প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Tuesday, May 5, 2026

প্রলেপ | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
প্রলেপ

"অনিমেষ বোঝেন প্রায় সমবয়সি মানুষটার কষ্ট। বাড়ি থেকে এভাবে চলে আসার অপমাননিজের ঘর ছেড়ে থাকার দুঃখ মেনে নিতে পারছেন না। হায় রে বোকা মানুষআপন বলে নিজের বলে তো কেউ হয় না।"

 
নীল রঙের গাড়িটা ধীরে ধীরে চোখের বাইরে চলে গেল, একরাশ ধোঁয়া রেখে। মাধবীদেবী একবার গেটের দিকে তাকালেন, আহ! গোলাপি রঙের কত বাহার। তবে সবগুলোই কী গোলাপি রং? নাতি বাবু তো বোগেনভোলিয়ার এই গোলাপি রংটাকে বলেছিল বলতে রাণী কালার।
-পিসি-ঠাম্মা দেখো এই লাল আর সাদা রং মিশে হয়ে গেল নতুন রং। একে রাণী কালার বলে।
কণিকা, মাধবীদেবীর একমাত্র বউদি বলেছিলেন,
-রাণী কেন রে? শুধু রাণীরাই এই রংটা ব্যবহার করে বুঝি!
সাত বছরের টুবলু বুঝেছিল ঠাম্মা মজা করছে। সব রংটা পিসি-ঠাম্মার গালে মাখিয়ে ধুপধাপ করে চলে গিয়েছিল। হাসতে হাসতে বউদি বলেছিল,
-ছোঁড়া আজ বেজায় চটেছে। দ্যাখো এখন মা-র কাছে নালিশ করবে।
মাধবীদেবীর ডানগালে রংটা লেগেছিল। আজও আচমকা হাতটা উঠে আসে গালে, তবে গাল আজ শুকন।
মাধবীদেবীর নামের ফুলগুলোর একবার গন্ধ নেন বুক ভরে। কী মিষ্টি গন্ধটা! আহ! মাধবীদেবী ভাবেন, রঙেরা কীরকম একে অন্যের মধ্যে মিশে যায় না! মানুষ কিন্তু নিজেকে ভুলে এইভাবে মিশতে পারবেই না। বোধহয় মানুষের আত্মসম্মান বোধ আছে বলে। সে বোধহয় সবচেয়ে বেশি নিজের অস্তিত্বটাকেই ভালোবাসে। তাই কোথাও গিয়ে মানুষকে একা হয়ে যেতে হয়। এটাই মনে করেন মাধবী। গেটটা খোলার আগে দেওয়ালের ফলকটার দিকে তাকালেন আনন্দ আশ্রমমাধবীদেবীর বর্তমান ঠিকানা।
 
ব্রতীনের শ্বশুরবাড়িতে অন্নপূর্ণা পুজো ছিল, এগারোটা নাগাদ একটা ক্যাব বুক করে চলে গিয়েছিলেন লেকটাউনে। একে গরম তার ওপর তিয়াষার মা-র অনুরোধে একটু গুরুভোজনই হয়ে গিয়েছিল, ভেতরে ভেতরে শরীরটা হাঁসফাঁস করছিল। চলেই আসছিলেন, বউমা বলল ড্রাইভার আছে, পৌঁছে দেবে। ব্রতীনের সঙ্গে দেখা হল না, সন্ধ্যায় আসবে ও অফিস ছুটির পর। বেয়ান পরমান্নটা সাথে দিয়ে দিলেন, ফ্রিজ আছে মাধবীদেবীর ঘরে। ছোট্ট ফ্রিজ, সেখানে রেখে দেবেন। নুড়ি-পাথর মাড়িয়ে এগিয়ে চললেন নিজের ঘরের দিকে।
 
আনন্দ আশ্রম, এই বৃদ্ধাবাসটি গড়িয়া ছাড়িয়ে নরেন্দ্রপুরের দিকে। অনেকখানি জায়গা নিয়ে তৈরি হয় বছর সাত-আট আগে। নরেন্দ্রপুর আগে তো রামকৃষ্ণ মিশনের জন্য বিখ্যাত ছিল, ঘুরতেও এসেছিলেন দাদা-বউদি থাকতে। জন্মেও ভাবেননি এখানেই একদিন উঠে আসতে হবে। সবই কপাল আর কী! তবে এখানে পরিষেবাটি খুবই ভালো। সেই দিকে কোনো অভিযোগ নেই আবাসিকদের। পয়সা হয়তো বেশি লাগে তবে আবাসিকদের শারীরিকভাবে সুস্থ রাখার সাথে পরিচালন সমিতি মানসিক স্বাস্থ্যেরও খেয়াল রাখেন। গল্প পাঠের আসর, গানবাজনা হয়। বাইরে থেকে বক্তারা আসেন কীভাবে একা অথবা নতুন জীবনকে এই জীবন সীমান্তে এসে আবসিকরা উপভোগ করতে পারেন সেটাও শেখান। একা হয়ে যাওয়া, বাতিল হয়ে গেলাম আপনজনের কাছে সে আতঙ্কে না ভুগে।

