বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১তম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[২য় পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[২য় পর্ব]
“কোথাকার কে সে তোর দাদু হল? চল, বাড়ি চল। তুই কাকে বলে এখানে এইচিস! আমরা দুটো লোক খেটে মরছি, আর তুমি যা খুশি করে বেড়াবে? সবে দু’-দিন জ্বর থেকে উঠেছে। আবার রোদে টো টো করে ঘোরা! তোর পিট ভাঙব, বাড়ি চল।”
গাঁয়ের পুরনো মন্দির চত্বরে কয়েকজন ছেলেছোকরা বসে ছিল। তারা হাঁক দেয়,
মাইনকা বেদে খুশি হয়ে সাপ খেলা দেখাতে বসে। সে মা মনসাকে প্রণাম করে সাপের ঝুড়ির ঢাকা খোলে। তাকে ঘিরে বেশ খানিকটা দূরে ছেলেপুলেরা দাঁড়িয়ে পড়ে গোল হয়ে। দেখতে দেখতে ভিড় জমে। মাইনকা খেলা দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখ কাউকে খুঁজে ফেরে। খেলা দেখাতে দেখাতে হঠাৎ তার চোখ চকচক করে ওঠে। ছেলেদের ভিড় ঠেলে বিভু সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে।
মাইনকা দ্বিগুণ উৎসাহে খেলা দেখাতে থাকে,
“কী, খোকা, খেলা ভালো লেগিছে?”
“তুমার নাম কিডা?”
ছেলের দল হিহি করে হাসতে হাসতে বলতে থাকে,
বিভুর চোখমুখ ছলছল করে ওঠে। মাইনকা ছেলের দলকে বকতে থাকে,
এর মধ্যেই একটি দুষ্টু ছেলে বিভুকে এক ধাক্কা দিয়ে ছুট দেয়। মাইনকা বেদে বিভুকে কোনোরকমে মাটিতে পড়ে যাওয়া থেকে ধরে ফেলে। ছেলেটির স্পর্শে মাইনকা বেদের সর্বশরীরে স্নেহের তরঙ্গ খেলে যায়। সেই মুহূর্তে বিভুর মা পাগলিনীর মতো ছুটতে ছুটতে আসছে,
সুধা দেখে এক বেদে তার ছেলের হাত ধরে আছে। চিলের মতো ছোঁ মেরে ছেলের হাত ছিনিয়ে নিয়ে বলে ওঠে,
মাইনকা বেদের কথা সম্পূর্ণ করতে দেয় না সুধা,
“মা, ওই দাদুকে বকচ কেন! নিতাই আমারে ধাক্কা দিলে পড়ে যাচ্ছিলুম যে, তাই…”
সুধা ছেলের গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে দেয়,
সেই সময় দিনু গয়লা দুধ দিয়ে ফিরছিল,
“কাকা, এই ছেলে আমার হাড়মাস চিবিয়ে খেলে। খামারবাড়িতে ধান পিটচি, ওখানেই বসে খেলছিল। একটু পর দেখি, আর নেই। খুঁজতে থাকি। মমতা পিসি বলল, ‘তোর ছেলে সাপ খেলা দেকচে।’ এখানে এসে দেখি, ওই বেদে আমার ছেলের হাত ধরে নিয়ে যাচ্চে!”
“কী, ওর এত বড় সাহস!”
ছেলের দল থেকে একজন বলে ওঠে,
“দেখোদিকি, কী কাণ্ড! যাও, বউমা, বাড়ি যাও। এই যে, কিছু মনে করুনিগো বেদে ভায়া। যাও, তুমি যাও।”
মাইনকা বেদের চোখে জল এসে গিয়েছে। সামান্য হাত ধরেছে বলে বাচ্চাটার এত কথা শুনতে হল!
বিভুরও মন খারাপ। দাদুটা তো বেশ ভালো। তাও কেন মা এমন করে বলল? বিভু কী মনে করে হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে তাকাল। দেখল, দাদুটা তাদের রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছে।
তাঁবুতে ফিরে মাইনকা চুপ করে শুয়ে পড়ল। কিছুতেই সে ছেলেটাকে ভুলতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, মা বিষহরি তার জন্যই তার ছেলেকে আবার এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। ওই বিভু ওর। আর কারও হতে পারে না।
সুধা বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে স্নান করাতে যাবে, কী গায়ে হাত পড়তে দেখে গা গরম। ছুটে শাশুড়িকে বলে,
বিভুর ঠাকুমা তার কপাল ছোঁয়,
ক্রমশ
No comments:
Post a Comment