প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Monday, September 15, 2025

ঋষিখোলা | জয়িতা বসাক

বাতায়ন/শারদ/ভ্রমণ/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | ভ্রমণ
জয়িতা বসাক
 
ঋষিখোলা

"শেষ চড়াইটুকু পেরোতে গিয়ে দেখি এক স্থানীয় কিশোরবয়স ষোলো কী সতেরোপিঠে পর্যটকদের মালপত্র সমেত বিশাল ঝুড়ি নিয়ে হেঁটে চলেছে। কথা বলে জানলামস্থানীয় স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে সে। তারপর পড়াশুনা ছেড়েসংসারের প্রয়োজনে বাপ-দাদাদের পেশাকে বেছে নিয়েছে।"


উষালগ্ন। বিগত রাতের কালো অন্ধকারগুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে মিলিয়ে যাচ্ছে পুবের দিগন্ত রেখায়। মিশে যাচ্ছে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের গহনে। কুলকুল করে একটা পাহাড়ি নদী পাথরের বুক চিরে এগিয়ে চলেছে। আলো ফোটার সাথে সাথে অসংখ্য


 পাহাড়ি পাখির সুমধুর গান ছুঁয়ে যাচ্ছে নদীর স্রোত। চারপাশ ঘিরে নিঝুম পাহাড়, সবুজ গালিচা বেয়ে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গহন অরণ্যকে আঁচলে বেঁধে প্রভাতী হাওয়া আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে, সারা শরীর জুড়ে তার জলজ সোঁদা ঘ্রাণ। অঞ্চলভেদে প্রতিটি ভোরের আলাদা আলাদা গন্ধ থাকে। চোখ বন্ধ করলেই তাকে অনুভব করা যায়, টের পাওয়া যায়। সমুদ্রের বাতাসের, সবুজ পাহাড়ের, গভীর অরণ্যের সব ঘ্রাণই যেন আলাদা আলাদা। পৃথক নারীর মতো স্বতন্ত্র। আবার সূর্য ওঠার সাথে সাথে প্রকৃতির এই নিজস্ব ঘ্রাণটা হারিয়ে যায়, ছড়িয়ে পরে রোদের চেনা পরিচিত গন্ধ।
সিলারিগাঁও, মনখিম, অরিতার ঘুরে আমাদের এবারের যাত্রাপথে শেষ আশ্রয় ঋষিখোলা। দার্জিলিং জেলার কালিংপং অঞ্চলে, পশ্চিমবঙ্গের একদম শেষ সীমানায় এই ঋষিখোলা। পাহাড়ের অপর প্রান্তেই সিকিম আর ঠিক মাঝখানে দিয়ে বয়ে চলেছে পাহাড়ি ঋষি নদী বা রেশি নদী। স্থানীয় ভাষায় "খোলা" মানে নদী বা স্রোত, ঋষি নদীর চারপাশের এই পাহাড়ি উপত্যকাটি তাই "ঋষিখোলা" নাম পরিচিত। এই জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০০০ কিমি উঁচু পাহাড়ের উপরে। সিকিমের গ্যাংটক থেকে ৯০ কিমি আর পশ্চিমবঙ্গের কালিংপং থেকে ৩৭ কিমি দূরে।


