প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | রাজদণ্ড

বাতায়ন/ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ৬ষ্ঠ সংখ্যা/ ২রা আষাঢ় , ১৪৩৩ নাসির ওয়াদেন সংখ্যা | সম্পাদকীয়   রাজদণ্ড "অগণিত ছাপো...

Tuesday, November 25, 2025

সামান্তার অপেক্ষা [৮ম পর্ব] | মমিনুল পথিক

বাতায়ন/ধারাবাহিক গল্প/৩য় বর্ষ/৩তম সংখ্যা/০৪ঠা পৌষ, ১৪৩২
ধারাবাহিক গল্প
মমিনুল পথিক
 
সামান্তার অপেক্ষা
[৮ম পর্ব]

"অনেক ভোরে আজ ঘুম ভেঙেছে সামান্তার। কোন মতেই আর ঘুম আসছে না তার। সারাক্ষণ মাসউদের মিষ্টি শুভ্র দেহখানা তার চোখের পাতায় ভাসছে। যেন কিছুতেই মুছতে পারছেন না তিনি।"

 
পূর্বানুবৃত্তি সামান্তা খাতা পেয়ে এবং মাসুদের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় খুব খুশি। রং ধরে সামান্তার মনে, মায়ের চোখেও তা গোপন থাকে না। তারপর…

প্রায় দুশো কিলোমিটার রাস্তা পাড়ি দিয়ে এসে এমনিতেই মাসদ ক্লান্ত আজ টিউশনি করতে যাবেন কিনা দ্বিধার মধ্যে ছিলেন। কিন্তু এক্ষণে সামান্তার খবর শুনে যেন সিদ্ধান্ত ফাইনাল- আজকে টিউশনিতে যাবেন না। মোবাইলে ব্যালেন্স শূন্য, গলির মোড় থেকে পঞ্চাশ টাকার একটি কার্ড কিনে আনলেন। কোমরের নীচে বালিশ নিয়ে দেয়াল হেলান দিয়ে সামান্তার নাম্বারটি খুঁজতে থাকেন। নাম্বার পেয়ে রিং করেন মাস,
-হ্যালো আসসালামু আলাইকুম, সামান্তা ম্যাডাম বলছেন? আমি মাসউদ বলছি।
অপর প্রান্ত হতে সামান্তা সালামের জবাব দিয়ে বললেন,
-জ্বি চিনতে পেরেছি, আসলে রিং আমিই করতাম; একটু দরকার ছিল।
-না ঠিক আছে ধলার মা’র কাছে শুনলাম...।
কথা বলা শেষ না হতেই সামান্তা বললেন,
-হ্যাঁ আমি আপনার কাছে গিয়েছিলাম। আম্মা বলছিলেন কিনা যে আমাদের বাসায় একটু চা খেয়ে যাবেন। কিন্তু আপনাকে না পেয়ে ফিরে এসেছি।
-আসলে আমারই ভুল হয়েছে, আপনাকে বলে যেতে পারিনি। হঠাৎ বাড়িতে যেতে হল, মায়ের অসুখ করেছিল কিনা তাই।
-আমি তো আর এমন কেউ নই যে আমাকে বলতেই হবে।
অভিমান করে কথাটি বলে সামান্তা।
-ছি! অমন করে বলবেন না, কষ্ট পাব। আসলে-
-থাক, আর বলতে হবে না। এখন বলুন বাড়ির খবর ভাল তো, বাবা, মা ভাল আছেন?
খুব আগ্রহের সাথে কুশলাদি জানতে চায় সামান্তা।
-মা এখন অনেকটা ভাল।
-মাসদ সাহেব আপনার অবসর আছে কি?
সামান্তার মনে রঙিন প্রশ্ন।
-জ্বি, কিন্তু কেন বলুন তো ম্যাডাম?
-আপনি ম্যাডাম সম্বোধনটা ছেড়ে কথা বলুন না।
-আপনি হলেন বড়লোকের মেয়ে, তাছাড়া আপনি স্কুলের শিক্ষক, সুতরাং ম্যাডাম বললে দোষের কী?
সামান্তা আর কথা বাড়ালেন না। শুধু বললেন,
-আচ্ছা বেশ আগামীকাল আমদের বাসায় রাতে খাবেন, আসবেন কিন্তু। মা আপনাকে আসতে বলেছেন।
-আচ্ছা চেষ্টা করব ইন্শআল্লাহ।
-শুধু চেষ্টা করলে হবে না, আসতেই হবে।
-তাহলে রাখি।
এই বলে মাসদ মোবাইলের লাইনটি কেটে দেন।
 
পরদিন মাসদ অফিস শেষে শহরের অভিজাত মিষ্টির দোকান থেকে মিষ্টি নিয়ে সামান্তার বাড়িতে যান। সামান্তা যারপর নাই খুশি । মা সাহানা চৌধুরী মাসদের সাথে দেখা করলেন, কথা বললেন। বুঝলেন বেশ ভদ্র ছেলে, যদিও চোখে-মুখে দারিদ্রের ছাপ। কিন্তু অর্ন্তচক্ষু দিয়ে অজান্তেই মেয়ের পাশে বসিয়েছেন মাসদকে। বেশ মানাবে দুজনকে, একেবারে সোনায় সোহাগা।
-মা কী ভাবছ তুমি?
-কিছু না।
মেয়ের কথায় হতচকিত হয়ে রান্নাঘরে চলে যান তিনি।
 
সামান্তা ও মাসউদ খোশ গল্পে মেতেছেন। অল্প কয়েকদিনে বেশ সম্পর্ক হয়েছে তাদের মাঝে। ইতিমধ্যে চা-পর্ব সমাপ্ত হয়েছে। রান্না হতে দেরি হওয়ায় অগত্যা আরও কিছু সময় পেলেন তাঁরা। আসলে নারীর বুক ফাটে কিন্তু মুখ ফোটে না প্রথম দেখাতেই মাসউদকে ভাল লেগেছিল সামান্তার। মনে মনে মনবাগানে ভালবাসার গোলাপ ফুটিয়েছেন সামান্তা।
 
খাবার তৈরি হওয়ায় খাওয়ার জন্যে ডাক পড়ল তাদের। নিজে হাতে মাসউদকে খাওয়ালেন সামান্তা। ভালবাসার মানুষকে তৃপ্তি সহকারে খাওয়ালে কত যে আনন্দ সামান্য উপলব্ধি মাত্রই বোঝা যায়। নানারকমের ব্যঞ্জনা রান্না করেছেন সাহানা চৌধুরী। খেতে খেতে মাসউদের পেট ফেটে যাবার উপক্রম।
 
সময়ের ব্যবধানে সামান্তা ও মাসদ অনেকদূর এগিয়েছে। তারা একে অপরকে গভীর ভাবে ভালবাসে। যদিও প্রথমে মাসদের আপত্তি ছিল কিন্তু সামান্তা নাছোড়বান্দা।
 
একদিন সামান্তা মাসদের মেসে দেখা এসে বলেন,
-মাসদ জীবনে এই প্রথম পুরুষ আমি তোমাকে পেলাম যাকে ভালবাসা যায়।
একদিন সামান্তা তার মায়ের নিকট মাসদকে ভাল লাগার কথাটি বলে ফেললেন। এ ব্যাপারে সাহানা চৌধুরীর অভিমত মেয়ে সুখী হলেই তাদের সুখ। স্বামীকে কথাটি বলতে গিয়েও সাহস হয়নি তার। অগত্যা মেয়ে নিজেই বাবা শাহানুর চৌধুরীকে খুব ভয়ে ভয়ে বলে ফেললেন।
 
-ধন্যি মেয়ে, সাবাস বেটি, এই না হলে তুমি চৌধুরী বংশের মেয়ে?
মেয়ের পিঠ চাপড়ে আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে কথাগুলো বলে ফেললেন সামান্তার বাবা। তিনি একটা বিষয়ে খুব ওয়াকিবহাল যে, তার মেয়ে অন্তত এ ব্যাপারে কোন ভুল করবে না, সে ঠিকই একজন রত্ন বেছে নেবে।
 
বাবা অমন করে রাজি হয়ে যাবেন ভাবতে পারেনি সামান্তা। দেরি না করে তার ঘরে গিয়ে মাসদকে মোবাইলে জানিয়ে দেন ব্যাপারটি।
 
সামান্তা বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে। খবরটি মাসদকে দেওয়ার জন্য মেসের সবাকে মিষ্টিমুখ করাবেন বলে মিষ্টি নিয়ে গেছেন সেখানে। মাসদের মেসমেটরা সবাই খুশিতে আটখানা। মিষ্টি খাওয়া শেষ হলে অল্পক্ষণ পরে মাসদকে সাথে নিয়ে সামান্তা বেরিয়ে পড়লেন।
 
