ধারাবাহিক গল্প
পারমিতা
চ্যাটার্জি
ভীরু
প্রেম
[৩য় পর্ব]
"নিজে হাতে পেস্ট্রি কেটে যখন অপুর মুখে তুলে ধরল তখন অপু আর নিজেকে সামলাতে পারল না, কান্নায় ভেঙে পড়ল। নীলয় দীর্ঘদিন বাদে তার স্ত্রীকে তার ভালবাসাকে শক্ত হাতে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল..."
পূর্বানুবৃত্তি আমি আর তোমার কাছে কিছু চাওয়াপাওয়ার আশা রাখি না, তুমি এখানে
শুলে কী না শুলে আমার তাতে কিছু আর যায় আসে না।
আমার ভেতরের সেই আমিটা যাকে তুমি চিনতে সে দীর্ঘদিন অবহেলা আর বঞ্চিত থাকতে-থাকতে নিজের চাওয়াপাওয়ার হিসেবটা ভুলে গেছে। তারপর…
এই বলে সে বেরিয়ে গিয়েছিল বাড়ি থেকে। সেদিন অপু অভিমান করতে পারেনি, কতটা কষ্ট হয়েছিল নীলয়ের তা সেদিন অনুভব করেছিল। তাই আজ বোধহয় মনের আনন্দে সব পূরণ করতে চাইছে। মা যে দু’মাস আগে চলে গেছেন তা ওকে
দেখে বোঝা যায় না।
শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই ঠিক। মা যে কদিন বিছানায় ছিলেন সে যত্নের ত্রুটি করেনি, নার্স,
আয়া কোনকিছুর কার্পণ্য করেনি, নিজের সবটুকু দিয়ে মায়ের সেবা করে গেছে। অপুকে মৃত্যুর সময়ও
ছেড়ে দেননি, তাকে
ঘরে ঢুকতে দেখলেই রেগে যেতেন, কিন্তু আড়াল থেকে মায়ের যাবতীয় পথ্য সব অপুই করে দিত
নিঃশব্দে। নীলয় সবই দেখত,
একদিন বলেও ফেলেছিল,
-অনেক তো
সহ্য করলে, আর
কটা দিন একটু সহ্য কর,
তোমার দুঃখের দিন শেষ হয়ে এসেছে।
কিন্তু অপুর
মধ্যে তখন অভিমানটা এত তীব্র ছিল যে সে নীলয়ের একথার
উত্তরে বলেছিল,
-আমার জন্যে আর নাই বা ভাবলে, আর নতুন করে কিছু পাবার বয়সও নেই, মনও নেই, সব শুকিয়ে
গেছে। নীলয় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিল শুধু আর কিছু বলতে পারেনি। মা যেদিন চলে যান
তার দুদিন আগে হঠাৎ অপুকে ঘরে ডেকে পাঠান। অপু তো অবাক মা
ডাকছেন শুনে। কাছে যাওয়ার পর বললেন,
-আমাকে আজ
তুমি একটু খাইয়ে দেবে?
এই অনুরোধ
শুনে সে তো অবাক, তবু
মুখ থেকে বেরিয়ে গেল,
-আমার হাতে খাবেন? যদি বিষ খাইয়ে দিই?
-তা তুমি
পারবে না, আমার
রান্না তো সব তুমিই কর,
চাইলে তখনই বিষ মেশাতে পারতে, তা যখন করনি
তখন এটাও পারবে না। আমারই ভুল ছিল সব,
সবসময় ভয় পেতাম আমার ছেলেটা বুঝি পর হয়ে যাচ্ছে।
অপু পরম
যত্নে খাইয়ে দিয়েছিল। তারপর যে কদিন বেঁচে ছিলেন সে কদিন অপুর হাতেই খেয়েছেন।
যাবার দিন ওর মাথার কাঁপা-কাঁপা হাত রেখে বলেছিলেন,
-সুখী হও মা।
অপু সেদিন
খুব কেঁদেছিল। মা চলে যাবার পর নীলয়কে একটুও কাঁদতে দেখেনি, ভেবেছিল এখন
হয়তো ঘোরের মধ্যে আছে,
বাড়ি খালি হলেই হয়তো খুব ভেঙে পড়বে। আজ সেই আগের নীলয়কে দেখছে যে নীলয়কে সে
ভালবেসেছিল। টেবিলে গিয়ে তো আরও অবাক নতুন ক্রিস্টালের ফুলদানিতে গোলাপের ফোয়ারা, নিজে হাতে পেস্ট্রি কেটে যখন অপুর মুখে তুলে ধরল তখন অপু আর নিজেকে
সামলাতে পারল না,
কান্নায় ভেঙে পড়ল। নীলয় দীর্ঘদিন বাদে তার স্ত্রীকে তার ভালবাসাকে শক্ত হাতে
বুকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-আজ থেকে
আবার শুরু হবে তোমার গান,
"আমার মল্লিকা বনে…"
কাঁদতে-কাঁদতে অপু বলল,
-কিন্তু
আমার মল্লিকা বনের কুঁড়িগুলো সব ঝরে পড়ে গেছে, আর হবে না।
নীলয় দুহাতে
ওর মুখটা তুলে ধরে ওর চোখে কপালে গালে চুম্বন এঁকে দিয়ে বলল,
-আবার নতুন
করে কুঁড়ি ফুটবে, আমিই
ফোটাব আবার। আমাকে খাইয়ে দেবে-না?
অপুর কান্না ভেজা চোখে হঠাৎ হাসি ফুটে উঠল। চোখের জল মুখে হাসি নিয়ে সে নীলের মুখে পেস্ট্রি কেটে তুলে ধরল, নীলয় খেতে-খেতে গান ধরল,
-হায় ভীরু
প্রেম হায়রে, জয়
করে তবু ভয় কেন তোর যায় না…
সমাপ্ত

No comments:
Post a Comment