ঋষি নদী

সিকিমের মনখিম থেকে ঋষিখোলার দূরত্ব কমবেশি ১৫ কিমি। তাই মনখিম থেকে জলখাবার খেয়ে ধীরেসুস্থে বেরিয়েছিলাম। পথে দু-একটা মনাস্ট্রি, মন্দির ঘুরে আমরা যখন ঋষিখোলায় পৌঁছলাম, তখন ঘড়ির দুটো কাঁটা এক হয়ে মিলে গেছে বারোটায়। মানচিত্র অনুযায়ী এখন আমরা সিকিমের আওতায়। পাহাড়ি রাস্তায় চলতে চলতে বেশ কিছুটা সময় ধরে অনেক নিচে ঋষিনদীকে বয়ে যেতে দেখছিলাম। তারপর হঠাৎ একটা পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে আমাদের গাড়িটা হঠাৎ মুখ গুঁজে নিচে নামতে শুরু করল। উৎরাই পেরিয়ে দ্রুত পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে গেলাম। এবার ঝিরঝিরে নদী সাঁতরে, গাড়িটা সটান আমাদের পৌঁছে দিল হোমস্টের দরজায়, যেটা আবার পশ্চিমবঙ্গে। সামনে ফুলের বাগান, রকমারি গাঁদা আর মরসুমি পাহাড়ি ফুল চারদিক আলো করে ফুটে আছে। নদীখাত থেকে উন্মুক্ত সিঁড়ি দিয়ে উঠে টানা বারান্দা। আর বারান্দার ধারে ধারে থাকার ঘর। বারান্দা রেখে আরো খানিক এগিয়ে গেলে টিনের বড় ছাউনির নিচে কিচেন আর ডাইনিং হল। একসাথে তিরিশ থেকে পঁয়তিরিশ জন অতিথির বসে খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।


অরণ্যপথ
পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে কেটে এই হোমস্টেটা বানানো। আবার ঘরের সামনের বারান্দায় দাঁড়ালে সামনে অল্প নিচ দিয়ে বয়ে চলছে অপ্রশস্ত ঋষি নদী। নদীর অপর প্রান্তে সিকিমের পাহাড়। নদীর উপর বাঁশ দিয়ে সাঁকো করা আছে, পারাপারের জন্য। যদিও নদীতে খুব অল্প জল, পাথর টপকে টপকে অনায়াসেই পার হয়ে ওপারে (সিকিমে) পৌঁছনো যায়। নদীর এপার-ওপার দুই রাজ্য, ব্যাপারটা কিন্তু ভাবতেই বেশ রোমাঞ্চকর। নদীর জল ঝকঝকে কাচের মতো স্বচ্ছ। সেই আয়নাজলে ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট মাছ তিরতির করে ভেসে চলেছে। পাহাড়ের দুই  কোল জুড়ে সারিসারি গাছ। মাথার ওপর মেঘহীন নীল আকাশ। আকাশের সেই নীলাম্বরী ছায়া বুকে নিয়ে ছুটে চলেছে তিরতিরে নদী। ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন বসন্ত ঋতু হলেও ঋষিখোলা কিন্তু সব ঋতুতেই চিরবসন্তে ভাস্বর।


হোমস্টে, ঋষিখোলা

পাহাড়ের কোলে নদীর ধরে পরপর বেশ কয়েকটি হোমস্টে গড়ে উঠেছে। স্থানীয় মানুষেরা নিজ উদ্যোগে অথিতিদের আহার আর রাত্রিবাসের ব্যবস্থা করে থাকেন। সকালের জলখাবারে পুরি, সবজি, চা। দুপুরে ভাত, ডাল, সবজি আর ডিমের ঝোল। রাতে ভাত অথবা রুটি, সবজি, স্যালাড আর চিকেন কারী। সব পাহাড়ি হোমস্টেতেই খাবারের মেনু প্রায় এক। নদীর পাশে হলেও, খাওয়ার জন্য বড় মাছ এইসব পাহাড়ি নদীতে অপ্রতুল।

