প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

মাইনকা বেদের মাদুলি [২য় পর্ব] | রাখী সরদার

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১১তম সংখ্যা/০৫ই ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[২য় পর্ব]

কোথাকার কে সে তোর দাদু হল? চল, বাড়ি চল। তুই কাকে বলে এখানে এইচিস! আমরা দুটো লোক খেটে মরছি, আর তুমি যা খুশি করে বেড়াবে? সবে দু’-দিন জ্বর থেকে উঠেছে। আবার রোদে টো টো করে ঘোরা! তোর পিট ভাঙব, বাড়ি চল।”

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
বেদের ডুগডুগির শব্দে পাড়ার ছেলেমেয়েরা মাইনকা বেদের পিছু নেয়। আজ স্কুল ছুটি। সাপ খেলার ডুগডুগির শব্দ বিভুর কানেও যায়। সে বাবা-মাকে কিছু না বলে ছুটতে ছুটতে ছেলেদের দলের সঙ্গে হাঁটতে থাকে।
গাঁয়ের পুরনো মন্দির চত্বরে কয়েকজন ছেলেছোকরা বসে ছিল। তারা হাঁক দেয়,
ও সাপুড়ে, কই, তোমার সাপ খেলে দেখাও দেখি।”
মাইনকা বেদে খুশি হয়ে সাপ খেলা দেখাতে বসে। সে মা মনসাকে প্রণাম করে সাপের ঝুড়ির ঢাকা খোলে। তাকে ঘিরে বেশ খানিকটা দূরে ছেলেপুলেরা দাঁড়িয়ে পড়ে গোল হয়ে। দেখতে দেখতে ভিড় জমে। মাইনকা খেলা দেখাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু তার চোখ কাউকে খুঁজে ফেরে। খেলা দেখাতে দেখাতে হঠাৎ তার চোখ চকচক করে ওঠে। ছেলেদের ভিড় ঠেলে বিভু সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে।
মাইনকা দ্বিগুণ উৎসাহে খেলা দেখাতে থাকে,
এই দেকেন, খোকাবাবুরা, উলুপি ক্যামন রাগ করিতেচে!”
 
