বাতায়ন/প্রেমের
Rush-লীলা/প্রবন্ধ/২য় বর্ষ/২৫তম সংখ্যা/০৬ই মাঘ, ১৪৩১
প্রেমের
Rush-লীলা | প্রবন্ধ
গৌতম
সমাজদার
আমার
চোখে রাসলীলা
"এই চক্রগুলো মায়াবদ্ধ জীবের 'জন্ম মৃত্যু' চক্র। যত গোপিনি তত শ্রীকৃষ্ণ মানে হল সকল জীবে মানুষ বিরাজমান। আর জগতের আত্মা নারীশক্তি যা এই প্রকৃতির মূল অংশ। এই উৎসব আসলে প্রকৃতির সুন্দর মেলবন্ধন।"
আজ থেকে
প্রায় পাঁচ হাজার দুশো আটত্রিশ বছর আগে শ্রীধাম বৃন্দাবনের তীরে বটগাছের
উপস্থিতিতে শ্রীকৃষ্ণ ব্রজ গোপাঙ্গনাদের অপ্রাকৃত রাসলীলা বিলাস করেছিলেন। পূজোর
পূর্ণিমা রাতে এই রাসনৃত্য হয়েছিল। সেইসময় সমগ্র পৃথিবী ও প্রকৃতি অনিন্দ্য
সুন্দর সাজে সেজে উঠেছিল। সমস্ত গাছগাছালি, পাখপাখালি উদ্বেলিত হয়েছিল এই
রাসলীলা দেখে।
শ্রীকৃষ্ণের এই রাসলীলা সর্বশ্রেষ্ঠ রাসলীলা ছিল। তখন তার বয়স মাত্র
আট বছর। কিন্তু দুঃখের কথা রাসলীলার একটি অপার্থিব ও আধ্যাত্মিক বিষয়কে বিভিন্ন
সিনেমা ও গানে দেখানো হয়েছে কামসর্বস্ব জৈবিক চাহিদা মেটানোর বিষয় হিসেবে। আসলে
আমাদের জানতে হবে শ্রীকৃষ্ণ আসলে কে? আমাদের সকলের মনে প্রিয় শ্রীকৃষ্ণ
ভাবনা আছে। সবাই আপন তার। প্রকৃতপক্ষে তার এই রাসলীলা আত্মার সঙ্গে আত্মার বিহার, নিজের সাথে
নিজের খেলা। এই খেলা মহাবিশ্ব জুড়ে প্রতিনিয়ত চলছে যার আনুষ্ঠানিক বৈচিত্র্যময়
এই বিলাস।
উত্তর
প্রদেশের মথুরা জেলায় এই পবিত্র স্থান বৃন্দাবন। তার মধ্যে অন্যতম
পবিত্র স্থান নিধিবন। প্রকাশ এই নিধিবনে রোজ রাতে রাসলীলায় মেতে ওঠেন রাধাকৃষ্ণ।
জানা যায় এই নিধিবনে রাধা ও সহস্র গোপিনির সাথে রাসলীলায়
মেতে ওঠেন স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ। আজও নাকি সেই রাসলীলা চলে। তাই পবিত্রতা রক্ষায় এর দ্বার সন্ধ্যায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এই নিধিবনে আছে প্রচুর
তুলসীগাছ। এই গাছ উচ্চতায় ছোট হলেও জোড়ায় জোড়ায় দেখতে পাওয়া যায়। বাকল
ফাঁপা হলেও এরা শুকিয়ে যায় না। এই তুলসীগাছরাই এদিন রাতে গোপিনি হয়ে কৃষ্ণের সাথে নৃত্যে মেতে ওঠে। রাস কথার অর্থ রস সার, নির্যাস, আনন্দ, আহ্লাদ, অমৃত ও
ব্রক্ষ্ম। রস থেকে রাস কথাটির উদ্ভব অর্থাৎ ব্রক্ষ্মরস ছাড়া আর কিছুই নন।
শ্রীকৃষ্ণ হলেন সেই মধুর রসের ঘনীভূত আধার। রসের আর একটি মানে হল নারী পুরুষের হাত
ধরাধরি করে গোলাকারে নৃত্য পরিবেশন।
উত্তরে
কোচবিহার থেকে ভাগীরথীর দুই পাড় নবদ্বীপ ও শান্তিপুর।
মেদিনীপুরেও রাসলীলা হয়। রাধা আর কৃষ্ণ একই আত্মা। জীবকে প্রেমতত্ত্ব আস্বাদন
করতে ও তার সাধনা শিক্ষা দিতে ব্রজধামে উভয়ে দেহ ধারণ
করেছিলেন। সেই ব্রজলীলা বুঝতে হলে সবার আগে এই লীলার আধ্যাত্মিক ভাব হৃদয় দিয়ে
বুঝতে হবে। আত্মা যখন সাংসারিক কুটিলতা ও মায়া ত্যাগ করে তখনই ব্রজভাব ঘটে।