সবই ভাল, শুধু মাধবীর মনে হয় বৃথা এই আয়োজন, যাদের ঘর থাকতেও ঘরে জায়গা হলো না, তাদের মানসিক কষ্ট বোঝার চেষ্টা হয়তো সবাই মিলে করছেন, তবু কোথাও ফাঁক থেকে যাচ্ছে। এটা অবশ্য একান্তভাবে মাধবীদেবীরই হয়তো মনে হয়। অবশ্য মাধবীদেবীর কি সেই অর্থে ঘর ছিল? চায়ের কাপটা নিয়ে সন্ধ্যায় বারান্দায় এসে বসেন মাধবীদেবী। লেকটাউন থেকে ফিরে আগে ভালো করে আবার স্নান করলেন, তারপর হজমের ওষুধ খেয়ে একটু শুলেন। কেয়ারটেকার ছেলেটার নাম গৌরব, বয়স বছর সাতাশ-আটাশ। ব্রতীনের থেকে প্রায় বারো বছরের ছোটো, পল সায়েন্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে ছেলেটা, সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিচ্ছে তবে হাসিখুশি ছেলেটা বলে না পেলেও ক্ষতি নেই। এখানে কাজ করতে ওর মোটেও খারাপ লাগে না। ছমাস ধরে মাধবী চেষ্টা করছেন এখানে মন বসাতে, সেই চেষ্টা যে সফল হচ্ছে না টের পায় গৌরব, হাসতে হাসতে বলে,
-আমাদের আর এই জায়গাটাকে ভালোবেসে ফেলবে দেখো, একটু সময় দাও।
 
আজ অনিমেষবাবুর জন্মদিন। অনিমেষবাবুর সঙ্গে মুখের আলাপ আছে, বিয়েশাদি করেননি। কলেজে পড়াতেন হাওড়ার দিকে। পৈতৃক বাড়িতেই থাকতেন, সেখান থেকে যাতায়াত করতেন, দূরেই ছিল কলেজ বর্ধমানের দিকে, তবু নিজের বাড়ি ছাড়ার কথা কোনোদিনও ভাবেননি। কিন্তু ভাইয়ের হঠাৎই ঘর কম পড়তে লাগল অবশ্যই রিটায়ারমেন্টের পর অনিমেষবাবুর। ভাইয়ের বউয়ের মনে হতে লাগল বেশি পরিশ্রম হচ্ছে, তারও তো বয়স হচ্ছে। এছাড়া মেয়ে-জামাই এলে থাকবে কোথায়? এতদিন তো জামাই ছিল না। বুল্টির ওই ছোটো এক ফালি ঘরে ওরা শোবে কী করে?

সত্যি গভীর সমস্যা! হাসতে হাসতে খাওয়ার টেবিলে গল্পগুলোই করছিলেন অনিমেষবাবু। খবরের কাগজে বিজ্ঞাপনটা চোখে পড়েছিল আগেই, নিজে এসে খোঁজখবর নিয়ে চলে এলেন বছর তিন আগে। সত্তর ছোঁয়ার অনেক আগেই বৃদ্ধাশ্রমে একটু মনটা খচখচ করছিল, একা একটা ফ্ল্যাটে উঠে যেতেই পারতেন, রিটায়ার করে টাকা ভালই পেয়েছেন, পৈতৃক বাড়ির অংশ বিক্রি করে দিয়েছেন ভাইকে, পেনশনও ভালোই পান। তবু সারাদিন একা থাকা, গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে নিজের শ্বাস ছাড়া সঙ্গী কেউ নেই সেই একটা ভয়, তার ওপর যুক্ত হলো  শরীর খারাপ নিয়ে আতঙ্ক। তাই ভাবলাম অসুখে সেবাটা তো পাব। কিন্তু এখন তো দেখি সেবার সাথে ভালোবাসা ফ্রি! হা হা…
 
খাবার ঘরে সেদিন সবাই সায় দিচ্ছিলেন, সবারই একই গল্প, শুধু কুশীলবরা আলাদা এই যা। তবু মাধবীদেবীর বুকে জমে আছে একরাশ অভিমান। মনের ভেতরটা এখন খরা জমির মতো ফুটিফাটা। কেন হবে না অভিমান? বিয়ে করেননি চাকরি করেছেন, আজীবন নিজের খরচ নিজে টেনেছেন। এমনকি দাদাকে টালিগঞ্জের করুণাময়ী মন্দিরের কাছে একতলা বাড়ি করার সময় অর্থ সাহায্য করেছেন। তারপরও মাধবীর রক্ত জল করে বানানো টাকার বাড়িতে মাধবীরই জায়গা হলো না। দাদা-বউদি চলে যাওয়ার পর তাঁকেও বেরিয়ে আসতে হলো। ব্রতীনের খুবই বিবেচনা অর্থ সাহায্য করতে চেয়েছিল, মাধবী নেননি। নেবেনও না কোনোদিন।
 
-ম্যাডাম ঝড়ের মধ্যে করেন কী? ঘরে আসুন।
বার্থ ডে বয়। টুবলুর জন্মদিনে বউদির সঙ্গে গিয়ে করুণাময়ী কালীবাড়িতে পুজো দিতেন। পায়েস রান্না করা নিয়ে তিয়াষার সঙ্গে বউদির মনোমালিন্য দেখে হাসতেন, জন্মদিনের কেকটা অবশ্য নাতি বাবুকে তাঁর পিসি-ঠাম্মাই উপহার দিত। এবারের জন্মদিন কী হবে কে জানে! তবে মাধবী কোনো হ্যাংলামি করবে না।
-ও ম্যাডাম কী ভাবেন, দেখুন এক্ষুনি জোরে বাজ পড়বে! কোন খেয়ালে থাকেন ঝোড়ো হাওয়া টের পাননি?
কথার রেলগাড়ি ছুটিয়ে দেন অনিমেষবাবু। মাধবী দেখেন নারকেল গাছের পাতারা প্রবল আনন্দে আজ দুলছে, যেন মজার খেলা পেয়েছে! সেই ছোট্ট ব্রতীনকে শাড়ি দিয়ে দোলনা বানিয়ে দোলাতেন। নারকেল গাছের পাতারা সেইরকম ছোট্ট ব্রতীন সব। নাকে আসে বৃষ্টির গন্ধ! গায়ে একটু একটু ছাঁট লাগছে। মাধবী লক্ষ্য করেননি অজান্তেই তিনি বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মাখতে মাখতে হাসছেন

অনিমেষ বোঝেন প্রায় সমবয়সি মানুষটার কষ্ট। বাড়ি থেকে এভাবে চলে আসার অপমান, নিজের ঘর ছেড়ে থাকার দুঃখ মেনে নিতে পারছেন না। হায় রে বোকা মানুষ, আপন বলে নিজের বলে তো কেউ হয় না।
-ম্যাডাম, হাতটা পাতুন তো একবার।
চমকে যান মাধবী, তবে হাতও পাতেন। দুষ্টু দুষ্টু হাসিতে অনিমেষ মাধবীর হাতে তুলে দেন রঙিন চকলেটের গুলির একটা ছোট্ট প্যাকেট। হো হো করে হাসতে হাসতে বলেন,
-ব্রতীন ছোটোবেলায় এই জেমস খাওয়ার কী বায়না করত আমার কাছে জানেন অনিমেষবাবু?
-তাই নাকি! আচ্ছা চলুন কেক কাটব সবাই অপেক্ষা করে আছে।
-আচ্ছা আপনি এগোন আমি একটু শাড়িটা বদলে আসছি। ভিজে গেছে।
ঘর থেকে শোনেন হলঘরের হইচই বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে। ফ্রিজটা খোলেন মাধবী টিফিন কৌটোটা বের করেন। পরমান্ন। এটাই হোক তবে ব্রতীনবাবুর জন্মদিনের পায়েস। নিজেকে একটু সাজিয়ে নিয়ে, হলঘরের দিকে এগিয়ে যান মাধবী হলঘর থেকে ভেসে আসছে তখনহ্যাপি বার্থডে টু ইউ...
গলা মেলাতে থাকেন মাধবীদেবী।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 9 (Last 7 days)