ধারাবাহিক
গল্প
ডঃ নিতাই
ভট্টাচার্য
সন্ধানে
[২য় পর্ব]
"সরলা ভেবেছে আজ না হোক কাল রঘু আসবে। দেখতে দেখতে কয়েকমাস কেটে গেল, রঘু আসেনি সরলার কাছে। এদিকে দাদার অভাবের সংসার। কাঁচা আনাজ বিক্রির পয়সায় সংসার কোনরকমে খুঁড়িয়ে চলে।"
পূর্বানুবৃত্তি সরলা পরিস্থিতির চাপে দাদার বাড়িতে
উঠতে বাধ্য হয়েছে তাও দাদার অনেক বলার পরে। বরের নেশা করে মারধোর আর সহ্য হয়নি। তারপর…
সংসারের দুর্দশা দেখে স্থির
রাখতে পারে না রঘু। চোখের সামনে সরলা অসীম যন্ত্রণা নিয়ে বেঁচে থাকবে আর রঘু নিরুপায়
হয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে, তাই হয়! মেজাজ
সপ্তমে তাই। নিজের উপর রাগ হয় ভীষণ। সরলাকে আঘাত করে নিজেকেই যেন শাস্তি
দেয় রঘু। এ এক অদ্ভুত আত্মনির্যাতন। রাতেরবেলায় সরলাকে মারধর করার পর উঠানে জোরে
জোরে মাথা ঠোকে রঘু।
-দূর হয়ে যা
তুই এখান থেকে। আমি একা না খেয়ে মরব।
তখন রঘুর পাশে বসে সরলাও
কাঁদে বলে,
-সব ঠিক হবে একদিন।
সরলার চোখে জলে দেখে রঘুর
মনের আগুন কয়েক গুণ বেড়ে ওঠে। তখন গলা তুলে বলে,
-কী ঠিক হবে? কী ঠিক হবে? আমাকে ন্যাবলা পেয়েছিস! মাতাল আমি? তোর কথায় বনমালী হাজরার জমিতে হাল নামবে? তোর কথায় পাকাধান কাটতে বাবু ডাকবে আমায়? আমি কাস্তে নিয়ে...
রঘুর চিৎকারে নিঝুম রাতের
নিথর বাতাস কেঁপে ওঠে। তখন ভয়ে সিঁটিয়ে থাকে সরলা। চেয়ে দেখে রঘুকে। আঁধার
ফুঁড়ে এক অচেনা মানুষ হাজির হয় সরলার সজল চোখের সামনে। কর্মক্ষম মানুষের হাতে
কাজ না থাকলে এমনই হয় বুঝি।
গ্রামের বনমালী হাজরার
বাড়িতে সারাবছর বাঁধা কাজ করত রঘু, সেই কত ছোটোবয়স থেকে
বছরদুয়েক আগে পর্যন্ত। মাসের শেষে যে টাকা পেতো পেট ভরানোর চিন্তা করতে হতো না।
সকালবেলায় দুধ দোয়ানো দিয়ে শুরু হতো রঘুর কাজ। তারপর
সারাদিন কাজের বিরাম ছিল না। নাওয়াখাওয়ার সময় পেতো না রঘু। এই জমি থেকে ওই জমি
ছুটছে। আবার কখনও শহরে ছুটছে বাবুর আজ্ঞাবহ হয়ে। এরই মাঝে গোয়াল পরিষ্কার করা, গোরুর চান করানো,
গোরুর
জন্য বিচুলি কাটা, কত কত কত কাজ। হাওয়ার পিঠে
জিন চাপিয়ে ছুটত রঘু। দুপুরে খাওয়া বনমালী হাজরার বাড়িতেই ছিল। সন্ধ্যাবেলায় গাইগুলোর
দুধ দুইয়ে সমবায়ে দুধ পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফিরত রঘু। এমনটাই চলত রোজ রোজ। আর আর
চাষের সময় নিশ্বাস ফেলার সময় থাকত না। তখন রঘু বাগদীর সে এক অন্য চেহারা।
জনাদশেক মুনিষ নিয়ে মাথায় তালপাতার টোকা চাপিয়ে একাই
সামলে দিত বাবুর বিশ বিঘে জমির চাষ। রাতেরবেলায় রঘু বাড়ি ফিরলে সরলা কপট
অভিযোগের সুরে বলত,
-বাবু তোমাকে রুপোর টাকা দেয় নাকি!
তখন হা হা করে হেসে উঠত রঘু।
তারপর বলত,
-দে দে দুটো ভাত দে আবার ভোরবেলায় উঠে যেতে হবে। আজ সকালে
সমবায়ে দুধ পৌঁছে দিতে দেরি হয়ে গেছে রে।
সেসব দিন কোথায় যেন হারিয়ে
গেল! কোন অশুভ গ্রহের পাপদৃষ্টি এলোমেলো করে দিলো জীবন!
-গোরু রেখে লাভ নেই আর, ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রির মতো অবস্থা। ছেলেরাও আর চায় না গোরু গোয়ালের হাঙ্গামা।
বলে বনমালী হাজরা। গোয়াল
ফাঁকা হলো একদিন। শূন্য গোয়ালে দাঁড়িয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলেছিল রঘু। সারাদিনের
বেশ কয়েকদফা কাজ কমল এইবার। মাসমাইনে কমল একই অনুপাতে। মনখারাপ হলেও নিজেকে সামলে
নিয়েছিল রঘু। তবে এর পরের ধাক্কাটা আর সামলাতে পারেনি। জমিতে হার্ভেস্টর এলো। এখন
চাষে আর লোক লাগে না। এক জনেই কাজ চলে। ধান কাটাই, ঝাড়াই, বস্তায় ভরা সব কাজ করে
মেশিন। হাজার মানুষের কাজ মেশিন করছে কয়েক মুহূর্তে। বনমালী হাজরা বলে,
-দুদিনের মধ্যে বিশ বিঘে জমির পাকাধান গোলায় আসে রঘু। শুধু
শুধু জন মুনিষ পুষে গুচ্ছের টাকা...
