বাতায়ন/গদ্য/১ম বর্ষ/১৮তম
সংখ্যা/২২শে ভাদ্র, ১৪৩০
গদ্য
উপেক্ষিৎ শর্মা
অন্যরকম [২]
বোধোদয়
একটু গোড়া
থেকেই শুরু করছি। আমাদের এগারো ক্লাসে HS ছিল, সবাই জানেন। HS পাশ করে কলেজের হোস্টেলে গিয়ে দেখি বন্ধুদের মধ্যে একটা বিদেশিয়ানার
ঝোঁক। কেউ ক্লিফ রিচার্ডস, হ্যারিস বেলাফন্টে, টিরনি লোপেজর গান গুণগুণ করছে, কেউ-বা
বার্ট ল্যাংকাস্টার, গ্রেগরি পেক, কার্ক ডগলাস-এর ফিল্ম যেমন স্যুইমার, মবিডিক,
স্পার্টাকাস নিয়ে আলোচনা করছে। কেউ কেউ জেমস হাডলি চেজ বা হ্যারল্ড রবিন্স-এর নভেল
বালিশের তলায় রেখে দিয়েছে, পড়ছে কিনা অবশ্য জানি না। সাহিত্যের ঝোঁক বরাবরই একটু
ছিল, তবে সাহিত্য সম্বন্ধে ঠিক সে-ভাবে সচেতন ছিলাম না তখন। লুকিয়ে-চুরিয়ে
প্রেমের কবিতা লেখা আর বন্ধুদের প্রেমপত্র লিখে দেওয়া, এই ছিল আমার তখনকার
সাহিত্যচর্চা।
আর ইংরেজি পড়ার দৌড় সিলেবাসের বাইরে, টেলস ফ্রম টেগোর, টেলস ফ্রম শেকসপিয়র আর ফার্স্ট
ইয়ারে পড়া জেবিএস-এর আর্মস এণ্ড দ্যা ম্যান। তবু দু’-একটা হাডলি চেজ আর হ্যারল্ড
রবিন্স-এর লেখা পড়তে শুরু করলাম এর-ওর-তার কাছ থেকে চেয়ে। ভাল লাগেনি। একেবারেই
ভাল লাগেনি। পরে একটু বিদেশি সাহিত্যের দিকে ঝোঁক হল। মম, মোঁপাসা, টলষ্টয়,
কাম্যু, মোরাভিয়া, গোর্কি পড়ছি। নিজেকে খুব আঁতেল আঁতেল মনে হচ্ছে। একদিন রাত্রে সামারসেট
মমের একটা বই নিয়ে পড়ছি, আমার রুমমেট এসে জিজ্ঞেস করল,
—
কী রে, কী পড়ছিস?
— এই
মমের একটা বই,
দ্য রেজার্স এজ।
— ‘সন্দীপন
পাঠশালা’ পড়েছিস?
— না
রে। কার লেখা?
— তারাশঙ্কর
বন্দ্যোপাধ্যায়-এর। নাম শুনেছিস তো? একটু আঁতে ঘা লাগল, বললাম,
— হ্যাঁ, কেন
শুনব না? যদিও তখন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় আমার কাছে একজন জি.কে মানে জেনারেল
নলেজের বিষয়। জি.কের ফাণ্ডা থেকে গলা ভারী করে গড়গড় করে বলে দিলাম, তারাশঙ্কর
বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন প্রথম বাঙালি জ্ঞানপীঠ পুরস্কার প্রাপ্ত সাহিত্যিক। ১৯৬৬ সালে
তাঁর ‘গণদেবতা’ উপন্যাসের জন্য তিনি এই পুরস্কার
পেয়েছেন। এছাড়া তিনিই প্রথম সাহিত্যিক যিনি সাহিত্যকে বা
লেখালেখিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেছেন... ইঃ।
— তাহলে এটা পড়ে
দেখতে পারিস।
— ঠিক আছে, দিস।
পড়া শুরু
করলাম সন্দীপন পাঠশালা। আপনারা সবাই জানেন গল্পের শুরুতেই গল্পের নায়ক সীতারাম
একটা প্রচলিত গল্প দিয়ে শুরু করেছেন। গল্পটা
এরকম,
এক জ্যোতির্বিদ
অন্ধকার রাত্রে আকাশের নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে পথ চলতে গিয়ে একটা কুয়োর মধ্যে পড়ে
গিয়েছিল। তাকে যে ব্যক্তি উদ্ধার করেছিল, সে
তাকে উদ্ধার করেই ক্ষান্ত হয় নাই, সঙ্গে একটি অমূল্য উপদেশও দিয়েছিল। বলছিল, ‘বাপু
হে, মাটির খবর জান আগে, তারপর আকাশের দিকে তাকিইয়ো।’ পড়ে মনে হল, আমার পিঠে যেন সপাং করে একটা চাবুকের ঘা পড়ল। কোমর সোজা করে আরেকবার উপদেশটা পড়লাম।
যেন মনে হল লেখক বুঝি আমার উদ্দেশ্যেই উপদেশটা দিয়েছেন। ভাবলাম, সত্যিই তো, মাটির
খবর না জেনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আমি কী দেখছি! বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ,
বিভূতিভূষণ, মানিক, তারাশঙ্কর না পড়ে মম মোপাসা টলস্টয় পড়ছি! ছি! নিজেকেই ধিক্কার
দিতে ইচ্ছে করল। আমার বোধোদয় হল যেন। নতুন করে চৈতন্যের
উন্মেষ ঘটল বলা যায়। এর জন্যে আমার রুমমেটকে অনেক অনেক
ধন্যবাদ। সন্দীপন পাঠশালা শেষ করে গণদেবতা পড়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে রইলাম।
এর মধ্যে
একদিন বিকেলে ক্লাশ থেকে ফিরে বিকেলের চা-জলখাবার খাচ্ছি, শরতের মন-উশখুশ হাওয়া
সবে বইতে শুরু করেছে, ফুরফুরে মেজাজে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছি, আমার রুমমেট রাঢ়বঙ্গের বাউলের নির্লিপ্তি নিয়ে এসে ঘোষণা করল,
‘তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় চলে গেলেন’। তারিখটা মনে আছে, ১৪ই সেপ্টেম্বর ১৯৭১। খবরটা
শুনে কেমন যেন থম্ মেরে গেলাম। কখন, কোথায়, কীভাবে, এই সব স্বাভাবিক প্রশ্নগুলো
অবান্তর মনে হল। একটা কিছু অপূর্ণতার হতাশায় আবিষ্ট হয়ে রইলাম। আসলে ইচ্ছে ছিল,
গণদেবতা লেখাটা পড়ে একদিন ওনার বাড়িতে দেখা করতে যাব। তারপর, তারপর একটা কবিতা
লিখেছিলাম, জানি না সেই দিনই না অন্য কোন দিন, তবে ওনাকে স্মরণ করেই লেখা...
সমাপ্ত
আন্তরিক লেখা। বেশ ভালো লাগলো।
ReplyDelete