সাপটা ফোঁসফোঁস করে উঠলেই লোকজনের ভিড়টা একটু পিছিয়ে যায়। কেউ কেউ খুশি হয়ে দু’-চার টাকা ছুঁড়ে দেয়। মাইনকা খুশি হয়ে তা কুড়িয়ে নেয়। খেলা দেখানো শেষ হয়ে গেলেও কিছু ছেলে দাঁড়িয়ে। তাদের সঙ্গে বিভুও কৌতূহলী চোখে সাপের ঝাঁপিটিকে দেখছে।
কী, খোকা, খেলা ভালো লেগিছে?”
বিভু মাথা নাড়ায়।
তুমার নাম কিডা?”
বিভুর থেকে একটু বড় একটি ছেলে তড়িঘড়ি উত্তর দেয়,
ওর নাম বিভু। রোগে ভুগো বিভু।”
ছেলের দল হিহি করে হাসতে হাসতে বলতে থাকে,
রোগে ভুগো বিভু, খেলে নাকো কভু, রোগে ভুগো বিভু, খেলে নাকো কভু।”
বিভুর চোখমুখ ছলছল করে ওঠে। মাইনকা ছেলের দলকে বকতে থাকে,
হেই, হেই, ওরে এমন বলিস ক্যানেরে! যা যা, সব ঘর যা।”
এর মধ্যেই একটি দুষ্টু ছেলে বিভুকে এক ধাক্কা দিয়ে ছুট দেয়। মাইনকা বেদে বিভুকে কোনোরকমে মাটিতে পড়ে যাওয়া থেকে ধরে ফেলে। ছেলেটির স্পর্শে মাইনকা বেদের সর্বশরীরে স্নেহের তরঙ্গ খেলে যায়। সেই মুহূর্তে বিভুর মা পাগলিনীর মতো ছুটতে ছুটতে আসছে,
বিভু উ-উ, বিভু উ-উ…”
সুধা দেখে এক বেদে তার ছেলের হাত ধরে আছে। চিলের মতো ছোঁ মেরে ছেলের হাত ছিনিয়ে নিয়ে বলে ওঠে,
কী গো বাপু, তুমি! সাপের খেলা দেখাতে এসে ছেলের হাত ধরে কুতায় নিয়ে যাচ্চ?”
মা জননী, মুই তো…”
মাইনকা বেদের কথা সম্পূর্ণ করতে দেয় না সুধা,
চুপ! পথ দেখেন। নাহলি এখুনি লোক ডাকব। তোমাদের মতো বেদেদের আমরা বেশ ভালোই চিনি।”
মা, ওই দাদুকে বকচ কেন! নিতাই আমারে ধাক্কা দিলে পড়ে যাচ্ছিলুম যে, তাই…”
সুধা ছেলের গালে এক থাপ্পড় কষিয়ে দেয়,
কোথাকার কে সে তোর দাদু হল? চল, বাড়ি চল। তুই কাকে বলে এখানে এইচিস! আমরা দুটো লোক খেটে মরছি, আর তুমি যা খুশি করে বেড়াবে? সবে দু’-দিন জ্বর থেকে উঠেছে। আবার রোদে টো টো করে ঘোরা! তোর পিট ভাঙব, বাড়ি চল।”
সেই সময় দিনু গয়লা দুধ দিয়ে ফিরছিল,
কী হয়েছে, বউমা? ছেলেটাকে অমন টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছ যে!”
কাকা, এই ছেলে আমার হাড়মাস চিবিয়ে খেলে। খামারবাড়িতে ধান পিটচি, ওখানেই বসে খেলছিল। একটু পর দেখি, আর নেই। খুঁজতে থাকি। মমতা পিসি বলল, ‘তোর ছেলে সাপ খেলা দেকচে।’ এখানে এসে দেখি, ওই বেদে আমার ছেলের হাত ধরে নিয়ে যাচ্চে!”
কী, ওর এত বড় সাহস!”
ছেলের দল থেকে একজন বলে ওঠে,
গয়লা দাদু, নিতাই বিভুকে ঠ্যালা মেরে ফেলে দিচ্ছিল। এই সাপুড়েটা ধরে নিল যে।”
দেখোদিকি, কী কাণ্ড! যাও, বউমা, বাড়ি যাও। এই যে, কিছু মনে করুনিগো বেদে ভায়া। যাও, তুমি যাও।”
মাইনকা বেদের চোখে জল এসে গিয়েছে। সামান্য হাত ধরেছে বলে বাচ্চাটার এত কথা শুনতে হল!
বিভুরও মন খারাপ। দাদুটা তো বেশ ভালো। তাও কেন মা এমন করে বলল? বিভু কী মনে করে হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরে তাকাল। দেখল, দাদুটা তাদের রাস্তা ধরেই হেঁটে আসছে।
তাঁবুতে ফিরে মাইনকা চুপ করে শুয়ে পড়ল। কিছুতেই সে ছেলেটাকে ভুলতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, মা বিষহরি তার জন্যই তার ছেলেকে আবার এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। ওই বিভু ওর। আর কারও হতে পারে না।
সুধা বাড়িতে গিয়ে ছেলেকে স্নান করাতে যাবে, কী গায়ে হাত পড়তে দেখে গা গরম। ছুটে শাশুড়িকে বলে,
মা, দেখোদিকিন, তোমার নাতির গাটা গরম কিনা। ডাক্তার বলেছে সারতে আরও বেশ কিছুদিন লাগবে। তবু যে মন মানছেনি।”
বিভুর ঠাকুমা তার কপাল ছোঁয়,
হ্যাঁগো বউ, বেশ গরম। তোরা তো শুধুই ডাক্তার-বদ্যি করচিস। একটু ঝাড়ফুঁক করিস না। মাদুলিও দিস না। জানিস, বউ, তিকাই মণ্ডলের মা বলচিল…”
 

ক্রমশ

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)