বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই
কার্ত্তিক,
১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
টেক্কা
তিলে তিলে পচে মরতে হবে এই চার দেওয়ালের মধ্যে। ছুটে নেমে আসে ওরা। ওদের দেখে কেঁদে ফেলেন বড় ভাই। সবিতা অচৈতন্য খাটে পড়ে আছে। ছোটজন গাড়ি বের করে, বহুদিন পরে আবার স্টিয়ারিংয়ে হাত পড়ল।
সবিতা
আর মাধুরী বসু-বাড়ির
দুই বউ। সম্পর্কে জা। তবে আজ বহুবছর একে অপরের সঙ্গে কথাও বলে না। বনিবনা বিশেষ কোনদিনই
ছিল না ওদের। তবু যতদিন শ্বশুর-শাশুড়ি বেঁচে ছিলেন কোনমতে দুই ভাই এক ছাদের তলায় ছিল।
কিন্তু রেষারেষি, একে অপরকে কাজে কর্মে, বিলাসিতায় টপকে যাবার এক
অলিখিত যুদ্ধ সবসময় চলত। ছেলেমেয়েদের
পড়াশোনা এমনকি সামান্য খেলাধুলা,
নাচ গানেও
ছিল কম্পিটিশন। যে বাচ্চা হারত তার কপালে জুটত মার আর একে অপরকে বিঁধিয়ে নানা কটু
মন্তব্য।
বড় বউ
সবিতার এক মেয়ে এক ছেলে, আর ছোট জন মাধুরীর
একটিই ছেলে। ভাইবোনেরা মায়েদের ভয়ে একে অপরকে এড়িয়ে চলত। তবু যতদিন বসু-পরিবারের কর্তা বেঁচে
ছিলেন সবকিছু ছিল আড়ালে। কিন্তু তার মৃত্যুর পর বাড়ির ভাগ নিয়ে অশান্তি চরমে
উঠল। সভা-সালিশি কোর্ট
ওর্ডারের পর বড় ছেলে একতলা আর ছোটছেলে দোতলায় আলাদা হাঁড়ি বসাল। ভাগের মা তিনমাস এঘরে
তো তিন মাস ওঘরে। দুই ভাইয়ের মধ্যেও কথা বন্ধ হলো। তবু একে অপরের দেখনদারী কমল
না। বড় ভাই কিছু কিনলে তা যতক্ষণ ছোটকে দেখাতে না পারছে শান্তি নেই। ছোটজনও
চেঁচিয়ে জানান দিত তার নতুন কিছু এলে, অফিসে প্রমোশনের খবরে। বাড়ির সামনে দুটো গ্যারাজে লাল নীল গাড়ি, বাড়িটাকেই ঢেকে ফেলেছে
অনেকটা। দুই ছেলের এমন ব্যবহারে মায়ের মন ভেঙে গেল, তার নিজের পালনপোষণে খামতির কথা ভেবে কষ্ট পেতেন। আশেপাশে প্রতিবেশীরা
নানা কথা জিজ্ঞেস করত। বেশিদিন
সেসব সহ্য করতে পারলেন না তিনি। বছর ঘুরতেই তিনিও পরলোকে যাত্রা করলেন। দুই বৌ এখন
যে যার সংসারে কর্তী।
সময়
বয়ে চলল, যত সময় এগোল ওদের
সম্পর্ক আরও খারাপ হলো। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেল। বড়জনের ছেলে নামকরা ডাক্তার, মেয়ে ইকোনমিক্সে এমএ। ছোটজন
পাল্লায় কম যায় কেন? সেই সুদূর ব্যাঙ্গালোরে
ছেলেকে ডাক্তারি পড়তে পাঠাল প্রায় সব সঞ্চয় খরচ করে। সে-ও এখন ডাক্তার হয়ে
ওখানেই এক নার্সিংহোমে কাজ করছে। মেয়ের বিয়েতে সব মনোমালিন্য একপাশে রেখে সবিতা
এসেছিল স্বামীর সাথে ছোট দেওর-জা’কে নিমন্ত্রণ করতে। কিন্তু ওরা যায়নি। একই বাড়িতে একতলায়
নতুন জামাইকে আশীর্বাদটুকু করেনি ছোট গিন্নি মাধুরী। সেদিনের পর আর কোনদিন কথা
বলেনি একে অপরের সাথে। ছেলেমেয়েরা সবাই বাইরে। বাড়ি এখন একেবারে নিস্তব্ধ। কাজ
ছেড়ে আসতেও পারে না ওরা বা বলা ভাল ওরা নিজেদের কেরিয়ারে এত ব্যস্ত যে এই
পারিবারিক ঝুটঝামেলা এড়িয়ে চলতে, আসা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।