সামান্তার চাকুরির খবর মাসদকে কতটুকু খুশি করেছিল তিনি নিজেই জানেন না। কারণ তাঁর কাছে মনে হয়েছিল এটা একটা অসমপ্রেম। তাঁর আর সামান্তার মধ্যে বিস্তর ফারাক। তাই তো তিনি হীনমন্যতায় ভুগছেন হয়তো। কল্পনা আর বাস্তব এক নয়। কল্পনার রঙিন জগতে রাজা-বাদশা সেজে সিংহাসনে আরোহন করা কিংবা সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়া সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তার প্রতিফলন বড়ই দুঃসহ ব্যাপার। এই অসমপ্রেম একদিন হয়তো কাচের আয়নার মতো টুকরো হয়ে যাবে সেই সাথে দুটো জীবনও। এই নানা ভাবনাচিন্তা পড়েন মাসুদ। মাঝে মাঝে ভাবতে থাকেন কেনইবা সামান্তার সাথে তার পরিচয় হলো? না হওয়াটাই বুঝি ভাল ছিল।
 
অনেক ভোরে আজ ঘুম ভেঙেছে সামান্তার। কোন মতেই আর ঘুম আসছে না তার। সারাক্ষণ মাসউদের মিষ্টি শুভ্র দেহখানা তার চোখের পাতায় ভাসছে। যেন কিছুতেই মুছতে পারছেন না তিনি। তার চোখের সামনে ভাসে গতকালের স্মৃতিগুলোও। এক সাথে হাত ধরে বেড়ানো। নদীর ধারে বসে গল্প করা, পার্কে বসে বাদাম খাওয়া। নানা স্মৃতি। আবার নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবেন, কী অদ্ভুদ সব ভাবছি আমি? বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন শেষ করে এখন কী ভীমরতি ধরেছে তাকে? মাসুদ আর আমার মাঝে আকাশ-পাতাল ব্যবধান? তবুও নিজেকে বুঝায় সে। সেও তো মানুষ। ধনী গরিবের ব্যবধান সবাই চিন্তা করলে মনের মানুষকে পাবে কীভাবে? হোক সে গরিব। মাসদই আমার নিকট সবচেয়ে ধনী।
 
পিএসসির গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর নিয়োগপত্র হাতে পান সামান্তা। তারপর একদিন সরকারি কলেজে যোগদান করেন তিনি। কপাল জোরেই নিজ জেলায় পদায়নও পেয়েছেন।
 
সামান্তা যোগদান করার প্রায় মাসখানেক পর মাসদের বদলি আদেশ আসে। মাসদ সামান্য বিচলিত হলেও সামান্তার মাথায় যেন বজ্রপাত পড়ে। সামান্তার ইচ্ছা মাসুদের বদলি আদেশ স্থগিত করবেন। কিন্তু মাসদ তাতে রাজি হয় না। এতে দুজনের মধ্যে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়।
 
আজ মাসদের বিদায়ের দিন। সহকর্মীরা সবাই যে যার মতো অনুশোচনা করছে। দু-এক জন রুমাল দিয়ে চোখ মুছেন। বদলির কাগজপাতি সব তৈরি হয়েছে। বিদায়ের সময় অফিসের বড় কর্তা খন্দকার রাশেদ করিম তার হাতে একটি উপহারের মোড়ক তুলে দেন। মাসদ স্যার ও পুরুষ সহকর্মীদের সাথে কোলাকুলি করে চোখের জলে বিদায় নিলেন।
 
সামান্তার ক্লাশ শেষ করে রিকশা নিয়ে যেন বাতাসের বেগে ছুটছেন। পথেই দেখা হয় মাসদের সাথে। দুজনে এক সাথে মেসে যান। ধলার মা ডুকরে ডুকরে কাঁদছে।
-আল্লাহগে এত ভালা মানুষ আর কই পামু গে।
মাসুদ ঢুকতেই কান্নার শব্দটি আরো তীব্র হয়। মাসুদ ধমক দেয়।
-খালা, কান্না থামাও। মানুষ মরছে নাকি?
 
-ওরে বাপরে, তোমার যাওয়া আমি সইতে পারমু না রে বাবা।
বিলাপ করতেই থাকে ধলার মা। ততক্ষণে সামান্তাও চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। মাসদ বেডিংপত্র একটি ভ্যানের উপর তুলে দিয়ে নিজে একটি রিকশায় ওঠে সামান্তার নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বাসস্ট্যান্ড অভিমুখে রওনা হন
 
সামান্তা মাসুদের যাত্রা অভিমুখে নিথর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। তখনও তার গন্ডদ্বয় দিয়ে অশ্রু ঝরছিল।
 
সমাপ্ত

No comments:

Post a Comment

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)