প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Wednesday, June 17, 2026

অদিতি | পারমিতা চ্যাটার্জি

বাতায়ন/নাসির ওয়াদেন সংখ্যা/ছোটগল্প/৪র্থ বর্ষ/৬ষ্ঠ সংখ্যা/২রা আষাঢ়, ১৪৩৩
নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | ছোটগল্প
পারমিতা চ্যাটার্জি
 
অদিতি

"শুভম কেনদিন ভাবেনি তার অদিতিকে ময়দানে নেমে এভাবে লড়াই করতে হবে, ভাগ্যিস সেদিন ওর স্কুলের চাকরিটা ছিল, নইলে আজ যে কী হত, ছোট্ট মেঘনাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াতে হত কে জানে?"

 
সকাল থেকে রাত অবধি যেন তাণ্ডব চলে, রাতে যখন শুতে আসে অদিতি মনে হয় শরীরের সব রক্ত জল হয়ে গেছে, শুভমেরও মনে হয় জীবনযুদ্ধে ছুটতে ছুটতে প্রেম ভালবাসা সেই বেণী ঝোলানো কলেজ পালানো অদিতি সব হারিয়ে গেছে।
আজ আকাশ কালো করে ঝড় এসেছে, মেঘের গর্জন, এখনি হয়তো শুরু হবে প্রবল বৃষ্টি, আজ শুভমের অদিতিকে কাছে পেতে ইচ্ছে করছিল, কিন্তু অদিতি তো ক্লান্তিতে শ্রান্তিতে ঘুমে কাতর সারাদিনের ক্লান্তিতে পরিশ্রান্ত মুখটা দেখে ভীষণ মায়া হল শুভমের, তার ঘুমন্ত মুখের ওপর এলোমেলো চুলগুলি উড়ে এসে পড়েছে, ক্লান্ত শিথিল হাত-পা ছড়িয়েছিটিয়ে আরামে ঘুমোচ্ছে, শুভম ওর কপালের ওপর থেকে চুলগুলি সরিয়ে দিল আদরের স্পর্শে ঘুমটা আরো গাঢ় হয়ে নেমে এলো।
অদিতি শুভমের খুব আদুরে বউ ছিল, শুভম কেনদিন ভাবেনি তার অদিতিকে ময়দানে নেমে এভাবে লড়াই করতে হবে, ভাগ্যিস সেদিন ওর স্কুলের চাকরিটা ছিল, নইলে আজ যে কী হত, ছোট্ট মেঘনাকে নিয়ে কোথায় দাঁড়াতে হত কে জানে? মাঝে মাঝে নিজেকে শুভমের জ্ঞানপাপী মনে হয়, সব জেনেবুঝেও অদিতির ওপর যখন মানসিক নির্যাতন করে, মনটা শান্ত হলে মনে হয় তার বিকলাঙ্গ শরীরটার মতন মনটাও অচল হয়ে যাচ্ছে।
কত সুন্দর সাজানোগোছানো ফ্ল্যাট ছিল তাদের, অদিতির নিপুণ গৃহিণীপনায় তা আরও মধুর হয়ে উঠত। অফিস থেকে ফিরে এসে চা খাওয়া গল্প করা, কখনও-বা হাল্কা শপিং, আইনক্সে গিয়ে সিনেমা দেখা, রাতে চিনা পাড়ায় গিয়ে খেয়ে বাড়ি ফেরা, ছুটি হলেই লং ড্রাইভ, অদিতির খুব প্রিয় ছিল।
তারপর তাদের দুজনের মাঝে মেঘনা এলো, সে কি খুশির দিন, তার আর অদিতির স্বপ্নের মেঘনা, আস্তে আস্তে বড় হয়ে উঠতে লাগল, নার্সারিতে ভর্তি হল, দুধ কর্ণফ্লেক্স খেয়ে বাবার সাথে স্কুলে যাওয়া আর মায়ের সাথে বাড়ি ফেরা, এই ছিল রুটিন, আবার ওর খাবারটাই বাবাকে খেতে হবে, বাবার ডিম টোস্ট খেলে হবে না, মাঝে মাঝে অদিতি ওকেও হাফবয়েল ডিম দিত, কোনদিন খেত, কোনদিন ছিটিয়েমিটিয়ে বমি করে একসা করত।