জলখাবার খেয়ে আশপাশটা একটু ঘুরতে বেড়োলাম। দূরে পাহাড়ের উপর একটা শিবমন্দির আছে। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য সেই মন্দির। নদীর তীর ধরে এগিয়ে খানিকটা চড়াই পেরিয়ে চলে এলাম অগভীর জঙ্গলের মাঝে। সারিবদ্ধ পাহাড়ি গাছের মাঝখান দিয়ে সরু পায়ে হাঁটা পথ, পাশে ঝিরঝির করে একটানা নদী বয়ে চলেছে। লোকবসতি নেই, চারপাশে শুধু অখণ্ড নিস্তব্ধতা, সারিবদ্ধ পাইন গাছ। কয়েকটি পাখি অতর্কিতে শিস দিয়ে যাচ্ছে, শুনিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ি সুর। মাথার উপর গাঢ় নীল আকাশ, পায়ের নিচে স্বচ্ছ জলের কলতান। কোলাহল মুক্ত, দূষণ মুক্ত, শহুরে যান্ত্রিকতা থেকে বহু যোজন দূর, প্রকৃতি যেখানে ভরে রেখেছে অপার সম্ভার।


প্রকৃতির মাঝে আমি

পায়ে পায়ে পথ চলে গেছে নদী পেরিয়ে, পাহাড় ডিঙিয়ে। এপ্রান্তে পথ শেষ, সরু বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে চলে এলাম নদীর অপর পারে, পাহাড়ে ধাপে ধাপে পা দিয়ে পৌঁছে গেলাম বেশ খানিক উঁচুতে। এখানে নিচের জায়গাটা বিস্তীর্ণ উপত্যাকার মতো দেখতে লাগছে। সেই আপাত সমতলে স্থানীয় মানুষেরা চাষ করেন। বিছিয়ে রয়েছে পাহাড়ি শস্যের শ্যামল আঁচল। সকালের নরম আলোয় পাহাড়িয়া এক বধূ একান্তে বীজবপন করে যাচ্ছে সেই নাতিপ্রস্থ কৃষি প্রান্তরে। আচমকা মনের মধ্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওর্থের 'সলিটারি রিপার' যেন গুনগুন করে উঠল।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা প্রায় বাস-রাস্তার কাছে চলে এসেছি। নদীর এদিকেও পাহাড়ি পথে খানিকটা উতরাই পেরিয়ে নদীর কোলে দু-একটা হোমস্টে আছে। সেক্ষেত্রে বড়রাস্তা অবধি গাড়ি আসে। তারপর পর্যটকরা পায়ে হেঁটে ওই উতরাইটুকু নেমে নদীর কোলের আস্তানায় আসেন। আবার ফেরার পথেও, পায়ে হেঁটে চড়াইটুকু পেরোতেই হয়। সঙ্গের মালপত্রের জন্য স্থানীয় পোর্টাররা ভরসা। শেষ চড়াইটুকু পেরোতে গিয়ে দেখি এক স্থানীয় কিশোর, বয়স ষোলো কী সতেরো, পিঠে পর্যটকদের মালপত্র সমেত বিশাল ঝুড়ি নিয়ে হেঁটে চলেছে। কথা বলে জানলাম, স্থানীয় স্কুলে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছে সে। তারপর পড়াশুনা ছেড়ে, সংসারের প্রয়োজনে বাপ-দাদাদের পেশাকে বেছে নিয়েছে। ঘরে মা আর ছোট বোন আছে। দু-দণ্ড দাঁড়ানোর সময় তার নেই। মালপত্র সঠিক সময়ে গাড়িতে পৌঁছে দিতে হবে। এগিয়ে চলেছে সে পাহাড়ি পথের পাথর ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে। পিঠে বিশাল বোঝার ভারে নুয়ে গেছে তার মাথা। প্রবল কষ্টে মুখ দিয়ে ঝরে পড়ছে লালা। চিরবঞ্চিত সমাজের প্রতিনিধি, এই কিশোরটিকে দেখেই আমি কাব্য, প্রকৃতি, নদী, সলিটারি রিপার সব ভুলে গেলাম। অসামান্য প্রকৃতির পেলব পর্দা সরে গিয়ে, চোখের সামনে ভেসে উঠল চলমান জীবনের একটা নির্মম চালচিত্র। কষ্টে দুচোখ আমার ভারী হয়ে উঠল।
ক্ষুধার রাজ্যে এই পৃথিবী বড়ই গদ্যময়…
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)