বাতায়ন/ঝড়/ভ্রমণ/৩য় বর্ষ/১ম সংখ্যা/১লা বৈশাখ, ১৪৩২
ঝড় | ভ্রমণ
অরূপ কুমার
দেব
এক
রোমাঞ্চকর যাত্রা
"জঙ্গলের কাছাকাছি আমাদের ট্রাক কাদায় আটকে গেল আর সার্ভের কাজে নিযুক্ত তেরোজনের দল পুরো রাত সেই শুনসান এলাকায় শুয়েবসে কাটালাম।"
ভারত সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার অধীনস্থ বিভাগে ফিল্ডে সার্ভের কাজ করার সময় এমন সব এলাকায় যেতে হয় যেখানে গাড়ি চলাচলের উপযোগী রাস্তাঘাট প্রায় নেই বললেই চলে। বিশেষত উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, মিজোরাম, নাগাল্যাণ্ড, মনিপুরের সীমান্তবর্তী প্রত্যন্তর পাহাড়ি এলাকায় কিছু কিছু রাস্তাঘাট গাড়ি চলাচলের পক্ষে যথেষ্ট বিপজ্জনক। তাছাড়া ত্রিভুজীকরণ বা প্নেন-টেবল সার্ভের পদ্ধতি ব্যবহার করে জরিপ করার সময় একটা পাহাড়ের চূড়া বা ত্রিভুজ স্টেশন থেকে অন্যটায় যাবার জন্য কমপক্ষে তিন-চার দিন জঙ্গলের পথ পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয়।
আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং
কর্মচারীদের কাছ থেকে তাদের প্রারম্ভিক চাকরির জীবনে এই ধরণের অভিযানের কথা আমি
অনেকবার শুনেছি।
তারা এখন অবসরপ্রাপ্ত হয়ে সুখেশান্তিতে জীবনযাপন করছেন। কিন্তু আমি কখনই ভাবিনি যে এই
ধরনের অভিজ্ঞতা আমার সাথেও খুব শীঘ্রই অন্যরকমভাবে ঘটতে চলেছে। প্রায় পনেরো বছর
আগে আমি এমন একটি কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলাম যা পাহাড়ি অঞ্চলে তিনশো কিলোমিটারেরও কম দূরত্ব অতিক্রম করতে দশ দিনের বেশি
সময় লেগেছিল।
জাতীয় সড়ক নম্বর ৫৩ যার
বর্তমান নম্বর ৩৭ দিয়ে শিলচর থেকে ইম্ফল শহরের দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিমি। ট্রেভেলার
বা টাটা সুমো করে জিরিবাম-ইম্ফল জাতীয় সড়ক দিয়ে সাধারণত দশ থেকে বারো ঘণ্টায় এই
পথ অতিক্রম করা যায়। কিন্তু
২০১০ সালে জুলাই-আগস্ট মাসে ধারাবাহিক প্রবল বৃষ্টিপাতের কারণে জিরিবাম পার হওয়ার
পর থেকেই জাতীয় সড়কের হাল খারাপ হয়ে গিয়েছিল। উপরন্তু সেই সময়ে ডিমাপুর-ইম্ফল
জাতীয় সড়ক নম্বর ৩৯ অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে বন্ধ ছিল। তাই কিছুদিন থেকে অনেক
দশ-বারো চাকার ভারী যানবাহন বা ট্রাক চলাচলের ফলে জিরিবাম-ইম্ফল জাতীয় সড়কের অবস্থা আরও
শোচনীয় হয়ে পড়ে।
মূল ঘটনার সুত্রপাত হয় ১৯শে
আগস্ট ২০১০ সালে।
তখন দুজন সার্ভেয়ার, একজন ড্রাইভার ও
গ্রুপ-ডি স্টাফ নিয়ে গঠিত চারজনের একটি দল প্রস্তুতিমূলক ফিল্ডের কাজের জন্য
ইম্ফলের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ট্রেলার সংযুক্ত কমান্ডার জিপ দিয়ে শিলচর অফিস থেকে প্রায় চারদিন পর তারা