সেদিন ছিল মেঘনার পাঁচবছরের জন্মদিন, ফ্লুরিস থেকে ওর বার্থডে কেক আনার সময় ঘটে গেল সেই ঘটনা, যা তাদের জীবনের ছবিটাকে দুমড়েমুচড়ে শেষ করে দিয়ে গেল। রাস্তার এ ধারে গাড়ি পার্ক করে রাস্তা পার হয়ে কেক নিয়ে ফিরছিল, একটা মিনিবাস ঝড়ের গতিতে তার ওপর দিয়ে চলে গেল।
তারপর? তারপর যমে মানুষে টানাটানি, হাসপাতাল, ছুটোছুটি, বোতল বোতল রক্ত জোগাড়, অদিতি দিনরাত এক করে ফেলেছিল, তবুও তার পা দুটো বাঁচাতে পারেনি, হাঁটুর নীচ থেকে দুটো পা কেটে বাদ চলে যায়, তারপর থেকেই শুভম অসমর্থ হয়ে বিছানায়, চোখের সামনে দেখে অদিতির হাভাঙা খাটুনি, তাও তারওপর নিষ্ঠুর আচরণ করে, অহেতুক সন্দেহর আগুন জ্বালিয়ে ওর জীবনটা আরও তিতিবিরক্ত করে দেয়, মেঘনা দেখতে দেখতে ন বছরের হয়ে গেল, বাপের অহেতুক মেজাজে তার ছোট শৈবটাও ধ্বং হয়ে যাচ্ছে, শুভম সব বুঝেও নিজের মনের সাথে যু্দ্ধে বার বার হেরে যায়।
আজ অদিতির ক্লান্ত বিধ্বস্ত মুখ মেঘনার নিষ্পাপ শৈশব তাকে যেন তাড়া করে ফেরে, মনে ভাবে জীবন তাকে কেন মুক্তি দেয় না, জীবন তো তার সব কেড়ে নিল তবে কী লাভ এই বেকার জীবনটার বোঝা বয়ে।
আজ অদিতির ঘুম ভাঙল বেশ বেলা করে, কাল শরীরটাও খুব খারাপ ছিল, সেও যেন আর পারছে না, তার ওপর শুভমের অহেতুক মেজাজ। কাজের মেয়ে সুধা দরজা ধাক্কা দিচ্ছে, ঘুম চোখে দরজা খুলে বাথরুমে ঢুকে গেল, মাথায় অনেক ঠান্ডা জল ঢালতে ঢালতে ভাবছিল, শুভ কী ছিল আর কী হয়ে গেল, কাল মৃণালদার সাথে ফিরেছে বলে কী জঘন্য ভাষায় কথা বলল, মৃণালদার অফিসটাও তার স্কুলের কাছে, তাই মাঝেবমাঝে তার গাড়ি করে বাড়ি ফেরে, মৃণালদা তার দাদার খুব বন্ধু ছিল, হয়তো অদিতির প্রতি একটা টান ছিল, কিন্তু তার মন জুড়ে ছিল তখন শুভম, কী ভবিতব্য দেখ সেই মৃণালদার সাথেই তার যোগাযোগ হল পরম বিপদের দিনে। যাক এখন তাড়াতাড়ি কাজ সেরে চা দিতে হবে নয়তো চেঁচাবে এক্ষুনি।
চা নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখল শুভমও নেই তার হুইল চেয়ারও নেই, কোথায় গেল মানুষটা, বিছনার ওপর একটা চিঠি পড়ে আছে,
 
অদিতি,
তোমায় সুখি করতে বা সুখি রেখে যেতে পারলাম না, আমার দুর্ভাগ্য, তোমার কষ্ট বুঝেও তোমার ওপর অত্যাচার করে গেছি, বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছে করে করতাম না আমার শরীরের সাথে মনটাও বিকল হয়ে গেছিল, নিজের রাস্তা নিজে খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম তোমায় মুক্তি দিয়ে, ভাল থেক, তুমি আর মেঘনা আমার অনেক ভালবাসা নিও
 
শুভম।
 
অদিতি চিঠিটা হাতে নিয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল, আমি মুক্তি চাই না শুভম মুক্তি চাই না।
 

~~000~~

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)