প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নারী না পুরুষ | সাম্য

বাতায়ন/নারী না পুরুষ / ধারাবাহিক গল্প/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ , ১৪৩৩ নারী না পুরুষ সম্পাদকীয় সাম্য "একে অন্যের পরিপূরক হয়ে ...

Saturday, August 15, 2026

দণ্ডদাতা | বীথিকা ঘোষ

বাতায়ন/নারী না পুরুষ/নাটক/৪র্থ বর্ষ/১০ম সংখ্যা/৩০শে শ্রাবণ, ১৪৩৩
নারী না পুরুষ
নাটক
বীথিকা ঘোষ
দণ্ডদাতা

"মহারাজ আমি ছোটো থেকেই নৃত্য খুব ভালোবাসি। আমার ছোট মেয়ে একদিন এক সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আসে এবং সবাইকে বলে আমাদের স্কুলের নৃত্য ও সংগীত দিদিমণি। তিনি নাকি আমাদের বাড়িতে আসতে চেয়েছেন।"

 
[ওপেনিং স্টেজের পর্দা আস্তে আস্তে ওপরের দিকে উঠে গেল। স্টেজে বসে থাকা দর্শক খুশিতে গুজগুজ ফুসফুস আওয়াজে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলঘোষক হাত তুলে জনতাকে চুপচাপ বসতে অনুরোধ করে বললেন আপনারা ধৈর্য্য ধরে বসুন আমাদের নাটক এখনই আরম্ভ হবে। স্টেজ আলোয় ঝলমল করছে, স্টেজের রূপসজ্জা পরিস্কার দেখা যাচ্ছে। বিশাল বড়ো হলঘর, ঘর এতটাই বড়ো মনে হয় যেন ছোটো মতো মাঠ। ফ্লোরটাও সবুজ কাশ্মীরি কার্পেটে মোরা, স্টেজের মাঝামাঝি একটি বিশাল আকৃতির সূক্ষ্ম কারুকার্য শোভিত রত্ন সিংহাসন। তার মধ্যে আসীন এই ভূ-গোলকের সর্ব শ্রেষ্ঠ অধীশ্বর। আলো ঝলমলে স্বর্ন খচিত সিংহাসনে মনি, মুক্ত বসানো সজ্জিত তাঁকেই বসানো শোভা পায়। তার দেহাঙ্গেও ঝলমলে পোশাক পরিহিত দীর্ঘদেহী যুবক আসন গ্রহণ করেছেন। তাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে গর্বে ও অহংকারে সর্বশ্রেষ্ঠ!
সিংহাসনের পেছনের দুদিকে দুজন দেহরক্ষী দণ্ডায়মান, তাদের কোমরে ঝুলছে সুবিশাল তলোয়ার, গাম্ভীর্যের প্রকাশ দেখলে বুক আপনা-আপনি কেঁপে ওঠে। এর থেকে এগিয়ে দু'ধারে সার দেওয়া রাজকীয় চেয়ার পাতা, প্রথম দুদিকের চেয়ারে আসীন দেশের দুজন সেনাপতি, তাদের অবয়ব দেখলেই বোঝা যায় তারা কতটা শক্তিধর। তারপরের চেয়ারগুলোতে বিভিন্ন বয়সের ব্যক্তিরা এসে আসন গ্রহণ করলেন।]
 
রাজাধিরাজ:-- প্রধান অমাত্যকে কার কী বক্তব্য আছে পেশ করা হোক।
 
(বিশাল দেহী উত্তররাজ উঠে দাঁড়িয়ে নিজ তলোয়ারের বাটের ওপর হস্ত স্থাপন করে কোমর একটু নামিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বললেন)
 
উত্তররাজ:-- আমি উত্তরাখণ্ডের রাজা উত্তররাজ, আমার অভিযোগ একজন অবগুণ্ঠিতা নারীর বিরুদ্ধে। তিনি তার রূপ পরিদর্শন করে প্রথমে আমাকে অভিভূত করে ফেলেন। আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তাকে অনেক ভূ-সম্পত্তি দিয়ে ফেলি। সে সম্পত্তি পেয়ে কোথায় হারিয়ে যায়, তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। সে যাবার সময় আমার রত্নখচিত আংটি চুরি করে নিয়ে যায়। মহারাজ আমি তার কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তি চাই!
মহারাজ:-- মাননীয় উত্তররাজ, একটি কথা আমায় ভাবাচ্ছে, একদিনের পরিচয়ে আপনি এত সম্পত্তি দান করে ফেললেন!
উত্তররাজ:-- না না মহারাজ অপরিচিত নয়, তিনি আমার পুত্রকে পড়াতেন প্রায় ছ'মাস।
 
