বাতায়ন/রং/ছোটগল্প/২য় বর্ষ/৩২তম সংখ্যা/২৯শে
ফাল্গুন, ১৪৩১
রং
| ছোটগল্প
অঞ্জনা
মজুমদার
রঙের
আড়ালে
"সবাইকে মিষ্টির ছবি দেখিয়ে কেউ কিছু দেখেছে কিনা। দুটি বাচ্চা বলল, তারা মিষ্টিদিদিকে দুজন মুখোশ পরা লোকের সাথে বাগানের পেছনদিকে যেতে দেখেছে।"
আজ দোল
পূর্ণিমা। মল্লিক বাড়িতে আজকের দিনে এলাহি উৎসবের আয়োজন হয়। আত্মীয়স্বজন ছাড়াও
মল্লিকদের কেকবিস্কুটের কারখানার সমস্ত কর্মচারী এদিন আমন্ত্রিত। ফলে মল্লিক বাড়ির
বাগানে চেনা-অচেনা লোকজন সাদা পোশাকে এসেছেন দোল খেলতে।
এখানে আবির খেলা হয় শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য মেনে। ওপর থেকে মল্লিক বাড়ির কর্তা দেখে
সন্তুষ্ট হলেন।
বাড়ির সবাইয়ের সাথে এবার তিনি নামলেন। মঞ্চে রাধাকৃষ্ণের পায়ে আবির দিয়ে দোল উৎসব শুরু
হল। কিছুক্ষণের মধ্যে বাগানে সবাই রঙিন হয়ে গেল। বাগানে যেন নানা রঙের ফুল ফুটেছে।
কাউকে চেনা যাচ্ছে না।
মিষ্টি
মুখেরও ব্যবস্থা আছে। এর মধ্যে বড়বৌমা এসে বললেন,
-বাবা
মিষ্টিকে দেখেছেন? মিষ্টি
বাড়ির একমাত্র নাতনি।
-এইতো ছিল। দাদাদের সাথে আছে বোধহয়।
-না বাবা ওদের সাথে নেই। কোথায় গেল?
মুহূর্তে
খোঁজ খোঁজ রব পড়ে গেল। সবাই খুঁজতে লাগল। মিষ্টি সকলের আদরের। বাড়ির সবাই, কাজের লোকজন
আর কারখানার সব্বাই তাকে ভারি ভালবাসে। কোথাও নেই। গেটের সিকিউরিটি বলছে কোনও
বাচ্চাকে তারা বেরোতে দেখেনি। তবে? মেয়েটা কোথায় গেল?
পুলিশ কমিশনার
মিঃ দেব নিমন্ত্রিত। তার বাহিনীর কয়েকজন উপস্থিত। মিঃ দেব দেরি করলেন না। লাইন
দিয়ে একদিকে পুরুষ আর একদিকে মহিলা আর একলাইনে বাচ্চাদের দাঁড় করিয়ে দিলেন। সবাইকে
মিষ্টির ছবি দেখিয়ে কেউ কিছু দেখেছে কিনা। দুটি বাচ্চা
বলল, তারা
মিষ্টিদিদিকে দুজন মুখোশ পরা লোকের সাথে বাগানের পেছনদিকে যেতে দেখেছে। মিঃ
দেব বাড়ির তিনদিকে গেট বন্ধ করে দিয়ে পাহারা বসিয়ে দ্রুত সহকারী মিঃ মিত্রকে নিয়ে
বাগানের পেছনদিকে চললেন। সবাইকে বললেন,
-কোনও শব্দ
নয়।
বাগানের
পেছনদিকে একটা ছোট্ট বাড়ি। ব্যবহার হয় না। সেখানে পৌঁছাতেই সবাই অবাক! এ কী! মিষ্টি একটা
লাঠি হাতে দুজন
রং
মাখা ভূতের মতো লোকের সামনে দাঁড়িয়ে। লোকদুটো দুচোখ দুহাতে রগড়াচ্ছে আর কাঁদছে।
-আর করব না। এবারের মতো ক্ষমা করে দাও মিষ্টিদিদি।
-তবে ফেরত দাও আমাদের রাধামাধবকে।
একটা লোক
কাঁধের ঝোলায় হাত ঢুকিয়ে হঠাৎই একটা ছোরা বের করে মিষ্টির দিকে এগোতে লাগল। অন্য
লোকটাও এগোচ্ছে। মিঃ দেব আর অপেক্ষা করলেন না। শূন্যে একটা গুলি ছুঁড়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন। কনস্টেবলরা ঘরে ঢুকে লাঠি মেরে ছোরাটা হাত থেকে ফেলে
দিল। বাবা দৌড়ে মিষ্টিকে কোলে তুলে নিলেন। লোকদুটোকে
পুলিশ গ্রেফতার করল। ওদের ঝোলা থেকে রাধামাধবের সোনা আর জেড পাথরের মূর্তি উদ্ধার
করেছে। মিঃ দেব বললেন,
-চলো মিষ্টি, ঘরে গিয়ে
তোমার গল্প শোনা যাক।
মিষ্টি বলল,
-গল্প নয়
সত্যি।
সবাই হাসল, সত্যি তো! মিষ্টিই তো
চোর ধরল।
-বলো কী করে ধরলে?
মিষ্টি বলল,
-সবাই যখন রং খেলছিল তখন রংমাখা লোকদুটো চুপিচুপি ঠাকুরঘরে
ঢুকল। পুজো হয়ে গেছে। প্রসাদ বাইরে খেয়েছে। তাও কেন ঠাকুরঘরে? ওমা গো! ওরা যে
রাধামাধবকে ঝোলায় পুরে বাগানের পেছনের দিকে চলল। আমি তাই একমুঠো রং নিয়ে ওদের পেছনে গেলাম। ওরা ঘরে ঢুকতেই ডাকলাম। আর তাকাতেই ওদের চোখে রং ছুঁড়ে দিলাম। তাই তো ওরা কাঁদছিল। তারপরও ওরা ছোরা বের করল। ভাগ্যিস
তোমরা এসে গেলে। নাহলে ওরা রাধামাধবকে নিয়ে চলে যেত।
মিঃ দেব
বললেন,
-মিষ্টি দারোগা থাকতে ওরা কি চুরি করতে পারত? সবাই বলো, মিষ্টি রানির জয়। রঙের আড়ালে চুরি?
সবাই একযোগে
বলল,
-থ্রি
চিয়ার্স ফর মিষ্টি। হিপ হিপ হুররে।
সবাই একসঙ্গে
করতালি দিয়ে উঠল।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment