প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Friday, May 16, 2025

সন্ধানে [৩য় পর্ব] | ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য

বাতায়ন/সাপ্তাহিক/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৮ম সংখ্যা/১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
ডঃ নিতাই ভট্টাচার্য
 
সন্ধানে
[৩য় পর্ব]

"বেশ কিছুক্ষণ পরে ট্রেন এসে দাঁড়ায় প্লাটফর্মে। ট্রেনে ওঠে রঘু। মানুষটা চলে যাচ্ছে সরলাকে একলা রেখে। ফুঁপিয়ে ওঠে সরলা।"


পূর্বানুবৃত্তি সংসারের দুর্দশা দেখে স্থির থাকতে পারে না রঘু। অনেক ঘুরে পারাজের কাছে এক ইটভাঁটায় কাজ পায় রঘু, সপ্তাহে কদিন মাত্র কাজ দেবে মালিক। তারপর…

সরলার ফিরে আসার পথে বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ওর দাদা। তবে স্বামীর এই ভগিনীপ্রীতি ভালো চোখে দেখেনি সরলার বৌদি। বরং স্বামী অসুস্থ হওয়ার পর থেকে বিষয়টা দিন দিন অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে। আজ যা মুখে 

এসেছে তাই বলেছে সরলাকে। অন্যদিন হলে হয়তো নিজের অসহায় অবস্থা বোঝাতে দুটো কথা বলত সরলা। দাদার শরীরের অবস্থা দেখে আজ চুপ থেকেছে। ওষুধ, ডাক্তার জরুরি এই মুহূর্তে। কথা বাড়িয়ে লাভ কী। এই পাঁচমাসে কিছু টাকা ব্যাংকে নিশ্চয় জমা পড়েছে। তুলে আনতে পারলে কাজে লাগবে। কিন্তু ব্যাংকের বই তো সেখানে।
 
কাউকে কিছু না বলে মেঠো পথে হাঁটা দেয় সরলা। সারাপথ রঘুর কথা ঘুরপাক খায় মাথায়। হাজারো ভাবনায় শ্লথ হয়ে আসে হাঁটার গতি। বাড়ির দরজায় পৌঁছে থমকে দাঁড়ায় সরলা। এই কমাসে বাড়িটা কেমন অচেনা হয়ে উঠেছে। উঠানে দাঁড়ায় কিছুক্ষণ। ঘরের দরজায় ছোট্ট তালা ঝুলছে। রঘু নেই। তাহলে?
-ধন্যি তোর জেদ বউ! সেই গেলি আর এদিকে রঘু...
বাড়ির চাবি নিয়ে ছবির মা আসে। রঘু ইদানিং ইটভাঁটাতেই থাকে। বাড়ি ফেরা তার মনমর্জি। গতকাল এসে ব্যাগে করে কীসব নিয়ে গেছে। ঘরের চাবিটা দিয়ে গেছে ছবির মাকে। এর বেশি কিছু জানে না ছবির মা। দুশ্চিন্তায় মাথা নুয়ে আসে সরলার। পায়ের নিচের মাটি কেঁপে ওঠে। কোনরকমে ঘরের তালা খোলে সরলা। ব্যাংকের বই, আধার কার্ড আরও কিছু টাকাপয়সা থাকত একটা ছোটো নীল রঙের ব্যাগে। ঘরের কোথাও নেই ব্যাগটা। তন্নতন্ন করে খোঁজে সরলা, ব্যাগটা পায় না। তাহলে?
 
চোত মাসের দুপুর। আকাশ থেকে আগুন ঝরছে যেন। বাড়ি ফেরে সরলা। দুয়ারে এসে বসে। বুকটা ধকধক করছে তখনও। শরীরে শক্তি নেই আর। মনে সহস্র প্রশ্নের ওঠাপড়া। সরলার বৌদি বলে,
-রঘু এসেছিল। এই ব্যাগটা তোমায় দিয়ে গেছে। আজ রাতে পারাজ স্টেশন থেকে...
বৌদির কথা শুনে চমকে ওঠে সরলা। কেমন একটা শূন্যতা জাপটে ধরে। ব্যাগটা হাতে নিয়ে খুলে দেখে। যা যা থাকবার কথা সবই রয়েছে ব্যাগের মধ্যে। বুক ফেটে কান্না আসে সরলার। কী ভেবেছিল রঘুকে!
সবে দুপুর। রাত হতে ঢের বাকি, সন্ধ্যাবেলার মধ্যে পারাজ স্টেশনে যাবেই সরলা। মানুষটা তাকে এখানে ফেলে রেখে কোথায় যাবে কে জানে! তার আগে অন্তত একটিবার দেখবে রঘুকে।
 
ব্যাংকে যায় সরলা। হাজারখানেক টাকা জমেছিল। সবটাই তুলে এনে দেয় বৌদির হাতে। বাড়িতে অসুস্থ মানুষ রয়েছে, কাজে লাগবে টাকাটা।
এদিকে ফুরিয়ে এসেছে বেলা। পশ্চিম আকাশে লালিমা ভাসিয়ে দিগন্তরেখার গায়ে মাথা রেখেছে সূর্য। রণপায়ে হেঁটে পারাজ স্টেশনে পৌঁছায় সরলা। অনেকের সঙ্গে রঘুও দাঁড়িয়ে প্লাটফর্মে। রঘু এগিয়ে আসে সরলাকে দেখে। একমুখ হেসে বলে,
-আমি ঠিক জানতাম তুই আসবি।
সজল চোখে রঘুকে দেখে সরলা। এই কমাসে বদলে গেছে রঘু। মুখে সেই পরিচিত পুরানো হাসি। বেশ কিছুক্ষণ পরে ট্রেন এসে দাঁড়ায় প্লাটফর্মে। ট্রেনে ওঠে রঘু। মানুষটা চলে যাচ্ছে সরলাকে একলা রেখে। ফুঁপিয়ে ওঠে সরলা। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে রঘু বলে,
-দেখিস কী? উঠে আয় তাড়াতাড়ি।
হঠাৎ করে বুকের ভিতর অপ্রত্যাশিত আনন্দের বন্যা আসে। ট্রেনে ওঠে সরলা। রঘু বলে,
-আমরা কোথায় যাচ্ছি জানিস?
-হুম।
বলে সরলা।
-কোথায়?
প্রশ্ন রঘুর।
-যেখানে কাজ আছে।
বলে চুপ করে সরলা। বউয়ের কথা শুনে হাসে রঘু। রঘুর গা ঘেঁষে বসে সরলা। অন্ধকার পৃথিবীর বুক চিরে হুহু করে ছুটে চলে ট্রেনটা, রঘুদের পৌঁছে দেবে কাজের দেশে। ঘর মাটি আত্মীয়পরিজন ছেড়ে কাজের আশায় দেশ ছাড়ল সরলা রঘুর হাত ধরে। আর কী ফিরবে কোনোদিন তার চেনা পৃথিবীতে? এক বিন্দু জোনাকি হয়ে প্রশ্ন-স্ফুলিঙ্গটি আঁধারে ভেসে বেড়ায় ফেলে যাওয়া নির্জন প্রান্তরে।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)