বাতায়ন/হাপিত্যেশ/ছোটগল্প/২য়
বর্ষ/৫ম সংখ্যা/৩২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১
হাপিত্যেশ | ছোটগল্প
সঙ্ঘমিত্রা দাস
স্বপ্নভঙ্গ
"সেদিন সন্ধ্যাবেলা, সামনে টিভি খোলা। সোফায় হেলান দিয়ে বসে মোবাইলে একটা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট স্ক্রল করছিল অলকানন্দা। কী মিষ্টি মিষ্টি মেয়েদের ছবি, এমনই একজনকে চাই ওর ছেলের জন্য। আদরে আদরে একদম ভরিয়ে দেবে তাকে। আকাশ পাশে এসে বসে। একটা ছবি এগিয়ে দেয় মায়ের দিকে। আকাশের পাশে একটি মেয়ে, ওর কাছ ঘেঁসে হাতের মধ্যে হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের বুঝতে সময় লাগে না। "আমার বৌমা?"
দীর্ঘবছর চলা বড়
যুদ্ধের আজ সমাপ্তি। জয়ী অলকানন্দা সান্যাল। চোখে তার বিজয়িনীর দাম্ভিকতা। মুখে
প্রশস্ত হাসি। অনেক বাধা, অনেক অনিশ্চয়তাকে একা হাতে ঠেলে সরিয়েছেন। চেহারায়,
শরীরে তার ছাপ স্পষ্ট। বয়সের তুলনায় একটু বেশিই বার্ধক্য যেন গ্রাস করেছে।
সেসবে
অবশ্য তার কোন আক্ষেপ নেই। আজ আকাশনীল মঞ্চে দাঁড়ানো, হাতে ডাক্তারি পরীক্ষায়
উত্তীর্ণ হবার শংসাপত্র। অলকানন্দার একমাত্র ছেলে। কার্ডিওলজিতে মাষ্টার্স করেছে
কোলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। স্বপ্নপূরণ আজ মা আর ছেলের। সমস্ত হলঘর
হাততালিতে মুখরিত হয়ে উঠেছে, গত অনেকগুলো বছরে এত ভাল রেজাল্ট হয়নি, সামনের
সারিতে বসা মায়ের চোখ তখন আনন্দে চকচক করছে। এতদিনের সমস্ত জ্বালা যেন জুড়িয়ে
জল হয়ে যাচ্ছে।
যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল সেই ছোট্ট আকাশনীলকে কোলে নিয়ে। ওর বয়স তখন সাত। হঠাৎ অফিস ফেরত এক বাইক অ্যাক্সিডেন্টে সুজিত সান্যালের মৃত্যু। খবরটা এলো টেলিফোনে, বিধাননগর পুলিশের কাছ থেকে। মাথায় পুরো আকাশটা ভেঙে পড়েছিল। ছুটে এসেছিল সেদিন এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। এসে দেখেছিল সব শেষ। ছেলে মাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল খুব জোরে। বেশি কিছু বোঝার বয়স তখন ওর নয়। তার বাবা যে আর কোনদিনও ফিরবে না সেটা অনুভব করেছিল কি না জানা নেই তবে মাকে কিছুতেই ছাড়ছিল না। সেদিন অলকানন্দা প্রাণ খুলে কাঁদতেও পারেনি ছেলের কথা ভেবে। লড়াই শুরু সেদিন থেকেই।
প্রথম কয়েকদিন
আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব সকলে আগলে রাখলেও আস্তে আস্তে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত
হয়ে পড়ে। একান্তই ঘরোয়া গৃহবধূ অলকানন্দাকে এক সময় আত্মীয়েরা একটু এড়িয়ে
যায়, আর্থিক সাহায্যের ভয়ে। জমানো পুঁজি আর এলআইসির টাকা সম্বল করে নিজের আর
ছেলের সমস্ত ভার সামলে নেয় সে। আহ্লাদ, আকাঙ্ক্ষাকে কোনদিনই গুরুত্ব দেয়নি।
আস্তে আস্তে সকলের থেকে নিজেকে সরিয়ে গুটিয়ে নিয়েছে। দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই চালিয়েছে আর প্রার্থনা করেছে ছেলেকে যেন সমাজে সকলের সামনে
মাথা উঁচু করে দাঁড় করাতে পারে। এমনভাবে তৈরি করবে যেন পাঁচজন চেয়ে দেখে তাকে।
ছেলের বিয়ে দিয়ে বৌমা আনবে। মেয়ের মতো নয়, মেয়ে করেই রাখবে তাকে। সুন্দর করে
এই ভাঙা সংসারটা আবার গোছাবে। তিলে তিলে স্বপ্নগুলো গড়েছে অলকানন্দা আর তাকে
সত্যি করার প্রয়াসে দিনের পর দিন পরিশ্রম করে গেছে।
আজ সেই স্বপ্ন সত্যির
পথে। এই হাসপাতালই একদিন তার সব কেড়ে তাকে নিঃস্ব করে দিয়েছিল আজ সেখানেই সে
ছেলেকে সসম্মানে মাথা উঁচু করে দাঁড় করিয়েছে। গর্বিত লাগছে নিজেকে। এবার
নিশ্চয়ই আকাশ কোন এক বড় হাসপাতালে চাকরি নেবে। সবাই জানবে তার ছেলে মস্ত
ডাক্তার। এতদিন সকলকে এড়িয়ে চলেছে, নিঃসঙ্গতা, একাকিত্বকে বুকে চেপে রোজ সকালে
হাসিমুখে ঘুম থেকে উঠেছে। আকাশকে বুঝতেও দেয়নি নিজের মনের কথা। এবার মুক্তি,
আকাশের বিয়ে দিয়ে মিষ্টি দেখে বৌমা আনবে। সব দায়দায়িত্ব তার হাতে সঁপে দেবে।
ঘর আলোয় ভরে উঠবে। জীবন খুশিতে ভরে যাবে। তিনজনের হইহই হাসিঠাট্টায় গমগম করবে এই
ঝিমিয়ে পড়া বাড়িটা।
রেজাল্ট বেরোনোর পর ক'দিন আকাশ বাড়িতে আছে। এতদিন হোস্টেলের খাবারে, অযত্নে বেশ রোগা হয়ে গেছে। মায়ের আদরে যত্নে বেশ ফুরফুরে মেজাজ এখন তার। অলকানন্দা রাতে খাবার টেবিলে বসে মাঝেমধ্যেই ছেলের বিয়ের কথা পাড়ে। "এবার বৌ আন, আমি আর কতদিন সামলাবো"। মনে মনে কল্পনার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়। আকাশ মুচকি হাসে, উত্তর দেয় না।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, সামনে টিভি খোলা। সোফায় হেলান দিয়ে বসে মোবাইলে একটা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট স্ক্রল করছিল অলকানন্দা। কী মিষ্টি মিষ্টি মেয়েদের ছবি, এমনই একজনকে চাই ওর ছেলের জন্য। আদরে আদরে একদম ভরিয়ে দেবে তাকে। আকাশ পাশে এসে বসে। একটা ছবি এগিয়ে দেয় মায়ের দিকে। আকাশের পাশে একটি মেয়ে, ওর কাছ ঘেঁসে হাতের মধ্যে হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের বুঝতে সময় লাগে না। "আমার বৌমা?" "ও অন্তরা, ডাঃ সুকুমার ভট্টাচার্য্যের মেয়ে। তোমাকে একবার ডাক্তারবাবুর কাছে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম মনে আছে? আমি অন্তরাকে বিয়ে করছি আর তাছাড়া দুর্গাপুরে ওদের একটা বড় নার্সিংহোম আছে। আমায় সেভেনটি পারসেন্ট শেয়ার হোল্ডার করবেন বলেছেন। আমার স্বপ্ন সফল মা। আমি ওখানেই থাকব। বাবা-মায়ের এক মেয়ে, বড় আদুরে, তুমি দেখো"
কথাগুলো কেমন যেন আস্তে আস্তে আবছা শোনাচ্ছে। যেন কত দূরে, আরো দূরে চলে যাচ্ছে বলতে বলতে।
মাথাটা ভীষণভাবে দপদপ করছে, আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। অলকানন্দা অনুভব করতে পারছে আশেপাশে কেউ কোথাও নেই, সে একেবারে একা, নিঃস্ব, সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালুচরে একাকী দাঁড়িয়ে। গরম হল্কা ঢুকছে চোখ কান নাক দিয়ে, সে কি পড়ে যাবে। হাতদুটো শক্ত কিছু ধরার চেষ্টায় কিন্তু কোথায় কী? চারপাশ ধু-ধু করছে।
আকাশ বলে চলেছে "তুমি চিন্তা করো-না মা, ছুটি পেলেই তোমার কাছে চলে আসব, যেমন হোস্টেল থেকে ফিরতাম। এমনই খাবার টেবিলে একসাথে বসে গল্প করব। শুধু কলেজের ওই প্রথম দিকের মতো হুটহাট চলে যেও-না দুর্গাপুরে। ওটা আমার শ্বশুরবাড়ি, খুব খারাপ দেখাবে, একটু বুঝো।”
অলকানন্দা উঠে দাঁড়ায় সোফা ছেড়ে, ছেলের মাথায় হাত রেখে বলে "চিন্তা করিস না, আমার জন্য তোকে কোনোদিনও অসুবিধায় পড়তে হবে না।" মনে মনে ভাবতে থাকে কোথায় হয়ে গেল এত বড় ভুল? তার পরিচর্যায় এতটা ফাঁক ছিল সে বুঝতেই পারল না। ভীষণ অসহায় লাগছে। ধীরে ধীরে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। ড্রেসিংটেবিলের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড় করাল নিজেকে। শেষবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষটা এখন ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে, জিজ্ঞাসু চোখে।
যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল সেই ছোট্ট আকাশনীলকে কোলে নিয়ে। ওর বয়স তখন সাত। হঠাৎ অফিস ফেরত এক বাইক অ্যাক্সিডেন্টে সুজিত সান্যালের মৃত্যু। খবরটা এলো টেলিফোনে, বিধাননগর পুলিশের কাছ থেকে। মাথায় পুরো আকাশটা ভেঙে পড়েছিল। ছুটে এসেছিল সেদিন এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। এসে দেখেছিল সব শেষ। ছেলে মাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছিল খুব জোরে। বেশি কিছু বোঝার বয়স তখন ওর নয়। তার বাবা যে আর কোনদিনও ফিরবে না সেটা অনুভব করেছিল কি না জানা নেই তবে মাকে কিছুতেই ছাড়ছিল না। সেদিন অলকানন্দা প্রাণ খুলে কাঁদতেও পারেনি ছেলের কথা ভেবে। লড়াই শুরু সেদিন থেকেই।
রেজাল্ট বেরোনোর পর ক'দিন আকাশ বাড়িতে আছে। এতদিন হোস্টেলের খাবারে, অযত্নে বেশ রোগা হয়ে গেছে। মায়ের আদরে যত্নে বেশ ফুরফুরে মেজাজ এখন তার। অলকানন্দা রাতে খাবার টেবিলে বসে মাঝেমধ্যেই ছেলের বিয়ের কথা পাড়ে। "এবার বৌ আন, আমি আর কতদিন সামলাবো"। মনে মনে কল্পনার রঙিন স্বপ্নে বিভোর হয়। আকাশ মুচকি হাসে, উত্তর দেয় না।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা, সামনে টিভি খোলা। সোফায় হেলান দিয়ে বসে মোবাইলে একটা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট স্ক্রল করছিল অলকানন্দা। কী মিষ্টি মিষ্টি মেয়েদের ছবি, এমনই একজনকে চাই ওর ছেলের জন্য। আদরে আদরে একদম ভরিয়ে দেবে তাকে। আকাশ পাশে এসে বসে। একটা ছবি এগিয়ে দেয় মায়ের দিকে। আকাশের পাশে একটি মেয়ে, ওর কাছ ঘেঁসে হাতের মধ্যে হাত জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মায়ের বুঝতে সময় লাগে না। "আমার বৌমা?" "ও অন্তরা, ডাঃ সুকুমার ভট্টাচার্য্যের মেয়ে। তোমাকে একবার ডাক্তারবাবুর কাছে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম মনে আছে? আমি অন্তরাকে বিয়ে করছি আর তাছাড়া দুর্গাপুরে ওদের একটা বড় নার্সিংহোম আছে। আমায় সেভেনটি পারসেন্ট শেয়ার হোল্ডার করবেন বলেছেন। আমার স্বপ্ন সফল মা। আমি ওখানেই থাকব। বাবা-মায়ের এক মেয়ে, বড় আদুরে, তুমি দেখো"
কথাগুলো কেমন যেন আস্তে আস্তে আবছা শোনাচ্ছে। যেন কত দূরে, আরো দূরে চলে যাচ্ছে বলতে বলতে।
মাথাটা ভীষণভাবে দপদপ করছে, আর কিছু শোনা যাচ্ছে না। অলকানন্দা অনুভব করতে পারছে আশেপাশে কেউ কোথাও নেই, সে একেবারে একা, নিঃস্ব, সাহারা মরুভূমির উত্তপ্ত বালুচরে একাকী দাঁড়িয়ে। গরম হল্কা ঢুকছে চোখ কান নাক দিয়ে, সে কি পড়ে যাবে। হাতদুটো শক্ত কিছু ধরার চেষ্টায় কিন্তু কোথায় কী? চারপাশ ধু-ধু করছে।
আকাশ বলে চলেছে "তুমি চিন্তা করো-না মা, ছুটি পেলেই তোমার কাছে চলে আসব, যেমন হোস্টেল থেকে ফিরতাম। এমনই খাবার টেবিলে একসাথে বসে গল্প করব। শুধু কলেজের ওই প্রথম দিকের মতো হুটহাট চলে যেও-না দুর্গাপুরে। ওটা আমার শ্বশুরবাড়ি, খুব খারাপ দেখাবে, একটু বুঝো।”
অলকানন্দা উঠে দাঁড়ায় সোফা ছেড়ে, ছেলের মাথায় হাত রেখে বলে "চিন্তা করিস না, আমার জন্য তোকে কোনোদিনও অসুবিধায় পড়তে হবে না।" মনে মনে ভাবতে থাকে কোথায় হয়ে গেল এত বড় ভুল? তার পরিচর্যায় এতটা ফাঁক ছিল সে বুঝতেই পারল না। ভীষণ অসহায় লাগছে। ধীরে ধীরে শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল। ড্রেসিংটেবিলের বড় আয়নাটার সামনে দাঁড় করাল নিজেকে। শেষবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া মানুষটা এখন ওর মুখের দিকে চেয়ে আছে, জিজ্ঞাসু চোখে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment