বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১৩তম সংখ্যা/১৯শে ভাদ্র, ১৪৩৩
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৪র্থ পর্ব]
ধারাবাহিক গল্প
রাখী সরদার
মাইনকা বেদের মাদুলি
[৪র্থ পর্ব]
"রমেশের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রকাণ্ড ঝড় আছড়ে পড়ল তাদের মাটির ঘরটিতে। সেই ঝড় এক টানে অতবড় বাঁশের আগড়টার দড়ি ছিঁড়ে বাইরে পুব আকাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল! ঝড়ের দাপটে তাদের মাটির ঘরটাই বোধহয় উড়ে যাবে!"
তারপর নিজের কোমরের ঘুনসি বের করে। ঘুনসিতে নানান পাথর, শিকড়বাকড় বাঁধা। সেইসবের ভিতর থেকে অতি ক্ষুদ্রাকার একটি হাড়ের টুকরো খুলে নেয়। সেই হাড়ের টুকরোতে সিঁদুর ও চিতাভস্ম লেপে বর্গাকার ঘরের চারপাশে মন্ত্র পড়তে পড়তে প্রদক্ষিণ করায়। তারপর হাড়ের টুকরোটি সেই বীভৎস ছবির মুখাকৃতির কপালে ছুঁইয়ে মাদুলিতে ভরে দেয়। তারপর গলন্ত মোম দিয়ে মাদুলির মুখ আটকে তাতে কালো ঘুনসির সুতো দিয়ে জড়িয়ে বেঁধে ফেলে।
মাইনকা খুশি খুশি মুখে সেই বর্গাকার ঘরের মাঝে ভাঙা শাঁখার টুকরো ছড়িয়ে তিনবার থুতু ছিটিয়ে উঠে পড়ে। এই অদ্ভুত প্রক্রিয়া সারতে তার বেশ রাত হয়। চারদিক নিস্তব্ধ। ফিনফিনে জ্যোৎস্নায় মাইনকা নিজেদের তাঁবুর উদ্দেশ্যে হেঁটে যায়।
“লে, শুয়ে পড় দিকি। মোদের ইবার দুঃখ থাকবে লাই। মোরা যে ব্যাটা পাইব।”
বেদেনি বেদের মুখ চেপে ধরে ফিশফিশায়,
বেশ ভোরবেলা মাইনকা বেদে বউকে ডাকতে শুরু করে,
সুন্দরী বেদেনি স্নান করে মাদুলিটা হাতে নিয়ে বিভুদের বাড়িতে পৌঁছায়। সুধা তখন উঠোনে জল ছড়া দিচ্ছে। বেদেনিকে দেখে চমকে ওঠে,
“মোরা আইজ চলে যাচ্চি। তুমার ছেলের ই মাদুলিটো দিতে এলুম। ছেলেকে সাফা কাপড় পইরে আইজ ইটা ডান হাতে সাঁঝের বেলা বিঁদে দিবে।”
সুধার হাতে মাদুলিটা দিয়েই সুন্দরী আর দাঁড়ায় না। সুধা জিজ্ঞেস করে,
সুধা সারাদিন কাজকর্ম করে খামার থেকে ঘরে আসে। ধান সব পেটানো হয়ে যাওয়ায় রমেশ আগড়টা (দরজা) দরজায় লাগানো বাঁশে বেঁধে দেয়। সুধা তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বেলে প্রণাম করে। ছেলের হাতে মাদুলিটা বাঁধতে গিয়ে তার মনটা কেমন কু ডেকে ওঠে। কী মনে করে মাদুলিটা দরজায় লাগানো বাঁশের আগড়ে বেঁধে রাখে।
আজ তাড়াতাড়ি সব শুয়ে পড়ে। সারাদিন প্রচুর পরিশ্রম হয়েছে। ছেলেকে কোলের কাছে জড়িয়ে সুধা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ ঘুমের মধ্যেই সে একটা ক্যাঁচকোঁচ শব্দ শোনে। তার মনে হয়, তাদের বাঁশের দরজা কে যেন টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে! দরজায় বাঁধা মাদুলিটা যেন টকটকে সিঁদুরবর্ণ ধারণ করেছে! ভয়ঙ্কর ঝড়ে মাটির ঘরটা দুলে উঠছে! একটা দমকা ঝড় আছড়ে পড়ে দরজায়। সুধা ঘুমের ভিতর চিৎকার করে ওঠে। রমেশ ধড়পড় করে উঠে বসে।
“সুধা, কী হয়েছে? স্বপ্ন দেখচিলে?”
রমেশ বেশ চিন্তিত স্বরে বলে ওঠে,
রমেশের মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই প্রকাণ্ড ঝড় আছড়ে পড়ল তাদের মাটির ঘরটিতে। সেই ঝড় এক টানে অতবড় বাঁশের আগড়টার দড়ি ছিঁড়ে বাইরে পুব আকাশের দিকে উড়িয়ে নিয়ে গেল! ঝড়ের দাপটে তাদের মাটির ঘরটাই বোধহয় উড়ে যাবে! রমেশ বউ-ছেলেকে ঘর থেকে টেনে বের করতে করতে চেঁচায়,
বুড়ি কোনো রকমে বের হয়ে আসে। এদিক-সেদিক গাছপালা ভাঙার শব্দ। অথচ এক ফোঁটা বৃষ্টি নেই! শুধু ভয়ংকর শব্দে ঝড় বইছে! রমেশ বউ, ছেলে, মাকে নিয়ে ফাঁকা উঠোনে উপুড় করা মেছলা জড়িয়ে বসে। একটু পরেই প্রকৃতির রুদ্র তাণ্ডব কমে আসে। কিন্তু রমেশ সাহস করে ঘরে ঢুকতে পারে না। মাটির ঘরটার পশ্চিমদিকের দেওয়াল ফেটে কাত হয়ে গিয়েছে।
এমন সময় সুধা ছেলেকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে,
ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটছে। চারদিকে গাছপালা ভেঙে তছনছ। যেন কিছু আগে এক দানব এসে সব লণ্ডভণ্ড করে গেছে। রমেশ সুধার কথার মাথামুণ্ডু কিছু বুঝতে পারে না। সে শুধু দেখতে পায়, আগড়টা যেদিকে উড়ে গেল, সেই পুবের আকাশটা এত ভোরে কেমন ঘোর লালচে রঙে ভেসে যাচ্ছে!
~~000~~

No comments:
Post a Comment