড়ি মাদুলি করি লে যাব।”
মাইনকা চুপ করে শুয়ে ছিল। মাদুলি তৈরির কথা শুনে তড়াক করে বিছানায় উঠে বসে,
তুকে করতি হবেনি। মুই মাদুলি বেইনে দিব।”
সুন্দরী মাইনকা বেদের চোখে কী যে দেখতে পেল, ভয়ে শিউরে উঠল!
তু কী করতি চাস!”
মুই উড়ান চণ্ডী মাদুলি বেইনে দুব।”
না, ই কাজ তুই করিস লাই।”
সুন্দরী, তুর সখ হয় লা যে মোদের একটো ব্যাটা থাকুক?”
সুন্দরী আর কোনো কথা কয় না। মাইনকা ছুটে তাঁবুর বাইরে বেরিয়ে যায়। চেঁচিয়ে সব বেদে পরিবারের উদ্দেশ্যে বলে,
কাইল দুপুরেই মোরা ইকেন থিকে চলে যাবক। সবাই সব কিচুক গুইচে লে।”
বেদে পরিবারের সবাই হতবাক! তবু সরদারের কথায় তারা সব গোছগাছ করতে থাকে। মাইনকা মাদুলির জোগাড়যন্ত্র করতে শুরু করে। এই উড়ান চণ্ডী মাদুলি তৈরি সে তার ঠাকুরদার থেকে শিখেছিল। এই মাদুলি তৈরি এখন সে ছাড়া তাদের বেদে পরিবারে আর কেউ জানে না। বড় ভয়ংকর এই মাদুলির গুণাগুণ। জীবনে একবারই মাদুলি বানানো যায়। মাইনকা নিজেও এর গুণাগুণ চোখে দেখেনি। তার ঠাকুরদা বলেছিল, এই মাদুলি নাকি যেখানেই বাঁধা হোক, মন্ত্র পড়তে শুরু করলেই কাজ দিতে শুরু করবে।
মাইনকা সন্ধের পূর্ব মুহূর্তে গিয়ে পৌঁছায় মাতলা নদীর ডান তীরে। জায়গাটা ভীষণ নিস্তব্ধ। বাতাস এখানে কেমন ভারী। একপাশে বিশাল ভাগাড়। গরু, মহিষ, পচা ছাগলের হাড়গোড়, দেহাবশেষ। এই সন্ধের মুহূর্তেও কয়েকটি শকুন একটা পচা ছাগলের দেহাবশেষ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে। চারদিক কী দুর্বিষহ, পচা দুর্গন্ধ! মাইনকাকে দেখে শকুনগুলো ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। মাইনকা অত্যন্ত সন্তর্পণে শকুনের পড়ে থাকা পালক কুড়িয়ে নিল। তারপর ভাগাড়ের পাশে নির্জন শ্মশানের দিকে হনহন করে এগিয়ে যায়।
শ্মশানে তখন এক ছোট ছেলের দেহ পুড়ছে। শ্মশানের পাশের বাইনগাছের আড়াল থেকে মাইনকা লক্ষ্য করতে থাকে। কয়েকজন লোক চিতার পাশে বসেই মদ খাচ্ছে। অদূরে একজন যুবক বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সেই-ই হয়তো হতভাগ্য পিতা। তাকে একজন বয়স্ক লোক সান্ত্বনার স্বরে বলছে—
তুই এমন করে যদি কাঁদিস, ওর মাকে কে সামলাবে? ছোট ব্যাটাটাকে তো মানুষ করতে হবে। এমন ভেঙে পড়লে চলবে?”
কিছু পরেই দাহকাজ শেষ করে তারা ফিরে যায়। মাইনকা ধীরে ধীরে সেই চিতাভস্মের কাছে এসে দাঁড়ায়। তখনও চিতার আগুন সম্পূর্ণ নেভেনি। নিভু নিভু আগুনের আভায় তার চোখ ধক করে জ্বলে ওঠে। সন্ধে পেরিয়ে আকাশে তখন গোলাকার চাঁদ উঠেছে। আজ মার্গশীর্ষ পূর্ণিমা। মাইনকা একটা ভাঙা কলসির টুকরো দিয়ে কিছুটা চিতাভস্ম তুলে নেয়। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে অতি দ্রুত পাশের ভাগাড়ের দিকে এগিয়ে যায়।
নির্জন ভাগাড়ে তখন মৃত পশুর দেহ নিয়ে কয়েকটি শিয়াল নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করছে। মাইনকা ভাগাড়ের দক্ষিণ দিকে একটি জায়গা নির্বাচন করে। তারপর কাঁধের ঝোলাটা নামিয়ে পশ্চিম দিকে মুখ করে উবু হয়ে বসে। ঝোলা থেকে মেটে সিঁদুর, ভাঙা শাঁখার টুকরো, চারটে মোমবাতি, একটি ছোট্ট ফাঁকা মাদুলি ও কালো ঘুনসির সুতো বের করে। সামনে সিঁদুর ছড়িয়ে একটি বর্গাকার ঘর বানায়। তারপর সেই ঘরের চার কোণে চারটে মোমবাতি জ্বালায়। ঘরের মাঝে চিতাভস্ম দিয়ে ভয়ঙ্কর একটা প্রাণীর মুখাকৃতি আঁকে। তারপর অদ্ভুত চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে!
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)