বাতায়ন/আতঙ্ক/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৩য় সংখ্যা/২৪শে বৈশাখ, ১৪৩৩
আতঙ্ক | ছোটগল্প
হিমাদ্রি
শেখর দাস
অদৃশ্য
"নীচে একটা গোপন ঘর। অনির্বাণ নীচে নামল। অন্ধকার, ঘরটা ছোট, দেওয়ালে নখের আঁচড়ের দাগ। ঠিক মাঝখানে একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ে আছে। সে ডায়েরিটা খুলল।"
কলকাতার শহরতলির এক পুরোনো
পাড়া, শালবাগান। নামটা শুনলে মনে
হয় শান্ত, সবুজে মোড়া কোনো জায়গা।
কিন্তু বাস্তবে শালবাগান এক অদ্ভুত দ্বৈত চরিত্রের অধিকারী, দিনে যেমন সাধারণ,
রাতে
তেমনই রহস্যময়। সেই পাড়াতেই নতুন ভাড়াটে হিসেবে আসে অনির্বাণ। পেশায় সাংবাদিক, সমাজের অন্ধকার দিক নিয়ে লেখালিখি করে। সে বরাবরই বিশ্বাস
করে—ভূত বলে কিছু নেই, আছে শুধু মানুষের
তৈরি আতঙ্ক।
বাড়িটা সে পায় খুব কম
ভাড়ায়। বাড়িওয়ালা মৃদু হেসে বলেছিলেন,
-বাড়িটা একটু পুরোনো,
তবে সব
ঠিকঠাক আছে।
কথাটার মধ্যে যেন একটা অদ্ভুত
চাপা সংকেত ছিল, যা তখন অনির্বাণ
বুঝতে পারেনি। প্রথম কয়েকদিন সব ঠিকই চলছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে কিছু অস্বাভাবিকতা
চোখে পড়তে শুরু করে। রাত হলেই পাশের বাড়ি থেকে অদ্ভুত আওয়াজ আসত। কখনো চাপা
কান্না, কখনো যেন কেউ ফিসফিস করছে। একদিন
কৌতূহল সামলাতে না পেরে অনির্বাণ পাশের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুললেন এক
বৃদ্ধা। চোখদুটো কেমন যেন ভয়ে ভরা।
-কী চাই?
-আমি নতুন এসেছি পাশের বাড়িতে… একটু কথা বলতে চাইছিলাম।
বৃদ্ধা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে
বললেন,
-এখানে বেশি কৌতূহল দেখানো ভাল নয় বাবা… সবাই নিজের মতো
থাকলেই ভাল।
দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে
গেল। উত্তরটা অনির্বাণের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিল।
পরদিন পাড়ার চায়ের দোকানে
বসে সে বিষয়টা তুলল। দোকানদার হেসে বলল,
-ওই বাড়ি নিয়ে বেশি ভাববেন না। অনেকদিনের পুরোনো বাড়ি, শব্দ তো হবেই।
কিন্তু অনির্বাণ বুঝল, লোকটা ইচ্ছে
করেই বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে।
একদিন রাতে সে নিজের ঘরে বসে
কাজ করছিল। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। অন্ধকারে চারপাশ নিস্তব্ধ। ঠিক তখনই সে শুনতে
পেল, তার নিজের ঘরের ভেতরেই যেন
কেউ হাঁটছে। সে টর্চ জ্বালাল, ঘর ফাঁকা। কিন্তু
দরজাটা অর্ধেক খোলা। অনির্বাণের স্পষ্ট মনে আছে, সে দরজাটা বন্ধ করেছিল। এই প্রথম তার বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত
শীতলতা নেমে এল। পরদিন সে বাড়িওয়ালার কাছে গেল।
-এই বাড়িতে আগে কে থাকত?
বাড়িওয়ালা একটু থেমে বললেন,
-একটা পরিবার ছিল… হঠাৎ একদিন চলে যায়।
-কেন?
-সেটা আমি জানি না… আর জানার দরকারও নেই।
উত্তরটা অসম্পূর্ণ। আর সেই
অসম্পূর্ণতাই অনির্বাণকে আরও গভীরে টেনে নিয়ে গেল। সে ঠিক করল, এই রহস্যের শেষ না দেখে সে ছাড়বে না।
পরবর্তী কয়েকদিন সে পাড়ার
পুরোনো লোকদের সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু সবাই একইভাবে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।
অবশেষে হরিপদ নামে এক বৃদ্ধ, একটু মুখ খুললেন,
-ওই বাড়িতে একসময় মিত্র পরিবার থাকত। স্বামী, স্ত্রী আর একটা মেয়ে। মেয়েটা খুব ভাল পড়াশোনা করত।
কিন্তু হঠাৎ একদিন মেয়েটা নিখোঁজ হয়ে যায়।
-তারপর?