(দর্শকাসন থেকে গুজগুজ ফিশফিশ আওয়াজ শোনা গেল।)
 
প্রধান অমাত্য:-- (উঠে দাঁড়িয়ে দর্শকদের উদ্দেশ্যে) আপনারা শান্ত হোন... আর কার কী বলার আছে, বলুন।
দক্ষিণরাজ:-- আমার অভিযোগ বাঙ্ময়ী নারীর অভিনয়-এর বিরুদ্ধে। সে অবগুণ্ঠিতা হয়েও এমন নরম-বিনয়ী কন্ঠস্বরে আমায় প্রেম নিবেদন করেন। আমি তার গলার মিষ্টি সুরে আকৃষ্ট হয়ে তাকে অনেক ধন-সম্পদ দান করে বসি৷ সে সম্পদ পেয়ে খুশি হয়ে নৃত্য করতে করতে আমায় মিষ্টি পানীয় খেতে দেয়। ও-ই পানীয় খেয়ে আমি গভীর ভাবে ঘুমিয়ে পড়ি। ঘুম ভাঙলে সেই নারীকে আর দেখতে পাইনি। সে যদি আমার কাছে নাই থাকবে তাহলে আমার সব ধন-সম্পদ ফেরত দিক।
মহারাজ:-- কী মুশকিল আপনারা এক একজন বড়ো বড়ো মহারথী। বিশাল বড়ো ভূখণ্ড সামলাছেন অথচ সামান্য নারীর কাছে আপনারা পরাস্ত হয়ে যাচ্ছেন! ভাবা যায় না, দেখা যাক কী করা যায়—
(তিনিও অভিবাদন জানিয়ে জ্ঞাপন করলেন)
পূর্বখণ্ডরাজ:-- মহারাজ আমি ছোটো থেকেই নৃত্য খুব ভালোবাসি। আমার ছোট মেয়ে একদিন এক সুন্দরী মহিলাকে নিয়ে আসে এবং সবাইকে বলে আমাদের স্কুলের নৃত্য ও সংগীত দিদিমণি। তিনি নাকি আমাদের বাড়িতে আসতে চেয়েছেন। আপনি জ্ঞাত আছেন, আমার স্ত্রী মারা গেছেন অনেক দিন হলো, আমার বড়ো কন্যাই সংসার পরিচালনা করে। সে বোনকে অনুমতি দেয় দিদিমণিকে নিয়ে আসতে। তারপর থেকে প্রতিদিন আমাদের বাড়িতে আসে এবং খুকিকে নৃত্য শেখায়। আমিও একদিন তার নৃত্য দেখে অভিভূত হই, তাকে বলি সন্ধ্যাবেলা এই সাতটা-সাড়ে সাতটার মধ্যে এসে নাচ দেখাতে পারবে? সে কেমন যেন বিস্ময়ে হাত নেড়ে কী যেন বলতে চাইল, আমি ভাবলাম গরিব মানুষ হয়তো টাকার কথা বলতে পারছে না।  না-না আমি পারিশ্রমিক দেব, মনে মনে ভাবলাম স্ত্রীর গয়নাগুলো তো পড়েই আছে দু-একটি দিলে আর কী হবে? কিন্তু একটা একটা করে দিতে দিতে প্রায় বেশির ভাগই দিয়ে ফেলি, সেই সময় আমার বড়ো মেয়ে বলে বাবা মার গয়না আর দিতে পারবে না, আমাদের জন্য তো কিছু রাখবে, না কি সবই দিয়ে দেবে? আমাদের কথা চলাকালীন সেই সময় আর কেউ ছিল না অথচ দিদিমণি আর আসছে না। সে জানতে পারল কী করে, আমি আর গয়না দেব না! সে যদি আর নৃত্য নাই দেখাবে তাহলে সব গয়না ফেরত দিক।
মহারাজ:-- কী বলব আপনাকে বুঝতে পারছি না, তবে আপনি বড্ড কাঁচা কাজ করে ফেলেছেন। তাকে পাব কোথায়? মেয়ের স্কুলে আসে?
পূর্বখণ্ডরাজ:-- না মহারাজ সে চাকরি ছেড়ে চলে গেছে।
মহারাজ:-- হুম, (চিন্তিত মুখে) কিছুক্ষণের জন্য সভা স্থগিত থাক... একটু ভেবে দেখা প্রয়োজন কী করা যায়।
 