ইম্ফল শহরে গিয়ে পৌঁছায়। তাদের ওই যাত্রা পথে জিপটিকে বুল ডোজারের সাহায্যে
দু-তিন জায়গায় প্রায় এক কিলোমিটার পথ ঠেলে নিয়ে যেতে
হয়েছিল।
শিলচর থেকে আমাদের দলের
যাত্রা শুরু হয় ৫ই সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে ৪০৭ গাড়ি বা মিনি ট্রাক নিয়ে। আমাদের তেরো সদস্যের
দলে ড্রাইভারসহ দুজন সার্ভেয়ার, সাতজন গ্রুপ-ডি কর্মচারী আর তিনজন
ক্যাম্পখালাসি ছিল।
এই কঠিন যাত্রাপথ অতিক্রম করতে আমার সহকর্মী সার্ভেয়ার যথেষ্ট সাহায্য করেছিল। আমরা আলোচনা করে সব
সমস্যার সঠিক সমাধান বের করতাম। প্রাথমিকভাবে আমি ভেবেছিলাম যে আমাদের যাত্রাপথ
তিন থেকে চারদিনের বেশি হবে না এবং এর জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলাম। তার প্রধান কারণ ছিল
আগের দলটি ঠিক চারদিনের মাথায় একই জাতীয় সড়ক দিয়ে ইম্ফল শহরে গিয়ে পৌঁছেছিল। আমরা
মনিপুরের বরাকপার গ্রামে দুপুরের খাবার খাওয়ার পরিকল্পনা করায় সে যাত্রায়
জিরিবামে বিশেষ কিছু খাওয়া হয়নি। কিন্তু কে জানত যে আমরা এক কঠিন রোমাঞ্চকর
যাত্রার দিকে ধীর গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।
জিরিবাম ছাড়ার মাত্র কয়েক
কিমি পরে আমাদের গাড়ির সামনে সারিবদ্ধ ভাবে কয়েকটা ট্রাক ও ট্রিপার দেখতে পেলাম।
আমাদের সরকারি বাহনচালক প্রায় পঞ্চাশটি ট্রাককে অতিক্রম করে খানিকটা এগিয়ে গেল।
কিছুদূর যাবার পর হঠাৎ জাতীয় সড়ক সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং আমরা ট্রাকের দীর্ঘ সারি
দেখতে পেলাম। গাড়ি
থেকে নেমে জানতে পারলাম যে কিছু আগে একটা ট্রাক কাদায় আটকে পড়েছে। ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার
পর আমাদের ৪০৭ গাড়িটি স্টার্ট দেয় এবং মিনিট পনেরো পর একই ধরনের ঘটনায় আবার থেমে
যায়।
সেই নির্দিষ্ট দিনে আট থেকে
দশবার আমরা আটকা পড়েছিলাম। অবশেষে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা নাগাদ ওনিয়ামলংয়ের কাছে
মাকরুতে দাঁড়াতে হয়েছিল। এবারে জঙ্গলের কাছাকাছি আমাদের ট্রাক কাদায় আটকে গেল আর
সার্ভের কাজে নিযুক্ত তেরোজনের দল পুরো রাত সেই শুনসান এলাকায় শুয়েবসে কাটালাম।
অফিসের ৪০৭ গাড়িটি ছিল
পুরানো মডেলের এবং ড্রাইভারের কেবিনের ভিতরের আলো দুর্ভাগ্যবশত খারাপ হয়ে যায়। তাছাড়া
ক্যাম্পখালাসিদের ব্যবহারের জন্য আমরা সাথে করে যে কেরোসিন তেল নিয়ে যাচ্ছিলাম তা
খারাপ রাস্তার ঝাঁকুনির জন্য অনেকটা পড়ে গিয়েছিল। তাই কেরোসিনের দুর্গন্ধে অন্ধকার কেবিনে মশার
কামড় খেয়ে আমাদের দুজনকে সেই রাতটা কাটাতে হয়েছিল। কেবিনটা সবে তিন ফুট চওড়া
এবং আমরা দুজন ছিলাম প্রায় পাঁচ ফুট আট ইঞ্চি লম্বা। তাই আমরা ভালো করে পা
