বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/কষ্টিপাথর/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই
কার্ত্তিক,
১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | কষ্টিপাথর
আলোচক— নাসির ওয়াদেন
কবিতা— তালাশ
কবি— নজর উল ইসলাম
কবি এখানে সরাসরি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং শব্দের কার্যকারণ সম্পর্কের ভেতর কিছু রহস্যময় শব্দবন্ধের মধ্য দিয়ে পাঠককে অনুভূতির অন্তঃপুরে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাতে প্রয়াসী হয়েছেন।
[বাতায়নে প্রকাশিত কবিতার
শিরোনাম ও কবির নাম ছাড়া শুধু মাত্র কবিতাটিকে ভিত্তি করে এই আলোচনা এবং পর্যালোচকের
দৃষ্টিতে কবিতার সম্ভাব্য শিরোনাম।]
বিষণ্ণতায়
ডুবে যায় বুকের সম্ভোগ, মায়ানীড়
দু-একদিন চিলেকোঠায় তাকিয়ে থাকি— ঘনিষ্ঠতায়়
আবালভূমি নাভিতে লুকিয়ে যায় ক্যামেরা থেকে
জীবন পড়তে না-পারা এক অতীব আশ্চর্য আকাশ
দু-একদিন চিলেকোঠায় তাকিয়ে থাকি— ঘনিষ্ঠতায়়
আবালভূমি নাভিতে লুকিয়ে যায় ক্যামেরা থেকে
সব ঢেউ তো ডাক ছাড়ে সজাগ তাড়নায়
প্রেমের বৈরিতার সামনে উজাড় খামতি-খয়রাতি
দু-আঁজলায় যতটুক ভালবাসা —
মোলায়েম হয়
নারীস্পর্শ সতর্ক করে জীবনবোধির মনন
অনুভূতি এক আকাশ ভাষাহীন চেতনার অনুরাগ
খুশির পুরাণে অস্তিত্বের যোগসন্ধি সুনিপুণ।
শিরোনামহীন মুহূর্ত পুষি খুব গোপনে রূপরস
এতকিছু সাজানো তাও বেবাক ভব-তালাশ…
কবিতার
সম্ভাব্য শিরোনাম—
১) মায়ায় অস্তিত্বের
আকাশ
২ ভাষাহীন
চেতনার বহিঃপ্রকাশ
৩ প্রেমের
বৈরিতা ও ভব-তালাশ
এই
কবিতার কেন্দ্রে শুধু প্রেম কিংবা বিষণ্ণতা নেই; রয়েছে ব্যক্তিমানুষের অন্তর্জগৎ, শরীরী অনুভব, ভাষার সীমাবদ্ধতা এবং অস্তিত্বকে নতুন করে পাঠ করার এক জটিল আকাঙ্ক্ষা। কবিতার
মায়াজাল যে বিশ্বাসে কৃত সকল গোপন অস্তিত্বের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা নিয়ে
অনন্তের পানে পাড়ি দেওয়ার সুকৌশলী বার্তাও আছে। তারমধ্যে প্রেম, ভালবাসা, অস্তিত্বের নিগূঢ় বন্ধন
ছিন্ন মুক্তি থেকে পরমার্থ লাভের ইঙ্গিত বহন করে চলেছে।
কবিতার
সামগ্রিক মূল্যায়ন:-
এই
কবিতাটি আধুনিক বাংলা কবিতার এক বিশিষ্ট প্রবণতার অন্তর্ভুক্ত, যেখানে অনুভূতির সরল বিবরণ
অপেক্ষা চিত্রকল্প, শব্দের অপ্রত্যাশিত
সংযোগ এবং মনস্তাত্ত্বিক ইঙ্গিত অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানস প্রকৃতির অদম্য
কৌতূহল ও নীরবতার শব্দোচ্ছ্বাস,
কবিতার
বিভিন্ন পঙ্ক্তিতে প্রেম,
বিষণ্ণতা, নারীশরীর, স্মৃতি, চেতনা ও অস্তিত্বের অনুসন্ধান
পরস্পরের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটি ব্যক্তিগত অথচ বহুমাত্রিক অনুভবের জগৎ নির্মাণ
করেছে। কাব্যিক চেতনাকে পরিস্ফুট করতে শব্দের নির্যাস ছড়িয়ে পড়েছে অর্থের গভীর
ব্যঞ্জনায়। কবি এখানে সরাসরি বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠা করতে চাননি; বরং শব্দের কার্যকারণ
সম্পর্কের ভেতর কিছু রহস্যময় শব্দবন্ধের মধ্য দিয়ে পাঠককে অনুভূতির অন্তঃপুরে
প্রবেশের আমন্ত্রণ জানাতে প্রয়াসী হয়েছেন।
প্রথম
পঙ্ক্তিতে খুঁজে পাওয়া যায়,
