প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Monday, September 15, 2025

সম্প্রীতি রক্ষার দায় কার? | গৌতম সমাজদার

বাতায়ন/শারদ/অন্য চোখে/৩য় বর্ষ/২২তম সংখ্যা/১লা আশ্বিন, ১৪৩২
শারদ | অন্য চোখে
গৌতম সমাজদার
 
সম্প্রীতি রক্ষার দায় কার?

"ভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুসারীদের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতপ্রতিকূল এবং শত্রু বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িকতা হল ধর্মের রাজনৈতিক বাণিজ্য। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের আনুমানিক পরিণতি।"


শিক্ষা-সংস্কৃতি, সভ্যতা ও মানবিক মূল্যবোধের ধারক ও বাহকের নাম মানব। যারা এই মানবতাকে লালনপালন করে না, তারা সত্যিই অমানুষ। তারা তো মানবতার, সভ্যতার কলঙ্ক। ধর্মের অনেক সংজ্ঞা থাকলেও মানুষের কল্যাণই সব ধর্মের মূল কথা। যদি তা লঙ্ঘিত হয়, তবে তা ধর্ম হওয়ার মর্যাদা রাখে না। রাজনীতিও মূলত মানুষের মঙ্গলের জন্য। যা আমাদের দুর্দশার কারণ হয়, নিপীড়নের, নির্যাতনের কারণ হয়, তা মোটেই রাজনীতি নয়। একটি প্রবাদ আছে, আমরা


 সবাই ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষ, যতক্ষণ বর্ণ আমাদেরকে ভিন্ন না করে, ধর্ম আমাদেরকে বিচ্ছিন্ন না করে। রাজনীতি আমাদের বিভাজিত না করে এবং সম্পদ আমাদেরকে শ্রেণীবদ্ধ না করে। কিন্তু আজ মানুষ বড় অসহায় এই ধর্ম, বর্ণ, রাজনীতি, সম্পদ ও সমস্যাকেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায়। অনেকে মনে করেন, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কেবলই এক মিথ এবং তার প্রচার বাস্তব অর্থে নিজেদের ভোলাবার জন্য। একের পর এক অপ্রীতিকর, ভয়ঙ্কর সব ঘটনার পর যা সাম্প্রদায়িক হামলা নামে পরিচিত। এই হামলায় কখনো কখনো মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। পূর্বে এই দাঙ্গা হয়েছে উভয় পক্ষের তৎপরতায়। অনেকে ভারতের আগষ্টের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরের সময়কে চিহ্নিত করে। কিন্তু ভারত ভাগের পর আশা করা গিয়েছিল, এই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বন্ধ হবে। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে দেখা গেল, দাঙ্গা, হত্যাকাণ্ড বন্ধ হয়নি। এই দাঙ্গা বন্ধ হয়নি কারণ মূল দূর করার কোন সদর্থক ভূমিকা গ্রহণ করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক, ধর্মীয় দলগুলি এই কাজে মদত দিয়েছে নিজ নিজ স্বার্থে। তাই এই সমস্যা আজও বহাল তবিয়তে বিরাজ করছে। প্রতিদিন তা বাড়ছে। কখনো কখনো তা প্রশাসনের হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।
 
সাম্প্রদায়িকতা কী? এটি একটি বিশ্বাস যে একই ধর্মের অনুসারীদের একই ধর্মনিরপেক্ষ স্বার্থ থাকে অর্থাৎ তাদের একই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বার্থ থাকে। তাই সামাজিক-রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব হয়। ভারতের মতো বহু ধর্মীয় সমাজে, এক ধর্মের এই সাধারণ ধর্মনিরপেক্ষ স্বার্থগুলি অন্য ধর্মের অনুসারীদের স্বার্থ থেকে ভিন্ন। ভিন্ন সম্প্রদায়ের অনুসারীদের স্বার্থ সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গত, প্রতিকূল এবং শত্রু বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সাম্প্রদায়িকতা হল ধর্মের রাজনৈতিক বাণিজ্য। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হল সাম্প্রদায়িক মতাদর্শের আনুমানিক পরিণতি। দুর্ভাগ্যের হলেও স্বাধীনতার পর থেকে ভারতে পাঁচ হাজারের বেশি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়েছে। বেশিরভাগই হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে। এর মূল কারণ নেতিবাচকতা, সঙ্কীর্ণতা, অন্যায্য অর্থ, সমাজের স্বার্থকে উপেক্ষা করা। সমাজের স্বার্থকে উপেক্ষা করে, ধর্মীয় অনুভূতির ভিত্তিতে উস্কানি দেওয়ার ক্ষেত্রে যে অন্যায়ের পথ নেওয়া হয়, তার মধ্যে প্রধান হল ভারতে গত ৫৭ বছরে সংঘটিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা স্পষ্টভাবে লক্ষিত হয়।
 
ভারতবর্ষ বৈচিত্র্যের দেশ। বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দেশ। এমন একটি দেশে যদি সরকার একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষকে রক্ষা করে, যারা সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে তাদের নিজস্ব স্বার্থ পূরণ করতে প্রস্তুত। তারা ভয় ছাড়াই তা করতে পারে। ভারতে সাম্প্রদায়িকতা সমস্যার প্রধানত দুটি কারণ— নীরব এবং স্পষ্ট। দারিদ্র, নিরক্ষরতা এবং বেকারত্ব অনেক বাধ্যবাধকতা তৈরি করে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। ধর্মীয়, রাজনৈতিক আর একটি হল আর্থ-সামাজিক এবং চতুর্থটি হল আন্তর্জাতিক। এগুলোই মৌলবাদকে উৎসাহিত করে।
 
তাই এই সাম্প্রদায়িকতার সমস্যা কোনভাবেই লঘু করা উচিত নয়। বিজ্ঞানসম্মত পথে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাহাঙ্গামার ন্যায় বিপজ্জনক একটি সামাজিক ব্যাধির কারণ খুঁজে সমাধানের রাস্তা বার করা উচিত। শুধুমাত্রই হিংসা, দাঙ্গার বিরুদ্ধে কুফলের নিন্দা করলেই বা শান্তি বজায় রাখার পক্ষে সওয়াল করলেই হবে না, বক্তৃতায় সমবেত গলা ফাটিয়ে মৈত্রীর মহিমায় জয়গান করলেই এর সমাধান হবে না। শক্তিশালী ব্যক্তিত্বও যখন কেবলমাত্র জাতীয় স্বার্থ, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের নামে আবেদন করেও সাম্প্রদায়িকতাকে ধ্বংস করা সম্ভব হয়নি। দেশের অসম্পূর্ণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পূর্ণ করার কষ্টকর পন্থা এড়ালে এক্ষেত্রে সাফল্য আসা সম্ভব নয়।
 
এই যে মানুষকে সাম্প্রদায়িক করে তোলা, এর দায় কিন্তু রাষ্ট্রের। মানুষ দেখছে উগ্রবাদীরা হিন্দুদের ওপর বারবার হামলা করছে। তাদের কোন শাস্তি হচ্ছে না। উলটোটা হলেও একই বিষয়। এতে মৌলবাদীরা সাহস পায়। মানুষ দেখছে মৌলবাদীরা হামলা করছে। তাদের শাস্তি না দিয়ে ভুক্তভোগীদের ধরে ধরে শাস্তি দিচ্ছে। এটাই কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতার এই স্ক্রিপ্ট দেখে সবাই অভ্যস্ত। যে ভারতবর্ষ গড়তে সব ধর্মের মানুষ রক্ত দিয়েছে, সেই দেশে যদি কার ধর্মের জন্য হামলার শিকার হতে হয়, এর চেয়ে কষ্ট আর লজ্জার কী হতে পারে? উগ্রবাদী ধর্মান্ধদের আসলে কোন ধর্ম নেই।
 
