প্রাপ্তমনস্কদের পত্রিকা ~ ~ ~ নাম নয় মানই বিবেচ্য

আতঙ্ক | সাগর না কুয়ো

বাতায়ন/ আতঙ্ক / সম্পাদকীয় /৪র্থ বর্ষ/ ২য় সংখ্যা/১ ৭ই বৈশাখ ,   ১৪৩৩ আতঙ্ক | সম্পাদকীয়   সাগর না কুয়ো "যদিও এখানে পিংপং-সাহিত্য বা চটি...

Saturday, November 1, 2025

প্রদীপের শিখা | অদিতি চ্যাটার্জি

বাতায়ন/নৃপেন চক্রবর্তী সংখ্যা/ছোটগল্প/৩য় বর্ষ/২৮ সংখ্যা/১৪ই কার্ত্তিক, ১৪৩২
নৃপেন চক্রবর্তী সংখ্যা | ছোটগল্প
অদিতি চ্যাটার্জি
 
প্রদীপের শিখা

"দৌড়ানোর সময় অনিন্দ্যবাবু গঙ্গার ঘাটের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যানভয়ে কেঁদে মা বলে ডেকে ওঠেন। সেইসময় অনুভব করেন মাথায় একটা ছোঁয়া আর নাকে হালকা চন্দনের গন্ধ। ভয়ে বন্ধ করা দুই চোখের সামনে দেখেন প্রদীপের শিখা।"

 
গঙ্গার ধারে অনিন্দ্যবাবুদের ভদ্রাসনে আজ সবাই ব্যস্ত, বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত মা "দয়াময়ী কালী"র আজ পুজো, আজ শ্যামা পুজো। কষ্টি পাথরের মা, আট বছরের ছোট্ট মেয়ে, যাকে লাল বেনারসি আর সাবেক সোনার গয়নায় সাজানো হচ্ছে। মা দয়াময়ীর নামে অনিন্দ্যবাবুর ঠাকুরদা এই বাড়ির নামকরণ করেন "দয়াময়ী কুঠি"। ঠাকুরদালানে একধারে চুপ করে বসে আছেন অনিন্দ্যবাবু, মায়ের সাজানো দেখছেন নাকি মাকে দেখছেন? বোঝা যায় না।
 
আজ বাড়ি আলোয় সাজবে, তার তদারকি করছে অনিন্দ্যবাবুর দুই ছেলে, ঠাকুরদালানের পাশে একটা ছোট্ট ঘরে মা-র ভোগের উপকরণ, কাঁসার সাবেক বাসন নিয়ে বসেছেন তার বৌ বসুধা আর বোন মাধবী। পরিজন-প্রতিবেশী বিকেল হলেই এই ঠাকুরদালানে চলে আসবে মা দয়াময়ীর পুজো দেখতে।
 
অনিন্দ্যবাবু একটু হাসেন আপন মনে, মায়ের আশীর্বাদে দয়াময়ী কুঠির মানুষের জীবন আজও আলোকময়। এই মাত্র শ্রীলেখা তার ছেলের বৌ এসে এক গ্লাস শরবত দিয়ে গেলেন, অনিন্দ্যবাবু একটু চুমুক দিয়েছেন গ্লাসে এমন সময় তাঁর নাতি রনি এসে হাজির, "ও দাদু গল্প বলো মা দয়াময়ীর"। এই নাতিটি তার বোন মাধবীর নাতি। ক্লাস ফোর। নিশ্চিত দাদা-দিদিরা পাত্তা দিচ্ছে না তাই দাদুকে মনে পড়েছে। অনিন্দ্যবাবু হেসে বলেন, "পুরোনো গল্প কি তোর ভাল লাগবে?" "লাগবে দাদু বলো প্লিজ"।
 
অনিন্দ্যবাবু একটু হাসেন, "জানিস তো এই মা দয়াময়ীকে আমার ঠাকুরদা বীরভূম থেকে নিয়ে এসেছিলেন, এই বাড়িতে একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে আছেন। সবাই মন দিয়ে পুজো করতেন এই আমি ছাড়া। আমি খালি প্রসাদ খেতাম" বলে আপন মনে হেসে ওঠেন।
 
একবার ট্রেন খুব লেট করেছে, ধর আজ থেকে পঁয়তাল্লিশ বছর আগের কথা বলছি, সেই সময়ে খুব অশান্তি চলছে এই শহরে, রাত বেশি হলে লোক দেখা যায় না রাস্তায় আর। স্টেশনে নেমে আমার খুব ভয় করছে, হালকা শীত পড়েছে কিন্তু ভয়ে আমার হাত ঠান্ডা। জোরকদমে চলছি, আর সেই প্রথম মা দয়াময়ীকে ডাকছি। বিশ্বাস কর আমি শুনলাম, ফাঁকা রাস্তায় জুতোর আওয়াজ। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখার সাহসটাও নেই।" এই পর্যন্ত বলে অনিন্দ্যবাবু থামলেন। দেখেন রনি চোখ বড় করে শুনছে। "তারপর আর কী গঙ্গার ঘাটটা চোখে পড়ল, সামান্যই পথ দৌড়ালাম, বাড়িতে চলে এলাম আর জুতোর শব্দ পাইনি। এই ঘটনার ব্যাখ্যা কী দাদুভাই আমি জানি না।"
 
অনিন্দ্যবাবু দেখেন মা গয়নায় সেজেছেন, গলায় একটা গোলাপের মালা। এই বাহাত্তর বছর বয়সে এসে, সেদিনের সব সত্যি কথা অনিন্দ্যবাবু কাউকে বলেননি। দৌড়ানোর সময় অনিন্দ্যবাবু গঙ্গার ঘাটের কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যান, ভয়ে কেঁদে মা বলে ডেকে ওঠেন। সেইসময় অনুভব করেন মাথায় একটা ছোঁয়া আর নাকে হালকা চন্দনের গন্ধ। ভয়ে বন্ধ করা দুই চোখের সামনে দেখেন প্রদীপের শিখা। এরপর সাহস করে উঠে, হেঁটে বাড়িতে যান।
 
অনিন্দ্যবাবু কোনো ঘটনারই ব্যাখ্যা খুঁজতে চেষ্টা করেননি, শুধু উপলব্ধি করেছেন জীবনের চরম সংকটে দেখতে পেয়েছেন প্রদীপের  শিখা। যা লড়াই করতে অনিন্দ্যবাবুকে সাহায্য করে গেছে।
 
রনি দেখে তাঁর মামাদাদুর চোখে জল, দাদু মা দয়াময়ীর দিকে তাকিয়ে গেয়ে চলেছে, "জনমেতে তোরই কোলে / মরণেতে নিস মা তুলে / মায়ের কোলে ঘুমায় ছেলে / এ শান্তি মা কোথায় বল..."
 
সমাপ্ত

1 comment:

  1. একেবারে উজ্জ্বল আলোময় শিখা প্রদীপের 🩸

    ReplyDelete

খাবারের সন্ধানে ~~~


Popular Top 10 (Last 7 days)