প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, September 9, 2023

ঋণী | সাগরিকা রায়

বাতায়ন/ধারাবাহিক/১ম বর্ষ/১৮তম সংখ্যা/২২শে ভাদ্র, ১৪৩০

ধারাবাহিক গল্প
সাগরিকা রায়

ঋণী

[তৃতীয় পর্ব]

পূর্বানুবৃত্তি সব কাজ ভুলে যাচ্ছে মোহনা। কর্ণ নামের অভদ্র নিষ্পাপ মুখের মানুষটার কথা মনে এলেই জ্বলে যাচ্ছে মাথা। বিতানকে মা খুব পছন্দ করলেও একেবারেই পছন্দ করে না মোহনা। মোহনা চাকরি করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। মন ভাল করার জন্য ব্রেকআপের পর ভেঙে না পড়া তুতো বোন রায়াকে ডেকে নিল মোহনা। হঠাৎ বিতান এসে হাজির। তারপর…

বুক থেকে ভার নেমে যাওয়ারই কথা, কিন্তু মনে অদ্ভুত কথা এল। তবু তো বিতান ছিল আশেপাশে। এখন আরও বেশি করে নিঃসঙ্গ লাগবে না? এই বিশাল আকাশে মোহনা কি একা একা একটা সার্কেলে ঘুরে বেড়াবে? একা পাখিটার মতো!

দেওয়ালে ঝোলানো কনট্রাস্ট কালারের ওয়াল হ্যাঙ্গিং থেকে গুচ্ছের পুরনো কার্ড বের করে মোহনা। কর্ণ একটা কার্ড দিয়েছিল ওকে। কোথায় যে রেখেছে সেটা! আজ মাঝে মাঝে মনে হয় সম্পর্কের সিরিয়াসনেসটা ওরা দু’জনের কেউই বোঝেনি। কর্ণর সেন্স অফ হিউমার মুগ্ধ করেছিল মোহনাকে। সম্পর্কের গতি কোনদিকে যাচ্ছে, বুঝতেই পারেনি ওরা। বিতানের কথা বলেছিল মোহনা কর্ণকে। কর্ণ খানিক চুপ থেকে মোহনার মত জানতে চেয়েছিল, “এক্সপ্রেস ইয়োর থটস।”
মোহনা অন্যমনস্ক সুরে বলেছে, “আমি কিছুই ভাবিনি।”
“সে কী? বিতান তো ভেবে বসে আছে। তুমি কি ওকে নাচাচ্ছ? এই তোমাদের স্বভাব। না নাচালে ভাল লাগে না!” কর্ণর গলায় উষ্মা টের পেয়ে অবাক হয়েছিল মোহনা। কর্ণ কি ওকে কিছু বলতে চায়?
“চাই। খুব জরুরি কথা। তোমার কি একটু সময় হবে?” দামি রেস্টুরেন্টে গিয়েছিল ওরা সেদিন। সফট ইন্সট্রুমেন্টাল ট্র্যাক, ক্যালেডিয়োস্কোপিক আলোয় জোড়া পায়রার বকম বকম চলছে মৃদু। পরিবেশ দেখে বুক দুরুদুরু মোহনার। অথচ বিতানের সঙ্গে বেড়াতে বেরিয়েছে যখন, কখনও এমন করে ঢাকঢোল বাজায়নি ওর হার্ট। হার্টের নিলয়-অলিন্দে সোরগোল পড়ে যায়নি তো।

“কী নেবে?” কর্ণ জানতে চেয়ে ওর দিকে তাকিয়েছিল। মোহনা থতমত, “যা হোক, কি-কিচ-ছু!”
“শরীর খারাপ নাকি?” কর্ণ উদ্বিগ্ন।
“না। ঠিক আছে।”
কর্ণ মোহনার হাতে হাত রেখেছিল, “ভয় করছে? জাস্ট কফি খাব। সঙ্গে স্ন্যাক্স। তারপর কথা। তুমি কি আন ইজি ফিল করছ?”
মাথা ঝাঁকিয়েছে মোহনা, “না, না। বলো। আমি শুনছি।” বলেই লজ্জায় চোখ নত। ওর মুখ নিচু করে নখের নেইল পালিশের মসৃণতা পরখ করছিল ও।
কফিতে একটা সিপ দিয়ে কর্ণ বলল, “একটা কথা বলব। অন্য ভাবে নেবে না আগেই বলে রাখছি।”
মোহনা কেঁপে উঠেছে। বলছে না কেন কর্ণ! মোহনা ঘেমেনেয়ে যাচ্ছে যে!
“আমাকে… কিছু টাকা দিতে পারবে? এই ধর পঁচিশ হাজার? খুব দরকার। আমি এখানে টাকা চাইবার মতো ঘনিষ্ঠ কাউকে পাচ্ছি না। তুমি ছাড়া। দেবে?”

প্রথমে মনে হল শরীরের সব রক্ত পায়ে নেমে আসছে। কর্ণ তাকিয়ে আছে দেখে সামলাতে হল চটপট নিজেকে।

“নেই না? তাই তো! তুমি এত টাকা…?”

কর্ণর অসহায় মুখ দেখে খারাপ লেগেছিল। কর্ণ বলেছে মোহনা ছাড়া এমন কেউ ঘনিষ্ঠ ওর নেই, যার কাছে টাকা চাইতে পারে ও। মোহনা আজ নিজের মনকে চিনেছে। ভাগ্যিস, কর্ণ থট রিডিং জানে না।

“পারব। আমার নিজস্ব কিছু আছে। পঁচিশ দিতে পারব।”
স্বস্তিতে উজ্জ্বল হয়েছিল কর্ণর মুখ, “বাঁচালে। আমি যত তাড়াতাড়ি পারি শোধ করে দেব।”
মোহনা ভ্রূ তুলেছে, “আমি সেটা বলিনি।”
“আমি বলছি। সেটা আমার দায়িত্ব।”

আস্তে আস্তে টাকা মিটিয়েই দিচ্ছিল কর্ণ। কেন টাকাটা নিয়েছিল কর্ণ, জানতে চায়নি মোহনা। পনেরো হাজার পর্যন্ত মিটিয়ে ঢিলেমি শুরু করেছিল কর্ণ। দেখাশোনা কমে আসছিল ক্রমে। ফোনেও সবসময় পাওয়া যায় না কর্ণকে। মোহনা ভিতরে ভিতরে অস্থির হচ্ছিল। তখন একদিন রায়া এসেছিল। এ-কথা সে-কথার পরে রায়া জানতে চেয়েছে, “তোর কি ব্রেকআপ হয়ে গেছে?”

“মানে?” মোহনা ঠিকঠাক বুঝতে পারেনি কথাটা।
“তোর ফ্রেন্ড কর্ণকে দেখলাম একজন হিরোইন টাইপ মেয়ের সঙ্গে মেট্রোতে। কবি সুভাষের দিকে যাচ্ছিল। আমি ক্ষুদিরামে নেমে গেলাম। ওরা নামেনি। আর মেয়েটার হাত ধরেছিল কর্ণ।”

রায়া চলে গিয়েছিল একটা ধ্বংসস্তূপকে পিছনে ফেলে। হতাশার জলে ডুবে গিয়েছিল মোহনা। কাউকে কিছু বলতে পারেনি। কিন্তু কর্ণকে খুঁজে ফেরে ও। মাঝে নিজে থেকে দেখা করে টাকার কথা তুলেছিল কর্ণ, “তোমার বাকি টাকা মিটিয়ে দিলেই আমি দায় মুক্ত। কাল ফোন করেছিলাম। রিসিভ করলে না। তারপরে যতবার করি, সুইচড অফ। কী হয়েছে?”

কোন কথাই বলেনি ও কর্ণকে। কিন্তু রাস্তায় হোক, যেখানে-সেখানে দেখতে পেলেই চেঁচিয়ে টাকা চায় মোহনা। কর্ণ ওর ব্যবহারে আহত-নিহত যা-ই হোক, মোহনা দেখতে যাবে না। কর্ণ ওর কেউ না। দাতাগ্রহীতা ছাড়া আর কোন সম্পর্কই নেই ওদের মধ্যে। একটা প্রতারক! সেদিন কর্ণ বিষণ্ণ মুখে বলেছে, “তুমি কোন সাইক্রিয়াটিস্টকে দেখাও। টাইম ইজ দ্য বেস্ট ফ্যাক্টর। অসুখ সেরে যাবে।”

“মনে হয় আপনার দেখানো দরকার। একজন উওম্যানাইজার।”
“মানে?”
“মানেটা মেট্রোতে বসে যার হাত ধরেছিলেন, তাকেই জিজ্ঞেস করুন।”
অবাক চোখে মোহনাকে দেখছিল কর্ণ, “আমার পেছনে স্পাইং চলছে? এনিওয়ে, যার সঙ্গে যাই, তোমার রেগে যাওয়ার কী হল?”