[বিশ্রামঘরে মহারাজ অদ্ভুত এক চিন্তায় তলিয়ে গেলেন। মনে মনে ভাবলেন তার বাড়িতেও তো একজন আছেন, তবে সে অবগুণ্ঠিত নয় আর প্রায় বছর দেড়েক হলো আছেন, তার বাবাকে দেখাশোনা করবেন বলে এসেছিলেন। হ্যাঁ, নিজের থেকেই এসেছিলেন মোটামোটি মাঝ বয়সি হবে; শুধু বাবার ঘরে যখন যায় তখন ঘোমটা দিয়ে যায়। তাকে সন্দেহ করার মতো কোন কিছু দেখতে পাইনি বরং তার অবয়বে মর্যাদাসম্পন্ন ও সংস্কৃতিসম্পন্ন মহীয়সী নারীর ছাপ সুস্পষ্ট। এমন কর্তব্যপরায়ণ মানুষ তিনি দেখেননি। যেদিন তিনি এলেন সেদিন থেকেই প্রাসাদের প্রায় পুরোটাই দেখাশোনা করছেন। দাস-দাসী, শ্রমিক কর্মচারী সবাই তার কথা মেনে চলে। এমনকি তিনি নিজেও তার মত অনুসারে চলেন, তিনি কী শুনতে বাধ্য করেন তা কিন্তু নয়। এমন একটা দৃঢ় ভঙ্গিতে কথা বলেন যে তিনি ও তার বাবা সবকথা শুনতে বাধ্য হন।
প্রাসাদ দেখাশোনা করার জন্য পুরুষ ও মহিলা মিলে দশ জনের মতো আছেন, তাদের কাজ ভাগ করা আছে। বাবা বেশ কিছুদিন হলো মাঝে মধ্যেই অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন, তখন মন্ত্রীদের পরামর্শে আমাকে সিংহাসনে বসিয়ে তিনি অবসর নিলেন। বাতাসে খবর ছড়ায়, একদিন ওই মহীয়সী মহিলা এসে আমার সঙ্গে দেখা করতে চান।]
 
দারোয়ান:-- একজন মহিলা আপনার সাথে দেখা করতে চান মহারাজ।
মহারাজ :-- নিয়ে এস তাকে।
 
[এক অনিন্দ্য সুন্দরী প্রৌঢ়া মহিলা প্রবেশ করলেন, তখন তার মাথায় অল্প ঘোমটা টানা ছিল। তিনি সুন্দরী কিন্তু তার সৌন্দর্যে তীব্রতা ছিল না, ছিল কোমল পরন্তু শান্তশ্রী।]
 
মহারাজ:-- মা আপনি বসুন। তাঁর চেহারা থেকে স্নেহ, মায়া, মমতা ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি নিজের মাকে কোনদিন দেখিনি, বাবার কাছে জানতে চেয়েছি কিন্তু উত্তর পাইনি। পরিচিত জনেরা কেউ কিছু বলতে পারে না, তারা কিছু জানে না। বয়স্ক ধাইমার কাছে মানুষ, তিনিও কিছু বলতে পারে না। জিজ্ঞেস করলে হাসে, হাত নেড়ে নিজেকে দেখায়। আমি বড়ো হতে হতেই উনিও কোথায় চলে গেলেন। হঠাৎ মাথায় ঝিলিক দিয়ে উঠল, অদ্ভুত সাদৃশ্য লক্ষ্য করলাম দুজনের মধ্যে, তাদের চোখের দৃষ্টিতে একই ছায়া; সমস্ত শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল!
মহিলা:-- তুমি ভালো আছো তো বাবা?  তোমার বাবা কেমন আছেন? যদিও আমি শুনেছি তিনি খুবই অসুস্থ। (তার কথার মধ্যে আন্তরিকতার স্পর্শ।) সেই থেকে তিনি আমাদের বাড়িতেই আছেন।
অমাত্য:-- প্রধান অমাত্য ঘোষণা করলেন, মহারাজের বিশ্রাম হয়ে গেছে তিনি সভাস্থলে আসছেন। সবাই প্রস্তুত হন এবং সভায় আসন গ্রহণ করুন।
মহারাজ:-- (তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন তাড়াতাড়ি এক গ্লাস জল খেয়ে, সভায় প্রবেশ করলেন।) লজ্জিত মুখে বললেন, মাফ করবেন একটু দেরি হয়ে গেল। সভা শুরু হোক আর কার কী বক্তব্য আছে পেশ করুন।
সভাস্থল:-- প্রধান অমাত্য ঘোষণা করলেন কার কী অভিযোগ আছে এই সময় বলে নিন। পশ্চিমখন্ড রাজ এসেছেন হয়তো তার কথা আছে সুতরাং একে একে চলে আসুন। নগরের প্রান্তরে কিছু গরিব চাষাভুসো বাস করে তাদের কিছু অভিযোগ এবং পাওনা আছে, সেসব নিয়ে আলোচনা হলো। ওদের সন্তুষ্ট করে মহারাজ স্বয়ং উত্তরখন্ডরাজকে বললেন
-- আপনার কী বক্তব্য আছে নিবেদন করুন।
উত্তরখন্ডরাজ:-- (তিনিও একই ভঙ্গিতে অভিবাদন জানিয়ে তিনি প্রায় একই অভিযোগ করেন, সেই মহিলা বিষয়ক প্রসঙ্গ।) আপনারা সবাই জানেন পশ্চিম সীমান্তে আমাদের বেশ বড়ো একটা মাঠ আছে। অনুমতি নিয়েই একদল পুরুষ-নারী মাঝে মাঝে বিভিন্ন সামগ্রী নিয়ে ওখানে মেলা বসায় বহু দিন ধরেই। এবারও বসিয়েছিল নিজেদের হাতের তৈরি বিভিন্ন সূক্ষ্ম সূচি শিল্পে বিভিন্ন সম্ভার নিয়ে আসে যেমন বিছানার চাদর পুরোটা কারুকার্য করা, দুটো পিলো কভার ফ্রিবিভিন্ন ধরনের উলের কাজ করা সামগ্রী সাজানো আছে। কুরুসেরও বোনা বিভিন্ন চাদর, টেবিল ডাকনা, গায়ের চাদর, বিভিন্ন ধরনের আসন, কার্পেট, বড়ো বড়ো আল্পনা দেওয়া বিছানার চাদর, পর্দা, সত্যি মহারাজ সবগুলোই দেখার মতো। আমি প্রায় রোজই যেতাম, ছেলেমেয়েরা বেশ আনন্দ করে এটা-ওটা দেখাচ্ছে শুধু একজন অবগুণ্ঠিত মহিলা মাঝে মধ্যে এসে একটি চেয়ারে বসে থাকেন। একদিন তিনি ঘোমটা সরিয়ে আমাকে বললেন, কী অপূর্ব সুন্দর মাঠটা--জানি না আপনি কে? তবে দেখলে বোঝা যায়, আপনি এখানকার রহিস আদমি আছেন। আপনি যদি কিছু সাহায্য করেন; তাহলে শহরের উপকন্ঠে একটি পার্মানেন্ট দোকান তৈরি করে দিতাম। তাহলে ওরা নিজেরা নিজেদের সংসার চালিয়ে নিতে পারত! আমি ভাবলাম এতে যদি ওদের উপকার হয় তাহলে অসুবিধার কী আছে, তাই না? আমি পঞ্চাশ হাজার টাকা অনুদান করলাম। ওমা ছেলেমেয়েরা কী খুশি, তারা একে একে এসে প্রণাম করতে লাগল। আমার খুব ভালো লাগল, আমি রাজ্যের সবাইকে বলব আপনাদের কাছ থেকে জিনিসপত্র কিনতে। কিন্তু আশ্চর্য এই ঘটনার তিন দিন পরে তারা দোকান ভেঙে কোথায় চলে যায়, কাউকেই কোন ঠিকানা দিয়ে যায়নি! এটা তো বিশাল বড়ো অন্যায় করা হলো, হ্যাঁ বলেছিল লাভের অংশ থেকে আমাকে কিছু কিছু করে টাকা দিয়ে মূল টাকা শোধ করে দেবে।
মহারাজ:-- এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন সমস্ত কথা, তিনি বললেন এতগুলা টাকা যে দিলেন তার কোন রসিদ নিয়েছেন? এরা ভ্রাম্যমাণ, এই যে গেল আর করে আসবে তার ঠিক নেই। আপনারা দেখছি মহিলা দেখলেই জ্ঞান থাকে না। আপনি নিজে ভুল করেছেন, আর এখন নালিশ জানাতে এসেছেন কার বিরুদ্ধে যার নাম ঠিকানা কিছুই জানেন না। মুখে বললেন ঠিকই কিন্তু মনে মনে ভাবছেন (আমি যার গুণে মুগ্ধ তিনিও তো সর্ব গুণে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু কোন সময় এমন কিছু চায়নি বা কোন ইঙ্গিত করেনি। না-না শুধু শুধু ভাবছেন তাছাড়া তিনি বহু দিন হলো আছেন যে নারী এত এত মহারাজদের কুপোকাত করে ফেলতে পারে, তাকে যোগ্য শাস্তি দিতেই হয়। এমন শাস্তি দেব আর কোন দিন মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না!)
[রাজাধিরাজ সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন, সবাইকে বিদায় দিয়ে বাড়ি ফিরে এসে দুঃশ্চিন্তায় ডুবে গেলেন। খানিক বাদে G. News - এর Control Room-এ ফোন করে জানালেন সমস্ত পরিস্থিতি এবং বললেন দুদিনের মধ্যে ও-ই রহস্যময়ী নারীকে অ্যারেস্ট করে রাজসভায় পেশ করুন।)
 
রাজ্যবাসী সেই খবর শুনে প্রায় সবাই অবাক হয়ে যায়, কী করে সম্ভব দুদিনের মধ্যে সেই রহস্যময়ী নারীকে ধরে আনবেন?
 
দ্বিতীয় অঙ্ক
 
[আজকের স্টেজও প্রায় আগের দিনের মতো সাজানো গুছানো তবে এখনো কেউ আসন গ্রহণ করেননি। নতুনত্বের মধ্যে স্টেজের পেছনে প্রায় দেওয়াল জুড়ে টিভির স্ক্রিন দেখা যাচ্ছে। তার মানে G. News-এর যা বক্তব্য সেটা ওখানে দেখা ও শোনা যাবে। দুদিন প্রায় সমাপ্ত, রাজ্যবাসীর প্রায় প্রত্যেকে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে, কখন সেই রহস্যময়ী ধরা পড়বে এবং সভায় নিয়ে আসা হবে? পথের বিভিন্ন স্থানে জনতার জটলা, বিভিন্ন দলের ফিশফিশানি কথাবার্তা কোলাহল বেশ ভালোই। গগনভেদী চিৎকার চেঁচামেচি না হলেও গুঞ্জন বেশ সূদুরপ্রসারী।]
 
প্রধান অমাত্য:--ঘোষণা করলেন, মহারাজ আপনারা সবাই এসে আসন গ্রহণ করুন। সময় হয়ে গেছে—;
G. News-এর ঘোষক:--ঠিক সেই সময় G. News-এর ঘোষক খবর পরিবেশন করতে লাগলেন— রাজ্যের শেষ সীমানায় প্রায় জঙ্গল বেষ্টিত ভূ-খণ্ডের ভেতরে একটি বিশাল বাগান বাড়িতে একজন বৃদ্ধাকে দেখা যায়, তবে তিনি একা নন তার সাথে অনেক বিভিন্ন বয়সের বালক-বালিকা, বিভিন্ন ধরনের মানুষ বসবাস করেন। অনেকেই বলছেন ও-ই বৃদ্ধ মহিলাই সেই রহস্যময়ী নারী, ইনি একেক মুহূর্তে একেক রকম রূপ ধারণ করতে পারেন। কখনো শিশু, কখনো যুবতী, কখনো বা বৃদ্ধ রমণীকে লাঠি ধরে ধরে খুঁট খুঁট করে অরণ্যের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ঘুরে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। মনে হয় কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তিনি কে? কেউ বলতে পারেন না। আবার অপর একজন বলে রাতের অন্ধকারে ঘোড়ার খুড়ের শব্দ পাওয়া যায়। অনুমান করা যায় সেই রহস্যময়ী ঘোড়া ছুটিয়ে কোথাও যান কিন্তু কখন ফেরেন সেটা জানা যায় না। সকলের একই প্রশ্ন— "কে এই রহস্যময়ী?" আমরা সময় চাইছি আরও অনুসন্ধান করতে, তবে কেউ নিরাশ হবেন না।
(সকলে ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে বাড়ি ফিরে গেলেন।)
এ-ই ঘটনার চার দিন পর রাজমহল থেকে ঘোষণা করা হলো। আজ সমস্ত রহস্য উদঘাটন হবে। যারা জানতে আগ্রহী তারা সভাস্থলে আসতে পারেন সন্ধ্যা ছয় ঘটিকায়।
 
তৃতীয় অঙ্ক
 
[বিভিন্ন কারুকার্য শোভিত স্টেজের ওপনিং স্ক্রিন আস্তে আস্তে ওপর দিকে তুলে নেওয়া হলো। আলোর রোশনাই-এ ঝলমল করছে আসর। তবে আজ স্টেজ একটু অন্য রকম ভাবে সাজানো, মহারাজের সিংহাসনের থেকে দূরত্ব রেখে বেশ অনেকগুলো আসন পাতা হয়েছে, এই আসনগুলোতে কারা বসবেন সেটা কেউ জানতে পারেনি। ঠিক ছটায় একে একে সবাই এসে আসন গ্রহণ করলেন। দর্শক আসনও ভর্তি, গিজগিজ করছে জনতা এদিক-ওদিক দাঁড়িয়ে আছেন বিস্ময়ে উপভোগ করতে চাইছে কী হয়?]
 
মন্ত্রী মহোদয় উঠে দাঁড়িয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়ে হাত জোর করে বললেন- "রানিমা আপনারা আসুন এবং আসন গ্রহণ করুন।" সঙ্গে সঙ্গে ভীষণ কৌতূহলে হলঘর কোলাহলে ফেটে পড়লস্বয়ং মহারাজও অপার বিস্ময় নিয়ে দাঁড়িয়ে পরলেন।
 
মহারাজ:-- কী বলছেন মন্ত্রী মহোদয়, মা কোথা থেকে আসবেন? তিনি তো নিরুদ্দেশ— কোথায় আছেন কেউ জানে না— এমনকি বাবাও তার খোঁজ জানেন না— তার কথা শেষ হবার আগেই এক অনিন্দ্য সুন্দরী বয়স্ক মহীয়সী মহিলা প্রবেশ করে আসন গ্রহণ করলেন এবং তার সহচর সহচরীদের এসে বসতে অনুরোধ করলেন। জনতা অপার বিস্ময়ে রানিমাকে এত বয়সেও এমন সুন্দরী দেখে অভিভূত হয়ে পড়লেন। এই সৌন্দর্যে কোন তীব্রতা নেই আছে শান্তশ্রী, তার বড়ো বড়ো চোখ থেকে স্নেহ মায়া মমতা ঝরে পড়ছে। (অপার বিস্ময়ে মহারাজ দেখলেন এই মহিলাই তার মা। আমার এত কাছে ছিলেন অথচ আমি জানতেই পারলাম না, তিনি আমার মা।)
মন্ত্রী মহোদয় হাত তুলে সভাস্থ প্রজা বর্গকে শান্ত হয়ে বসতে অনুরোধ করলেন। রানিমা কিছু বলবেন, আপনাদের সমস্ত কৌতূহল মিটিয়ে দেবেন।
রানিমা:-- হাত তুলে সভাস্থ সবাইকে আন্তরিক আশীর্বাদ স্বরূপ অভিবাদন জানিয়ে বললেন, আপনাদের অনেক কৌতূহলের জিজ্ঞাসা আজ আমি মিটিয়ে দেব। আমার বিয়ে হয়েছিল আজ থেকে প্রায়  তিরিশ বছর আগে, আমার শ্বশুর কুল শ্রদ্ধার সঙ্গে বলবার মতো কোনো সম্পদই রেখে যাননি। তিন পুরুষ ধরে একটানা মদ আর মেয়ে মানুষ নিয়ে হুল্লোড় করেছেন, এই প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে লেখা আছে শুধু অসংযম আর অমর্যাদার কাহিনি।
বংশের প্রথম পুরুষের এক ব্রাহ্মণের সুন্দরী স্ত্রীর প্রতি কামনার দৃষ্টি পড়ে। তিনি বেশ কিছু সম্পদ দিয়ে ব্রাহ্মণের কাছ থেকে তার স্ত্রীকে কিনে নেন। পরদিন তার মৃতদেহ দিঘির জলে ভেসে উঠতে দেখা যায়। সবাই বলেন আত্মহত্যা, এমন অনেক ঘটনা তারা ঘটিয়েছেন। আমি আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে পাইনি, এ বাড়ির ধাই-মা আমার হাত দুটো ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, "বউমা পারলে এই বংশটাকে রক্ষা করো। কয়েক দিনের মধ্যে বুঝতে পারলাম এদের কোন লাগাম নেই, আমি সময় বুঝে তাকে বোঝাবার চেষ্টা করতে লাগলাম, ফল স্বরূপ তিনি আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিলেন। তখন আমি চার মাসের অন্তঃসত্তা, ধাই-মা সেটা জানতেন তার সাথে পরামর্শ করে মন্ত্রী মহোদয়ের বাড়িতে গিয়ে সমস্ত বুঝিয়ে বললাম।
মন্ত্রী মহোদয়:-- আপনি বসুন রানিমা, আমি অনেক ঘটনাই জানি মানে আমাদের জানতে হয়, বলুন কী বলতে চান। সব শোনার পর, দুজনের পরামর্শে ঠিক হলো কী কী করতে হবে! বাকিটা তো আপনারা জানেন, আমাদের পুরুষ মহিলা চর সমস্ত রাজ্যের খবরাখবর জোগাড় করে আনতেন। যারা অন্যায় করতেন তাদের বাড়িতে কায়দা করে কাজ নিয়ে সে বাড়ির সমস্ত খবর সংগ্রহ করে আনা হতো, একটু একটু করে সমস্ত রাজ্য আমাদের মুঠোয় চলে এলো। আমার কাজের সুবিধার জন্য জঙ্গলে ওই বাড়িটি তৈরি করে দেন মন্ত্রী মহোদয়। সেই বাড়িতেই আমার পুত্র সন্তান জন্ম নেয়, মানে আপনাদের বর্তমান মহারাজ!
সেনাপতির কাছে সমস্ত শুনে উনি আমাকে নিয়ে আসতে গিয়েছিলেন, তখন আমার ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। দেখছেন তো এখানে কত কাজ অসহায় মেয়ে-পুরুষের বাস হয়ে উঠছে, খোকা একটু বড়ো হলে ধাই-মা সমেত ওকে আপনার কাছে পাঠিয়ে দেব। একদিকে পড়াশোনা অপর দিকে অপরাধীদের ধরে আনা, আমরা তাদের সমাজের উপযুক্ত করে ছেড়ে দিতাম। তাই আপনারা অনেক গুণ্ঠিত, অবগুণ্ঠিত মহিলার প্রতিকৃতি দেখতে পেতেন, তারা কেউ লোভী প্রতারক নয়, আপনাদের ভালোর জন্যই কাজ করেছে। এখন আর কেউ মদ বিক্রি করে না, তাই কেউ খেতেও পায় না।
যারা কোষাগার ফাঁকি দিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে তাদেরও শাস্তি দেওয়া হয়েছে। যারা অন্যায় ভাবে মেয়েদের ভোগ করতে চেয়েছে, তাদেরও উপযুক্ত আক্কেল দেওয়া হয়েছে। এখন রাজ্যে কোন গণ্ডগোল নেই সুতরাং আমার ছুটি, আমাকে নিয়ে আপনারা ভাববেন না। আমার জন্য আমার পিতামহ অনেক বড়ো বাড়ি দিয়ে গেছেন। সেখানেও এমন ভাবে অভাগাদের সামাজিক ভাবে তৈরি করা হচ্ছে, ভালো মানুষ তৈরি না হলে দেশের ও দশের মঙ্গল হবে কী করে? আপনারা ভালো থাকবেন, সবাইকে নমস্কার!
আর একটি কথা পুরুষ না মহিলা কার আধিপত্য কাম্য, এই কথার বিচার করা অত সহজ নয়! আমি অনেক কাজ করেছি বটে কিন্তু ভেবে দেখবেন, মন্ত্রী মহোদয় আর এই সাহসী বীর ও বীরাঙ্গনারা যদি আমায় সাহায্য না করতেন আমার পক্ষেও এত কাজ করা সম্ভব হতো না, আমি মনে করি মহিলা ও পুরুষ একজন আর একজনের পরিপুরক! আপনাদের উত্তর পত্রিকাকে জানাবেন! 
 
সভাঘর এতক্ষণ স্তব্ধ ছিল, জনতা কিছু বলতে চাইছিল কিন্তু সেই সুযোগ কেউ পেল না স্কিন ড্রপ পরে  গেল!
 

যবনিকা

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)