সেখানে প্রকৃতি ব্রজেশ্বরী। তার মিলনবাস বৃন্দাবন। জগতে প্রকৃতি পুরুষ ঘোর আসক্ত, তাদের
বিচ্ছেদই মুক্তি সোপান। শ্রীকৃষ্ণের সুমধুর বাঁশির সুরে মুগ্ধ হয়ে গোপিনিবৃন্দ নিজেদের সব কাজ সেরে সংসারের সমস্ত মোহ ত্যাগ করে বৃন্দাবনে শ্রীকৃষ্ণের
চরণে নিজেদের সমর্পণ করেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ বুঝিয়েছিলেন সংসারে ফিরে যেতে। তারা
ফিরে যেতে না চাইলে তাদের মনোবাসনা পূরণার্থে রাসলীলা আরম্ভ করেন। যে মুহূর্তে
তারা ভাবল শ্রীকৃষ্ণ তাদের অধীন, তাদের মন গর্ব অহংকারে পূর্ণ হল। সেই মুহূর্তে শ্রীকৃষ্ণ গোপিনিদের মধ্য
থেকে অন্তর্হিত হলেন।
শ্রীকৃষ্ণ
তাদের অধীন ভাবায় পরে তারা ভুল বুঝতে পারে। শ্রীকৃষ্ণ যে কারোর একার নয়, সবার, বুঝলেন
শ্রীকৃষ্ণ ত্রিজগতের। তাকে কোন বন্ধনেই আটকে রাখা
যায় না, সব
বুঝলেন এবং তাদের সম্মান ও খুশি করতে যতজন গোপিনি ততজন কৃষ্ণ হয়ে গোপিনিদের মনের ইচ্ছা পূরণ
করেছিলেন। তাতে গোপিনিবৃন্দও পৃথিবীর জগতের মায়া কাটিয়ে
মুক্তিলাভ করেছিলেন। এইভাবেই রাসলীলার প্রচলন হয়েছিল।
মূলত বৈষ্ণব
ধর্মে বিশ্বাসী মানুষ এই উৎসব পালন করলেও এই রাসযাত্রা বা রাসলীলা আজ সার্বজনীন।
কথিত আছে নবদ্বীপে রাস পূর্ণিমায় রাস উৎসব প্রথম প্রচলন করেন শ্রীচৈতন্যদেব। মথুরা, বৃন্দাবন ছাড়াও মণিপুর, ওড়িশা, অসমেও খুব
শ্রদ্ধাসহকারে এই উৎসব পালিত হয়। রাসলীলাতে আমরা দেখি গোপীগণ চক্রাকারে নাচছেন।
এই চক্রগুলো মায়াবদ্ধ জীবের 'জন্ম মৃত্যু' চক্র। যত গোপিনি তত শ্রীকৃষ্ণ মানে হল সকল জীবে মানুষ বিরাজমান। আর জগতের আত্মা
নারীশক্তি যা এই প্রকৃতির মূল অংশ। এই উৎসব আসলে প্রকৃতির সুন্দর মেলবন্ধন। মায়া
আর নিজেদের ষড় রিপুর জাল কাটতে উচিত জ্ঞান, কর্ম আর ভক্তির সমন্বয়ে নিজেদের
আত্মা থেকে মায়ার আবরণ সরিয়ে দেওয়া। এবার বিষয় হচ্ছে এই রাসলীলা সত্য, নাকি
কাল্পনিক। দেখা যায় ভাগবত পুরাণে দশম স্কন্ধে উল্লেখ আছে শ্রীকৃষ্ণ শরৎ
পূর্ণিমাতে রাসলীলা করেছেন। পুরাণের মতে শ্রীকৃষ্ণ বৈশাখ মাসে রাসলীলা করেছিলেন।
আবার জানা যায় শ্রীকৃষ্ণের রাসের কামক্রীড়া দেখে দেবতাদের পত্নীরাও কামার্ত হয়ে
গেলেন। ভাগবত বলছে, আছে
বাহু বিস্তার করে আলিঙ্গন করা, হাতে চাপ দেওয়া, গোপিনিদের শিখা ধরা, উরুতে হাত
দেওয়া, সায়ার
দড়ি ধরে টানা, স্তন
ধরা, রসিকতা
করা, নখ
দিয়ে শরীরে ক্ষত করা,
মৃদু হাসি হাসা বাহা পুরাণে এগুলি বর্ণিত আছে। কিন্তু কোন সভ্য সমাজে এটা কি
কাম্য? শ্রীকৃষ্ণ
মোটেই এগুলি করতে পারেন না। তার কৃষ্ণের চরিত্র অত্যন্ত উজ্জ্বল ছিল। মহাভারতে
তাকে যোগীরাজ, যজ্ঞেশ্বর
বলা হয়েছে। তার পক্ষে এগুলো করা কিছুতেই সম্ভব নয়। আর এই বর্ণনাগুলো নিতান্তই
কাল্পনিক বলে মনে হয়।
সমাপ্ত
No comments:
Post a Comment