প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Monday, May 19, 2025

দহন জ্বালা | অঞ্জনা মজুমদার

বাতায়ন/দহন/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২
দহন | ছোটগল্প
অঞ্জনা মজুমদার
 
দহন জ্বালা

"গোকুলবাবু খোকাকে কোলে নিয়ে গালে গাল ঠেকিয়ে দেখলেন খোকার গায়ে সত্যি জ্বর নেই। বুকের ভেতর একটা শান্ত হাওয়া বয়ে গেল। গোকুলবাবু আর দহন জ্বালা অনুভব করছেন না।"


আজকের কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এবছরের উষ্ণতম দিন। গোকুলবাবুর কাঁধে ধুপের প্যাকেট ভর্তি ব্যাগ। আজকে বেশি বিক্রি হয়নি। আর দশটা প্যাকেট বিক্রি করতে না পারলে খোকার ওষুধ কিনতে পারবেন না। কাল থেকে খোকার খুব জ্বর। কোনও মতে ডাক্তার দেখানো হয়েছে কিন্তু একটা জরুরি ওষুধ কেনার টাকা ছিল না। ভাগ্য ভালো কলকাতার বাসে ফেরিওয়ালাদের ভাড়া দিতে হয় না!

 
বাস থেকে নেমে ফুটপাতের কলের জলে চোখে মুখে জল দিলেন গোকুলবাবু। গরমটা বড্ডই বেশি। উত্তর কলকাতার গলিগুলোতে ভাগ্যিস রোদ একটু কম ঢোকে। প্রথম বাড়ির কড়া (এখনও উত্তর কলকাতার সব বাড়িতে কলিংবেল নেই) নাড়তে একটি অল্পবয়সি বৌ দরজা খুলে দাঁড়াতেই ভিতর থেকে শাশুড়ির বাজখাঁই গলা শোনা গেল,
-বৌমা, ভরদুপুরে আর দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না। বন্ধ করে দাও। জানো না, আমাদের বাড়তি কিছু কেনার পয়সা নেই?
বৌটি তাড়াতাড়ি মলিন মুখে দরজা বন্ধ করে দিল। পরের বাড়িতে কলিংবেল আছে। বাজাতেই কেউ একজন আই হোল দিয়ে দেখে দরজা না খুলেই জিজ্ঞেস করল,
-কী চাই?
-আমি ধুপকাঠি বিক্রি করতে এসেছি
গোকুলবাবু বললেন।
-আমাদের বাড়িতে ধুপে অ্যালার্জি আছে
উত্তর এলো। পরের বাড়িতে দরজা খোলাই ছিল। আওয়াজ শুনে একটা ক্ষীণ স্বর ভেসে এল,
-খোকা ফিরলি? ঘরে আয়।
গোকুলবাবু পায়ে পায়ে একটা ঘরের ভেতরে আওয়াজ শুনে উঁকি দিলেন। মলিন একটা বিছানায় একা শুয়ে এক বৃদ্ধা। ঘরে জানালার ফাঁক গলে দুপুরের চড়া রোদ্দুরের টুকরো। মাথার ওপর একটা পুরোনো পাখা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দে ঘুরছে। পাখায় হাওয়ার চেয়ে শব্দ বেশি। বৃদ্ধা হাতড়াচ্ছেন,
-জলের গ্লাসটা?
উনি বোধহয় চোখে ভালো দেখতে পান না। গোকুলবাবু জলের গ্লাসটা এগিয়ে দিলেন। বৃদ্ধা বললেন,
-আজ নিতাইয়ের মা শুধু আলুভাতে ভাত করে রেখে গেছে। তুই হপ্তার টাকা পেলে একটু ডাল আনিস। গরমের সময় টক ডাল খাওয়া ভালো। শুকনো ভাত খেতে তোর কষ্ট হয়। আর একটা ধুপকাঠির প্যাকেট আনিস। ঠাকুরের সামনে দেবো।
গোকুলবাবু ব্যাগ থেকে এক প্যাকেট ধুপকাঠি বৃদ্ধার পাশে টেবিলের ওপর রেখে ধীরে ধীরে ঘরের বাইরে এলেন। কানে বাজছে বৃদ্ধার কন্ঠ,
-চৌবাচ্চার ঠান্ডা জলে নেয়ে আয় শরীর জুড়োবে।
গোকুলবাবু দরজার বাইরে পা রাখলেন। এটাই গলির শেষ বাড়ি। পকেটে হাত দিয়ে দেখলেন খোকার ওষুধ হবে না বোধহয়। দেখা যাক বাসে যদি বিক্রি হয়। আজ আর দহন জ্বালা সইছে না।
 
আজ বাসেও মাত্র এক প্যাকেট ধুপ বিক্রি হল। ক্লান্ত পায়ে গোকুলবাবু বাড়ি ঢুকলেন। খোকা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল।
-বাবা আমার জ্বর একদম সেরে গেছে।
খোকার মা বললেন,
-ডাক্তারবাবু বলেছিলেন ঠান্ডা জলে গা ধুইয়ে দিয়েছি। জ্বরটা মনে হয় ছেড়ে গেছে।
গোকুলবাবু খোকাকে কোলে নিয়ে গালে গাল ঠেকিয়ে দেখলেন খোকার গায়ে সত্যি জ্বর নেই। বুকের ভেতর একটা শান্ত হাওয়া বয়ে গেল। গোকুলবাবু আর দহন জ্বালা অনুভব করছেন না।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)