রম্যরচনা
প্রদীপ কুমার দে
বউয়ের বগলে বই
ঝিঙাফুল
সিরিজ— ১২
"কিছু বই ধরতে পারলাম, কিছু পড়ে গেল। ঝাঁকাওলা তার ঝাঁকা খালি করে সব মোটা মোটা বই মেঝেতে ফেলে দিল। টাকা আর ঝাঁকা নিয়ে ব্যাটারছেলে মুটে আমার দিকে কটকট চোখে তাকিয়ে প্রস্থান দিল।"
অফিস থেকে ফিরে এত টায়ার্ড হয়ে যাই তার একটাই কারণ পয়সা বাঁচাতে চাই। হেঁটে, বাসে ঝুলে আবার হেঁটে, বাড়িতে এসে চাঁদমুখ দেখতে পেলে আবার একটু চনমনে হই। কিন্তু আজ একটু অন্যরকম হল। ঘর্মাক্ত হয়ে ফ্ল্যাটের দরজায় এসে ঢাক্কা খাই, দেখি ফ্ল্যাটের দরজা বাইরে থেকেই বন্ধ। মানে ঝিঙাফুল নেই। কিন্তু গেল কই? আমাকে তো আগেভাগে কিছু বলেনি?
আগেভাগে
ফ্ল্যাটে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিই। দু কাপ চায়ের জল
বসিয়ে দিই গ্যাস ওভেনে। বসা আর হয়ে ওঠে না ফ্ল্যাটের কলিংবেল বেল ঝাঁঝিয়ে ওঠে, দৌড়ে যাই বউ
ভেবে। আরে এ কী?
এ আবার কে?
-মুটে?
মাথায় এক ঝাঁকা বই!
-আরে এই
মুটে, কিসকো
মাংতা? ইধার
কায়ে? ইয়ে
তো গলদ রুম মে আ গিয়া!
-না সাব, মেম সাহেব নে এই রুমভিই বুলা থা!
-আরে নেহি রে
কহি মেমসাব ইদার রয়তে নেহী।
-কেয়া বাত
বলতে হ্যায় আপ? মেমসাব
আভি আতা হোগা...
ঝামেলার
একশেষ! আর কোথা যাই?
চক্ষু ছানাবড়া! পিছনে সত্যি-সত্যিই মেমসাব ঝিঙাফুল দুই বগলে
বেশ কিছু বই নিয়ে দরজা দিয়ে ঢুকে আমার উপর এসে পড়ল,
-ধরো, ধরো দেখছ কী? বইগুলো যে
পড়ে যাচ্ছে।
কিছু বই
ধরতে পারলাম, কিছু
পড়ে গেল। ঝাঁকাওলা তার ঝাঁকা খালি করে সব মোটা মোটা
বই মেঝেতে ফেলে দিল। টাকা আর ঝাঁকা নিয়ে ব্যাটারছেলে মুটে আমার দিকে কটকট চোখে তাকিয়ে প্রস্থান দিল।
ঘরভরতি বই
আর বই। আমি অবাক চোখে,
-এসব কী? কী হবে?
ঝিঙাফুল জামাকাপড়
ছেড়ে বাথরুমে ছুটল,
-আমি আর
দাঁড়াতে পারছি না, এসে
বলছি।
নাইটি পরে বইয়ের কাছে চলে গেল,
-শোনো বই
পড়লে সব জানা যায়। তুমিই তো সেদিন বললে না যে, এখনকার ছেলেমেয়েরা কেউ উপোস করে না, তা সেইসব
অজানা বিষয়ে জ্ঞান নিতেই সব ধরণের বইই কিনে আনলাম। ধর্মের বই, জ্ঞানের বই, গ্রামার বই, গল্প, উপন্যাস
এমনকি কবিতার বই সব কিনেছি। এবার পড়তে হবে। আর হ্যাঁ তুমি কাল একটা বইয়ের আলমারি
কিনে এন, লাইব্রেরি
বানাব। অনেক পড়াশোনা করতে হবে আমায়। পিছিয়ে পড়লে চলবে না যে...
-আরে
পড়াশোনা করবে সে-তো ভালো কথা, তাতে এত বই
লাগে? একেবারে
এক ঝাঁকা?
-নাহলে এত
জ্ঞান হবে কী করে? যদিও তোমার অনেক জ্ঞান তাও তুমিও
পড়বে। এসেই বদমায়েশি না করে বউ ছেড়ে বই নিয়েই মজা নেবে?
-কী মুশকিল! তা এত বই?
-তুমি
লাইব্রেরি দেখনি? তারপর
বাচ্চা আসবে এবার ও পড়বে,
ওকেও পড়াতে হবে না?
-হ্যাঁ
সেটাই তো বলছিলাম এখনই বই নিয়ে পড়ে থাকলে আসল কাজ মানে বাচ্চাটা আসবে কী করে?
-ও এমনিতেই
হয়ে যাবে, অত
সময় দিতে হবে না। বাজে অভ্যাস হয়ে গেছে তোমার! রোজ রোজ দরকার নেই। সপ্তাহে একদিনই
যথেষ্ট। তোমার শরীর ভেঙে যাবে, আমার মামিমা আমাকে পইপই করে বলেছিল, 'এইসব
নোংরামি বেশি করবি না,
স্বামী রোজই চাইবে তুই একটু কন্ট্রোল করে রাখবি, নেশা বাড়তে দিবি না তাহলে শেষে তুই
না পারলে ও বাইরে যাবে!'
-দেখো কী গণ্ডগোল! ভুলভাল কথা। এইজন্যই স্বামীরা বাইরে যায়।
ব্যস হয়ে
গেল দফারফা! বউ ঝিঙাফুলের চোখে জল এসে গেল। ঘরের আলো নিভিয়ে সোজা বিছানায় উঠে শুয়ে
পড়ল আর জানাল,
-যাও, যাও তুমিও
বাইরেই যাও…
আমি
একমিনিটও নষ্ট না করে লাফিয়ে ওর পাশে শুয়ে ওর চোখের জল বালিশ চাপা দিয়ে মুছিয়ে
দিলাম। মাথায় মুখে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম,
-থাক চলো, আজ সারারাত
বই পড়ব। তুমি পড়বে আমি শুনব আবার আমি পড়লে তুমি শুনো।
-সত্যি? তাহলে খুব
মজা হবে রাত জেগে...
বউ আনন্দে
লাফিয়ে উঠে আমাকে জাপটিয়ে নিল,
-তাড়াতাড়ি
নাও। কিন্তু তার আগে আমার মা হওয়াটাও কিন্তু খুব জরুরি, সময় নষ্ট
করে লাভ নেই...
-হ্যাঁ ঠিকই
এই লাভে কোন লোকসান হওয়ার ভয় নেই!
সমাপ্ত…

শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাচ্ছি সম্পাদক মহাশয় সহ সকল লেখক ও পাঠকজনে 🌹
ReplyDeleteদারুণ 👍👍👍
ReplyDeleteধন্যবাদান্তে শুভেচ্ছা জানাই সকলকেই 🌹