-তারপর শুরু হয় আতঙ্ক। মা নাকি প্রতিদিন রাতের বেলা মেয়ের
সঙ্গে কথা বলত। লোকজন বলে, মেয়েটা নাকি বাড়ি
ছেড়ে যায়নি… তাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।
অনির্বাণ চমকে উঠল।
-কোথায়?
হরিপদ চোখ নামিয়ে বললেন,
-সেটা কেউ জানে না… তবে সবাই ভয় পেত।
এই গল্পটা যেন একটা ছায়ার
মতো তার মাথায় ঘুরতে থাকল। সে ঠিক করল,
পাশের
বাড়িটায় ঢুকতে হবে।
এক রাতে, যখন চারপাশ নিস্তব্ধ,
সে
চুপিচুপি বাড়িটার ভেতরে ঢুকে পড়ল। দরজা খোলা ছিল, যেন কেউ অপেক্ষা করছিল। ভেতরে ঢুকেই একটা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ নাকে এল।
দেওয়ালগুলোতে ফাটল, মেঝে ধুলো ভর্তি।
হঠাৎ সে শুনতে পেল,
-দাদা… আমাকে বের করো…
একটা ক্ষীণ কণ্ঠস্বর। অনির্বাণ
থমকে দাঁড়াল। কণ্ঠস্বরটা আসছে বাড়ির ভেতরের একটা ঘর থেকে। দরজাটা বন্ধ। সে
দরজাটা ঠেলে খুলল। ঘরটা একেবারে ফাঁকা। কিন্তু মেঝের একটা অংশ একটু আলাদা। সে
টর্চের আলো ফেলল, একটা কাঠের ঢাকনা। ঢাকনাটা খুলতেই চোখে পড়ল নীচে একটা গোপন ঘর। অনির্বাণ নীচে নামল। অন্ধকার, ঘরটা ছোট, দেওয়ালে নখের
আঁচড়ের দাগ। ঠিক মাঝখানে একটা পুরোনো ডায়েরি পড়ে আছে। সে ডায়েরিটা খুলল। তাতে
লেখা—
-আমাকে এখানে আটকে রাখা হয়েছে… মা বলছে বাইরে গেলে সবাই
আমাকে নিয়ে যাবে… কিন্তু আমি জানি, এটা সত্যি নয়… আমি
ভয় পাচ্ছি…
অনির্বাণের হাত কাঁপতে লাগল। পরের
পাতায়—
-আজ অনেকদিন হয়ে গেল… আলো দেখি না… মা বলে, এটা আমার ভাল জন্য…
শেষ পাতায় শুধু একটা বাক্য—
-আমি আর পারছি না…
অনির্বাণ বুঝতে পারল, মেয়েটাকে তার নিজের মা বন্দি করে রেখেছিল। ভয়ের নাম করে, সমাজের ভয় দেখিয়ে,
তাকে
পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। এই আতঙ্ক কোনো ভূতের নয়, এটা মানুষের তৈরি। ঠিক তখনই তার পিছনে শব্দ হল। সে ঘুরে
দাঁড়াল। সেই বৃদ্ধা, যাকে সে প্রথমদিন
দেখেছিল। তার চোখ দুটো অদ্ভুত।
-তুমি এখানে কেন এসেছ?
-আপনি জানতেন সব?
বৃদ্ধা হাসলেন শীতল হাসি,
-আমি তার মা… আমি তাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম… এই সমাজ খুব
খারাপ… ওকে কেউ কষ্ট দিক, সেটা আমি চাইনি…
অনির্বাণ চিৎকার করে উঠল,
-আপনি তাকে মেরে ফেলেছেন!
বৃদ্ধা চুপ করে রইলেন। তারপর
ধীরে বললেন,
-আমি তাকে বাঁচাতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি…
তার চোখ থেকে জল পড়তে লাগল। সেই
মুহূর্তে অনির্বাণ বুঝল, সবচেয়ে ভয়ঙ্কর
আতঙ্ক হলো ভালবাসার বিকৃত রূপ।
পরদিন খবরের কাগজে একটা
প্রতিবেদন প্রকাশ পেল— শালবাগানের গোপন ঘর, সমাজের ভয়ের শিকার
এক কিশোরী।
পাড়া আবার স্বাভাবিক হয়ে
গেল। কিন্তু অনির্বাণ জানত, এই গল্পের শেষ এখানেই নয়। সমাজে এখনও এমন হাজারো অদৃশ্য ঘর
আছে, যেখানে আতঙ্কের নামে মানুষকে
বন্দি করে রাখা হয়। আর সেই আতঙ্কই হলো সবচেয়ে বড় রহস্য।
~~000~~
No comments:
Post a Comment