প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

মাইনকা বেদের মাদুলি [৪র্থ পর্ব] | রাখী সরদার

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৩তম সংখ্যা/১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৪র্থ পর্ব]

"রমেশের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রকাণ্ড ঝড় আছড়ে পড়ল তাদের মাটির ঘরটিতে। সেই ঝড় এক টানে অতবড় বাঁশের আগড়টার দড়ি ছিঁড়ে বাইরে পুব আকাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল! ঝড়ের দাপটে তাদের মাটির ঘরটাই বোধহয় উড়ে যাবে!"

 
পূর্বানুবৃত্তি
 
যখনই পূর্ণিমার চাঁদ মেঘের আড়ালে চলে যায়, সেই মুহূর্তে ভাগাড় থেকে কুড়িয়ে আনা শকুনের পালক মোমবাতির আগুনে পোড়াতে থাকে। আর বিড়বিড় করে এক মন্ত্র পড়তে থাকে। চাঁদ আকাশে দেখা গেলেই চুপ হয়ে যায়। মেঘের আড়ালে ডুবে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে। এভাবে চারটি পালক পুড়িয়ে ঘরের ভিতরে আঁকা ভয়ঙ্কর মূর্তির মুখে ‘বিভূতি’ নামটি উচ্চারণ করে আহুতি দেয়।
তারপর নিজের কোমরের ঘুনসি বের করে। ঘুনসিতে নানান পাথর, শিকড়বাকড় বাঁধা। সেইসবের ভিতর থেকে অতি ক্ষুদ্রাকার একটি হাড়ের টুকরো খুলে নেয়। সেই হাড়ের টুকরোতে সিঁদুর ও চিতাভস্ম লেপে বর্গাকার ঘরের চারপাশে মন্ত্র পড়তে পড়তে প্রদক্ষিণ করায়। তারপর হাড়ের টুকরোটি সেই বীভৎস ছবির মুখাকৃতির কপালে ছুঁইয়ে মাদুলিতে ভরে দেয়। তারপর গলন্ত মোম দিয়ে মাদুলির মুখ আটকে তাতে কালো ঘুনসির সুতো দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে ফেলে।
মাইনকা খুশি খুশি মুখে সেই বর্গাকার ঘরের মাঝে ভাঙা শাঁখার টুকরো ছড়িয়ে তিনবার থুতু ছিটিয়ে উঠে পড়ে। এই অদ্ভুত প্রক্রিয়া সারতে তার বেশ রাত হয়। চারদিক নিস্তব্ধ। ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় মাইনকা নিজেদের তাঁবুর উদ্দেশ্যে হেঁটে যায়।
 
বেদেবহরের সবাই তখন ঘুমিয়ে। একমাত্র সুন্দরী বেদেনি জেগে। ভয়ভয় চোখে একবার বাইরের দিকে তাকায় আর নিজেদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নেয়। কাল সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে। মানুষটা এখনও ফিরছে না। ওই উড়নচণ্ডী মাদুলি বানানো খুব কঠিন কাজ। ভাগাড়ে ওই মাদুলি বানাতে গিয়েই তার দাদা-শ্বশুর মারা গিয়েছিল। এ যে বেদে জীবনের নিয়মবিরুদ্ধ। বিষহরি তাদের রক্ষাকর্ত্রী। সেখানে মায়ামূর্তির সাধনা করার অর্থ নিজের বিপদ ডেকে আনা। সুন্দরীর এমন সন্ত্রস্ত ভাবনার মাঝে মাইনকা বেদে তাঁবুর বাইরে ডাক দেয়,
সুন্দরী, জেইগে আছু?”
সুন্দরী বেদেনি বিস্মিতকণ্ঠে বলে ওঠে,
তুই ফিরলি! মোর যে কী ডর হইছিল!”
লে, শুয়ে পড় দিকি। মোদের ইবার দুঃখ থাকবে লাই। মোরা যে ব্যাটা পাইব।”
বেদেনি বেদের মুখ চেপে ধরে ফিশফিশায়,
চুম মর। দেওয়ালেরও কাইন আছে। চ দিকি, একটুকুন চোক বুইজে লিই।”
বেশ ভোরবেলা মাইনকা বেদে বউকে ডাকতে শুরু করে,
সুন্দরী, উঠ। ভইর হইছে। গা ধুয়ে ই মাদুলি লিয়ে দিয়ে আয় আগে।”
সুন্দরী বেদেনি স্নান করে মাদুলিটা হাতে নিয়ে বিভুদের বাড়িতে পৌঁছায়। সুধা তখন উঠোনে জল ছড়া দিচ্ছে। বেদেনিকে দেখে চমকে ওঠে,
এত্ত সকালবেলা এইচো, মাসি! সূর্য উঠেনি যে একন!”
মোরা আইজ চলে যাচ্চি। তুমার ছেলের ই মাদুলিটো দিতে এলুম। ছেলেকে সাফা কাপড় পইরে আইজ ইটা ডান হাতে সাঁঝের বেলা বিঁদে দিবে।”
সুধার হাতে মাদুলিটা দিয়েই সুন্দরী আর দাঁড়ায় না। সুধা জিজ্ঞেস করে,
মাসি, কত দাম?”
দাম লাগব নি। আসি, মোদের মেলা দূর যেতি হবে।”
সুধা সারাদিন কাজকর্ম করে খামার থেকে ঘরে আসে। ধান সব পেটানো হয়ে যাওয়ায় রমেশ আগড়টা (দরজা) দরজায় লাগানো বাঁশে বেঁধে দেয়। সুধা তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলে প্রণাম করে। ছেলের হাতে মাদুলিটা বাঁধতে গিয়ে তার মনটা কেমন কু ডেকে ওঠে। কী মনে করে মাদুলিটা দরজায় লাগানো বাঁশের আগড়ে বেঁধে রাখে।
আজ তাড়াতাড়ি সব শুয়ে পড়ে। সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম হয়েছে। ছেলেকে কোলের কাছে জড়িয়ে সুধা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই সে একটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শোনে। তার মনে হয়, তাদের বাঁশের দরজা কে যেন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে! দরজায় বাঁধা মাদুলিটা যেন টকটকে সিঁদুরবর্ণ ধারণ করেছে! ভয়ঙ্কর ঝড়ে মাটির ঘরটা দুলে উঠছে! একটা দমকা ঝড় আছড়ে পড়ে দরজায়। সুধা ঘুমের ভিতর চিৎকার করে ওঠে। রমেশ ধড়পড় করে উঠে বসে।
সুধা, কী হয়েছে? স্বপ্ন দেখচিলে?”
সুধা ঘুমন্ত ছেলেকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। দরজার দিকে তার চোখ যায়। মাদুলিটা রক্তবর্ণ হয়ে উঠছে! সে কিছু বলবে কী, মুহূর্তেই শোনা যায় মেঘের গর্জন। সাঁ-সাঁ শব্দ! পৃথিবী যেন আজ ওলটপালট হয়ে যাবে!
রমেশ বেশ চিন্তিত স্বরে বলে ওঠে,
এই অসময়ে ঝড় উটেচে! বৃষ্টি হবে কি! খামারের পলকুটিগুলা সাপটাইতে…”
রমেশের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রকাণ্ড ঝড় আছড়ে পড়ল তাদের মাটির ঘরটিতে। সেই ঝড় এক টানে অতবড় বাঁশের আগড়টার দড়ি ছিঁড়ে বাইরে পুব আকাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল! ঝড়ের দাপটে তাদের মাটির ঘরটাই বোধহয় উড়ে যাবে! রমেশ বউ-ছেলেকে ঘর থেকে টেনে বের করতে করতে চেঁচায়,
মা, ঘর থিকে বের হও। এ ঝড়ে ঘর টিকবে নি।”
বুড়ি কোনো রকমে বের হয়ে আসে। এদিক-সেদিক গাছপালা ভাঙার শব্দ। অথচ এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই! শুধু ভয়ংকর শব্দে ঝড় বইছে! রমেশ বউ, ছেলে, মাকে নিয়ে ফাঁকা উঠোনে উপুড় করা মেছলা জড়িয়ে বসে। একটু পরেই প্রকৃতির রুদ্র তাণ্ডব কমে আসে। কিন্তু রমেশ সাহস করে ঘরে ঢুকতে পারে না। মাটির ঘরটার পশ্চিমদিকের দেওয়াল ফেটে কাত হয়ে গিয়েছে।
এমন সময় সুধা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে,
সব, সব আমার জন্যি হল। মা শীতলা গো, তুমি বাঁচালে। আমার ছেলেটার হাতে যদি বাঁধতুম মাদুলিখান, কী যে হতো!”
ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটছে। চারদিকে গাছপালা ভেঙে তছনছ। যেন কিছু আগে এক দানব এসে সব লণ্ডভণ্ড করে গেছে। রমেশ সুধার কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারে না। সে শুধু দেখতে পায়, আগড়টা যেদিকে উড়ে গেল, সেই পুবের আকাশটা এত ভোরে কেমন ঘোর লালচে রঙে ভেসে যাচ্ছে!
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)