একটি সুস্থ সমাজ হল ভালবাসা, যত্ন এবং বোঝাপড়ার এক  নিখুঁত মিশ্রণ। ঐক্যবদ্ধভাবে বাস করা, সম্পর্কের মধ্যে কোন বিশ্বাস থাকছে না। আমাদের সহনশীল হতে হবে। আমরা যেন একে অপরের ধর্ম, বর্ণ, মর্যাদা এবং সংস্কৃতিকে সম্মান করি। প্রতিটি মানুষের নিজ ধর্মের পালন নিশ্চিত করতে হবে। যেকোন সমস্যায় বসে মুখোমুখি আলোচনা করতে হবে। নেতিবাচক বিষয়গুলি পরিহার করতে হবে। মিডিয়াকে দায়িত্বশীল হতে হবে। বিভিন্ন মিডিয়ায় ঘৃণামূলক বক্তব্য, ভুয়ো খবর প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে উৎসাহিত করে, সন্দেহের সৃষ্টি করে একে অপরের প্রতি।
 
আমরা সবাই জানি দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি না থাকলে উন্নয়ন অসম্ভব। সম্প্রীতি বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়। এটি হল শাসনব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মূল অংশ। এটা নির্ভর করে ক্ষমতাচর্চার ওপর। অনেক ধর্মীয় নেতাদের ঘৃণামূলক, বিদ্বেষমূলক প্ররোচনা বন্ধ করা উচিত এবং প্রয়োজনে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আকাশ থেকে পড়ে না, মাটিতেও জন্মায় না। সম্প্রীতি হল দীর্ঘ অনুশীলনের বিষয়। রাজনীতি ও ধর্মীয় মাঠে হিংসা জিইয়ে রেখে দেশে শান্তি ও সহিষ্ণুতা আশা করা যায় না।
 
পশ্চিমবঙ্গের বাদুড়িয়া এবং বসিরহাটে যা ঘটছে তা একটি সতর্কতা। দার্জিলিঙে যা ঘটছে তা একটি সতর্কতা। যখন মানুষকে তাদের খাবারের পছন্দের জন্য পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে, তখন এটি সতর্কতা। বর্তমান ভারতে দলিত আদিবাসী এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের সঙ্গে যা ঘটছে তা একটি সতর্কতা। যেকোন দিন এই বিপদের বিস্ফোরণ হতে পারে। পুরো জাতিকে জ্বালিয়ে দিতে পারে। তাই এটা উদাসীনতার সময় নয়। অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা এক ভয়াবহ বিপদের আঁচ ক্রমশ পড়তে শুরু করেছে। যখন সব রাজনৈতিক দল এক্ষেত্রে গভীর ঘুমে ডুবে থাকে, তখন সাধারণ মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। এক্ষেত্রে সম্প্রীতি গড়ে তোলার জন্য একে অপর ধর্মের মানুষকে জানুন। একে অপরের উৎসবে সামিল হোন, বন্ধন গড়ে তুলুন। রক্তদান শিবির করার মধ্য দিয়ে বন্ধন রচিত হয়। বুঝব আমরা সবাই ভাইবোন। দরিদ্রের জন্য রান্নাঘর বা খাবারের ব্যবস্থা করুন। একে অপরের সাথে সময় কাটাতে হবে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ওপর সিনেমা, প্রদর্শনী করা উচিত। বিকল্পে সাহিত্যে ফুটিয়ে তুলতে হবে সম্প্রীতির বার্তা। করতে হবে সেমিনার, কর্মশালা। প্রয়োজনে প্রতিবাদ, সমাবেশ, আবেদন। উন্নত ভারতের জন্য সব ধর্মের মানুষকে নিয়ে গাছ লাগান। সবাই মিলে খাদ্য উৎসব করুন। আসুন, সেই উন্নত, সমৃদ্ধশালী ভারতের জন্য স্বপ্ন দেখি, একসাথে কাজ করি।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)