জমির আলে দাঁড়িয়ে হুহু করে
উঠেছিল রঘুর বুক। সেই মুহূর্তেই ভাবীদিনের অন্নহীনতার আভাস পেয়েছিল। তবে নিজের
পরাজয় স্বীকার করতে সময় নিয়েছিল রঘু। গ্রামে বনমালীই একা চাষি নয়, আরও অনেকেই রয়েছে। অসীম আশায় বুক বেঁধে সবার জমির আলে
কাস্তে হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছে রঘু। একই দৃশ্য সর্বত্র, একই কথা সবার মুখে।
হার্ভেস্টর গ্রাস করেছে জনমুনিষের ভাত।
তারপর থেকে কর্মহীন রঘু। কম ঘোরেনি কাজের খোঁজে। কোথাও কাজ নেই, কোথাও নেই। গ্রামগুলো যেন বদলে গেল রাতারাতি। কারো গোয়ালে গোরু নেই।
জমিতে মুনিষ লাগে না। মাটি কাটতে লোকের প্রয়োজন নেই। এ যেন
আলাদিনের সেই দৈত্যের কারসাজি,
এক
তুড়িতে পাল্টে দিয়েছে রঘুদের জীবন। এক অভূতপূর্ব দুর্দশার অশনিসংকেত!
স্বামীর এই অবস্থা। তাই নিজের
কাজের আশায় সরলা গিয়েছিল গ্রামের হরিপদ মণ্ডলের কাছে। হাসতে হাসতে মন্ডলবাবু বলে,
-কাজ কোথায় পাবে বৌমা?
কাল
আধার কার্ডটা নিয়ে...
তারপর থেকে মাসে মাসে ভাতা
পায় সরলা। ব্যাংক থেকে টাকাটা তুলে নিয়ে আসে নিজে গিয়ে। সে টাকায় চুলোর আগুন
মাঝেমধ্যে জ্বলে ঠিকই, সেটাই কি যথেষ্ট? কাকে বলবে সে যন্ত্রণার কথা।
ওদিকে অনেক ঘুরে পারাজের কাছে
এক ইটভাঁটায় কাজ পায় রঘু, সপ্তাহে ক’দিন মাত্র কাজ
দেবে মালিক। চাষের কাজ খুইয়ে অনেক রঘুই ভিড় করে দাঁড়িয়ে সেখানে, সবাইকে তো আর এক সঙ্গে কাজ দেওয়া যাবে না। কাজেই...। যেদিন
কাজ আছে সেদিন সামান্য মজুরি আসে। তারপর মদ্যপান। তারপর...।
-অত ভাবার কী আছে বুঝিনে বাপু। কয়েকদিন ওখানে গিয়ে
থাকবি। তারপর দেখবি বাপ বাপ করে হাজির হয়েছে রঘু। এখন দুবেলা ভাত পাচ্ছে তো তাই
তোর কদর...
সরলাকে বলেছিল সরলার দাদা। কথাটা
ঠিকই। কীভাবে যে হাঁড়ি চড়ায় সরলা সে কথা কী রঘু জানে!
শুধুই বউয়ের গায়ে হাততোলা। শিক্ষা হওয়া উচিত লোকটার। করুণ
অভিমান দানা বাঁধে সরলার বুকে। আবার সঙ্গে অন্য ভাবনাও মনে আসে। যদি হিতে বিপরীত হয়? দাদাকে বলে,
-তুমি ফিরে যাও দাদা। আমি বরং মানুষটাকে বুঝিয়ে...
-কথা শোন বোঝার মতো অবস্থায় নেই রঘু। আমার সঙ্গে চল।
সরলার মুখের কথা থামিয়ে
দিয়ে বলেছিল সরলার দাদা। সেদিন বড্ড দোটানায় পড়ে ছিল সরলা। উঠানের একপাশে
দাঁড়িয়ে ছিল পাশের বাড়ির ছবির মা। বলে,
-তোর দাদা ভালো কথাই বলেছে বউ। ক’দিন বাপের
বাড়ি চলে যা। হারামজাদাটাকে বুঝতে দে। তাছাড়া আমরা তো রয়েছি...
সেই বাপের বাড়ি এসেছে সরলা।
ভেবেছে আজ না হোক কাল রঘু আসবে। দেখতে দেখতে কয়েকমাস কেটে গেল, রঘু আসেনি সরলার কাছে। এদিকে দাদার অভাবের সংসার। কাঁচা
আনাজ বিক্রির পয়সায় সংসার কোনরকমে খুঁড়িয়ে চলে। মাঝেমধ্যেই দাদাকে বলেছে সরলা,
-এবার ফিরে যাই। ভালো লাগছে না আর।
রঘুর খবর আনে সরলার দাদা। বলে,
-সে এখন ভালোই আছে। মদ খাওয়াটা কমেছে আর ক’টাদিন পরে
নাহয় যাবি।
ক্রমশ…

No comments:
Post a Comment