‘বিষণ্ণতায় ডুবে যায় বুকের
সম্ভোগ, মায়ানীড়’
মায়ানীড়
কবিতার আবহ নির্মাণে তাৎপর্যপূর্ণ। ‘বিষণ্ণতা’ ও ‘সম্ভোগ’-এর পাশাপাশি অবস্থান
আনন্দ ও অবসাদের দ্বন্দ্বকে সামনে আনে। ‘মায়ানীড়’ শব্দটি আশ্রয়, মায়া এবং মানসিক নিরাপত্তার
ইঙ্গিত বহন করে, কিন্তু তার
নিরাপত্তার মধ্যে বিস্ময় বিদ্যমান। তাই সেই আশ্রয়েও বিষণ্ণতা প্রবেশ করেছে। ফলে
প্রেম এখানে নিছক সুখের, আনন্দের অভিজ্ঞতা নয়; তার মধ্যে রয়েছে আকাঙ্ক্ষা, ক্লান্তি এবং আত্মিক
অনিশ্চয়তা, বিষন্নতার চরম আঘাত।
পরের
পঙ্ক্তিতে দেখতে পাই, ‘জীবন পড়তে না-পারা এক অতীব
আশ্চর্য আকাশ’ জীবনকে পাঠ-অযোগ্য অথচ বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরে।
আকাশের ব্যাপকতা ও জীবনের দুর্বোধ্যতা এখানে অর্থবহভাবে মিলিত হয়েছে। এখানে
বিপরীত ধর্মী ইঙ্গিত বহন করে এক মিশ্র সামাজিক প্রতিক্রিয়া।
‘দু-একদিন চিলেকোঠায় তাকিয়ে
থাকি— ঘনিষ্ঠতায়’ পঙ্ক্তিতে নিঃসঙ্গতার একটি অন্তরঙ্গ পরিসর তৈরি হয়। চিলেকোঠা
যেন মনের এমন এক নির্জন কক্ষ,
দূরবর্তী
নিস্তব্ধতা এসে বুঝিয়ে দিতে চায়, যেখানে মানুষ নিজের অনুভূতির মুখোমুখি দাঁড়ায়, ভবিষ্যতের কল্পনায় বিহ্বল হয়ে পড়ে। কিন্তু পরবর্তীতে
দেখি '‘আবালভূমি নাভিতে
লুকিয়ে যায় ক্যামেরা থেকে'
পঙ্ক্তিটি
তুলনামূলকভাবে দুর্বোধ্য ও অবোধগম্য। ‘নাভি’, ‘আবালভূমি’ ও ‘ক্যামেরা’—এই তিনটি শব্দের সংযোগে শরীর, আদি ভূখণ্ড এবং দৃশ্যমানতার
একটি সম্ভাব্য সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। ক্যামেরা যা ধরে রাখতে চায়, অন্তরঙ্গতার গভীরে তা যেন
অধরা থেকে যায়। এই চিত্রকল্প অভিনব, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হলে পাঠকের কাছে এর ব্যঞ্জনা গভীরতর
হতে পারত।
দ্বিতীয়
স্তবকে, দেখা যায় যে, এখানে কবিতার আবেগ আরও
দ্বন্দ্বময় হয়ে ওঠেছে। ‘সব ঢেউ তো ডাক ছাড়ে সজাগ তাড়নায়’ পঙ্ক্তিতে ঢেউয়ের
গতিশীলতা আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে কাজ করে। এর বিপরীতে ‘প্রেমের বৈরিতার সামনে
উজাড় খামতি-খয়রাতি’ পঙ্ক্তিতে দেখা যায় যে, প্রেমের বিরোধ, অপূর্ণতা ও আত্মসমর্পণের এক জটিল চিত্র, মনস্তাত্ত্বিক চেতনার ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে। ‘খামতি-খয়রাতি’
শব্দবন্ধে অভাব ও দানের দ্বৈত অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে অভাববোধ চিন্তা
শক্তিকে ব্যাহত করে, আবার অন্যদিকে, প্রেমে মানুষ যেমন নিজেকে
উজাড় করে দেয়, তেমনই কখনো কখনো সে
ভালবাসার সামান্য প্রাপ্তির জন্যও উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করে। এই অনুভূতিকে পরবর্তী
পঙ্ক্তির ‘দু-আঁজলায় যতটুক ভালবাসা — মোলায়েম হয়’ শব্দবন্ধ উল্লেখ করে তাকে আরও
সংবেদনশীল করে তোলে। এখানে ভালবাসা পরিমিত, কোমল এবং স্পর্শযোগ্য।
‘নারীস্পর্শ সতর্ক করে
জীবনবোধির মনন’ পঙ্ক্তিতে শরীরী অনুভূতি কেবল কামনার বিষয় হয়ে থাকে না; তা আত্মসচেতনতারও উৎস হয়ে
জেগে ওঠে। নারীস্পর্শ যেন মননকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে। তবে ‘জীবনবোধির মনন’