জবাব দিতে না পেরে জ্বলেছে মোহনা। এভাবে কর্ণর কাছে নিজেকে প্রকট না করলেই হত! অদ্ভুত ভাবে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে কর্ণ। মোহনা ছাড়বে না। কী করে টাকা উদ্ধার করা যায় দেখে নেবে।

এসএসসি দেবার জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছিল মোহনা। মা বিয়ের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। সার্ভে পার্কে পিসির কাছে গেছে আজ। পিসির হাতে ভাল ছেলে আছে। ওরা মোহনার ছবি দেখে পছন্দ করেছে। পুজোর পরেই বিয়ে লাগিয়ে দেবে। মনমেজাজ বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে কেন কে জানে! মোহনা কাফেটেরিয়াতে যাচ্ছিল সময় কাটাতে। অর্ণার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল পুজো প্যান্ডেলের সামনে। অর্ণা অবাক হয়েছিল, “তুই এখানে? পুজো মার্কেটিং শেষ হয়নি? আজ সপ্তমী কিন্তু। পার্লারে যাবি তো?”

একটু পরে হেসে বলেছে, “তোর বয়ফ্রেন্ডকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি।” মোহনা বিতানের কথা ভেবেছে। কিন্তু অর্ণা ভুল সংশোধন করে দিল, “সেই পিকনিক-ফ্রেন্ড।”
“ও আর ফ্রেন্ড নেই এখন।” মোহনা হেসেছে। অর্ণা অবাক, “শুনেছিলাম তোরা বিয়ে করছিস।” জবাব দিল না মোহনা। পুজো প্যান্ডেলের ঢাক বাজছিল বুকের মধ্যে। বিস্বাদ মনে বাড়িতে ঢুকতেই হতবাক হয়ে গেল! সোফায় বসে বাবার সঙ্গে কথা বলছিল কর্ণ। মোহনাকে দেখে হাসল, “এসে গেছ? একটু কথা ছিল।”
“কী কথা?” কথা জড়িয়ে যাচ্ছে মোহনার। কর্ণ এখানে কেন?
“তোমরা কথা বল।” বাবা উঠে যেতেই মোহনা কড়া চোখে তাকাল, “আমার সঙ্গে কোন কথা নেই।”
কর্ণ ভ্রূ তুলল, “সে কী? রাস্তাঘাটে টাকা টাকা করে লোক জমিয়ে দিচ্ছ, কথা নেই বললে হবে?”
“কথা মানে ওটাই। আই জাস্ট ওয়ান্ট মাই টেন থাউজেন্ডস ব্যাক টু মি।”
“ওটা তুমি ভোলনি।”
“না।”
“আমার থেকেও বেশি সেটা?”
“মানে? হাজার গার্ল ফ্রেন্ড নিয়ে ঘুরে ফের ন্যাকামি করতে আমার কাছেই আসতে হল?”
“কথা সামলে। যাকে দেখেছ…”
“সে আপনার বোন।”
“নিশ্চয়ই। তাছাড়া গার্ল ফ্রেন্ড হলেই বা কী হত? তুমি আমাকে নয়, টাকা ভালবাস। দশ হাজার টাকার জন্য পাগল! নাও।” ব্যাগ থেকে টাকা বের করে কর্ণ, “শোধ বোধ।”

মোহনা কর্ণর বাড়ানো হাতের টাকা নিতে হাত বাড়িয়ে দেয় না।
“কী হল?”
“টাকা দিয়ে চলে যাবে তো? নেব না টাকা। চাই না।”
“মানে কী? এই টাকার জন্য রাস্তায় বের হতে ভয় হত। এখন শোধ যখন করে দিতে চাচ্ছি, তখন…?”
“টাকা দিয়ে চলে যাবে। আর আসবে না। ওই দশ হাজারের জন্যই তবু রিলেশন টিকিয়ে রেখেছি। নেব না টাকা। সারাজীবন ঋণী থেকে যাবে আমার কাছে।”
“মানে?”
“কোন কিছুই এই দশ হাজার টাকার থেকে বেশি নয়।” মোহনার জল টলমল চোখে শরতের আলো, “এ টাকা খরচের জন্য নয়। রেখে দাও।”

কর্ণ হাসে। মোহনা কাঁদে। টুপটাপ শিউলি ঝরে গাল বেয়ে।

 

সমাপ্ত


1 comment:

  1. বাহ্ সুন্দর একটি গল্প ।

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)