মৃত বসন্ত
পাঁচ-ছ দিন হোলো কালীপুজো শেষ হয়েছে। প্যান্ডেলের নেড়া নেড়া বাঁশগুলো একপাশে ল্যাম্পপোস্টের আলো আর এক পাশে অন্ধকার নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে। গাছের পাতার উপরে ধোঁয়া ধোঁয়া আলো নিয়ে কুয়াশা চুঁইয়ে পড়ছে। কিছু ঘুমন্ত বাড়ির গায়ে ঝোলানো কিছু টুনি, বার বার রং বদল করেই চলেছে। যেন শব্দ বিহীন এক রাতকে ঠমক দেখিয়েই চলেছে। দূর থেকে ভেসে আসা আবছা গান রাতের তন্দ্রাকে যেন মদিরাশক্ত করে চলেছে, "শিশে কি উম্রো প্যার কি আঁখির মিসাল ক্যা…" চরাচরে যেন কীসের খেলা!
দুজনের মাঝখানের অনেকটা জায়গা জুড়ে নিয়েছে সংসারের দায়িত্ব, কাজ, ব্যস্ততা... দুজনের একই বৃত্তে অথচ কী ভীষণ বিকর্ষণ। যেন জোর করে দুই মেরুকে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। যেখানে কেউ কখনো মেলে না। একটা স্বয়াস্তি দুজনের জীবনে কেউ কাউকে ছেড়ে গেলেও কারও কোনো দায়ভার নেই। বিয়েতে দুজনের কেউ বিশ্বাসী নয়, বরং তাদের ধারণা লিভ-ইন জীবন অনেক বেটার। সেও প্রায় বছর তিনেক হল।
অনিশ অনেকটা কুয়াশা বুকে নিয়ে ঢিলে পায়ে বিছানায় বসে ল্যাপটপ খোলে। জানে নতুন কিছুই নেই। সারাদিন অন্তত পনেরো-ষোলো বার মেল চেক করেছে। নো রিপ্লাই। চার মাস ধরে বহু জায়গায় অ্যাপ্লাই করেছে, সিভি মেল করেছে কিন্তু অপেক্ষার শুদ্ধতা বড়ই মসৃণ। কোনো দাগ পড়েনি তাতে। অনিশের একটা কাজ খুব দরকার। সেটা জলির জন্য নাকি পৌরুষের আত্মগরিমার জন্য, বুঝতে পারে না। অথবা বলা ভাল বুঝতে চায় না।
জলি
সবকিছু থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে, ফ্ল্যাটের রেন্ট সে আর দিতে পারবে না জানিয়ে
দিয়েছে। নিজের ভার নিজের কাছে বড্ড বেশি মনে হয় অনিশের। অথচ তিন বছর আগে দুটো
রঙিন প্রজাপতি উড়ে এসে বাসা বেঁধেছিল এই ছোট্ট ফ্ল্যাটে। তাদের বুকে তখন ফুলের রেণু।
জলি অনেক উপরে উঠতে চেয়েছে ডানা মেলে কিন্তু অনিশ এখানেই নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজে
নিয়েছিল। তার তিনকুলে এক পিসিমা ছাড়া কেউ ছিল না। বিয়েতে যদিওবা অনিশের কিছুটা
মত ছিল কিন্তু জলি বাঁধা পড়তে চায়নি কোনো বাঁধনে। এইভাবেই চলে যেত দিন অথবা রাত।
কিন্তু অনিশ যখন জানলো তাকে আমেদাবাদ ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার করে দেওয়া হচ্ছে তখন
বুকের কাছে ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল অনিশের। অনেক তদবির করেছিল ট্রান্সফার আটকানোর
কিন্তু বিফল হয়েছে প্রতিবার। সে জলিকেই বেছে নিয়েছিল গতানুগতিক চলচিত্রে। অতএব
সে চাকরি ছাড়ল, রেশম গুটির মতো আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রাখতে চেয়েছিল জলিকে। কিন্তু
নরম অথচ দৃঢ় বাঁধন কেটে অনেক উঁচুতে উড়ে গিয়েছিল স্ত্রী প্রজাপতি।
সে এখন নতুন সঙ্গী বেছে নিয়েছে। চলে যেতে চায় সব কিছু কাটিয়ে। কোনো আইন এখনও তৈরি হয়নি তার সিদ্ধান্তে বিঘ্ন ঘটাবে। অনিশ এখন রোজ হাত পেতে অপমান গ্রহণ করে তার নিত্যকার প্রয়োজনে। জলির ভালবাসার পাত্র পূর্ণ এক আশ্বিনের খেতের জন্য। অনিশ বানজারা, ব্রাত্য এখন। তার শরীর মরে যায়। প্রতিদিন এক মৃত শরীর জেগে থাকে ভুলে যায় তার বসন্তকাল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment