প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | সম্পাদকীয় | রাজতন্ত্র

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/ সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক , ১৪৩৩ দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা সম্পাদকীয়   রাজতন্ত্র ...

Saturday, October 24, 2026

সেই পুজো আর ফিরে আসে না | আদিত্য ভৌমিক

বাতায়ন/দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা/অন্য চোখে/৪র্থ বর্ষ/২০তম সংখ্যা/১০ই কার্ত্তিক, ১৪৩৩
দেবকুমার মুখোপাধ্যায় সংখ্যা | অন্য চোখে
আদিত্য ভৌমিক
সেই পুজো আর ফিরে আসে না

এখন পুজোর ছবি তোলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়া হয়, কে কোথায় গেলাম তার হিসাব থাকে। অথচ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময়টা যেন কমে গেছে।

 
শরতের আকাশে সাদা মেঘ দেখলেই আজও বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। কাশফুলের দোলা, শিউলির গন্ধ আর দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ যেন কোথা থেকে পুরোনো দিনের দরজা খুলে দেয়। সেই দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের ছোটবেলা।
 
কত বছর আগের কথা! তখন দুর্গাপূজা মানেই ছিল নতুন জামাকাপড়ের আনন্দ। পুজোর কয়েক দিন আগে থেকেই নতুন জামার গন্ধটা নাকে লেগে থাকত। মা যত্ন করে জামাটা তুলে রাখতেন। আর আমরা বারবার আলমারি খুলে দেখে আবার রেখে দিতাম।
 
ষষ্ঠীর সকাল থেকেই মনটা কেমন ছটফট করত। কখন নতুন জামা পরব, কখন প্যান্ডেলে যাব, কখন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে! সন্ধ্যা নামলেই পাড়ার পূজামণ্ডপে ভিড় বাড়ত। চারদিকে আলো, ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর মানুষের হাসি। পরিচিত মুখগুলো একে একে দেখা যেত। কারও হাতে নতুন খেলনা, কারও হাতে বেলুন, কারও চোখে নতুন জামার উচ্ছ্বাস। তখন আনন্দের জন্য খুব বেশি কিছু লাগত না। একটা নতুন জামা, দুটো ফুচকা, কয়েকজন বন্ধু আর মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ। এই দিয়েই যেন পুরো পৃথিবীটা সুন্দর হয়ে উঠত। রাত বাড়লে বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করত না। মা দূর থেকে ডাকতেন, “অনেক হয়েছে, এবার বাড়ি আয়।” আমরা বলতাম, “আর একটু থাকি মা!” সেই আর একটু কখন যে আরও এক ঘণ্টা হয়ে যেত, তা বুঝতেই পারতাম না। পুজোর দিনগুলোতে পকেটে টাকা থাকত সামান্য। তবুও মনে হতো আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ। অল্প কিছু টাকা দিয়ে কিছু কিনে বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে খাওয়ার আনন্দটা আজকের অনেক দামী খাবারের মধ্যেও খুঁজে পাই না।
 
তারপর সময় বদলে গেল। ছোটবেলা পেরিয়ে আমরা বড় হয়ে গেলাম। নতুন জামা এখনও আসে, পুজোর আলো এখনও জ্বলে, মণ্ডপ এখনও সাজে, ঢাক এখনও বাজে। চারপাশে আগের চেয়ে অনেক বেশি আয়োজন। শুধু কোথায় যেন সেই আনন্দটা আর খুঁজে পাই না। এখন পুজোর ছবি তোলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি দেওয়া হয়, কে কোথায় গেলাম তার হিসাব থাকে। অথচ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সঙ্গে মন খুলে কথা বলার সময়টা যেন কমে গেছে। আগে পুজো শেষ হলে মন খারাপ হতো, কারণ আনন্দের দিনগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছিল। এখন পুজো শেষ হলে মন খারাপ হয় অন্য কারণে। মনে হয়, আমরা হয়তো পুজোর আনন্দকে নয়, আমাদের শৈশবকেই হারিয়ে ফেলেছি। আজও শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসে। কাশফুল দোলে। শিউলি ঝরে। ঢাকের শব্দে চারদিক মুখর হয়ে ওঠে। সবই আছে। শুধু কোথায় যেন সেই ছোট্ট মানুষগুলো নেই, যারা সামান্য আনন্দকেও দুহাত ভরে গ্রহণ করতে জানত। তাই প্রতি বছর পুজো এলে মনে মনে সেই পুরোনো দিনগুলোর কাছে ফিরে যাই। চোখ বন্ধ করলে এখনও দেখতে পাই, নতুন জামা পরে ছোট্ট আমি পাড়ার মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে আলো, মানুষের ভিড়, ঢাকের শব্দ আর অদ্ভুত এক আনন্দ। হয়তো সেই পুজো আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। তবু শরতের বাতাসে যখন শিউলির গন্ধ ভেসে আসে, মনে হয় পুজো আসলে হারিয়ে যায়নি, হারিয়ে গেছে শুধু আমাদের সেই ছোটবেলাটা।
 
~~000~~
 
 

No comments:

Post a Comment

নাবিকের খোঁজে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)