মেলতে পারছিলাম না। আমাদের গাড়ির পিছনের অংশটি তাঁবু,
সরকারি
যন্ত্রপাতি আর সবার লাগেজ দিয়ে বোঝাই ছিল। তার উপর শুয়ে ছিল খালি পেটে থাকা আমাদের ড্রাইভারসহ
এগারোজন সরকারি কর্মচারী।
পরদিন সকাল ৮টা নাগাদ গাড়ি
চলতে শুরু করল, কিন্তু কয়েক মিনিট পর আবার
একই ঘটনা ঘটল। আমি অবশেষে বুঝতে পারি যে আমরা তিন থেকে চারশো ট্রাকের
মধ্যে আটকা পড়েছি এবং ফিরে আসাটা প্রায় দুঃসাধ্য। সেদিন সকালে ক্ষুধা নিবারণের
জন্য সবাই রান্না করার সিদ্ধান্ত নিল। কিন্তু যত্রতত্র কাদা এবং বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে
আমাদের চিন্তাধারা বাস্তবায়িত হল না। ভাগ্যক্রমে দুপুরবেলা নাগাদ আমরা একটি ঝরনা পাই এবং
ক্যাম্পখালাসিরা সবাই মিলে পুরো দলের জন্য খাবার তৈরি করে। আমাদের সঙ্গে মাত্র তিন
থেকে চারদিনের রেশন ছিল তাই আমরা দিনে একবার করে খাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
স্থানীয় লোকজন আর
প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে মতবিনিময় করে জানতে পারলাম যে ইম্ফল পৌঁছতে আরো দিনদশেক
সময় লাগবে। প্রতিনিয়ত কোনও-না-কোনও গাড়িতে
যান্ত্রিক গোলযোগ নতুবা কাদায় পড়া সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। এইভাবে আমাদের ভাগ্য
সামনে থাকা গাড়িগুলোর উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। দিনের পর দিন আমরা কচ্ছপের
গতিতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। জাতীয় সড়কের অবস্থা ধানক্ষেতের মতো হয়ে গিয়েছিল এবং উচুঁনীচু পথে
সর্বত্র ছিল জল আর কাদায় ভরা বড়ো বড়ো
গর্ত।
পাঁচদিন পর আমরা তামেংলং
জেলার কাম্বিরন গ্রামে পৌঁছালাম আর যেখান থেকে ইম্ফল যাওয়া পর্যন্ত কিছু রেশন কিনে
নিলাম। অনেকদিন পর সেখানের
একটা রেশনের দোকানে কিছু টাকার বিনিময়ে মোবাইলগুলো চার্জ করতে পেরেছিলাম। মনিপুরের এই পাহাড়ি
অঞ্চলে নেটওয়ার্কের অবস্থা খুবই শোচনীয় হওয়ায় আমি অফিস আর পরিবারের সাথে
কয়েকদিন যোগাযোগ করতে পারিনি।
কাম্বিরন গ্রামের কাছে একটি
সিআরপিএফ ক্যাম্প ছিল যার পাহাড়ের চূড়ায় কিছু নির্দিষ্ট অবস্থানে মোবাইলগুলি
কিছু সংকেত ধরতে পারে। সেখান থেকে পাঁচ-ছয়দিন পর অফিস ও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ
করি। এই যাত্রায় আটকে পড়া কিছু মানুষ আর ট্রাক চালকদের সাথে আমাদের এই কদিনে ভালো সম্পর্ক
গড়ে উঠেছিল। তাই যখনই রাস্তা সারাতে তারা আমাদের সাহায্য চেয়েছিল আমরাও সদলবলে
করেছিলাম। এখনও
যখন কোনও পথে একে ওপরের সাখে দেখা হয় তখন আমরা সেই সময়ের গল্প করি।
প্রতিদিন সকালে সূর্যের প্রথম
কিরণের সাথে মনে আশা জন্মায় যে আজ আমরা এই প্রতিবন্ধকতাগুলি অতিক্রম করতে পারব যা