বড়জনের
ছেলে নামজাদা এক ব্যবসায়ীর মেয়ে বিয়ে করে নিজের নার্সিংহোম খুলেছে। মেয়ে ঘোর
সংসারী। তার নিজের দুটি সন্তান। ছোটজনের ছেলে শুধু বাবার সাথে টাকার ব্যাপারেই
সম্পর্ক রাখে। ছোট থেকে দাদা-দিদির সাথে সম্পর্ক গড়ে না ওঠার জন্য প্রতিনিয়ত দায়ী করে
মা-বাবাকে। বাড়ি একেবারই আসতে চায় না।
দুই
ভাই রিটায়ার করেছে। বয়স বেড়েছে অনেকটাই। এখন যেন ফিরে চাইলে মনে হয় সবকিছু বড়
ফাঁকা, মলিন। দুটো পরিবার
কেমন ধুঁকে ধুঁকে চলছে। দুই বৌয়ের একজনের হার্টের অসুখ, অন্যজনের আর্থারাইটিসে চলতে ফিরতে ভীষণ কষ্ট। এখন তো ওপর
থেকে নীচে নামতে সিঁড়ি ভাঙতেও পারে না ভাল করে। অথচ এই দোতলার জন্য থানাপুলিশ
পর্যন্ত করেছিল এক সময়। যে ছেলেমেয়েদের জন্য এত অহংকার করত, একে অপরকে টেক্কা দিত তারা আজ
ফিরেও দেখে না। এখন বাজারঘাটে,
রাস্তায়
দুইভাই মুখোমুখি হলে চোখ নামিয়ে নেয়।
চলছিল
এভাবেই। এখন আর পাড়া প্রতিবেশী ওদের চিলচিৎকার-ঝগড়া শুনতে পায় না।
গাড়িগুলো গ্যারাজে দাঁড়িয়ে আছে বহুদিন। রং চটেছে, ওদের শরীরেও বার্ধক্য। দুদিন ধরে বড় বৌ সবিতার জ্বর, ডাক্তার দেখে গেছে দোতলা থেকে
দেখেছে মাধুরী। কাজের মেয়েকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছে কী হয়েছে। সেই জ্বর যেন কমলই
না। সাত দিন পেরিয়ে গেছে। বারবার ডাক্তার আসছেন। মাধুরী জানাল বরকে সবটা। কিন্তু
এত বছরের কলুষতা মিটিয়ে যেতে পারল না একবার দেখতে। রাত অনেক হয়েছে। হঠাৎ নীচের
তলায় বড় ভাইয়ের জোরে চিৎকার, স্ত্রীর নাম ধরে ডাকছে। ঘুম ভেঙে গেল উপরে ওদের। একবার নীচে
যাবে? যদি ঢুকতে না দেয়, অপমান করে! কিন্তু না, এতদিন তিল তিল করে যা
গুছিয়েছে ওরা,
নিজেদের সম্পর্ক বিসর্জন দিয়ে তারাই আজ ওদের পাশে নেই। ওদের সন্তানরা স্বার্থপর
তৈরি হয়েছে শুধু ওদেরই ভুলে। আর ভুল নয়। একে অপরের পাশে দাঁড়াতে না পারলে জীবন
আর ক্ষমা করবে না। তিলে তিলে পচে মরতে হবে এই চার দেওয়ালের মধ্যে। ছুটে নেমে আসে
ওরা। ওদের দেখে কেঁদে ফেলেন বড় ভাই। সবিতা অচৈতন্য খাটে পড়ে আছে। ছোটজন গাড়ি
বের করে, বহুদিন পরে আবার
স্টিয়ারিংয়ে হাত পড়ল। পাশে বড়দা, মাধুরীর কোলে মাথা রেখে সবিতা শুয়ে আছে গাড়ির পেছনে। ভাই দাদাকে ভরসা
জোগায়।
-চিন্তা নেই আমরা ঠিক সময়ে
হাসপাতালে পৌঁছে যাব।
গাড়ি
যত এগোতে থাকে সব বিভেদ যেন পিছনে পথে পড়ে থাকে। হাসপাতালে ডাক্তার দেখে এলেন
এইমাত্র। জানিয়েছেন একদম ঠিক
সময়ে নিয়ে এসেছেন তাই এই যাত্রায় সামলে নিয়েছেন সবিতাদেবী। স্বস্তির নিঃশ্বাস
ছাড়ে মাধুরী। দুই ভাই জড়িয়ে ধরে একে অপরকে। ঘন্টাখানেক পরে দেখা করতে পারবে ওরা
তার আগে তিনজনে হাসপাতালের সামনে চায়ের দোকানটায় একসাথে বসে চা স্যান্ডউইচ খেয়ে
নিল। এতক্ষণ যা টেনশন গেছে। এখন একটু রিলিফ।
~~000~~
No comments:
Post a Comment