শব্দবন্ধটি অর্থের দিক থেকে কিছুটা ঘন এবং বিমূর্ত। এর তাৎপর্য স্পষ্টতর হলে
কবিতার এই গুরুত্বপূর্ণ উপলব্ধিটি আরও কার্যকর হত ও পাঠক মনে উপলব্ধির স্পৃহা
বেড়ে যেত।
শেষ স্তবকে
কবিতাটি ব্যক্তিগত অনুভূতি থেকে অস্তিত্বের বৃহত্তর পরিসরে প্রবেশ করে। ‘অনুভূতি
এক আকাশ ভাষাহীন চেতনার অনুরাগ’ পঙ্ক্তিতে ভাষার সীমা অতিক্রম করে অনুভূতির
স্বাধীন বিস্তার প্রকাশিত হয়েছে। ‘খুশির পুরাণে অস্তিত্বের যোগসন্ধি সুনিপুণ’ পঙ্ক্তিটি
সুখ ও অস্তিত্বের মধ্যে এক গভীর সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করে। এখানে ‘পুরাণ’
ব্যক্তিগত অনুভূতিকে স্মৃতি ও আখ্যানের বৃহত্তর মাত্রা দেয়। অন্যদিকে ‘শিরোনামহীন
মুহূর্ত পুষি খুব গোপনে রূপরস’—এই পঙ্ক্তিতে কবির নান্দনিক চিন্তাচেতনার বিস্তার
ও আত্মপরিচয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নামহীন মুহূর্তকে লালন করার মধ্যে রয়েছে
ব্যক্তিগত স্মৃতি, গোপন প্রেম এবং
সৌন্দর্যকে নিজের মধ্যে ধারণ করার সুদৃঢ় প্রবণতা। শেষের ‘এতকিছু সাজানো তাও বেবাক
ভব-তালাশ…’ কবিতাটিকে আবার অনুসন্ধানের অনিশ্চিত পথে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এত
আয়োজনের পরেও জীবনের অনুসন্ধান শেষ হয় না।
তবে
কবিতা পাঠ করতে গিয়ে কিছু পঙ্ক্তিতে দুর্বোধ্যতা ব্যঞ্জনার পরিবর্তে অর্থের
প্রতিবন্ধক হয়ে উঠেছে। বিশেষত ‘আবালভূমি নাভিতে লুকিয়ে যায় ক্যামেরা থেকে’ এবং
‘জীবনবোধির মনন’-এর মতো অভিব্যক্তিতে শব্দের অভিনবত্ব থাকলেও তাদের পারস্পরিক
সম্পর্ক আরও সুসংহত করা সম্ভব। আধুনিক কবিতায় রহস্য অবশ্যই মূল্যবান, কিন্তু সেই রহস্যের ভিতরে
একটি অনুভবযোগ্য অন্তঃসংগতি থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি ‘বিষণ্ণতা’, ‘প্রেম’, ‘অস্তিত্ব’ ও ‘চেতনা’র মতো
বিমূর্ত অনুষঙ্গের সঙ্গে আরও কিছু ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দৃশ্য যুক্ত হলে কবিতাটি পাঠকের
মনে অধিক স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারত।
পরিশেষে, পর্যালোচনা করে সমগ্র কবিতার
ভেতর দুর্বোধ্য আওয়াজ ও শব্দের সারিবদ্ধ বিন্যাস পাঠককে বিভ্রান্ত করার যথেষ্ট
উপকরণ বিদ্যমান।
সামগ্রিক
বিচারে, এটি একটি
উচ্চাকাঙ্ক্ষী, আত্মমগ্ন ও নান্দনিক
অনুসন্ধানধর্মী কবিতা। এর
সাফল্য সরল বক্তব্যে নয়, বরং অনুভূতির বহুমুখী
সংঘাতে। প্রেম এখানে একই সঙ্গে শরীরী, মানসিক এবং দার্শনিক; বিষণ্ণতা এখানে কেবল
দুঃখ নয়, আত্মোপলব্ধিরও
ক্ষেত্র। কবিতাটি আরও সংহত শব্দপ্রয়োগ ও চিত্রকল্পের অন্তর্গত সম্পর্ককে দৃঢ়
করতে পারলে তার শিল্পমূল্য বৃদ্ধি পাবে।
‘মায়ানীড়ে অস্তিত্বের আকাশ’
শিরোনামে কবিতাটির অন্তর্লীন সুর সবচেয়ে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়। কারণ, শেষ পর্যন্ত এই কবিতা ভালবাসার
পূর্ণতা ঘোষণা করে না; বরং ভালবাসার ভিতর
দিয়ে নিজের অস্তিত্বকে বোঝার এক অসমাপ্ত, গোপন ও বিস্ময়কর যাত্রার কথাই বলে। দুর্বোধ্যতার ভেতর
আকাঙ্ক্ষাকে মেলে ধরার প্রয়াসে কবি কিছু দুর্বোধ্য শব্দের ব্যবহার কবিতার মান
উন্নত করতে সচেষ্ট হলেও খামতি থেকে যায়।
~~000~~

No comments:
Post a Comment