সন্ধ্যাবেলায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে ধূলিসাৎ হয়ে যায়। কেবিনে বসে আমরা দুজন
সার্ভেয়ার ও ড্রাইভারকে চলার প্রতি মুহূর্তে নিজেদের হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ
রাখতে হয়েছিল। এর প্রধান কারণ আমাদের সামনে দেখতে পাওয়া বড়ো বড়ো গর্ত ও সুবিশাল ভুমিস্খলন এবং কীভাবে আমাদের ৪০৭ গাড়িটি নিজের ক্ষতি না
করে কোনও ভাবে এপাশ-ওপাশ করে সেগুলোকে অতিক্রম করতে পেরেছিল। আমাদের পঁচিশ বছরের সরকারি
বাহনচালক অত্যন্ত দক্ষ্যতার সাথে অনেক ঝুঁকি নিয়ে পথের এইসব বাধাবিপত্তি কাটিয়ে
আস্তে আস্তে এগিয়ে যাচ্ছিল। আমরা জানতাম যে যদি আমাদের গাড়ি কাদায় আটকা পড়ে বা তাতে
কোনও যান্ত্রিক গোলযোগ দেখা দেয় তবে আমাদের এই যাত্রা অনির্দিষ্টকালের জন্য
সেখানেই স্থায়ী হবে। সৌভাগ্যক্রমে ভগবানের অশেষ কৃপায় আমাদের ৪০৭ গাড়িটি কোনও
ক্রমে সেখান থেকে বেরোতে পেরেছিল।
অবশেষে এগারো দিনের মাথায় এই
কঠিন যাত্রার যবনিকাপাত হয় যখন আমরা নুংবা গিয়ে পৌঁছলাম। এটি মণিপুরের তামেংলং
জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এবং শিলচর থেকে প্রায় একশো পঞ্চাশ
কিলোমিটার দূরে। আমাদের দাড়িমুখো চেহারা আর পরনে থাকা ময়লা কাপড়চোপড় দেখে মনে
হয়েছিল যেন আমরা জেল থেকে সদ্য মুক্তি পাওয়া তেরোজন কয়েদি।
নুংবাতে আমরা অনেকদিন পর ভাল
করে পেট ভরে খেয়ে আবার ইম্ফলের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। গাড়িটির ব্রেক
এই কদিন কাদায় চলাচল করে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যার মেরামত করার জন্য আমাদের
আবার নোনেতে থামতে হয়। সেই দিনই ১৫ই সেপ্টেম্বর ২০১০ সালে অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার
দিকে আমরা ইম্ফল শহরে এসে পৌঁছালাম। এইভাবেই জাতীয় সড়ক নম্বর ৫৩ দিয়ে শিলচর থেকে ইম্ফল পর্যন্ত
মাত্র ২৭০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে আমাদের প্রায় এগারো দিন সময় লেগেছিল।
ইম্ফল পৌঁছানোর পরের দিন আমরা
সকাল আটটা থেকে সার্ভের কাজে আকণ্ঠ নিমগ্ন হয়ে যাই। আটাশ দিনের মধ্যে
দুর্গাপূজার ঠিক কয়েকদিন আগে সার্ভের সম্পূর্ণ কাজটি শেষ করতে পেরেছিলাম। তারপর
আমরা দু-তিনটে জাতীয় সড়ক দিয়ে কোহিমা-ডিমাপুর-যোরাবাট ও শিলং হয়ে শিলচরে ফিরে আসি।
দূরপাল্লার গাড়ি আর ট্রাক
চালকদের জন্য এই ধরণের যাত্রার অভিজ্ঞতা খুব একটা নতুন নয় কারণ তারা এর জন্য
মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে। কিন্তু আমাদের কাছে এটা একটি কঠিন রোমাঞ্চকর যাত্রা ছিল যা
আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল গেঁথে থাকবে।
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment